মানুষের ভাষা | নিউজ ডেস্ক
নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের রণদামামা বাজার আগেই ভোটার তালিকা সংশোধন (SIR) ঘিরে রণক্ষেত্র রাজ্যের রাজনীতি। বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ায় (Special Intensive Revision) 'গুরুতর অনিয়ম', 'কর্তব্যে গাফিলতি' এবং 'সংবিধিবদ্ধ ক্ষমতার অপব্যবহার'-এর অভিযোগে সোমবার সাতজন সহকারী নির্বাচনী পঞ্জীকরণ আধিকারিককে (AERO) সাসপেন্ড করল ভারতের নির্বাচন কমিশন। এই ঘটনায় নবান্ন ও দিল্লির নির্বাচন সদনের মধ্যে সংঘাত এক নতুন মাত্রা পেল। একদিকে যখন কমিশন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়ে এগোচ্ছে, অন্যদিকে তখন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এই চক্রের মূলে খোদ মুখ্যসচিব ও মুখ্যমন্ত্রী রয়েছেন বলে বিস্ফোরক অভিযোগ এনেছেন।
কমিশনের কড়া পদক্ষেপ: কেন এই কোপ?
নির্বাচন কমিশন সূত্রে খবর, ভোটার তালিকা সংশোধনের এই বিশেষ পর্বে বেশ কিছু আধিকারিক প্যান কার্ড বা ভুয়ো স্কুল সার্টিফিকেটের মতো নথিকে বৈধ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, যা কমিশনের স্পষ্ট নির্দেশিকা বহির্ভূত। সাতজন আধিকারিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা উপযুক্ত নথি যাচাই না করেই বহু ভোটারকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন বা অযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও নাম বহাল রেখেছেন। রিপ্রেজেন্টেশন অফ পিপল অ্যাক্ট, ১৯৫০-এর ১৩সিসি (13CC) ধারা প্রয়োগ করে এই কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সাসপেন্ড হওয়া আধিকারিকদের তালিকা:
| আধিকারিক | পদমর্যাদা ও কর্মস্থল | নির্বাচনী ক্ষেত্র |
| সত্যজিত দাস | জয়েন্ট বিডিও | ১৩৯-ক্যানিং পূর্ব (দঃ ২৪ পরগনা) |
| জয়দেব কুণ্ডু | এফইও | ১৩৯-ক্যানিং পূর্ব (দঃ ২৪ পরগনা) |
| ডালিয়া রায় চৌধুরী | ওম্যান ডেভেলপমেন্ট অফিসার | ১৬-ময়নাগুড়ি (জলপাইগুড়ি) |
| শেফাউর রহমান | সহকারী কৃষি অধিকর্তা | ৫৬-শামশেরগঞ্জ (মুর্শিদাবাদ) |
| নিতিশ দাস | রেভিনিউ অফিসার | ৫৫-ফারাক্কা (মুর্শিদাবাদ) |
| শেখ মুর্শিদ আলম | এডিএ, সুতি ব্লক | ৫৭-সুতি (মুর্শিদাবাদ) |
| দেবাশিষ বিশ্বাস | জয়েন্ট বিডিও | ২২৯-ডেবরা (পঃ মেদিনীপুর) |
ফর্ম-৭ নিয়ে তরজা ও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার আবেদন বা আপত্তি জানানোর জন্য ব্যবহৃত হয় 'ফর্ম-৭'। বিরোধী পক্ষ বারবার অভিযোগ তুলছিল যে, সিইও (CEO) দপ্তর এবং জেলা নির্বাচনী আধিকারিকদের (DEO) অফিসে হাজার হাজার ফর্ম-৭ জমা পড়ে থাকলেও সেগুলোর নিষ্পত্তি করা হচ্ছে না।
সুপ্রিম কোর্টের গত ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্দেশ এবং পূর্ববর্তী এসআইআর নির্দেশিকা মেনে কমিশন জানিয়েছে, ১৬ই ফেব্রুয়ারির (আজকের) মধ্যেই সমস্ত ঝুলে থাকা ফর্ম-৭-এর নিষ্পত্তি করতে হবে। কমিশন নির্দেশ দিয়েছে যে, ইআরও (ERO) এবং এইআরও (AERO) দপ্তরগুলিকে অবিলম্বে এই অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে হবে। কমিশনের সাফ বার্তা—কোনোভাবেই যোগ্য ভোটার বাদ পড়া বা অযোগ্য কোনো অনুপ্রবেশকারীর নাম তালিকায় থাকা বরদাস্ত করা হবে না।
