Translate

Thursday, January 9, 2020

মর্নিং স্কুল আধুনিক শিশুর অভিশাপ ? শৈশবের অন্তর্জলি।

মর্নিং স্কুল আধুনিক শিশুর অভিশাপ ? শৈশবের অন্তর্জলি।
                                                          

সময়ের চাকা


সকলে কি এখনও গরুর গাড়ী চড়েন ? রাত ৮ টায় ঘুমিয়ে পড়েন ? রেডিওতে বিবিধ ভারতী শোনার জন্য সারা সপ্তাহ বসে থাকেন ? অথবা মোবাইল ফোন ,কম্পিউটার সহ আধুনিক সরঞ্জাম চোখেই দেখেননি ? কানেও শোনেননি ?
ভাবছেন এমন মানুষ কজন-ই বা আছেন ?
আসলে সবই পাল্টেছে। পাল্টায়নি বাশ কিছু।

এখনকার রুটিনটা আর আগের মতো নেই

আধুনিক কর্ম ব্যাস্ততার জীবনে মানুষ সকল থেকে রাত কাজ করে কুলিয়ে উঠতে পারছে না। মনে হয় ২৪ ঘন্টার দিন আরও কয়েক ঘন্টা বেশি হলে ভালো হতো।কাজথেকে ক্লান্ত শরীরটা বিপর্যস্ত মনকে বয়ে নিয়ে যখন বাড়ি ফেরে তখন রাতের হিসেবে বেশ রাত। অধিকাংশ বাড়িতেই টিভি দেখা ,খাওয়া ,অফিস এর অসমাপ্ত কাজ ইত্যাদি সেরে শুতে রাত ১২ তার কম হয় না। চেষ্টা করেও আগে হয় না।
ঘরের ছোট্ট বাচ্চাটা কি এই রুটিনের বাইরে থাকে ? তার ও তো এক গাদা হোম টাস্ক শেষ করতে রাত কাবার হওয়ার জোগাড়।
মর্নিং স্কুল। শৈশব  শিক্ষা  কি দায় ? দায়সারা ? না দায়িত্ত্ব ?  

                                                                                        image from Raising Children Network 

রাতে না ঘুমালে আপনার সকালে কাজ করার সময় কষ্ট হয় না ? ঝিমুনি আসে না ? পুরো কর্ম উদ্যম নিয়ে কাজ করতে পারেন ? মেজাজটা এমনিতেই খিট কহিতে হয়ে থাকে ? কিন্তু ঠ্যালায় পরে সবই মেনে নিতে হয় ? পেটের দায় যে দাদা। কিন্তু শৈশবের শিক্ষা কি দায় না ঠ্যালা । দায়সারাও তো হতে পারে না । রাত ১২টা কি ১-২টা তে ঘুমোতে যাওয়া প্রাইমারি স্কুল এর একটি শিশু কি তবে ভোর ৫ টায় উঠে ৬টার মর্নিং স্কুল করতে পারে ? হাঁ পারে। পারছে তো। আর সেই সাথে তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গঠনমূলক সময়টা নষ্ট করা হচ্ছে না কি ?

