Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

Recent in Home

মমতা সরকারের ১৫ বছর: দুই ডজন কেলেঙ্কারী ও ব্যর্থতার পূর্ণাঙ্গ খতিয়ান

মমতা সরকারের ১৫ বছর: দুই ডজন কেলেঙ্কারী ও ব্যর্থতার পূর্ণাঙ্গ খতিয়ান 


সম্পাদকীয় : মানুষের ভাষা , প্রবীর রায় চৌধুরী : 


২০০৬ সালের সিঙ্গুর আন্দোলন বাংলার রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী পটপরিবর্তন এনেছিল। "মা-মাটি-মানুষ"-এর স্লোগান এবং একটি বামপন্থী সরকারের ৩৪ বছরের দুর্ভেদ্য দুর্গকে ধুলিসাৎ করে ২০১১ সালে যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় এসেছিলেন, তখন সাধারণ মানুষের মনে এক পাহাড়প্রমাণ প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু আজ, ২০২৬ সালের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে তাঁর গত ১৫ বছরের শাসনকালের দিকে ফিরে তাকালে প্রতিশ্রুতির এক কঙ্কালসার রূপ ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না।

যে শাসক ক্ষমতার দম্ভে সাধারণ মানুষের অধিকারকে অবজ্ঞা করেন এবং সাংবিধানিক কাঠামোকে নিজের ইচ্ছেমতো ভাঙাগড়া করতে চান, ইতিহাসের বিচারসভায় তাঁর পতন অনিবার্য। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গত দেড় দশকের শাসনকাল বিশ্লেষণ করলে এমন কিছু 'মেগা ব্যর্থতা' বা ঐতিহাসিক স্খলন সামনে আসে, যা শুধু বাংলার অর্থনীতিকেই পঙ্গু করেনি, বরং সামাজিক ও প্রশাসনিক কাঠামোকে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট একটি বা দুটি ঘটনা নয়, তাঁর সরকারের সামগ্রিক পতনের এই পূর্ণাঙ্গ দলিলটি নিচে তুলে ধরা হলো:

 শিল্প ও কর্মসংস্থানের সমাধিক্ষেত্র

১. সিঙ্গুর— এক ঐতিহাসিক ভুল ও শিল্পের শ্মশান:

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক উত্থানের প্রধান সিঁড়ি ছিল সিঙ্গুর। টাটা মোটরস-এর ন্যানো কারখানাকে বাংলা থেকে তাড়িয়ে তিনি কৃষকদের জমি ফেরতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু আজ ১৫ বছর পর সিঙ্গুরের সেই জমি কৃষির অযোগ্য এবং শিল্পের জন্য মৃত। যে টাটাকে তাড়িয়ে তিনি রাজনৈতিক মাইলেজ পেয়েছিলেন, সেই টাটাই গুজরাটের সানন্দে শিল্পনগরী গড়ে তুলেছে, আর সিঙ্গুর পরিণত হয়েছে বাংলার শিল্পহীনতার সবচেয়ে বড় স্মৃতিস্তম্ভে।

২. স্থায়ী চাকরির নামে প্রহসন ও 'সিভিক' রাজ:

ক্ষমতায় আসার আগে বাম আমলের কর্মসংস্থান নিয়ে তীব্র সমালোচনা করলেও, নিজের আমলে তিনি স্থায়ী সরকারি চাকরির কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দিয়েছেন। লক্ষ লক্ষ বেকার যুবক-যুবতী যখন স্থায়ী চাকরির আশায় বসে, তখন তাঁর সরকার গোটা প্রশাসনকে 'সিভিক ভলান্টিয়ার' এবং 'চুক্তিভিত্তিক' (Contractual) কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে। নামমাত্র বেতনে, বিনা নিরাপত্তায় এই অস্থায়ী কর্মীদের দিয়ে পুলিশ থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা চালানো হচ্ছে, যা শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের সাথে এক চরম প্রতারণা।

৩. শিক্ষক নিয়োগের 'মেগা' দুর্নীতি ও মেধার হত্যা:

