মানুষের ভাষা | নিউজ ডেস্ক
কলকাতা: লোকসভা নির্বাচনের দামামা বেজে গিয়েছে রাজ্যে। প্রথম দফার নির্বাচনের আর মাত্র দু’সপ্তাহেরও কম সময় বাকি। ঠিক এই রাজনৈতিক উত্তেজনার আবহেই, ফের একবার রেশন বণ্টন দুর্নীতি মামলায় নজিরবিহীন তৎপরতা দেখাল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। শুক্রবার সাতসকাল থেকে কলকাতা সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে একযোগে তল্লাশি অভিযান শুরু করেছেন ইডি আধিকারিকরা। এখনও পর্যন্ত পাওয়া খবর অনুযায়ী, কলকাতা, হাওড়া, মুর্শিদাবাদ, বনগাঁ, হাবড়া এবং রানিগঞ্জ সহ মোট ১২টি জায়গায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের নিয়ে চিরুনি তল্লাশি চলছে।
এই বিপুল পরিমাণ অর্থ তছরুপের মামলায় রাজ্যের প্রাক্তন খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক বর্তমানে জেলবন্দি। গত বছর অক্টোবর মাসে তাঁর গ্রেপ্তারের পর থেকেই এই দুর্নীতির শিকড় কতদূর বিস্তৃত, তা নিয়ে তদন্ত জারি রেখেছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। আজকের এই অতর্কিত অভিযান প্রমাণ করে যে, এই মামলার তদন্তে নতুন কোনও সূত্র বা প্রভাবশালী যোগের হদিশ পেয়েছে ইডি।
শহরে ইডির তৎপরতা: লর্ড সিনহা রোড থেকে পদ্দার কোর্ট
শুক্রবার ভোররাতে সিজিও কমপ্লেক্স থেকে ইডি আধিকারিকদের একাধিক টিম বেরিয়ে পড়ে। কলকাতা শহরের দুটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় সকাল থেকেই রুদ্ধশ্বাস অভিযান চলছে।
১. লর্ড সিনহা রোডের ব্যবসায়ী ফ্ল্যাট:
কলকাতার অভিজাত এলাকা লর্ড সিনহা রোডে এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর বাড়িতে হানা দেয় ইডির একটি দল। সূত্রের খবর, ব্যবসায়ী বাসন্ত কুমার সারাফের ফ্ল্যাটে সকাল থেকেই তল্লাশি চলছে। ফ্ল্যাটের বাইরে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা কড়া পাহারায় মোতায়েন রয়েছে। কাউকে ভেতরে প্রবেশ করতে বা বেরোতে দেওয়া হচ্ছে না।
ইডি সূত্রে জানা গিয়েছে, রেশন বণ্টন দুর্নীতির তদন্ত প্রক্রিয়া চলাকালীন এই বাসন্ত কুমার সারাফের নাম উঠে আসে। তদন্তকারীদের হাতে আসা তথ্য-প্রমাণ অনুযায়ী, এই ব্যবসায়ীর একটি কোম্পানির মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে রেশনের সামগ্রী পাচার করা হতো। অভিযোগ উঠেছে যে, সাধারণ মানুষের জন্য বরাদ্দ গম এবং চাল দিনের পর দিন খোলা বাজারে বা প্রাইভেট কোম্পানিতে সাপ্লাই করে দেওয়া হতো। এই পাচার চক্রের নেপথ্যে আর কোন কোন প্রভাবশালী ব্যক্তি রয়েছে এবং কীভাবে এই বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেন হতো, তা জানতেই এই ব্যবসায়ীকে জিজ্ঞাসবাদ করা হচ্ছে। পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতেই চলছে নথি পরীক্ষা।
২. পদ্দার কোর্টের ‘ভুতুড়ে’ অফিস:
শহরের অন্যতম বাণিজ্যিক কেন্দ্র পদ্দার কোর্টে ইডির অভিযান ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। পদ্দার কোর্টের সাত নম্বর ফ্লোরে তিনটি গেটের মধ্যে তিন নম্বর গেট দিয়ে প্রবেশ করে একটি নির্দিষ্ট ফ্লোরে পৌঁছান আধিকারিকরা। শান্তনু দত্ত নামের এক আধিকারিকের নেতৃত্বে সিআরপিএফ-এর কড়া নিরাপত্তায় চলছে এই তল্লাশি।
এখানেই উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। তদন্তকারীরা দেখতে পান, এই ফ্লোরে অবস্থিত মোট ছ’টি কোম্পানির ঠিকানা হুবহু এক। এই কোম্পানিগুলি হলো:
এমএস অসেন্ট ডিল ট্রেড প্রাইভেট লিমিটেড (MS Ascent Deal Trade Pvt Ltd)
বেঙ্গল বায়োফিউয়েল (Bengal Biofuel)
বাবা ইন্টারন্যাশনাল (Baba International)
বাবা ফুড ইন্ডাস্ট্রি (Baba Food Industry)
কয়াল ফাউন্ডেশন (Kayal Foundation)
জিআরভি এক্সাম ট্রেডার্স (GRV Exam Traders)
একটি মাত্র ছোট ঠিকানায় ছ’টি ভিন্ন কোম্পানির অস্তিত্ব দেখে হতবাক তদন্তকারীরাও। অভিযোগ রয়েছে যে, রেশন দুর্নীতির কয়েক হাজার কোটি টাকা এই ধরণের ‘শেল কোম্পানি’ বা ভুতুড়ে কোম্পানির মারফত বাইরে পাচার করা হয়েছে বা কালো টাকা সাদা করা হয়েছে। অর্থাৎ, হাওয়ালা মারফত টাকা বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে এই কোম্পানিগুলিকে কাজে লাগানো হতো বলে প্রাথমিক অনুমান ইডির। এদিন সকাল ৮টা নাগাদ যখন তল্লাশি শুরু হয়, তখন অফিসে মাত্র কয়েকজন কর্মী ছিলেন। যারা মূলত এই ব্রাঞ্চের দেখাশোনা করেন, তাদের অবিলম্বে অফিসে আসার নির্দেশ দিয়েছে ইডি। গেট বন্ধ করে ভেতরে জোরকদমে চলছে নথি তল্লাশি।
৩. মিন্টো পার্ক এবং সংলগ্ন এলাকা:
শুধুমাত্র লর্ড সিনহা রোড বা পদ্দার কোর্ট নয়, কলকাতার মিন্টো পার্ক এলাকার একটি অফিসেও ইডি আধিকারিকরা পৌঁছে গিয়েছেন। সেখানেও কেন্দ্রীয় বাহিনীর ঘেরাটোপে চলছে অভিযান।
কলকাতার বাইরেও ইডি ‘অ্যাকশন’: বনগাঁ থেকে মুর্শিদাবাদ
রেশন দুর্নীতির জাল যে শুধুমাত্র কলকাতায় সীমাবদ্ধ নয়, তা আজকের অভিযান থেকেই স্পষ্ট। কলকাতার বাইরেও একাধিক জেলায় একই সাথে তল্লাশি চলছে।
১. উত্তর ২৪ পরগনা (হাবড়া ও বনগাঁ):
রেশন বণ্টন দুর্নীতি মামলায় অন্যতম অভিযুক্ত জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক বা বালুর গড় হিসেবে পরিচিত হাবড়াতেও সকাল থেকে সক্রিয় ইডি। হাবড়া এবং বনগাঁর বেশ কিছু জায়গায় আধিকারিকরা তল্লাশি চালাচ্ছেন। বনগাঁর ক্ষেত্রে, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত শঙ্কর আঢ্যর বাড়িতে এর আগেও তল্লাশি চালানো হয়েছিল এবং তাঁকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। আজকের তল্লাশিতে আরও কোনও নতুন নাম উঠে আসে কি না, সেটাই এখন দেখার। উল্লেখ্য, এই উত্তর ২৪ পরগনারই সন্দেশখালিতে শেখ শাহজাহানের বাড়িতে তল্লাশি চালাতে গিয়েই গত জানুয়ারি মাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন ইডি আধিকারিকরা, যা নিয়ে তোলপাড় হয়েছিল দেশ। তারপর থেকেই ফের রেশন দুর্নীতির তদন্ত গতি পেয়েছে।
