SIR :এবার বিচারকদের হাতে SIR, সুপ্রিম কোর্টের নজিরবিহীন ঐতিহাসিক রায় - কোর্ট আর কমিশনের সঙ্গে ঝামেলা পাকিয়ে বেকায়দায় রাজ্য সরকার
মানুষের ভাষা ওয়েব ডেস্ক, কলকাতা: আজ, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক এবং নির্বাচনী ইতিহাসে এক নজিরবিহীন দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন (SIR) বা বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় রাজ্য বনাম নির্বাচন কমিশন (ECI) মামলায় সুপ্রিম কোর্ট আজ এমন এক ঐতিহাসিক এবং কড়া রায় দিয়েছে, যা রাজ্য রাজনীতির সমীকরণকে কার্যত উলটে দিয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকারের হাত থেকে এই প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ কার্যত ছিনিয়ে নিয়ে বিচারব্যবস্থার হাতে তুলে দিয়েছে দেশের শীর্ষ আদালত।
রাজ্য সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের মধ্যে তৈরি হওয়া "ট্রাস্ট ডেফিসিট" বা আস্থার অভাবের কারণে সুপ্রিম কোর্ট এই "অসাধারণ নির্দেশ" (extraordinary order) দিতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে, ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো একটি আদ্যোপান্ত প্রশাসনিক কাজে এখন থেকে সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে কলকাতা হাইকোর্ট।
নজিরবিহীন রায়: এসডিও/এডিএম-এর ভূমিকা পালন করবেন বিচারকরা!
নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী, ভোটার তালিকায় নাম তোলা বা বাদ দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এক্তিয়ার থাকে শুধুমাত্র ইলেক্টরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার বা ইআরও (ERO)-দের হাতে। সাধারণত, মহকুমা শাসক (SDM) বা অতিরিক্ত জেলা শাসক (ADM) পদমর্যাদার অফিসাররাই এই দায়িত্ব পালন করে থাকেন। কিন্তু এ রাজ্যে এই অফিসারদের নিয়োগ নিয়েই রাজ্য ও কমিশনের মধ্যে চূড়ান্ত অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল।
আজ সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ডি.ওয়াই. চন্দ্রচূড় (যদিও বর্তমানে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এই বেঞ্চের নেতৃত্ব দিচ্ছেন) প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি এবং বিচারপতি বিপুল এম. পাঞ্চোলির বেঞ্চ এক অভাবনীয় নির্দেশ দেয়। সুপ্রিম কোর্ট কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে অনুরোধ করেছে, তিনি যেন কর্মরত এবং প্রাক্তন বিচার বিভাগীয় আধিকারিকদের (অতিরিক্ত জেলা জজ বা জেলা জজ পদমর্যাদার) নিয়োগ করেন, যাঁরা এই এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ায় ইআরও (ERO) হিসেবে কাজ করবেন।
আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, "অসাধারণ পরিস্থিতির" কারণেই এমন "অসাধারণ নির্দেশ" দেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি নিযুক্ত বিচার বিভাগীয় আধিকারিককে সাহায্য করার জন্য নির্বাচন কমিশনের মাইক্রো-অবজারভার এবং রাজ্যের অফিসাররা থাকবেন।
কেন এই পরিস্থিতি তৈরি হলো?
এর আগের শুনানিতে শীর্ষ আদালত রাজ্যকে নির্দেশ দিয়েছিল যে, নির্বাচন কমিশনকে পর্যাপ্ত সংখ্যক 'গ্রুপ-বি' অফিসার দিতে হবে, যাঁরা কমিশনের মাইক্রো-অবজারভারদের জায়গা নিতে পারেন। কিন্তু আজ শুনানিতে কমিশনের আইনজীবী দামা শেষাদ্রি নাইডু জানান, রাজ্য সরকার এমন কোনো এসডিএম (SDM) পদমর্যাদার অফিসার দেয়নি যাঁরা 'কোয়াসি-জুডিশিয়াল' বা আধা-বিচারবিভাগীয় নির্দেশিকা জারি করতে পারেন। অন্যদিকে রাজ্যের আইনজীবী কপিল সিবাল যুক্তি দেন যে, রাজ্যে এসডিএম-রা 'গ্রুপ-এ' অফিসার, তাই শীর্ষ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী মাইক্রো-অবজারভারদের সরাতে এসডিএম পদমর্যাদার অফিসার প্রয়োজন।
এই চরম "ব্লেম গেম" বা দোষারোপের পালা দেখে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ চরম হতাশা ব্যক্ত করে বলে, "আমরা হতাশ। আমরা রাজ্যের কাছ থেকে সহযোগিতার আশা করছিলাম"। যখন দুই পক্ষই অফিসার নিয়োগ নিয়ে গড়িমসি করছে, তখন বিচারপতি বাগচি বলেন, "যেহেতু দুই পক্ষের মধ্যেই দ্বিধা রয়েছে, তাই আমরা বিচার বিভাগীয় আধিকারিকদের নিয়োগ করব"।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চালে চরম বুমেরাং
আজকের এই রায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য এক বিশাল বুমেরাং। গত শুনানিতে (১৪ ফেব্রুয়ারি) যখন সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছিল যে, নির্বাচন কমিশনের মাইক্রো-অবজারভাররা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না, তখন তৃণমূল কংগ্রেস একে রাজ্যের জন্য "বড় জয়" এবং "গণতন্ত্রের জয়" বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার করেছিল। খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গত ৪ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টে সশরীরে উপস্থিত হয়ে দাবি করেছিলেন যে, কমিশন কেবল বাংলাকেই টার্গেট করছে এবং মাইক্রো-অবজারভারদের দিয়ে প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে।
