কঠোর কমিশনের নির্দেশিকায় SIR -এ গ্রাহ্য নয় এই নথি , বাদ পড়তে পারে বহু নাম
মানুষের ভাষা | নিউজ ডেস্ক, কলকাতা
ভোটার তালিকায় নাম তোলা নিয়ে আবাসের নথি বাতিলের সিদ্ধান্তে তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি
নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়া নিয়ে সংঘাত চরমে। সোমবার ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের এক নয়া নির্দেশিকায় স্পষ্ট জানানো হয়েছে, ‘বাংলার বাড়ি’ বা আবাস যোজনার সরকারি অনুমোদন পত্রকে ভোটার তালিকায় নাম নথিভুক্ত করার ক্ষেত্রে বৈধ পরিচয়পত্র হিসেবে গণ্য করা হবে না। কমিশনের এই কড়া অবস্থানে বিপাকে পড়েছেন কয়েক লক্ষ মানুষ, যাঁরা কেবল এই নথির ওপর ভিত্তি করেই শুনানিতে অংশ নিয়েছিলেন। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গর্জে উঠেছে তৃণমূল কংগ্রেস, অন্যদিকে বিজেপি একে ‘দুর্নীতি রুখতে কড়া পদক্ষেপ’ হিসেবেই দেখছে।
কী বলছে কমিশনের নয়া নির্দেশিকা?
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে পশ্চিমবঙ্গ মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিককে (CEO) পাঠানো চিঠিতে জানানো হয়েছে:
বাংলার বাড়ি, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা (গ্রামীণ) এবং ইন্দিরা আবাস যোজনা স্কিমের অধীনে পাওয়া অর্থসাহায্যের অনুমোদন পত্র বা অ্যালটমেন্ট লেটার কোনোভাবেই এসআইআর-এর শুনানিতে গ্রাহ্য হবে না।
নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, এই নথিগুলি মূলত আর্থিক সহায়তার প্রমাণ, কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব বা স্থায়ী ঠিকানার প্রামাণ্য দলিল নয়।
যদি কোনো ভোটার কেবলমাত্র এই নথির ওপর ভিত্তি করে আবেদন করে থাকেন এবং অন্য কোনো বিকল্প নথি (যেমন আধার, পাসপোর্ট বা ড্রাইভিং লাইসেন্স) দিতে ব্যর্থ হন, তবে তাঁর নাম ভোটার তালিকা থেকে পাকাপাকিভাবে বাদ দেওয়া হতে পারে।
শুনানির শেষলগ্নে বড় প্রশ্ন: কতজনের নাম বাদ যাবে?
গত ১৪ই ফেব্রুয়ারি বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর-এর শুনানি প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। রাজ্যজুড়ে কয়েক কোটি ভোটারের তথ্য যাচাই করা হয়েছে। প্রতিনিধি সূত্রের খবর, বিপুল সংখ্যক ভোটার আবাসের নথি জমা দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশন এই ভোটারদের তথ্য পুনরায় খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছে।
সম্ভাব্য প্রভাব (পরিসংখ্যান):
রাজ্যে আনুমানিক ২৮ লক্ষ মানুষ ‘বাংলার বাড়ি’ প্রকল্পের সুবিধা পেয়েছেন। কমিশন সূত্রের খবর, এর মধ্যে যদি ১ থেকে ২ লক্ষ মানুষও কেবল এই নথি জমা দিয়ে থাকেন, তবে তাঁদের নাম বাতিলের খাতায় চলে যেতে পারে। আগামী ২১শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্ক্রুটিনি চলবে, যার ফলে এই ভোটারদের ভাগ্য এখন সুতোর ওপর ঝুলছে।
‘চক্রান্তের প্রতিবাদ করবে তৃণমূল’:জোড়াফুল শিবির
কমিশনের এই আচমকা নির্দেশিকার তীব্র বিরোধিতা করেছে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস। সোশ্যাল মিডিয়ায় দলের পক্ষ থেকে পোস্ট করে জানানো হয়েছে, "সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এবং প্রযুক্তিগত অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়ে নির্বাচন কমিশন সাধারণ মানুষকে বিপদে ফেলছে। এটা সম্পূর্ণ অনৈতিক ও অবৈধ।"