বাংলার বুকে সম্ভবত সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারি হলো এসএসসি (SSC) ও টেট (TET) দুর্নীতি। টাকার বিনিময়ে অযোগ্যদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে শিক্ষকতার চাকরি, আর রাস্তায় বছরের পর বছর ধর্নায় বসে কেঁদেছেন যোগ্য প্রার্থীরা। দুর্নীতি ঢাকতে রাজ্য মন্ত্রিসভায় বেআইনিভাবে 'সুপারনিউমারারি পোস্ট' বা অতিরিক্ত শূন্যপদ তৈরি করে অযোগ্যদের চাকরি বাঁচানোর যে নির্লজ্জ চেষ্টা সরকার করেছিল, সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের হস্তক্ষেপে তা চরমভাবে ব্যর্থ হয়।

৪. মহার্ঘ ভাতা (DA) বঞ্চনা ও আইনি পরাজয়:

রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য ডিএ বা মহার্ঘ ভাতা থেকে দিনের পর দিন বঞ্চিত করে সরকার দাবি করেছে যে, কোষাগারে টাকা নেই (অথচ খয়রাতির মেলায় টাকার অভাব নেই)। স্যাট (SAT) থেকে শুরু করে কলকাতা হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত এই আইনি লড়াই গড়িয়েছে। সর্বোচ্চ আদালতের কড়া নির্দেশের সামনে রাজ্য সরকারের সমস্ত টালবাহানা শেষ পর্যন্ত ধোপে টেকেনি।

সাংবিধানিক আস্ফালন ও বিচারবিভাগীয় চপেটাঘাত

৫. সিএএ (CAA) প্রতিরোধে চরম ব্যর্থতা:

সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ককে আশ্বস্ত করতে রাস্তায় নেমে "কাগজ আমরা দেখাবো না" বলে যে তীব্র আন্দোলন তিনি গড়ে তুলেছিলেন, ২০২৪ সালের মার্চ মাসে তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। কেন্দ্র সিএএ-র নিয়মাবলি কার্যকর করে এবং রাজ্যের সমস্ত আপত্তি উড়িয়ে পোর্টালের মাধ্যমে নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়।

৬. তিন তালাক ও ওয়াকফ বিল:

তিন তালাককে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করার তীব্র বিরোধিতা করেছিল শাসকদল। একইভাবে ওয়াকফ সংশোধনী বিল আটকাতেও জেপিসি-তে তুমুল প্রতিবাদ জানানো হয়। কিন্তু সংসদীয় সংখ্যাতত্ত্ব এবং সাংবিধানিক কাঠামোর সামনে রাজ্যের এই আস্ফালন শক্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে।

৭. 'সার' (SIR) রুখতে গিয়ে সুপ্রিম কোর্টে ভর্ৎসনা:

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিরোধের রাজনীতির কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দিয়েছে 'সার' (SIR) সংক্রান্ত ঘটনাক্রম। নিজের রাজনৈতিক জমি ধরে রাখতে তিনি নির্বাচন কমিশনের এই পদক্ষেপকে যেকোনো মূল্যে রুখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টে তাঁকে সম্পূর্ণ খালি হাতে ফিরতে হয়েছে, উল্টে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের কড়া ভর্ৎসনার মুখে পড়তে হয়েছে রাজ্য প্রশাসনকে। আজ যখন নির্বাচন কমিশন SIR-এর চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করছে, তখন সংখ্যালঘুদের আইনি সুরক্ষা দেওয়ার যে মিথ্যা বুদবুদ তিনি তৈরি করেছিলেন, তা চিরতরে ফেটে গেল।

৮. কেন্দ্রীয় প্রকল্প আটকাতে গিয়ে পিছু হঠা:

