ডোমিসাইল সার্টিফিকেট নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বনাম শুভেন্দু: ‘আগে আইনের বই পড়ুন’, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কড়া আক্রমণ বিরোধী দলনেতার
পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে এখন ‘ডোমিসাইল সার্টিফিকেট’ বা নিবাসী শংসাপত্র নিয়ে সংঘাত তুঙ্গে। একদিকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে সরাসরি সিইসি (CEC) জ্ঞানেশ কুমারকে চিঠি দিয়েছেন, অন্যদিকে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী পাল্টা সাংবাদিক বৈঠক করে মুখ্যমন্ত্রীর আইনি জ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
নিজস্ব প্রতিবেদন, কলকাতা: ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়া নিয়ে নবান্ন ও দিল্লির লড়াই এবার এক নতুন মোড় নিল। রাজ্য সরকারের দেওয়া ডোমিসাইল সার্টিফিকেট বা স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার শংসাপত্র ভোটার তালিকায় নাম তোলার ক্ষেত্রে কেন গ্রাহ্য হচ্ছে না, তা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবার তার পাল্টা জবাবে মেজাজ হারালেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। শুভেন্দুর স্পষ্ট কথা, "মুখ্যমন্ত্রীর উচিত আগে আইনের বই পড়া। ১০ বছরের স্থায়ী বসবাসকারী না হলে সেই শংসাপত্র কোনোভাবেই গ্রাহ্য হতে পারে না।"
মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে লড়াই
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, রাজ্য সরকারের বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ যে ডোমিসাইল সার্টিফিকেট ইস্যু করছে, তা ভোটার পরিচয়ের প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ না করার জন্য অনানুষ্ঠানিকভাবে জেলা নির্বাচন আধিকারিকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মমতার অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন একটি অপরিকল্পিত ও ত্রুটিপূর্ণ এসআইআর প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। তাঁর দাবি না মানলে এই সংশোধন প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার জন্যও তিনি সিইসি-কে চিঠি দিয়েছেন। কলকাতার মেয়রের নির্দেশে কাউন্সিলরদের মাধ্যমে যে শংসাপত্র বিলি হচ্ছিল, তা বাতিলের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ শাসকদল।
শুভেন্দুর বিস্ফোরক দাবি: অনুপ্রবেশকারীদের জায়গা দেওয়ার চেষ্টা?
শুভেন্দু অধিকারী এই বিতর্কে সরাসরি ‘অনুপ্রবেশ’ এবং ‘আইপ্যাক’ (I-PAC) তত্ত্ব টেনে এনেছেন। তাঁর অভিযোগ, আইপ্যাক-এর তৈরি করা ফর্মুলা মেনে অবৈধ ভোটার, মৃত ভোটার এবং বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের তালিকায় রাখার চেষ্টা চলছে। শুভেন্দুর নিশানায় রয়েছেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার প্রাক্তন জেলাশাসক সুমিত গুপ্তও। শুভেন্দুর দাবি, সুমিত গুপ্তকে কলকাতা পৌরসভার কমিশনার বানিয়ে বরো ভিত্তিক বার্থ সার্টিফিকেট পাইয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা চলছে যাতে অবৈধ নাগরিকদের বৈধতা দেওয়া যায়। শুভেন্দু মনে করিয়ে দেন যে, নির্বাচন কমিশনের সফটওয়্যার অত্যন্ত আপডেটেড এবং তাতে কোনো জালিয়াতি ধরা পড়বেই।
কী এই ডোমিসাইল সার্টিফিকেট এবং কেন এত ভিড়?
ডোমিসাইল সার্টিফিকেট হলো এমন একটি প্রমাণপত্র যা নিশ্চিত করে যে এক ব্যক্তি নির্দিষ্ট কোনো রাজ্যে বা অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু হতেই কলকাতা পুরসভার সদর দপ্তর ও বরো অফিসগুলোতে এই সার্টিফিকেটের জন্য হু হু করে ভিড় বাড়তে থাকে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮০ থেকে ১০০টি আবেদন জমা পড়ছিল। পুরসভার পক্ষ থেকে কাউন্সিলরদের নির্দেশিকা পাঠিয়ে এই কাজ ত্বরান্বিত করার চেষ্টা হলেও, কমিশন তাতে বাদ সাধায় এখন কার্যত বন্ধ হয়ে গিয়েছে এই শংসাপত্র গ্রহণ করার কাজ।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৬-এর আগে ভোটার তালিকার প্রতিটি নাম নিয়ে দুই পক্ষই সতর্ক। শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, বৈধ নাগরিকদের নাম বাদ যাচ্ছে না, বরং ‘ভুতুড়ে’ ভোটারদের দফারফা করতেই কমিশন ডোমিসাইল সার্টিফিকেটের কড়াকড়ি বাড়িয়েছে। অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ এটি আসলে প্রান্তিক মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র।
শেষ পর্যন্ত এই আইনি লড়াই কোন দিকে বাঁক নেয়, সেদিকেই নজর রাখছে রাজনৈতিক মহল।
0 মন্তব্যসমূহ