ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্র(AC 159):
২০২৬ সালের নির্বাচনের গভীর বিশ্লেষণ
ভবানীপুর বরাবরই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটি হাই-প্রোফাইল কেন্দ্র, কারণ এটি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজের নির্বাচনী গড় এবং তৃণমূল কংগ্রেসের দুর্গ। কিন্তু সম্প্রতি রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর একটি দাবি রাজ্য রাজনীতিতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ভোটার তালিকা সংশোধনের (Special Intensive Revision বা SIR) পর এই কেন্দ্র থেকে প্রায় ৪৬,০০০ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে এবং আরও ১৪,০০০-এর বেশি নাম এখনও বিচারাধীন (under adjudication)। এই পরিসংখ্যানকে হাতিয়ার করে বিরোধী শিবিরের দাবি— ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য সবচেয়ে কঠিন লড়াই হতে চলেছে এবং এখানে তৃণমূলের জয় অনিশ্চিত।
বিগত ৫টি নির্বাচনের পরিসংখ্যান (ভবানীপুর কেন্দ্র)
ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের (এবং কলকাতা দক্ষিণ লোকসভার অন্তর্গত এই সেগমেন্টের) বিগত পাঁচটি নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে এর রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি পরিষ্কার বোঝা যায়:
| নির্বাচনের বছর | নির্বাচনের ধরন | ভবানীপুর সেগমেন্টে প্রথম (দল ও প্রার্থী) | ভবানীপুর সেগমেন্টে দ্বিতীয় (দল ও প্রার্থী) | ভবানীপুর সেগমেন্টে লিড/জয়ের ব্যবধান |
| ২০১৪ | লোকসভা | বিজেপি (তথাগত রায়)* | তৃণমূল কংগ্রেস (সুব্রত বক্সী) | ১৮৫ (বিজেপির লিড) |
| ২০১৬ | বিধানসভা | তৃণমূল কংগ্রেস (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) | কংগ্রেস (দীপা দাশমুন্সি) | ২৫,৩০১ (তৃণমূল জয়ী) |
| ২০১৯ | লোকসভা | তৃণমূল কংগ্রেস (মালা রায়) | বিজেপি (চন্দ্র কুমার বসু) | ৩,১৬৮ (তৃণমূলের লিড) |
| ২০২১ | বিধানসভা (সাধারণ) | তৃণমূল কংগ্রেস (শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়) | বিজেপি (রুদ্রনীল ঘোষ) | ২৮,৭১৯ (তৃণমূল জয়ী) |
| ২০২১ | বিধানসভা (উপনির্বাচন) | তৃণমূল কংগ্রেস (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) | বিজেপি (প্রিয়াঙ্কা টিব্রেওয়াল) | ৫৮,৮৩৫ (তৃণমূল জয়ী) |
| ২০২৪ | লোকসভা | তৃণমূল কংগ্রেস (মালা রায়) | বিজেপি (দেবশ্রী চৌধুরী) | ৮,২৯৭ (তৃণমূলের লিড) |
(নোট: লোকসভা নির্বাচনে কলকাতা দক্ষিণ তৃণমূল জিতলেও, ভবানীপুর সেগমেন্টের ভিতরে বিজেপির ভোট বরাবরই চিন্তায় রেখেছে শাসকদলকে। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে এই নির্দিষ্ট বিধানসভা সেগমেন্ট থেকে বিজেপি প্রার্থী তথাগত রায় তৃণমূলের চেয়ে ১৮৫ ভোটে এগিয়ে ছিলেন। ২০১৯ লোকসভাতেও এই কেন্দ্রে লড়াই অত্যন্ত হাড্ডাহাড্ডি ছিল, যেখানে ভবানীপুর সেগমেন্টে তৃণমূলের মার্জিন নেমে এসেছিল মাত্র ৩ হাজার পেরোনো কিছু ভোটে।)
২০২৬-এ ভবানীপুর কেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য "টাফ" হতে পারে? (ডিপ অ্যানালাইসিস)
শুভেন্দু অধিকারীর দাবি এবং রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি মিলিয়ে দেখলে কয়েকটি মূল সমীকরণ উঠে আসে, যা ২০২৬ সালের লড়াইকে কঠিন করে তুলতে পারে:
১. ৪৬,০০০ ভোটারের নাম বাতিল (The Voter List Arithmetic):