পিএম কিষাণ সম্মান নিধি এবং 'এক দেশ, এক রেশন কার্ড'-এর মতো প্রকল্প তিনি দীর্ঘদিন আটকে রেখেছিলেন নিজের ইগোর কারণে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কৃষকদের ক্ষোভ এবং সুপ্রিম কোর্টের কড়া হস্তক্ষেপে নতিস্বীকার করে এই প্রকল্পগুলো মেনে নিতে বাধ্য হন। এমনকি, কেন্দ্রের রেরা (RERA) আইন পাশ কাটিয়ে নিজস্ব WBHIRA আইন চালুর যে আইনি স্পর্ধা রাজ্য দেখিয়েছিল, সুপ্রিম কোর্ট তাকে অসাংবিধানিক বলে বাতিল করে দেয়।

দুর্নীতির দুর্গ ও অপরাধীদের রক্ষাকবচ

৯. পার্থ চট্টোপাধ্যায় ও অর্পিতার টাকার পাহাড়:

শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতিতে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠের ফ্ল্যাট থেকে যখন ইডি টাকার পাহাড় উদ্ধার করে, তখন দলের শীর্ষ নেতা হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে রক্ষা করতে পারেননি মুখ্যমন্ত্রী। নিরুপায় হয়েই তাঁকে বহিষ্কার করতে বাধ্য হয় দল।

১০. জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক (রেশন দুর্নীতি):

রেশন দুর্নীতির অভিযোগে প্রাক্তন খাদ্যমন্ত্রীকে ইডি গ্রেপ্তার করার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, "বালুর শরীর খারাপ, ওর কিছু হলে ইডি-র বিরুদ্ধে এফআইআর করব।" এই ফাঁকা আওয়াজ কোনো কাজেই আসেনি।

১১. অনুব্রত মণ্ডল (গরু পাচার):

বীরভূমের দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতাকে সিবিআই গ্রেপ্তার করার পর মুখ্যমন্ত্রী জনসমক্ষে তাঁকে "বীরের সম্মান" দিয়ে ছাড়িয়ে আনার কথা বলেছিলেন। কিন্তু অনুব্রতকে দীর্ঘ সময় তিহাড় জেলেই কাটাতে হয়।

১২. সন্দেশখালির শাহজাহান ও নারী নির্যাতন:

ইডি আধিকারিকদের ওপর হামলার পর শেখ শাহজাহানকে ৫৫ দিন ধরে আড়াল করার আপ্রাণ চেষ্টা করে রাজ্য পুলিশ। কিন্তু কলকাতা হাইকোর্টের কড়া নির্দেশে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে বাধ্য হয় এবং আদালতের নির্দেশে তাকে সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

আইনশৃঙ্খলার পতন ও নারী নিরাপত্তার চরম সংকট

১৩. আর. জি. কর (R.G. Kar) হাসপাতালের নারকীয় ঘটনা:

রাজ্য সরকার এই ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার তদন্ত কলকাতা পুলিশের হাতেই রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু নজিরবিহীন প্রমাণ লোপাটের অভিযোগ এবং দেশজুড়ে তীব্র প্রতিবাদের মুখে কলকাতা হাইকোর্ট রাজ্য পুলিশের তদন্তে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করে মামলাটি সরাসরি সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেয়।

১৪. পঞ্চায়েত নির্বাচনে রক্তপাত ও কেন্দ্রীয় বাহিনী:

নির্বাচনে বিরোধী শূন্য করার লক্ষ্যে রাজ্য নির্বাচন কমিশন এবং সরকার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল কেন্দ্রীয় বাহিনী ছাড়া ভোট করাতে। কিন্তু ব্যাপক হিংসার পর হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে সারা রাজ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করতে বাধ্য হয় সরকার।

১৫. রামনবমীর অশান্তি ও এনআইএ (NIA) তদন্ত:

হাওড়া, ডালখোলা-সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে রামনবমীর মিছিলে অশান্তির ঘটনায় রাজ্য পুলিশের তদন্তে ভরসা না রেখে হাইকোর্ট এই স্পর্শকাতর মামলাগুলো এনআইএ-এর হাতে তুলে দেয়। এটি রাজ্য প্রশাসনের ওপর বিচারব্যবস্থার চূড়ান্ত অনাস্থার প্রমাণ।

