মানুষের ভাষা নিউজ ডেস্ক, কলকাতা: ২০২৬-এর বিধানসভা ভোটের আগে বঙ্গ রাজনীতিতে ফের এক বার বড়সড় ভাঙনের সংকেত। যে বাম-আইএসএফ-জেইউপি (JUP) জোট নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে ছিল, তা কার্যত ভ্রূণেই বিনষ্ট হতে বসেছে। সোমবার মুর্শিদাবাদে দাঁড়িয়ে বিস্ফোরক ঘোষণা করলেন জনতা উন্নয়ন পার্টির (JUP) প্রতিষ্ঠাতা তথা বহিষ্কৃত তৃণমূল বিধায়ক হুমায়ুন কবীর। জানিয়ে দিলেন, সিপিএম বা আইএসএফ—কারও সঙ্গেই জোটে যাচ্ছেন না তিনি। উল্টে আলিমুদ্দিনকে কার্যত হুঁশিয়ারি দিয়ে হুমায়ুন বলেছেন, “সিপিএম এখন শূন্যে আছে, ওদের মহাশূন্যে পাঠানোর ব্যবস্থা আমি করব।”
আসনের ‘অযৌক্তিক’ দাবি: ভেস্তে গেল জোট?
নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই রাজ্যে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যাচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও মহম্মদ সেলিম এবং নওশাদ সিদ্দিকীর সঙ্গে জোটের টেবিলে বসার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন হুমায়ুন। কিন্তু সোমবার তাঁর সুর ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। হুমায়ুনের অভিযোগ, বামফ্রন্টের শরিক দল—ফরোয়ার্ড ব্লক, আরএসপি এবং খোদ আইএসএফ যে সংখ্যক আসনের দাবি জানাচ্ছে, তা তাঁর কাছে একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়।
হুমায়ুনের কথায়, “২১ তারিখে আমি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেব। তবে যে পদ্ধতিতে বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু এবং তাঁদের শরিক দলগুলো আসনের ডিমান্ড করছে, তাতে সমঝোতা সম্ভব নয়। এমনকি আইএসএফ যে সংখ্যা চাইছে, তাতেও আমি সম্মত নই। আমি একাই লড়ব, কিন্তু ওদের আস্ফালন মেনে নেব না।”
নয়া তৃতীয় ফ্রন্ট: হুমায়ুনের ছাতার তলায় মিম-এসডিপিআই
সিপিএম-কে বাদ দিলেও রাজ্যে এক শক্তিশালী অ-তৃণমূল ও অ-বিজেপি জোট গড়তে মরিয়া হুমায়ুন। এদিন তিনি স্পষ্ট করেন যে, তাঁর লক্ষ্য এখন সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক মানুষের দলগুলিকে এক ছাতার তলায় আনা।
হুমায়ুনের সম্ভাব্য জোট সঙ্গী ও রণকৌশল:
আসাদউদ্দিন ওয়েইসির মিম (AIMIM): হুমায়ুন জানিয়েছেন, তাঁর সঙ্গে মিম-এর আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে। মুর্শিদাবাদ, মালদা এবং উত্তর দিনাজপুরের আসনগুলিতে মিম প্রার্থী দিতে পারে।
এসডিপিআই (SDPI) ও আজাদ সমাজ পার্টি: চন্দ্রশেখর আজাদের দলের সঙ্গেও তাঁর কথা চলছে বলে দাবি হুমায়ুনের।
ক্ষুদ্র আঞ্চলিক দল: আরও অন্তত ৭-৮টি ছোট ছোট রাজনৈতিক দলকে নিয়ে একটি শক্তিশালী মঞ্চ গড়ে তোলার কথা জানিয়েছেন তিনি।
আগামী ২৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে হুমায়ুন কবীর তাঁর দলের এবং সহযোগী দলগুলির প্রার্থীতালিকা চূড়ান্ত করবেন বলে জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, এই ফ্রন্ট কেবল সংখ্যালঘু ভোটে ভাগ বসাবে না, বরং রাজ্যের অন্তত ১০০টি আসনে জয়-পরাজয় নির্ধারণ করবে।
