Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

Recent in Home

মোথাবাড়িতে বিচারকদের ওপর হামলায় তৎপর এনআইএ (NIA), ভোট পরবর্তী হিংসা রুখতে রাজ্যে থাকছে ৫০০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী



মানুষের ভাষা, নিউজ ডেস্ক

মালদহ: লোকসভা নির্বাচনের দামামা বেজে গিয়েছে। আর নির্বাচন যত এগোচ্ছে, রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নির্বাচন কমিশনের কড়া পদক্ষেপ ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে উত্তেজনার পারদ ততই চড়ছে। একদিকে যেমন মালদহের মোথাবাড়িতে ভোটার তালিকা সংশোধনের (SIR) কাজে গিয়ে আক্রান্ত হওয়া বিচারকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ শুরু করেছে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা বা এনআইএ (NIA), ঠিক তেমনই অন্যদিকে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখে এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন। কমিশন সূত্রে খবর, ভোট গণনার পরেও রাজ্যে শান্তি বজায় রাখতে মোতায়েন থাকবে অন্তত ৫০০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী (CAPF)। সব মিলিয়ে ভোটের মুখে বাংলা এখন আক্ষরিক অর্থেই এক কড়া নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে ফেলার প্রস্তুতি চলছে।

এনআইএ-র আতশকাঁচের নিচে মোথাবাড়ির তাণ্ডব

মালদহের মোথাবাড়িতে এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত সাতজন বিচারবিভাগীয় আধিকারিককে (Judicial Officers) ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রেখে তাণ্ডব চালানোর ঘটনায় ইতিমধ্যেই কড়া অবস্থান নিয়েছে দেশের সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালতের নির্দেশের পরেই এই নজিরবিহীন হামলার শিকড়ে পৌঁছতে মাঠে নেমে পড়েছে এনআইএ।

এনআইএ সূত্রে খবর, যে সাতজন বিচারক ওইদিন চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁদের বয়ান রেকর্ড করার প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। আইজি (IG) পদমর্যাদার আধিকারিক সোনিয়া সিং গতকালই কলকাতায় এসে পৌঁছেছেন। তাঁর প্রত্যক্ষ নির্দেশে এবং একজন এসপি (SP) র‍্যাঙ্কের অফিসারের তত্ত্বাবধানে এনআইএ-র একটি বিশেষ দল কলকাতায় থাকা আক্রান্ত বিচারকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। পাশাপাশি, মালদহ নিবাসী এক বিচারকের সঙ্গেও তদন্তকারীরা কথা বলেছেন বলে জানা গিয়েছে।

কী খুঁজছেন এনআইএ গোয়েন্দারা?

তদন্তকারী সংস্থার মূল লক্ষ্য হলো সেই অভিশপ্ত বিকেলের প্রতিটি মুহূর্তের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ সংগ্রহ করা। বিচারকদের কাছে এনআইএ আধিকারিকরা মূলত জানতে চেয়েছেন:

  • সেদিন ঠিক কখন এবং কীভাবে এই উন্মত্ত বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়?

  • যখন তাঁদের গাড়ি লক্ষ্য করে ইট-পাথর ছোঁড়া হচ্ছিল এবং গাড়ির কাঁচ ভেঙে দেওয়া হচ্ছিল, তখন তাঁদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কী ছিল?

  • ঘটনাস্থল থেকে তাঁদের উদ্ধার করার সময় পুলিশি নিরাপত্তার প্রকৃত চিত্রটা ঠিক কেমন ছিল?

শুধু বিচারকদের বয়ান নয়, রাজ্য পুলিশের ভূমিকাও এখন এনআইএ-র স্ক্যানারে। সেদিন ঘটনাস্থলে ঠিক কতজন পুলিশ কর্মী নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন, তাঁরা কখন থেকে কখন পর্যন্ত সেখানে উপস্থিত ছিলেন, এবং পুলিশের উপস্থিতির পরেও কীভাবে বিক্ষোভকারীরা বিচারকদের গাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে হামলা চালাল— এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন গোয়েন্দারা। ইতিমধ্যেই মোথাবাড়ির ওই বিডিও (BDO) অফিসের ম্যাপ বা নকশা সংগ্রহ করা হয়েছে। কোন দিক দিয়ে বিচারকরা প্রবেশ করেছিলেন (Entry), কোন দিক দিয়ে তাঁদের বের করার কথা ছিল (Exit) এবং কতটা দূরত্ব পর্যন্ত পুলিশি কর্ডন ছিল— তার সমস্ত খুঁটিনাটি তথ্য পুলিশের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছে এনআইএ।