আগের ১৫টি পয়েন্টের পর, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন সরকারের আরও কিছু অন্ধকার অধ্যায় এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির খতিয়ান নিচে তুলে ধরা হলো, যা এই ১৫ বছরের শাসনকালের কফিনে এক একটি বিশাল পেরেক:

প্রাকৃতিক সম্পদ লুট, সিন্ডিকেট রাজ ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি

১৬. কয়লা পাচার— কালো হিরের কালো টাকা:

বাংলার খনিজ সম্পদ লুটের এক নজিরবিহীন অধ্যায় হলো কয়লা পাচার কেলেঙ্কারি। হাজার হাজার কোটি টাকার এই দুর্নীতিতে ইডি এবং সিবিআইয়ের জালে ধরা পড়েছে প্রশাসনের একাংশ এবং শাসকদলের বহু প্রভাবশালী নেতা। এই পাচারের কালো টাকা কীভাবে রাজ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশে পাচার হয়েছে এবং শাসকদলের শীর্ষ নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠদের কীভাবে বারবার কেন্দ্রীয় এজেন্সির জেরার মুখে পড়তে হয়েছে, তা রাজ্যবাসীর কাছে আজ আর কোনো গোপন বিষয় নয়। প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার বদলে সরকার কার্যত পাচারকারীদের স্বর্গরাজ্য তৈরি করে দিয়েছিল।

১৭. বালি মাফিয়াদের দৌরাত্ম্য ও নদীমাতৃক বাংলার সর্বনাশ:

কয়লার পাশাপাশি রাজ্যের প্রতিটি নদীর বুক চিরে চলেছে অবৈধ বালি খাদানের রমরমা কারবার। বীরভূম, বাঁকুড়া, বর্ধমান থেকে শুরু করে রাজ্যের সর্বত্র শাসকদলের ছত্রছায়ায় থাকা 'বালি মাফিয়া'রা পরিবেশের তোয়াক্কা না করে কোটি কোটি টাকার বালি লুট করেছে। স্থানীয় নেতা থেকে শুরু করে পুলিশ-প্রশাসনের একাংশের পকেটে পৌঁছেছে এই লুটের বখরা। সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করতে গেলে জুটেছে হুমকি এবং মারধর।

১৮. সিন্ডিকেট রাজ, জমি দখল (Land Grab) ও অবৈধ নির্মাণ:

গত ১৫ বছরে 'সিন্ডিকেট' শব্দটি বাংলার সমাজজীবনের এক অবিচ্ছেদ্য এবং ভয়ংকর অঙ্গে পরিণত হয়েছে। সাধারণ মানুষের জমি জোর করে দখল করা, জলাভূমি ভরাট করে ইমারত তোলা এবং প্রোমোটার-নেতা-পুলিশের অশুভ আঁতাঁতে শহর থেকে গ্রাম— সর্বত্র গজিয়ে উঠেছে অবৈধ নির্মাণ। খাস কলকাতার বুকে গার্ডেনরিচে বেআইনি বহুতল ভেঙে পড়ে একাধিক নিরীহ মানুষের মৃত্যু চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, টাকার বিনিময়ে প্রশাসনের চোখের সামনে কীভাবে মানুষের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবৈধ নির্মাণের রমরমা চলেছে।

১৯. পুরসভায় নিয়োগ দুর্নীতি— ঝাড়ুদার থেকে করণিক পদেও নিলাম:

শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির তদন্তে নেমেই কেন্দ্রীয় এজেন্সির হাতে আসে পুরসভা নিয়োগ দুর্নীতির কেঁচো, যা খুঁড়তে গিয়ে আস্ত কেউটে বেরিয়ে পড়ে। রাজ্যের একাধিক পুরসভায় গ্রুপ সি, গ্রুপ ডি, সাফাইকর্মী থেকে শুরু করে চালক পদেও কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে অযোগ্যদের চাকরি বিক্রি করা হয়েছে। ওএমআর (OMR) শিট কারচুপি করে এই প্রাতিষ্ঠানিক লুট প্রমাণ করে যে, সরকারের প্রতিটি স্তরেই দুর্নীতির শিকড় কতটা গভীরে প্রবেশ করেছে। হাইকোর্ট বাধ্য হয়ে এই দুর্নীতিতেও সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দেয়।