হুমায়ুন কবীরের এই আক্রমণাত্মক মন্তব্যের পর সিপিএম নেতৃত্ব অবশ্য বিশেষ গুরুত্ব দিতে নারাজ। দলের রাজ্য কমিটির এক নেতার বক্তব্য, “বামফ্রন্ট দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক শক্তি। আমরা কোনো ব্যক্তির সঙ্গে নয়, নির্দিষ্ট আদর্শ এবং দলের সঙ্গে সমঝোতা করি। কে কোথায় শূন্যে যাবে, তা মানুষ ঠিক করবে।” তবে রাজনৈতিক মহলের মতে, নওশাদ সিদ্দিকীর আইএসএফ-এর সঙ্গে জোট নিয়ে বামেদের টানাপোড়েন এখনও মেটেনি, তার ওপর হুমায়ুনের এই বিচ্ছেদ আলিমুদ্দিনের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করল।
হুমায়ুন কবীরের মূল ঘাঁটি মুর্শিদাবাদ। এই জেলায় ২২টি বিধানসভা আসন রয়েছে, যা রাজ্যের সংখ্যালঘু রাজনীতির পিঠস্থান।
| বছর | তৃণমূলের আসন সংখ্যা | বাম-কংগ্রেস জোট | বিজেপি | অন্যান্য |
| ২০২১ | ২০ | ০ | ২ | ০ |
| ২০২৬ (সম্ভাবনা) | ? | ? | ? | জেইউপি-মিম ফ্যাক্টর |
পরিসংখ্যান বলছে: গত পঞ্চায়েত নির্বাচন থেকেই মুর্শিদাবাদ ও মালদায় বাম-কংগ্রেসের ভোটব্যাঙ্ক কিছুটা ফিরতে শুরু করেছিল। কিন্তু কংগ্রেস এবার একলা চলার নীতি নেওয়ায় এবং হুমায়ুন কবীর স্বতন্ত্র জোট গড়লে সেই ভোট আরও তিন ভাগে ভাগ হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এতে আদতে তৃণমূল না কি বিজেপির সুবিধা হবে, সেটাই এখন দেখার।
সম্প্রতি ভোটার তালিকা সংশোধন (SIR) এবং আধিকারিকদের সাসপেনশন নিয়ে নির্বাচন কমিশন ও তৃণমূলের মধ্যে যে লড়াই চলছে, তাতেও মুখ খুলেছেন হুমায়ুন। তবে তাঁর আক্রমণ মূলত প্রশাসনিক স্তরের ব্যর্থতার দিকে। তাঁর দাবি, আধিকারিকদের ব্যবহার করে শাসক দল ভোটের আগেই ফায়দা তুলতে চাইছে। যদিও তৃণমূলের অভিযোগ, হুমায়ুন আসলে বিজেপির বি-টিম হিসেবে কাজ করে সংখ্যালঘু ভোট ভাগ করতে চাইছেন।
হুমায়ুন কবীর জানিয়েছেন, তাঁর দল ‘টেবিল’ অথবা ‘টুইন রোজেস’ (জোড়া গোলাপ) প্রতীকে লড়াই করতে চায়। তাঁর প্রধান লক্ষ্য মুর্শিদাবাদের রেজিনগর ও ভরতপুর আসন দুটি পুনরুদ্ধার করা। পাশাপাশি নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুরের মতো হাই-ভোল্টেজ কেন্দ্রেও তিনি প্রার্থী দেওয়ার কথা ভাবছেন যাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও শুভেন্দু অধিকারীর লড়াইয়ের মাঝে নিজের অস্তিত্ব জানান দেওয়া যায়।
বঙ্গ রাজনীতির ইতিহাস বলে, নির্বাচনের আগে তৃতীয় বা চতুর্থ ফ্রন্ট তৈরির চেষ্টা বারবার হয়েছে, কিন্তু সাফল্যের হার নগন্য। কিন্তু হুমায়ুন কবীরের মতো ‘মাঠের রাজনীতিক’ যখন জোট ছেড়ে বেরিয়ে একলা চলার কথা বলেন এবং সঙ্গে মিম-এর মতো শক্তি থাকে, তখন তাকে হালকাভাবে নেওয়া মুশকিল। মুর্শিদাবাদ কি তবে ২০২৬-এ কোনো মিরাকল দেখতে চলেছে? ২১ শে ফেব্রুয়ারির ঘোষণার দিকেই এখন তাকিয়ে রাজ্য রাজনীতি।
Tags: #HumayunKabir #CPM #ISF #JUP #WestBengalElection2026 #AIMIM #MurshidabadPolitics #BengalJot #BreakingNews #ManusherBhasha #ElectionUpdate #ThirdFront #MamataBanerjee #MdSalim #NawsadSiddique
0 মন্তব্যসমূহ