ভোট পরবর্তী হিংসা রুখতে নজিরবিহীন পদক্ষেপ কমিশনের

মোথাবাড়ির ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই রাজ্যের সার্বিক নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। সাধারণত ভোট গণনার পরপরই কেন্দ্রীয় বাহিনী রাজ্য ছেড়ে চলে যায়। কিন্তু এবার ছবিটা সম্পূর্ণ আলাদা হতে চলেছে।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর রাজ্যজুড়ে যে বেলাগাম ভোট পরবর্তী হিংসার (Post-poll violence) সৃষ্টি হয়েছিল, তা সারা দেশের নজর কেড়েছিল। খুন, ধর্ষণ, লুঠতরাজ এবং অগ্নিসংযোগের মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগে পরবর্তীতে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে সিবিআই তদন্ত শুরু হয়। পাঁচ বছর পর, আসন্ন নির্বাচনে যাতে সেই ভয়াবহ ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি না হয়, তার জন্যই এবার আগেভাগে কড়া দাওয়াই দিল কমিশন।

কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, ভোট গ্রহণ পর্ব এবং ভোট গণনা শেষ হওয়ার পরেও রাজ্যে আইন শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য অন্তত ৫০০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় সশস্ত্র বাহিনী (Central Armed Police Forces) মোতায়েন রাখা হবে। এর পাশাপাশি, ভোট গণনার আগে ইভিএম (EVM), স্ট্রং রুম এবং কাউন্টিং সেন্টারগুলির নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার জন্য আরও ২০০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী রাজ্যে মজুত রাখা হবে। অর্থাৎ, গণনা সম্পূর্ণ না হওয়া এবং পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই বিপুল পরিমাণ বাহিনী রাজ্যের স্পর্শকাতর এলাকাগুলিতে টহলদারি চালাবে। বিধানসভা বা লোকসভা নির্বাচনের ইতিহাসে ভোট পরবর্তী সুরক্ষার জন্য এত বিপুল পরিমাণ বাহিনী রেখে দেওয়ার নজির কার্যত নেই বললেই চলে।

শাসক-বিরোধী তরজা তুঙ্গে

কমিশনের এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে স্বভাবতই শাসক এবং বিরোধী শিবিরের মধ্যে রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে। বিরোধীদের দাবি, রাজ্যের পুলিশ দলদাসে পরিণত হয়েছে। তাই ভোট পরবর্তী হিংসা থেকে সাধারণ মানুষ এবং বিরোধীদের রক্ষা করতে এই কেন্দ্রীয় বাহিনী রাখা অত্যন্ত জরুরি। বিজেপির এক নেতার কটাক্ষ, "রাজ্যপাল এবং কমিশনকে বিশেষ দায়িত্ব নিতে হবে। তৃণমূলের হাত থেকে তৃণমূলকেই বাঁচাতে হবে, যাতে শাসকদলের নিজেদের মধ্যে লিঞ্চিং না হয়। আমরা রাজ্যে আর রক্তপাত বা ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা চাই না।"

অন্যদিকে, তৃণমূল নেতৃত্ব এই পদক্ষেপেও নিজেদের অবিচল আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেছে। শাসকদলের এক শীর্ষ নেতার কথায়, "কমিশন যত খুশি বাহিনী রাখুক। আমরা নির্বাচন কমিশনার এবং আধিকারিকদের অনুরোধ করব, ৪ তারিখ সন্ধ্যায় ফলাফল বেরোনোর পর আপনারা যেন কলকাতায় থাকেন। আমরা বাংলা স্পেশাল রসগোল্লা নিয়ে গিয়ে আপনাদের খাইয়ে আসব। মানুষ তৃণমূলের সঙ্গেই আছে।"