দলের মুখপাত্রদের দাবি, সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল যাতে কোনো যোগ্য ভোটার বাদ না পড়ে এবং আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি না হয়। কিন্তু শুনানির কাজ শেষ হওয়ার পর এই ধরণের নিয়ম বদলে হাজার হাজার মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার ষড়যন্ত্র চলছে। তৃণমূলের হুঁশিয়ারি, মানুষের ভোটাধিকার রক্ষায় তারা প্রয়োজনে আদালতের দ্বারস্থ হবে।
তৃণমূলের ব্যর্থতা নিয়ে জেলায় জেলায় সরব গেরুয়া শিবির
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে ডামাডোলের মাঝেই তৃণমূল সরকারের ‘ব্যর্থতা’ তুলে ধরতে সোমবার রাজ্যজুড়ে ‘চার্জশিট’ প্রকাশ করল বিজেপি। পুলিশের চার্জশিট নয়, বরং প্রশাসনিক ও দুর্নীতির খতিয়ান সম্বলিত এই পুস্তিকা নিয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণ কলকাতা এবং জেলাগুলিতে পথে নামেন বিজেপি নেতারা।
কলকাতা: উত্তর কলকাতায় কেয়া ঘোষ এবং দক্ষিণ কলকাতায় রুদ্রনীল ঘোষ তৃণমূলের ‘দুষ্টু চক্র’ এবং পুলিশের একাংশের মদতে চলা অরাজকতার অভিযোগ তুলে সরব হন।
মালদা: দক্ষিণ মালদায় সুকান্ত মজুমদার তৃণমূলের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ানোর অভিযোগ তুলে একগুচ্ছ ব্যর্থতার খতিয়ান প্রকাশ করেন।
অন্যান্য জেলা: বর্ধমানে লকেট চট্টোপাধ্যায় এবং ডেবরায় রাহুল সিনহা অভিযোগ তোলেন যে, তৃণমূলের আমলে ১৫ বছরে কোনো উন্নয়ন হয়নি, কেবল দুর্নীতি হয়েছে।
বিজেপির সাফ দাবি, পিপলস রিপ্রেজেন্টেটিভ অ্যাক্ট অনুযায়ী কেবল ভারতীয় নাগরিকরাই ভোট দিতে পারেন। আবাসের নথি নাগরিকত্বের প্রমাণ হতে পারে না। বিজেপির কটাক্ষ, "মানুষই ২০২৬-এ তৃণমূলকে চূড়ান্ত চার্জশিট ধরিয়ে দেবে।"
ভোটার তালিকা সংশোধনের অন্তিম লগ্ন (টাইমলাইন)
| তারিখ | কার্যক্রম |
| ১৪ ফেব্রুয়ারি | এসআইআর শুনানি প্রক্রিয়া শেষ। |
| ১৬ ফেব্রুয়ারি | জেলা নির্বাচনী আধিকারিকদের স্ক্রুটিনি সংক্রান্ত বিশেষ নির্দেশ। |
| ২১ ফেব্রুয়ারি | সমস্ত নথি যাচাই ও অভিযোগ নিষ্পত্তির শেষ দিন। |
| ২৮ ফেব্রুয়ারি | চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ। |
নির্বাচন কমিশন এবং রাজ্য সরকারের এই দড়িটানাটানির মাঝে সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে রয়েছেন প্রান্তিক ভোটাররা। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকা এবং গ্রামীণ বাংলায় যাঁদের কাছে আবাসের নথিই ছিল একমাত্র সরকারি সম্বল, তাঁদের নাম যদি ২৮শে ফেব্রুয়ারির চূড়ান্ত তালিকায় না থাকে, তবে তা রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। প্রশ্ন উঠছে, যদি এই নথি গ্রহণযোগ্য নাই হয়, তবে শুনানির আগে কেন তা স্পষ্ট করা হয়নি?
শেষ মুহূর্তের এই নিয়ম বদল কি কেবল প্রশাসনিক বিভ্রান্তি, নাকি এর পিছনে বড় কোনো রাজনৈতিক সমীকরণ কাজ করছে, তা নির্বাচনের ফলাফলই বলবে।
Tags: #WestBengal #ElectionCommission #SIR2026 #VoterList #BanglarBari #TMCvsBJP #VoterID #BengalPolitics #ManusherBhasha #SuvenduAdhikari #MamataBanerjee #BreakingNewsBengal #AwasYojana #SupremeCourt
আপনি কি মনে করেন আবাসের নথি বাতিল করা সঠিক সিদ্ধান্ত? আপনার এলাকায় ভোটার তালিকা নিয়ে কোনো সমস্যা হচ্ছে? আমাদের জানান কমেন্ট বক্সে।

0 মন্তব্যসমূহ