গরিবের হক মারা ও সাংবিধানিক অবক্ষয়

২০. ১০০ দিনের কাজ ও আবাস যোজনায় মহালুট:

গরিব মানুষের মাথার ছাদ এবং পেটের ভাতের টাকাতেও থাবা বসিয়েছে শাসকদলের পঞ্চায়েত স্তরের নেতারা। ১০০ দিনের কাজে (MGNREGA) লক্ষ লক্ষ ভুয়ো জব কার্ড তৈরি করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। অন্যদিকে, দোতলা বাড়ির মালিক শাসকদলের নেতারা 'প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা'র ঘর পেয়েছেন, আর প্রকৃত গরিব মানুষ ত্রিপল খাটিয়ে দিন কাটাতে বাধ্য হয়েছেন। এই ব্যাপক দুর্নীতির কারণেই কেন্দ্র টাকা দেওয়া বন্ধ করতে বাধ্য হয়, আর রাজ্য সরকার নিজের দলের নেতাদের চুরি আড়াল করতে 'কেন্দ্রের বঞ্চনা'র রাজনৈতিক স্লোগান তুলে মানুষের চোখ ঘোরানোর চেষ্টা করে।

২১. সারদা ও রোজভ্যালি— চিটফান্ড কেলেঙ্কারি:

মমতা সরকারের প্রথম মেয়াদের সবচেয়ে বড় কলঙ্ক ছিল চিটফান্ড দুর্নীতি। সারদা ও রোজভ্যালির মতো ভুঁইফোড় কোম্পানিগুলো লক্ষ লক্ষ গরিব মানুষের সারাজীবনের সঞ্চয় লুট করে নিয়েছিল। শাসকদলের বহু মন্ত্রী, সাংসদ এবং প্রভাবশালী নেতা এই ফান্ডের টাকায় ফুলেফেঁপে উঠেছিলেন এবং পরবর্তীতে সিবিআইয়ের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘদিন জেলও খেটেছেন। গরিব মানুষের টাকা ফেরানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে সরকার যে কমিশন গড়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কোনো কাজেই আসেনি।

২২. একুশের ভোট-পরবর্তী হিংসা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন:

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল জয়ের পর বাংলায় যে নজিরবিহীন রাজনৈতিক সন্ত্রাস এবং ভোট-পরবর্তী হিংসা (Post-Poll Violence) দেখা গিয়েছিল, তা দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক কালো দাগ। বিরোধী দলের কর্মী-সমর্থকদের খুন, ধর্ষণ, বাড়িঘর ভাঙচুর এবং ঘরছাড়া করার ঘটনায় রাজ্য পুলিশ সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ছিল। কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (NHRC) তদন্ত করে রিপোর্ট দেয় যে বাংলায় "আইনের শাসন নয়, শাসকের আইন" চলছে এবং হাইকোর্ট সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দেয়।

২৩. রেশনে গরিবের চাল চুরি (Mid-day Meal & Ration Scam):

কোভিড মহামারীর চরম সংকটের সময়েও গরিবের জন্য বরাদ্দ রেশনের চাল ও গম চুরি গেছে শাসকদলের নেতাদের গুদামে। মিড-ডে মিলের মতো শিশুদের পুষ্টির প্রকল্পে অত্যন্ত নিম্নমানের খাবার দেওয়া এবং ফান্ডের টাকা অন্য খাতে বেআইনিভাবে খরচ করার ঘটনাও বারবার সামনে এসেছে, যার জেরে কেন্দ্রীয় দল এসে তদন্ত করতে বাধ্য হয়েছে।