‘মুখ্যসচিবের মাধ্যমে চক্র চালাচ্ছে মুখ্যমন্ত্রী’, বিস্ফোরক শুভেন্দু
সাতজন আধিকারিকের সাসপেনশন নিয়ে আজ শানিত আক্রমণে নামেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, "এই সাতজন তো শুধু চুনোপুঁটি। আসল চক্রী নবান্নে বসে। মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তীকে দিয়ে পুরো চক্রটি চালাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।"
শুভেন্দুর আরও অভিযোগ, "রোহিঙ্গা এবং অযোগ্য ভোটারদের বাঁচানোর জন্যই এসআইআর প্রক্রিয়াকে তচনচ করা হয়েছে। ভারতের অন্য কোনও রাজ্যে কমিশনের গোপন ফাইল সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর টেবিলে যায় না, কিন্তু এখানে প্রাক্তন মুখ্যসচিব মনোজ পন্থ থেকে বর্তমান নন্দিনী চক্রবর্তী—সকলেই কমিশনের কাজকে রাজনৈতিক স্বার্থে প্রভাবিত করছেন।" তিনি দাবি করেন, এই আধিকারিকরা জেলাশাসকদের চাপে পড়ে নিয়ম ভেঙে তালিকায় নাম ঢুকিয়েছেন, তাই এঁদের বিরুদ্ধে এফআইআর (FIR) হওয়া উচিত।
পাল্টা আক্রমণে তৃণমূল: ‘নির্বাচন কমিশন নয়, নির্যাতন কমিশন’
শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস এই পদক্ষেপকে পুরোপুরি রাজনৈতিক এবং ‘বিজেপির ষড়যন্ত্র’ বলে দেগে দিয়েছে। দলের পক্ষ থেকে এক প্রতিক্রিয়ায় জানানো হয়েছে, "বিজেপিকে ভোটের সুবিধা পাইয়ে দিতেই নির্বাচন কমিশন এই ধরণের অতিসক্রিয়তা দেখাচ্ছে। আইন মেনে কাজ করলেও আধিকারিকদের ভয় দেখানো হচ্ছে।" তৃণমূলের দাবি, ২০২৬-এর এপ্রিলে বাংলার মানুষ এই ‘ভয়ের রাজনীতির’ যোগ্য জবাব দেবেন।
ভোটার তালিকা সংশোধনের খতিয়ান: এক নজরে (পরিসংখ্যান)
বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকার যে খসড়া প্রকাশিত হয়েছে, তাতে দেখা গিয়েছে নজিরবিহীন তথ্য:
মোট ভোটার সংখ্যা (অক্টোবর ২০২৫ পর্যন্ত): ৭,৬৬,৩৭,৫২৯
খসড়া তালিকায় নাম থাকা ভোটার: ৭,০৮,১৬,৬৩০
তালিকা থেকে বাদ পড়া নাম (ASDD ক্যাটাগরি): প্রায় ৫৮.২ লক্ষ
মৃত ভোটার: ২৪.১৬ লক্ষ
স্থানান্তরিত/অনুপস্থিত: ৩২.৬৫ লক্ষ
ডুপ্লিকেট নাম: ১.৩৮ লক্ষ
শুনানিতে অংশ নেওয়া ‘আনম্যাপড’ ভোটার: প্রায় ৩২ লক্ষ (যাঁদের ২০০২ সালের তালিকার সঙ্গে যোগসূত্র পাওয়া যায়নি)।
পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ তারিখসমূহ
কমিশনের পক্ষ থেকে সংশোধিত সময়সূচি ঘোষণা করা হয়েছে:
১৬ ফেব্রুয়ারি (আজ): ফর্ম-৭ সহ সমস্ত ঝুলে থাকা অভিযোগ নিষ্পত্তির শেষ দিন।
২১ ফেব্রুয়ারি: নথি যাচাই এবং স্ক্রুটিনি শেষ করার অন্তিম সময়।
২৫ ফেব্রুয়ারি: পোলিং স্টেশনের চূড়ান্ত যৌক্তিককরণ (Rationalisation)।
২৮ ফেব্রুয়ারি: ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের জন্য চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ।
রাজ্য রাজনীতির পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সাসপেনশন কেবল হিমশৈলের চূড়া মাত্র। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পর যদি বড়সড় অসঙ্গতি ধরা পড়ে, তবে নবান্ন বনাম নির্বাচন কমিশনের সংঘাত আদালত পর্যন্ত গড়াতে পারে। এখন সকলের নজর ২৮ ফেব্রুয়ারির দিকে, কারণ সেদিনই ঠিক হবে ২০২৬-এর চূড়ান্ত নির্বাচনী রণক্ষেত্রে কতজন ‘যোদ্ধা’ লড়াই করার ছাড়পত্র পাচ্ছেন।

0 মন্তব্যসমূহ