ভোটার তালিকা প্রকাশের সঙ্গেই বঙ্গে কেন্দ্রীয় বাহিনী! ৪৮০ কোম্পানির মধ্যে অর্ধেক আসছে শুরুতেই
সীমান্তবর্তী জেলা উত্তর ২৪ পরগনা ও মুর্শিদাবাদে সবচেয়ে বেশি বাহিনী মোতায়েন করা হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদন, মানুষের ভাষা: বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার আগেই, পশ্চিমবঙ্গে ৪৮০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী (সিএপিএফ) মোতায়েন করা হতে চলেছে।
এক নজিরবিহীন পদক্ষেপে, ভারতের নির্বাচন কমিশন (ইসি) পশ্চিমবঙ্গে কেন্দ্রীয় বাহিনী (সিএপিএফ) মোতায়েন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রাজ্যে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হতেই, আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি সংশোধিত ভোটার তালিকা প্রকাশের দিন থেকেই এই বাহিনী মোতায়েন শুরু হয়ে যাবে।
কমিশনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণার আগেই ৪৮০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী আসছে রাজ্যে। এর মধ্যে ২৪০ কোম্পানি আসবে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে—যেদিন 'স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন'-এর পর প্রথম ভোটার তালিকা প্রকাশিত হওয়ার কথা। বাকি বাহিনী চলে আসবে ১০ মার্চের মধ্যে। ভোটার তালিকা প্রকাশের পর রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কড়া হাতে নিয়ন্ত্রণ করতেই আগেভাগে এই বিপুল সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়ে আসার পদক্ষেপ নিয়েছে কমিশন।
রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল এই প্রসঙ্গে বলেন, “১ মার্চের মধ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হবে। তারা 'এরিয়া ডোমিনেশন' বা রুটমার্চের কাজ করবে। তারা অলস বসে থাকবে না। রাজ্যের আইনশৃঙ্খলারক্ষায় তারা সহায়তা করবে। জেলা শাসক (ডিএম) এবং পুলিশ সুপাররা (এসপি) তাদের গাইড করবেন। জওয়ানদের কাছে বডি ক্যাম থাকবে এবং তাদের গাড়িতে জিপিএস লাগানো থাকবে। প্রোটোকল অনুযায়ী আমরা তাদের ওপর কড়া নজর রাখব।”
বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় সবচেয়ে বেশি সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হবে। সেখানে ৩০ কোম্পানি বাহিনী থাকছে। এরপরই রয়েছে আরেক সীমান্তবর্তী জেলা মুর্শিদাবাদ, যেখানে ১৬ কোম্পানি বাহিনী মোতায়েন করা হবে— যার মধ্যে মুর্শিদাবাদ এবং জঙ্গিপুর পুলিশ জেলায় ৮ কোম্পানি করে বাহিনী থাকবে।
বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে মোট ৩৫টি পুলিশ জেলা (পিডি) এবং কমিশনারেট রয়েছে।
উত্তর ২৪ পরগনা ও মুর্শিদাবাদ ছাড়াও, ব্যারাকপুর পুলিশ জেলায় ৯ কোম্পানি, বসিরহাট পিডি-তে ৭, বারাসাত পিডি-তে ৬ এবং বনগাঁ পিডি ও বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটে ৪ কোম্পানি করে সিএপিএফ মোতায়েন করা হবে।
আরেক সীমান্তবর্তী জেলা দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ১৫ কোম্পানি সিএপিএফ মোতায়েন করা হবে— ডায়মন্ড হারবার পুলিশ জেলায় ৬, বারুইপুর পিডি-তে ৫ এবং সুন্দরবন পিডি-তে ৪ কোম্পানি। হাওড়া জেলাতেও ১৫ কোম্পানি বাহিনী মোতায়েন করা হবে। এর মধ্যে হাওড়া পুলিশ কমিশনারেটে ৭ এবং হাওড়া গ্রামীণ পিডি-তে ৮ কোম্পানি জওয়ান থাকবেন।