কিন্তু সেই তথাকথিত "জয়" আজ বুমেরাং হয়ে ফিরে এলো। রাজ্য সরকার ভেবেছিল, কমিশনের মাইক্রো-অবজারভারদের ডানা ছেঁটে দিয়ে নিজেদের প্রশাসনিক অফিসারদের (যাঁদের মধ্যে অনেকেই শাসক দলের প্রতি সহানুভূতিশীল বলে বিরোধীদের অভিযোগ) দিয়ে ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ নিজেদের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করবে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট রাজ্যের অসহযোগিতা দেখে পুরো প্রক্রিয়ার রাশই রাজ্য প্রশাসনের হাত থেকে কেড়ে নিল। সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাজ্য সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের মতো দুটি সাংবিধানিক সংস্থার মধ্যে এই ধরনের "ট্রাস্ট ডেফিসিট" অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।
ফলস্বরূপ, রাজ্য সরকার এখন এই এসআইআর প্রক্রিয়ায় কার্যত একটি 'ল্যাম ডাক' (Lame Duck) বা ক্ষমতাহীন সরকারে পরিণত হলো। ভোটার তালিকা থেকে কাদের নাম বাদ যাবে বা কার নাম যুক্ত হবে, তার ওপর নবান্নের আর কোনো পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণও রইল না।
ডিজিপি এবং জেলাশাসকরা এখন 'ডিমড ডেপুটেশন'-এ
রাজ্য প্রশাসন এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়েও সুপ্রিম কোর্ট আজ কড়া অবস্থান নিয়েছে। শীর্ষ আদালত নির্দেশ দিয়েছে যে, রাজ্যের সমস্ত জেলাশাসক (Collector) এবং পুলিশ সুপার (SP)-দের এই প্রক্রিয়ায় বিচার বিভাগীয় আধিকারিকদের সম্পূর্ণ লজিস্টিক সহায়তা এবং নিরাপত্তা প্রদান করতে হবে। সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এই কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য জেলাশাসক এবং পুলিশ সুপাররা এখন থেকে 'ডিমড ডেপুটেশন' (deemed deputation)-এ থাকবেন। অর্থাৎ, তাঁরা এই প্রক্রিয়ার জন্য সরাসরি কমিশন এবং বিচারব্যবস্থার কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন, নবান্নের কাছে নয়।
এর আগে, এসআইআর প্রক্রিয়ায় যুক্ত আধিকারিকদের ওপর হুমকি ও হিংসার ঘটনা রোধে ব্যর্থ হওয়ার কারণে সুপ্রিম কোর্ট রাজ্যের ডিরেক্টর জেনারেল অফ পুলিশ (DGP)-কে ব্যক্তিগত হলফনামা জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। আজ ফের আদালত রাজ্য পুলিশ এবং প্রশাসনের ভূমিকায় কড়া নজরদারি চালিয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট আগামীকাল রাজ্য নির্বাচন কমিশনার, মুখ্যসচিব, ডিজিপি এবং কলকাতা হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট জেনারেলকে নিয়ে একটি বৈঠক করার নির্দেশ দিয়েছে, যাতে এই অচলাবস্থা দ্রুত কাটানো যায়।
প্রায় ১.৩৬ কোটি ভোটারের ভাগ্য নির্ধারণ
প্রসঙ্গত, নির্বাচন কমিশন রাজ্যে প্রায় ১.৩৬ কোটি ভোটারকে "লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি" (logical discrepancy) বা যৌক্তিক অসঙ্গতির কারণে নোটিশ পাঠিয়েছে। এর মধ্যে পিতা-মাতার নামের অমিল, বা বয়সের অস্বাভাবিক পার্থক্যের মতো বিষয়গুলি রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট আজ নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দিয়েছে, আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে যেটুকু প্রক্রিয়াকরণ সম্পন্ন হয়েছে, তার ভিত্তিতে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করতে হবে। বাকি নামগুলি পরবর্তীতে সাপ্লিমেন্টারি বা পরিপূরক তালিকা হিসেবে প্রকাশ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
রাজ্যের প্রশাসনিক ব্যর্থতা
রাজ্য রাজনীতির গতিপ্রকৃতি দেখার পর এই রায়কে কেবল একটি আইনি নির্দেশ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি রাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর দেশের সর্বোচ্চ আদালতের চূড়ান্ত অনাস্থা। রাজ্য সরকার যদি প্রথম থেকেই কমিশনের সঙ্গে সংঘাতে না গিয়ে স্বচ্ছভাবে এই ১.৩৬ কোটি ভোটারের তথ্য যাচাইয়ে সহযোগিতা করত, তবে আজ হয়তো কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতিদের এসডিও বা এডিএম-এর কাজ করতে হতো না।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে সময় কিনে নির্বাচন কমিশনকে চাপে ফেলতে চেয়েছিল। কিন্তু প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চ রাজ্যের সেই কৌশল ধরে ফেলেছে। "আমরা হতাশ"—সুপ্রিম কোর্টের এই একটি বাক্যই প্রমাণ করে যে রাজ্য সরকার দেশের শীর্ষ আদালতের আস্থাও হারিয়েছে।
আগামী বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই নির্ভুল ভোটার তালিকা তৈরি হওয়া অত্যন্ত জরুরি। সুপ্রিম কোর্ট আজ বুঝিয়ে দিল, এই প্রক্রিয়ায় রাজ্য সরকার বা কোনো রাজনৈতিক দলের হস্তক্ষেপ বরদাস্ত করা হবে না। রাজ্যের শাসক দলের জন্য এটি এক অশনিসংকেত, কারণ 'সেটিং' বা প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে ভোটার তালিকা নিয়ন্ত্রণের দিন সম্ভবত শেষ হতে চলেছে।
0 মন্তব্যসমূহ