ভবানীপুরের মতো একটি কেন্দ্রে, যেখানে মোট ভোটারের সংখ্যা ২ লক্ষের সামান্য বেশি, সেখানে একলপ্তে ৪৬,০০০ নাম বাতিল হওয়া একটি গেম-চেঞ্জিং ফ্যাক্টর। বিরোধী দলনেতার দাবি অনুযায়ী, এই বাতিল হওয়া নামগুলি ছিল "ভুয়া ভোটার" যা শাসকদলকে সাহায্য করতো। যদি এই ১৪,০০০ বিচারাধীন নামও শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়, তবে মোট ভোটারের প্রায় ২৫-৩০% ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়বে। এই বিপুল সংখ্যক ভোট যদি সত্যিই শাসকদলের ভোটব্যাঙ্ক হয়ে থাকে, তবে অংকের হিসেবে এটি তৃণমূলের জন্য একটি বড় ধাক্কা।
২. জনবিন্যাস এবং অবাঙালি ভোটব্যাঙ্ক (Demographic Divide):
ভবানীপুর মূলত একটি মিশ্র সংস্কৃতির এলাকা। ৭৩, ৭৪, ৭০ বা ৭২ নম্বর ওয়ার্ডগুলোতে অবাঙালি (মাড়োয়ারি, গুজরাটি, হিন্দিভাষী) ভোটারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। ২০১৪ এবং ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে এই অবাঙালি ভোটব্যাঙ্ক ঢালাওভাবে বিজেপিকে সমর্থন করেছিল। ২০২১ সালের উপনির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ধরে রাখতে কিছু অবাঙালি ভোটার তাঁকে ভোট দিয়েছিলেন (মমতা নিজেও দাবি করেছিলেন যে তিনি প্রায় ৪৬% অবাঙালি ভোট পেয়েছেন)। কিন্তু ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে সেই "মুখ্যমন্ত্রীকে জেতানোর আবেগ" কাজ না-ও করতে পারে।
৩. মার্জিনের ওঠানামা (Shrinking General Election Margins):
২০২১ সালের উপনির্বাচনের অস্বাভাবিক বিশাল ব্যবধান (৫৮ হাজার) বাদ দিলে, সাধারণ বিধানসভা নির্বাচনে ভবানীপুরে তৃণমূলের মার্জিন খুব বড় নয়। ২০১৬ সালে যেখানে মার্জিন ছিল ২৫ হাজার, ২০২১ এর মূল নির্বাচনে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের মার্জিন ছিল ২৮ হাজার। অর্থাৎ, বিরোধী বা বিজেপির ভোট এখানে প্রায় ৩৫-৪০% এর ঘরে সবসময় স্থির থাকছে। বাতিল হওয়া ভোটাররা যদি তৃণমূলের দিক থেকে কমে যায়, তবে বিজেপির এই সলিড বেস ভোট ব্যবধান ঘুচিয়ে দিতে পারে।
৪. প্রতিষ্ঠান-বিরোধী হাওয়া (Anti-Incumbency):
২০২৬ সালে তৃণমূল সরকার রাজ্যে টানা ১৫ বছর পূর্ণ করবে। ভবানীপুর পুরোপুরি আরবান বা শহুরে ভোটারদের কেন্দ্র। রাজ্যে আরজি কর কাণ্ড, নিয়োগ দুর্নীতি সহ একাধিক ইস্যু নিয়ে শহুরে ভোটারদের মধ্যে যে প্রতিষ্ঠান-বিরোধী মানসিকতা বা Anti-incumbency তৈরি হয়েছে, তা এই কেন্দ্রে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
ভবানীপুরের ওয়ার্ড ও বুথ-ভিত্তিক ডেমোগ্রাফিক বিশ্লেষণ
ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রটি কলকাতা পৌরসংস্থার মোট ৮টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত (৬৩, ৭০, ৭১, ৭২, ৭৩, ৭৪, ৭৭ এবং ৮২)। বুথ-ভিত্তিক পাটিগণিত বুঝতে হলে এই ওয়ার্ডগুলোর জনবিন্যাস বা ডেমোগ্রাফি বোঝা সবচেয়ে জরুরি:
অবাঙালি নিয়ন্ত্রিত ওয়ার্ড (৭০, ৭২, ৭৪): এই ওয়ার্ডগুলোতে মূলত গুজরাটি, মাড়োয়ারি, পঞ্জাবি এবং হিন্দিভাষী ভোটারদের আধিপত্য। ভবানীপুরের মোট ভোটারের প্রায় ৪০-৪৬% এই অবাঙালি সম্প্রদায়। এই বেল্টটি প্রথাগতভাবে বিজেপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
বাঙালি অধ্যুষিত ওয়ার্ড (৬৩, ৭১, ৭৩): এর মধ্যে ৭৩ নম্বর ওয়ার্ডটি সবচেয়ে হাই-প্রোফাইল, কারণ এটি খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজের পাড়া (হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিট)।
মিশ্র ও সংখ্যালঘু নিয়ন্ত্রিত ওয়ার্ড (৭৭, ৮২): চেতলা এবং আলিপুরের কিছু অংশ নিয়ে গঠিত এই ওয়ার্ডগুলোতে (বিশেষ করে ফিরহাদ হাকিমের প্রভাবাধীন ৮২ নং ওয়ার্ড) তৃণমূলের একচেটিয়া আধিপত্য রয়েছে। তৃণমূলের জয়ের মার্জিন মূলত এখান থেকেই আসে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের বুথে হেরেছিলেন?