রোবট তৈরির কম্পিটিশন। শৈশবের ইতি। জীবনেরও।

                                                image from Flicker

বর্তমান ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা সম্মন্ধে প্রচুর বিতর্ক আছে। অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা ও হলো , হচ্ছে , হবে। সিলেবাসের পর সিলেবাস পাল্টালো। কিন্তু যাদের উপর তার প্রয়োগ করা হচ্ছে তাদের মন , মানসিকতা , মেধা , চরিত্র গঠনের সব রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে দিনের পর দিন। ছোট ছোট পরিবার , ভাই নেই ,বোন নেই , খেলার মাঠ নেই , বন্ধু নেই --সকাল থেকে রাত আছে শুধু ট্রেনার , টিচার আর টর্চার । একটি শিশুকে গানে মান্না দে বা লতা মঙ্গেশকর , আঁকায় যামিনী রায় ,ক্রিকেটে শচীন ,আবৃত্তিতে জগন্নাথ - উর্মিমালা হতে হবে। হতেই হবে। ও ভুলে গেছি। নাচটাও তো চাই। ক্যারাটে ,সাঁতার এসবতো শিখতেই হবে। সঙ্গে প্রতিটি সাবজেক্টের জন্য এক বা একাধিক প্রাইভেট টিউটর। ভাবুন তো সে করবে কখন এতো কাজ ? না করলে ! ধুস ! এক চড়ে সিধা হয়ে যাবে না ? এটা নৃশংসতা না হলে কোনটা নৃশংসতা। অনেকেই এরকম লেখা অনেক পড়েন। ফেইসবুক উপচে পড়ে। তারপর বলেন , আসলে কম্পিটিশনে টিকে থাকতে গেলে এসব ভাল হবে না। আদপে সর্বাঙ্গে হারিয়ে যাওয়া শৈশবের গ্লানি মেখে ,তার উপর করা সব অত্যাচারের বদলা নেওয়ার প্রতিহিংসার শপথ নিয়ে যে বেড়ে উঠল সে কে ? হতে পারে সফল ক্যারিয়ার গড়ে নেওয়া একজন। সে কম্পিটিশন-এ জিতে গেছে , হতে পারে সে জেতে নি বলে লাইভ ভিডিও চ্যাটে বাবাকে সাক্ষী রেখে ঝাঁপ দেয় ২০ তলা থেকে বা ঝুলে পড়ে কড়িকাঠে। লজ্জা !!


একটু ভাবলেই অনেকটা সমাধান

এমন নয় যে উপরের সমস্যাগুলো ইতিপূর্বে কেউ বলেই বা ভাবে নি। কিন্তু তার জন্য যে আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন দরকার তা হচ্ছে কই ? তাই ভাবতে হবে এর মধ্যে থেকেই কি ভাবে এই সমস্যাগুলোকে সমাধান করা যায়। নির্মল শৈশবকে সজীব তরতাজা রেখেও কিভাবে সফল হয় যায়।একেকজন মানুষের সাংসারিক অবস্থান ,উপার্জন ,বিন্যাস,দায়-দায়িত্ত্ব এক এক রকম।তাই প্রত্যেককেই আলাদা করে ভাবতে হবে সাবের মাঝে যেন পরিবারের ছোট্ট শৈশব টা অবহেলিত না হয়। নিজের বুদ্ধিতে সকলে মিলে তার জন্য একটি আদর্শ রুটিন তৈরি করে যায় যাতে তার পড়াশুনার মাঝে সে পর্যাপ্ত আনন্দের সময়টুকু পায়। রাতের ঘুম যেন ৮-৯ ঘন্টা ঘুমাতে পারে , যাতে সকালের স্কুল করা যায় তরতাজা ভাবে। জীবন যাপনের ছোটোখাটো পরিবর্তনের জন্য পয়সা লাগেনা। লাগে ভাবনা ও সদিচ্ছা।
 বর্তমান জীবনে ছাত্রের উপর মর্নিং স্কুল এর ক্ষতিকর প্রভাব :-

বেশি রাতে শুতে যাওয়া একটি শিশু যখন সকালে ৫ তাই উঠে স্কুল এ যায় তখন তার চোখে ঘুম লেগে থাকে। ফলত ক্লাসে সে সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করতে পারে না। আমেরিকার ন্যাশনাল সেন্টার ফর হেলথ রিসার্চ এর গবেষণায় জানা গিয়েছে যে যে সব শিশু ৮-৯ ঘন্টা ঘুমতে পারে না তাদের মানে রাখার ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়। গাড়ি চালানোর মতো প্রতিবর্ত ক্রিয়া তারা ক্রমশ হারিয়ে ফেলে। শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি তাদের ভিতরে জমতে জমতে তাদের মেজাজ ভীষণ ভাবে পরিবর্তনশীল ও ধৈর্যহীন হয়ে পড়ে। যা পরিবারের মানুষ না বুঝে তাদের ভুল ভাবে শাসন করে ও ধীরে ধীরে তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
মর্নিং স্কুল -শৈশবের অন্তর্জলি


