বাংলায় সাময়িকভাবে কাজ বন্ধ করল আইপ্যাক (I-PAC)। হ্যাঁ, ঠিকই শুনছেন, বাংলায় ২০ দিনের জন্য কাজ বন্ধ করল আইপ্যাক। পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত কাজ আপাতত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিল তৃণমূলের ভোটকুশলী এবং পরামর্শদাতা এই সংস্থা। লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনের চরম ব্যস্ততার মধ্যেই এই অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্ত রাজ্য রাজনীতিতে আক্ষরিক অর্থেই ভূমিকম্পের সৃষ্টি করেছে।
আইপ্যাকের অন্দরে বড়সড় রদবদল বা সংকটের একটা আঁচ পাওয়া যাচ্ছিল। এবার সেটাই সত্যি হল। তাহলে কি পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত কাজ সাময়িকভাবে গুটোল এই সংস্থা? এই মুহূর্তে সূত্রের মারফত যে ইমেল বার্তার খবর আমরা পাচ্ছি, সেখানে সংস্থার কর্মচারীদের স্পষ্ট ভাষায় 'ওয়ার্ক ফ্রম হোম' বা বাড়িতে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আলাদা করে এখনই কাউকে ছাঁটাই করা হচ্ছে না ঠিকই, কিন্তু ফিল্ড ওয়ার্ক বা মাঠে ময়দানে নেমে যাবতীয় কাজ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
এক নজরে আজকের খবরের মূল হাইলাইটস:
কাজের উপর স্থগিতাদেশ: আগামী ২০ দিনের জন্য পশ্চিমবঙ্গে আইপ্যাকের সমস্ত ফিল্ড অপারেশন বন্ধ। কর্মীদের সাময়িক ছুটিতে বা ওয়ার্ক ফ্রম হোমে পাঠানো হয়েছে।
ইমেল নির্দেশিকা: আইনি 'বাধ্যবাধকতা'র কারণ দর্শিয়ে শনিবার মধ্যরাতে কর্মীদের কাছে ইমেল পাঠিয়েছে আইপ্যাক কর্তৃপক্ষ। আগামী ১১ মে-র পর পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক হবে।
ইডি হানা ও ১৫ই মার্চ গ্রেফতারি: কয়লা কেলেঙ্কারি ও অন্যান্য আর্থিক দুর্নীতির তদন্তে আইপ্যাকের শীর্ষ আধিকারিকদের বাড়িতে ইডি তল্লাশি এবং গত ১৫ই মার্চ অন্যতম ডিরেক্টর বিনেশ চান্দেলের গ্রেফতারি এই সিদ্ধান্তের মূল অনুঘটক।
তৃণমূলের সংকট: আগামী ২৩ এবং ২৯ এপ্রিল রাজ্যে হাইভোল্টেজ ভোটগ্রহণ। ঠিক তার আগেই ভোটকুশলীদের ময়দান ছাড়ায় তৃণমূলের বুথ ম্যানেজমেন্ট বড়সড় প্রশ্নের মুখে।
বিজেপির ফায়দা: আইপ্যাকের এই অনুপস্থিতি এবং শাসকদলের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলাকে হাতিয়ার করে নির্বাচনের শেষ লগ্নে মাইলেজ পেতে মরিয়া বিজেপি।
মধ্যরাতের ইমেল এবং থমথমে সেক্টর ফাইভ
শনিবার রাত থেকেই সল্টলেক সেক্টর ফাইভের আইপ্যাকের সদর দফতরে একটা চাপা উত্তেজনা ছিল। বিভিন্ন বিধানসভা কেন্দ্রে কর্মরত কর্মীদের হঠাৎ করেই ডেকে পাঠিয়েছিল কর্তৃপক্ষ। অনেকেই ভেবেছিলেন, ভোটের আগে শেষ মুহূর্তের কোনো মাস্টারস্ট্রোক বা নির্দেশিকা দেওয়া হবে। কিন্তু মধ্যরাতে কর্মীদের ইনবক্সে আসা একটি ইমেল গোটা চিত্রটাই বদলে দেয়।
ইমেলে আইপ্যাক কর্মীদের বলা হয়েছে, ‘‘আইনকে আমরা শ্রদ্ধা করি এবং গোটা প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করছি। নির্দিষ্ট সময়ে বিচার মিলবে, আমরা নিশ্চিত।’’ আইনি বাধ্যবাধকতার কারণেই এই ২০ দিনের বিরতি বলে স্পষ্ট করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ফিল্ড ওয়ার্ক সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। তবে ভার্চুয়ালি কিছু টেলিফোনিক সার্ভের কাজ চলতে পারে। কিন্তু বাস্তব চিত্রটা হলো, গোদরেজ ওয়াটার সাইডের অফিস, যেখানে বসে গোটা রাজ্যের নির্বাচনী ছক কষা হতো, তা কার্যত স্তব্ধ।