এরপরেই সর্বোচ্চ বাহিনী মোতায়েন করা হবে বিরোধী দলনেতা তথা নন্দীগ্রামের বিধায়ক শুভেন্দু অধিকারীর জেলা পূর্ব মেদিনীপুরে (১৪ কোম্পানি) এবং হুগলিতে ১৪ কোম্পানি (চন্দননগর পিডি-তে ৮ এবং হুগলি গ্রামীণ পিডি-তে ৬)।
কলকাতা, মালদহ এবং নদিয়া— এই তিন জেলার প্রতিটিতে ১২ কোম্পানি করে বাহিনী মোতায়েন করা হবে (নদিয়ার রানাঘাট এবং কৃষ্ণনগর পিডি-তে ৬ কোম্পানি করে)। অন্যদিকে, উত্তর দিনাজপুরে মোতায়েন হবে ১১ কোম্পানি (রায়গঞ্জ পিডি-তে ৬ এবং ইসলামপুরে ৫)।
এছাড়াও কোচবিহারে ৯ কোম্পানি, পূর্ব বর্ধমানে ৮, পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূম, বাঁকুড়া এবং জলপাইগুড়িতে ৭ কোম্পানি করে, দার্জিলিংয়ে ৬, আলিপুরদুয়ার ও পুরুলিয়ায় ৫ কোম্পানি করে এবং শিলিগুড়ি পুলিশ কমিশনারেট ও কালিম্পংয়ে ৩ কোম্পানি করে সিএপিএফ মোতায়েন করা হবে।
জেলাভিত্তিক কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের তালিকা একনজরে:
| জেলা / পুলিশ জেলা (PD) | কোম্পানির সংখ্যা |
| উত্তর ২৪ পরগনা (মোট) | ৩০ |
| মুর্শিদাবাদ (মুর্শিদাবাদ ৮ + জঙ্গিপুর ৮) | ১৬ |
| দক্ষিণ ২৪ পরগনা (ডায়মন্ড হারবার ৬ + বারুইপুর ৫ + সুন্দরবন ৪) | ১৫ |
| হাওড়া (কমিশনারেট ৭ + গ্রামীণ ৮) | ১৫ |
| পূর্ব মেদিনীপুর | ১৪ |
| হুগলি (চন্দননগর ৮ + হুগলি গ্রামীণ ৬) | ১৪ |
| কলকাতা | ১২ |
| মালদহ | ১২ |
| নদিয়া (রানাঘাট ৬ + কৃষ্ণনগর ৬) | ১২ |
| উত্তর দিনাজপুর (রায়গঞ্জ ৬ + ইসলামপুর ৫) | ১১ |
| ব্যারাকপুর পুলিশ জেলা | ৯ |
| কোচবিহার | ৯ |
| পূর্ব বর্ধমান | ৮ |
| পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূম, বাঁকুড়া, জলপাইগুড়ি | ৭ (প্রতিটিতে) |
| দার্জিলিং | ৬ |
| আলিপুরদুয়ার, পুরুলিয়া | ৫ (প্রতিটিতে) |
| বনগাঁ পিডি, বিধাননগর কমিশনারেট | ৪ (প্রতিটিতে) |
| শিলিগুড়ি পুলিশ কমিশনারেট, কালিম্পং | ৩ (প্রতিটিতে) |
সম্প্রতি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক রাজ্যের মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব এবং পুলিশের মহাপরিচালককে (ডিজিপি) একটি চিঠি পাঠিয়েছে। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, "ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) ২০.০২.২০২৬ তারিখের বার্তার ভিত্তিতে, প্রাথমিকভাবে ৪৮০ কোম্পানি সিএপিএফ মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এরা মূলত এরিয়া ডোমিনেশন (এলাকায় টহলদারি), সাধারণ মানুষের মনে আস্থা বৃদ্ধি, ভোটের দিনের ডিউটি, ইভিএম/স্ট্রং রুম পাহারা এবং ভোট গণনা কেন্দ্রের নিরাপত্তায় কাজ করবে।"
কোন বাহিনী কত কোম্পানি আসছে?
নির্বাচন কমিশন সূত্রে খবর, এই ৪৮০ কোম্পানি সিএপিএফ-এর মধ্যে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিভাজন নিম্নরূপ:
সিআরপিএফ (CRPF): ২৩০ কোম্পানি
বিএসএফ (BSF): ১২০ কোম্পানি
আইটিবিপি (ITBP): ৪৭ কোম্পানি
এসএসবি (SSB): ৪৬ কোম্পানি
সিআইএসএফ (CISF): ৩৭ কোম্পানি

0 মন্তব্যসমূহ