রাতের অল্প ঘুম, ভোরে উঠেই সকালের স্কুল , স্কুল থেকে ফিরেই পড়া , নাচ শেখা ,গান বা আঁকা শেখা ,গভীর রাতে হোম টাস্ক , না পারলেই চরম গালাগাল বা নির্মম প্রহার। মনোভাবটা এই যে "তুমি বিশ্রাম নিলে, আনন্দ করলে,খেলা করলে আমার অমুকের থেকে পিছিয়ে পরবে , তোমাকে সবকিছুতে সবার আগে থাকতে হবে। " --শৈশবের আনন্দ থেকে বঞ্চিত শিশু যে চাপ অষ্টপ্রহর নিয়ে চলেছে তাতে তার মস্তিষ্কে তথা স্নায়ুতে যে পরিমান স্ট্রেস জামা হয় , আধুনিক গবেষণা জানাচ্ছে , তারফলে তারা অল্প বয়সেই বিভিন্ন মাদকের প্রতি আসক্ত হচ্ছে। তাদের মনের ক্লান্তি কে দূর করবে ? সবাই তো নিজেকে নিয়ে ব্যাস্ত। নিজের ছেলে মেয়ে অন্যের থেকে কতটা এগিয়ে ট্রেনে -বাসে -অফিসে -আড্ডায় সেটা জাহির করেই খুশি। গাছের ডালে বসে সেই ডাল কাটা একেই বলে।সকালের স্কুল এর বদলে বেলার স্কুল তাদের ঘুমটা পুষিয়ে দেবে।স্ট্রেস একটু হলেও কমবে।
আধুনিক জীবনে মাধ্যযুগীয় মর্নিং স্কুল
                                                 Image from livehindustan.com

শীতকালের সকালে যখন রাস্তার কুকুর ও গুটি মেরে থাকে তখন অন্ধকার থাকতে একটি বাচ্চা কে কাঁচা ঘুম থেকে তুলে চর-থাপ্পড় মেরে ,বিশাল ভারী ব্যাগ কাঁধে চাপিয়ে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার চেয়ে অবৈজ্ঞানিক কিছু কি এই বিজ্ঞানের যুগে হতে পারে ?
ভয়াবহ শারীরিক  মানসিক ক্ষতি

গবেষক ডায়ানা জাকারম্যান,( পিএইচডি, স্বাস্থ্য গবেষণা জাতীয় গবেষণা কেন্দ্র) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে , কম ঘুমানো বাচ্চারা সাধারণত হরমোনাল ডিসফাংশনের এর শিকার হয়। তারা হয় স্থূল হয়ে পরে , ক্ষুধার্ত হয় এবং ক্লান্ত হয় অথবা বিভিন্ন রোগের শিকার হয় যেমন চোখের দৃষ্টি শক্তির সমস্যা , বদহজম ইত্যাদি। যেহেতু তারা বেশি ক্লান্ত, তারা প্রায়শই কম ব্যায়াম করে এবং বেশি চিনিযুক্ত ক্যাফিনেটযুক্ত পানীয় পান করে। এটি ওজন বাড়ানোর একটি ভয়াবহ চক্র শুরু করে, যা স্ট্রেসের দিকে পরিচালিত করে।
বাচ্চাটা কার  কেনো ?

কর্মরত বাবা মায়েরা আবার কিছু ক্ষেত্রে চাইছেন এমন স্কুল যেখানে বাচ্চা সারাটা দিন থাকে পারে। তাহলে বাচ্চাটা কার ? বাচ্চাটা কেনই বা ?

সামাজিক চিরস্থায়ী ক্ষতি

স্কুল দেরিতে শুরু করলেই আমরা লক্ষ লক্ষ বিদ্যাসাগর -রবীন্দ্রনাথ পেয়ে যাবো এমন তা হয়তো নয়। কিন্তু শৈশব হয়তো বাঁচবে , সমাজে কিছু সমাজবিরোধী হয়তো কম হবে। উচ্চশিক্ষিত সন্তান সেই শৈশবের চোরা আক্ষেপ নিয়ে হয়তো বৃদ্ধ বাবা -মা কে পেটাবে না , বা রাস্তায় বার করে দেবে না। সামান্য ঝামেলাতেই যে মানুষ এতো অধৈর্য হয়ে খুন খারাপি করছে তা হয়তো একটু কমবে। শুধু সকালের স্কুল বেলায় হলেই সব হবে না। তবে অন্য গুলোর সাথে এটাও ভাবার বোধহয় এবার সময় এসেছে।

No comments:

Post a Comment

Thank You .Please do not enter any spam link in the comment box.

Don't Miss It !

CHILD CARE || MEMORY TIPS - How to use a trip to the playground to help your children strengthen their memory

How to use a trip to the playground to help your children strengthen their memory To remember things, you need to give them your full attent...