ইডির সাঁড়াশি আক্রমণ এবং মুখ্যমন্ত্রীর নজিরবিহীন পদক্ষেপ
এই নাটকীয় পটপরিবর্তনের বীজ পোঁতা হয়েছিল বেশ কিছুদিন আগেই। আইপ্যাকের কলকাতার দফতর এবং সংস্থার কর্ণধার প্রতীক জৈনের লাউডন স্ট্রিটের বাড়িতে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)-এর ম্যারাথন তল্লাশি অভিযান রাজ্য রাজনীতিতে আলোড়ন ফেলেছিল। সেই তল্লাশি চলাকালীন খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেখানে পৌঁছে যান। অভিযোগ ওঠে, বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি এবং ফাইল তিনি তল্লাশির মাঝপথেই তুলে নিয়ে বেরিয়ে আসেন।
মুখ্যমন্ত্রীর স্পষ্ট অভিযোগ ছিল, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতেই বিজেপি কেন্দ্রীয় সংস্থাকে ব্যবহার করছে। তাঁর দলের অত্যন্ত গোপনীয় নির্বাচনী রণকৌশল সংক্রান্ত নথি ইডি 'চুরি' করার চেষ্টা করছিল বলে তিনি দাবি করেন। এই জল গড়িয়েছে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। একদিকে যখন দেশের শীর্ষ আদালতে মামলা বিচারাধীন, ঠিক সেই সময়েই এই কাজ বন্ধের সিদ্ধান্ত প্রমাণ করছে, আইনি চাপ কতটা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।
১৫ই মার্চ বিনেশ চান্দেলের গ্রেফতারি: আইপ্যাকের মেরুদণ্ডে আঘাত
এই গোটা ঘটনাক্রমের সবথেকে বড় টার্নিং পয়েন্ট হলো গত ১৫ই মার্চ। এই দিন কয়লা কেলেঙ্কারির তদন্তের সূত্রে নয়াদিল্লিতে আইপ্যাকের অন্যতম ডিরেক্টর এবং সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিনেশ চান্দেলকে গ্রেফতার করে ইডি। বর্তমানে তিনি কেন্দ্রীয় সংস্থার হেফাজতেই রয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৫ই মার্চের এই গ্রেফতারি আইপ্যাকের আত্মবিশ্বাসে সবচেয়ে বড় ফাটল ধরিয়েছে। বিনেশ চান্দেল ছিলেন সংস্থার অন্যতম ব্রেন বা মস্তিষ্ক। তাঁর গ্রেফতারির পর অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব হয়ে একে "গণতন্ত্র নয়, ভীতি প্রদর্শন" বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তব হলো, শীর্ষ নেতৃত্বের একজন শ্রীঘরে থাকায় সংস্থার বাকি কর্মীদের মধ্যেও চরম আতঙ্ক তৈরি হয়।
আইপ্যাকের কর্মীরা এর আগে বিভিন্ন জেলায় তৃণমূলের একাংশের বিক্ষোভের মুখে পড়েছেন। অনেক জায়গায় তাদের ঘেরাও করে রাখা হয়েছে। এরপর ইডির রেড এবং খোদ ডিরেক্টরের গ্রেফতারি কর্মীদের মনোবল একেবারে তলানিতে নিয়ে ঠেকিয়েছে। আইনি জটিলতায় জড়িয়ে পড়ার ভয়েই কি তবে নির্বাচনের এই চূড়ান্ত মুহূর্তে পিঠ বাঁচানোর পথ বেছে নিল সংস্থা? এই প্রশ্নটাই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে।
বিপাকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তৃণমূলের নির্বাচনী ছক
আগামী ২৩ এবং ২৯ এপ্রিল রাজ্যের ২৯৪টি আসনে দুই দফায় ভোটগ্রহণ। ভোটের ফল জানা যাবে ৪ মে। আর আইপ্যাক যে ২০ দিনের বিরতি নিয়েছে, তা শেষ হতে হতে গোটা ভোটপর্ব মিটে যাবে, এমনকি নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়াও শুরু হয়ে যাবে। অর্থাৎ, নির্বাচনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ সময়েই তৃণমূলের 'ওয়াররুম' কার্যত ফাঁকা।
এর ফলে কতটা বিপাকে তৃণমূল?