ঘটনাটি ঘটেছিল ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে। সেই নির্বাচনে কলকাতা দক্ষিণ লোকসভা কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের প্রার্থী ছিলেন সুব্রত বক্সী এবং বিজেপির প্রার্থী ছিলেন তথাগত রায়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ভবানীপুর বিধানসভা সেগমেন্টে তৃণমূলকে পিছনে ফেলে বিজেপি ১৮৫ ভোটের লিড পেয়েছিল। সবচেয়ে বড় ধাক্কা ছিল ৭৩ নম্বর ওয়ার্ড—যেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজের বাড়ি এবং বুথ অবস্থিত। খোদ মুখ্যমন্ত্রীর নিজের ওয়ার্ডেই সেবার বিজেপি তৃণমূলের চেয়ে বেশি ভোট পেয়েছিল! যদিও এটি লোকসভা নির্বাচন ছিল এবং মমতা নিজে প্রার্থী ছিলেন না, তবুও নিজের পাড়ায় দলের এই পিছিয়ে পড়াটা প্রমাণ করে যে ভবানীপুরে প্রতিষ্ঠান-বিরোধী ভোট এবং মেরুকরণ কতটা গভীরে কাজ করতে পারে।
SIR ডেটা এবং অবাঙালি ভোটের প্রভাব (The Game Changer)
এখন আসা যাক সবচেয়ে বড় অঙ্কে। SIR বা ভোটার তালিকা সংশোধনের পর প্রায় ৪৬,০০০ নাম বাদ যাওয়া এবং ১৪,০০০ নাম বিচারাধীন থাকার অর্থ হলো, ভবানীপুরের ডেমোগ্রাফিতে এক বিশাল ভূমিকম্প ঘটে গেছে।
১. ভোটের ভিত্তি কমে যাওয়া: ভবানীপুরে আগে মোট ভোটার ছিল প্রায় ২ লক্ষ ৬ হাজার। ৪৬ হাজার নাম বাদ যাওয়ার পর তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ লক্ষ ৬০ হাজারের আশেপাশে। বিরোধী দলের দাবি অনুযায়ী, এই বাতিল হওয়া নামগুলির বেশিরভাগই ছিল "ভুয়া" বা এমন ভোটার যারা তৃণমূলকে সুবিধা করে দিত।
২. অবাঙালি ভোটের কনসলিডেশন: মোট ভোটারের সংখ্যা কমে যাওয়ায়, অবাঙালি ভোটারদের (যাঁদের সংখ্যা প্রায় ৭০-৭৫ হাজার) শতকরা হার বা ওয়েটেজ এই কেন্দ্রে আরও বেড়ে গেল। ২০২৬ সালের নির্বাচনে যদি অবাঙালি ভোটব্যাঙ্ক একজোট হয়ে বিজেপির দিকে ঢলে পড়ে (যেমনটা ২০১৪ বা ২০১৯ লোকসভায় দেখা গিয়েছিল), তবে তা তৃণমূলের জন্য সামলানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
২০২৬ নির্বাচনে বিজেপির সম্ভাব্য জয়-পরাজয়ের অঙ্ক (Statistical Projection)
মোট বৈধ ভোটার (আনুমানিক): ১,৬০,০০০ (যদি ৪৬ হাজার পুরোপুরি বাদ যায়)।
ভোটদানের হার (৬৫% ধরলে): পোলড ভোট হবে প্রায় ১,০৪,০০০।
বিজেপির টার্গেট: অবাঙালি বেল্ট (৭০, ৭২, ৭৪ ওয়ার্ড) এবং বাঙালি হিন্দু মধ্যবিত্তের প্রতিষ্ঠান-বিরোধী ভোট মিলিয়ে বিজেপি যদি এই ১ লক্ষ ৪ হাজার ভোটের মধ্যে ৫০-৫৫% ভোট নিজেদের বাক্সে টানতে পারে, তবে তাদের ঝুলিতে আসতে পারে প্রায় ৫২,০০০ থেকে ৫৭,০০০ ভোট।
তৃণমূলের চ্যালেঞ্জ: তৃণমূলের কোর ভোটব্যাঙ্ক যদি ওই ৪৬ হাজার বাতিলের খাতায় বড়সড় ধাক্কা খেয়ে থাকে, তবে শুধুমাত্র ৭৭ ও ৮২ নম্বর ওয়ার্ডের উপর ভরসা করে ১ লক্ষ ভোটের মধ্যে ৫০ হাজার পার করা অত্যন্ত কঠিন হবে।


0 মন্তব্যসমূহ