ফর্ম সিক্স (Form 6) ঘিরে সিইও দপ্তরে তৃণমূলের দরবার

বাহিনীর কড়াকড়ির মাঝেই রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (CEO) দপ্তরে জমা পড়া একাধিক অভিযোগ ঘিরেও সরগরম রাজ্য রাজনীতি। ভোটার তালিকায় নতুন নাম তোলার জন্য 'ফর্ম সিক্স' (Form 6) জমা দেওয়াকে কেন্দ্র করে গত তিনদিন ধরে সিইও দপ্তরের সামনে রীতিমতো ধুন্ধুমার পরিস্থিতি তৈরি হয়। শুক্রবার তৃণমূল কংগ্রেসের একটি প্রতিনিধি দল সরাসরি মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তরে গিয়ে এই বিষয়ে নিজেদের ঘোর আপত্তি ও অভিযোগ দায়ের করেছে।

তৃণমূলের অভিযোগ, একদিকে নির্বাচন কমিশন সকলকে অনলাইনে ফর্ম পূরণের নির্দেশ দিচ্ছে, অথচ অন্যদিকে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে প্রায় সাড়ে ১০ হাজার 'ফর্ম সিক্স' অফলাইনে জমা নেওয়া হয়েছে। তৃণমূলের প্রতিনিধি দলের এক সদস্য জানান, "প্রথমে ওঁরা এই বিপুল পরিমাণ অফলাইন ফর্ম জমা পড়ার কথা মানতেই চাইছিলেন না। আজ আমাদের চাপে পড়ে সিইও জানিয়েছেন যে, তিনি ওই নির্দিষ্ট সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ (CCTV Footage) প্রকাশ করবেন এবং বিধানসভা কেন্দ্র অনুযায়ী কারা কারা ওই ফর্ম জমা দিয়েছেন, তার একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা বের করবেন।"

এই অভিযোগ নস্যাৎ করে পাল্টা সুর চড়িয়েছে বিরোধী শিবির। তাঁদের দাবি, ফর্ম সিক্স জমা দেওয়ার অধিকার প্রতিটি নাগরিকের রয়েছে। বিরোধীদের বক্তব্য, "যাঁর নাম বৈধ ভোটার হিসেবে প্রমাণিত হবে, তাঁর নাম তালিকায় থাকবে। আর যে বৈধ নাগরিক নয়, তাকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবেই। শাসকদল যতই বাধা দেওয়ার চেষ্টা করুক, ভুয়ো ভোটারদের এবার আর বরদাস্ত করা হবে না।"

ভবানীপুরের রিটার্নিং অফিসার বদল ঘিরে চরম সংঘাত

নির্বাচনী বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এবার উঠে এসেছে খোদ মুখ্যমন্ত্রীর খাসতালুক ভবানীপুর। ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের রিটার্নিং অফিসার (Returning Officer) হিসেবে নির্বাচন কমিশন সুরজিৎ রায়কে নিয়োগ করেছে। এই সুরজিৎ রায় পূর্বে নন্দীগ্রাম ২ নম্বর ব্লকের বিডিও ছিলেন। আর এই নিয়োগ ঘিরেই তীব্র আপত্তি জানিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস।

তৃণমূলের ন্যাশনাল ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য ও রাজ্যসভার সাংসদ ডেরেক ও'ব্রায়েন সরাসরি জাতীয় নির্বাচন কমিশনারকে চিঠি দিয়ে এই আধিকারিককে সরিয়ে দেওয়ার আর্জি জানিয়েছিলেন। তৃণমূলের অভিযোগের ভিত্তিতে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের সচিব সুজিত কুমার মিশ্র রাজ্যের মুখ্যসচিবকে চিঠি দিয়ে সুরজিৎ রায়ের পরিবর্তে তিনজনের একটি নতুন প্যানেল পাঠাতে বলেন। রাজ্য সরকার সেই নির্দেশ মেনে তিনজন বিকল্প অফিসারের নাম কমিশনে পাঠালেও, আশ্চর্যের বিষয় হলো, কমিশন এখনও পর্যন্ত সেই প্রস্তাব কার্যকর করেনি বা রিটার্নিং অফিসার বদল করেনি।

এই চরম প্রশাসনিক অচলাবস্থা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে তৃণমূল। দলের বক্তব্য, "রাজ্য সরকার নাম পাঠানোর পরেও কেন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, তা অত্যন্ত সন্দেহজনক।" অন্যদিকে, বিরোধীদের কটাক্ষ, "শাসকদল ভয় পেয়ে অফিসারদের চমকাচ্ছে। নিজেদের পছন্দমতো অফিসার বসিয়ে ভোট করার দিন শেষ। কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করছে।"



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Comments

Ad Code