প্রথমত, আইপ্যাক শুধুমাত্র একটি পরামর্শদাতা সংস্থা ছিল না। বুথ স্তরের ডেটা সংগ্রহ, স্থানীয় নেতাদের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন, বিরোধী শিবিরের হাওয়া বোঝা এবং সেই অনুযায়ী তাৎক্ষণিক রণকৌশল তৈরি করায় তাদের জুড়ি মেলা ভার ছিল। ভোটের ঠিক ৪৮ ঘণ্টা আগে কোন বুথে কী ধরনের সমস্যা হতে পারে, কোথায় কোন বার্তা দিতে হবে— এই মাইক্রো-ম্যানেজমেন্ট পুরোপুরি আইপ্যাকের হাতে ছিল। এখন সেই কেন্দ্রীয় কমান্ড সিস্টেমটাই ভেঙে পড়ল।
দ্বিতীয়ত, তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব, বিশেষত মমতা এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বহুলাংশে আইপ্যাকের দেওয়া ডেটার ওপর নির্ভর করে টিকিট বন্টন থেকে শুরু করে প্রচারের অভিমুখ ঠিক করেছিলেন। হঠাৎ করে মাঠ থেকে আইপ্যাক সরে যাওয়ায়, স্থানীয় স্তরে দলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং ক্ষোভ প্রশমন করার জন্য কোনো নিরপেক্ষ তৃতীয় পক্ষ আর রইল না।
বিজেপির পালে হাওয়া: অ্যাডভান্টেজ গেরুয়া শিবির
আইপ্যাকের এই প্রস্থান ভোটের বাজারে সরাসরি সুবিধা করে দিচ্ছে প্রধান বিরোধী দল বিজেপিকে। কীভাবে?
১. মনস্তাত্ত্বিক জয়: ভোটের আগে শাসকদলের প্রধান নির্বাচনী সেনাপতির এভাবে রণে ভঙ্গ দেওয়া বিজেপির কর্মী-সমর্থকদের কাছে এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক জয়। বিজেপি ইতিমধ্যেই এই ঘটনাকে হাতিয়ার করে প্রচার শুরু করেছে যে, দুর্নীতির চাপে তৃণমূলের তাসের ঘর ভেঙে পড়ছে।
২. দুর্নীতির ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠা: ইডি-সিবিআইয়ের তদন্ত যে নিছক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়, বরং এর গভীরে সত্যিই বড়সড় দুর্নীতি লুকিয়ে আছে— আইপ্যাকের এই পলায়নপর মনোবৃত্তি সেই ন্যারেটিভকেই সাধারণ মানুষের কাছে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলছে। বিজেপি প্রচারে বারবার তুলে ধরবে যে, দুর্নীতি ঢাকতেই মুখ্যমন্ত্রী নিজে গিয়ে ফাইল তুলে এনেছেন এবং ভয়ে আইপ্যাক বাংলা ছেড়েছে।
পরবর্তী পদক্ষেপ: রবিবারের প্রচার মঞ্চের দিকে নজর
নির্বাচনী মহাযুদ্ধের এই চূড়ান্ত লগ্নে এসে আইপ্যাকের এই সিদ্ধান্ত একপ্রকার বেনজির। তৃণমূলের একটি সূত্র দাবি করছে, আইপ্যাকের কিছু কর্মী বাড়ি থেকে বা অন্য কোনোভাবে কাজ চালিয়ে যাবেন। কিন্তু ভোটের ময়দানে শারীরিক উপস্থিতি ছাড়া এই ধরনের হাইভোল্টেজ নির্বাচন কতটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, তা নিয়ে খোদ ঘাসফুল শিবিরের অন্দরেই প্রবল সংশয় রয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারে রবিবার তারকেশ্বরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম সভা রয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ ২৪ পরগনার সাগরে এবং পরে নন্দীগ্রামে জনসভা করবেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। আইপ্যাকের এই আচমকা কাজকর্ম বন্ধ হওয়া নিয়ে মমতা বা অভিষেক প্রকাশ্য মঞ্চ থেকে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেন কি না, অথবা কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করতে কী নতুন বার্তা দেন, সেদিকেই এখন তীক্ষ্ণ নজর থাকবে গোটা বাংলার রাজনৈতিক মহলের।
0 মন্তব্যসমূহ