আপনার নির্দেশ অনুযায়ী, এই ঐতিহাসিক খতিয়ানকে সম্পূর্ণ করতে ২৪ নম্বর পয়েন্টটি যুক্ত করা হলো। এর মাধ্যমে আপনার নিবন্ধটি "মমতা সরকারের দুই ডজন (২৪টি) মেগা ব্যর্থতা"-র একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও অকাট্য দলিলে পরিণত হলো।

আগের ২৩টি পয়েন্টের পর এই সর্বশেষ এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টটি নিচে দেওয়া হলো:

তোষণনীতির চূড়ান্ত পরাভব ও বিচারবিভাগীয় কশাঘাত

২৪. ওবিসি (OBC) শংসাপত্র বাতিল— তোষণনীতির গালে বিচারব্যবস্থার চরম চপেটাঘাত:

মমতা সরকারের ভোটব্যাঙ্ক রাজনীতি এবং সংবিধানকে বুড়ো আঙুল দেখানোর সবচেয়ে বড় এবং লজ্জাজনক উদাহরণ হলো কলকাতা হাইকোর্ট কর্তৃক ৫ লক্ষ ওবিসি (OBC) সার্টিফিকেট বাতিল করে দেওয়ার ঐতিহাসিক রায়। ২০১০ সালের পর থেকে নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়ের ভোট নিশ্চিত করার তাগিদে, কোনো রকম আইনি ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া বা যথাযথ সমীক্ষা ছাড়াই পাইকারি হারে এই শংসাপত্রগুলো বিলি করা হয়েছিল। আদালত অত্যন্ত কড়া ভাষায় এই প্রক্রিয়াকে বেআইনি আখ্যা দিয়ে বাতিল করে দেয়। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, সস্তার রাজনীতির জন্য রাজ্য প্রশাসনকে কীভাবে দলদাসে পরিণত করা হয়েছিল। যোগ্য ওবিসি প্রার্থীরা, যারা প্রকৃত অর্থেই সংরক্ষণের দাবিদার ছিলেন, রাজ্য সরকারের এই নির্লজ্জ তোষণনীতির কারণে তাঁরা চরম বঞ্চনার শিকার হন। সুপ্রিম কোর্টেও রাজ্যের এই চরম সাংবিধানিক স্খলন কোনো রক্ষাকবচ পায়নি।

পতনের দোরগোড়ায় অহংকারের সিংহাসন 

সিঙ্গুরের শ্মশান থেকে সন্দেশখালির নারী নির্যাতন, কয়লা-বালির লুট থেকে শুরু করে শিক্ষক ও পুরসভার চাকরি বিক্রি, এবং সিএএ বা ওবিসি সংরক্ষণ নিয়ে সাংবিধানিক কাঠামোর সাথে নিত্যদিনের সংঘাত— এই দুই ডজন বা ২৪টি মেগা ব্যর্থতা কেবল কোনো সরকারের প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়, এটি একটি রাজ্যের প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়ের প্রামাণ্য দলিল।

যে নেত্রী একসময় "মা-মাটি-মানুষ"-এর স্লোগান দিয়ে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, তাঁর দেড় দশকের শাসনেই বাংলা পরিণত হয়েছে দুর্নীতি, সিন্ডিকেট রাজ এবং বিচারবিভাগীয় তিরস্কারের এক বিশ্বস্ত উপাখ্যানে। সাধারণ মানুষ, বেকার যুবক-যুবতী এবং প্রকৃত অধিকার থেকে বঞ্চিত জনতা আজ বুঝতে পেরেছে যে, খয়রাতির চাদর এবং রাজনৈতিক হুঙ্কার দিয়ে এই পাহাড়প্রমাণ ব্যর্থতাকে আর ঢেকে রাখা সম্ভব নয়।

আসন্ন ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে, বাংলার প্রতিটি কোণায় যখন এই দুই ডজন বঞ্চনার হিসাব উঠবে, তখন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়া এই অহংকারের সিংহাসন আর টিকতে পারবে না। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে— ক্ষমতার দম্ভে যারা জনতার আদালতকে বোকা ভাবে, চূড়ান্ত বিচারে তাদের পতন কেবল সময়ের অপেক্ষা।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Comments

Ad Code