৩৪ বছর পর বাংলার মাটিতে ‘বিশ্ব ইজতেমা’: হুগলিতে জনসমুদ্র, কোটি মানুষের আখেরি মোনাজাতে বিশ্বশান্তির প্রার্থনা
নিজস্ব প্রতিবেদন, হুগলি: পশ্চিমবঙ্গের ধর্মীয় ইতিহাসে আজ এক ঐতিহাসিক দিন। দীর্ঘ ৩৪ বছর পর রাজ্যের মাটিতে সমাপ্ত হলো মুসলিম ধর্মপ্রাণ মানুষদের বৃহত্তম সমাবেশ ‘বিশ্ব ইজতেমা’। হুগলি জেলার ধনেখালি ব্লকের দাদপুর থানার অন্তর্গত পুইনান গ্রামে আয়োজিত এই সম্মেলনে গত চার দিনে যে পরিমাণ জনসমাগম হয়েছে, তা গত কয়েক দশকের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। আজ ৫ জানুয়ারি (সোমবার) আখেরি মোনাজাতের মাধ্যমে এই মহাসম্মেলন শেষ হচ্ছে, যেখানে প্রায় এক কোটি মানুষের সমাগম হয়েছে বলে আয়োজক ও প্রশাসন সূত্রে খবর।
৯ হাজার বিঘা জুড়ে ‘মিনি ভ্যাটিকান’
হুগলির ধনেখালি ও দাদপুর এলাকার চারটি গ্রাম পঞ্চায়েত জুড়ে প্রায় ৯ হাজার বিঘা (প্রায় ১৬০ একর) জমিতে গড়ে তোলা হয়েছিল এই ইজতেমা ময়দান। ১৯৯২ সালে শেষবার হাওড়ার নিবরা-বাকড়া এলাকায় এত বড় ইজতেমা হয়েছিল। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এই বছর ২ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই সম্মেলনে নেপাল, বাংলাদেশ এবং ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে লক্ষ লক্ষ মুসল্লি অংশগ্রহণ করেছেন। পুইনানের বিশাল ময়দান এখন আক্ষরিক অর্থেই এক জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মিলনমেলা: নেপাল থেকে বাংলাদেশ
ধর্মীয় বয়ান ও শান্তির বার্তা শুনতে এই ইজতেমায় কাঁটাতারের বাধা পেরিয়েও বহু মানুষ সামিল হয়েছেন। নেপালের বিরাটনগর থেকে আসা কামাল উদ্দিন জানান, এর আগে তিনি বিহার বা উত্তরপ্রদেশের ইজতেমায় গেলেও পশ্চিমবঙ্গের আতিথেয়তায় তিনি মুগ্ধ। তাবলিগ জামাতের এই সম্মেলনে রাজনীতি বা বিভেদের কোনো স্থান নেই—স্রেফ ভ্রাতৃত্ব ও মানবতার কল্যাণে চার দিন ধরে চলেছে নিরন্তর প্রার্থনা ও ধর্মীয় আলোচনা।
নজিরবিহীন প্রশাসনিক তৎপরতা ও সুরক্ষা
এত বড় জনসমাগম সামাল দিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও হুগলি জেলা প্রশাসন গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ‘যুদ্ধকালীন’ তৎপরতায় কাজ করেছে।
অস্থায়ী হাসপাতাল: ময়দানের পাশেই ১৭০ শয্যার একটি অত্যাধুনিক অস্থায়ী হাসপাতাল তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা মোতায়েন ছিলেন।
নিরাপত্তা বলয়: হুগলি গ্রামীণ পুলিশের পক্ষ থেকে গোটা এলাকা সিসিটিভি (CCTV) এবং ড্রোন নজরদারিতে রাখা হয়েছিল। দিল্লি রোড ও দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগস্থলে যানজট রুখতে মোতায়েন ছিল হাজার হাজার পুলিশ কর্মী।
যান চলাচল: সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করে দিল্লি রোডের সুগন্ধা মোড় ও এক্সপ্রেসওয়ের মহেশপুর মোড়ে গাড়ি ডাইভার্ট করা হয়েছিল।
আখেরি মোনাজাত ও বিশ্বশান্তির ডাক
আজ ৫ জানুয়ারি সকালে মোহতারম হযরতজি মাওলানা সাদের বিশেষ বয়ানের পর শুরু হয় কাঙ্ক্ষিত আখেরি মোনাজাত। ধর্মপ্রাণ মানুষের কান্নায় সিক্ত হয় পুইনানের মাটি। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে গোটা দেশ ও বিশ্বের মানুষের মঙ্গল কামনায় হাত তোলেন কোটি কোটি মুসল্লি। আয়োজকদের মতে, এটি কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক জীবন্ত উদাহরণ।
দীর্ঘ ৩৪ বছরের খরা কাটিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মাটি ফের ‘বিশ্ব ইজতেমার’ সাক্ষী থাকল। ধনেখালির ধুলো ওড়া প্রান্তরে যখন লাখো কণ্ঠ থেকে ‘আমিন, আমিন’ ধ্বনি আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল, তখন তা বুঝিয়ে দিয়েছে যে বাংলা আজও সম্প্রীতির পীঠস্থান। ২০২৬-এর আগে এই শান্তিময় সমাবেশ প্রশাসন ও আয়োজক—উভয় পক্ষের জন্যই এক বিশাল সাফল্য।
Tags -বিশ্ব ইজতেমা ২০২৬ পশ্চিমবঙ্গ, Bishwa Ijtema 2026 Hooghly, পুইনান ইজতেমা ময়দান, আখেরি মোনাজাত ২০২৬ লাইভ।
'তাবলিগ জামাত', 'ধনেখালি ইজতেমা', 'বিশ্বশান্তির প্রার্থনা'—এই কি-ওয়ার্ডগুলো গুগল র্যাঙ্কিংয়ে আপনার ব্লগকে শীর্ষে রাখবে।



0 মন্তব্যসমূহ