২. মুর্শিদাবাদ:
মুর্শিদাবাদ জেলার একাধিক জায়গাতেও আজ সকাল থেকে চিরুনি তল্লাশি চলছে। সূত্রের খবর, গতকাল গভীর রাতেই ইডির একটি দল মুর্শিদাবাদে পৌঁছে গিয়েছিল। সকাল হতেই কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের নিয়ে চিহ্নিত জায়গাগুলিতে অভিযান শুরু হয়েছে। রেশনের মাল পরিবহণের ক্ষেত্রে বা দুর্নীতির টাকা পাচারের ক্ষেত্রে জেলার কোনও চক্র কাজ করত কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
রাজনৈতিক সংযোগ ও আগামী নির্বাচন
বিধানসভা নির্বাচনের মাত্র দু’সপ্তাহের কম সময় বাকি। রাজ্যের প্রথম দফা নির্বাচনের প্রস্তুতি তুঙ্গে। ঠিক এই মুহূর্তে রেশন দুর্নীতি মামলায় ইডির এই ব্যাপক তৎপরতা নিশ্চিতভাবেই রাজ্যের রাজনৈতিক আবহে প্রভাব ফেলবে।
বিরোধী দলগুলি দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে যে, রাজ্যে রেশন বণ্টন ব্যবস্থায় বিপুল দুর্নীতি হয়েছে এবং এর পেছনে শাসকদলের প্রথম সারির নেতারা জড়িত। প্রাক্তন খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক এবং বনগাঁর প্রভাবশালী নেতা শঙ্কর আঢ্যর গ্রেপ্তারি সেই অভিযোগকেই সিলমোহর দিয়েছে। এরপর আজকের অভিযান এবং লর্ড সিনহা রোডের ব্যবসায়ীর ফ্ল্যাট বা পদ্দার কোর্টের ‘ভুতুড়ে’ অফিস থেকে কী ধরণের তথ্য বেরিয়ে আসে, তার ওপর নির্ভর করবে আগামী দিনের রাজনৈতিক সমীকরণ।
ইডির এই তৎপরতাকে বিরোধী দলগুলি ‘তদন্তের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া’ হিসেবে দেখলেও, শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের তরফ থেকে একে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ এবং ‘নির্বাচনের আগে এজেন্সির রাজনীতি’ হিসেবেই ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, নির্বাচনের মুখে বিরোধী নেতাদের হেনস্থা করতেই কেন্দ্রীয় সংস্থাকে কাজে লাগানো হচ্ছে।
উপরিউক্ত তথ্য এবং তদন্তের ভবিষ্যৎ
রেশন বণ্টন দুর্নীতি মামলায় এ পর্যন্ত বিপুল পরিমাণ কালো টাকার হদিশ পাওয়া গিয়েছে। তদন্তকারীদের ধারণা, সাধারণ মানুষের রেশনের চাল-গম খোলা বাজারে চড়া দামে বিক্রি করে যে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে, তা দেশের বাইরে বিভিন্ন কোম্পানি ও রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় খাটানো হয়েছে। আজকের পদ্দার কোর্টের অভিযান সেই টাকার গতিপথ বা ‘মানি ট্রেল’ খোঁজার ক্ষেত্রেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই বিপুল পরিমাণ দুর্নীতির নেপথ্যে যে একটি সুপরিকল্পিত সিন্ডিকেট কাজ করত, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। একযোগে ১২ জায়গায় তল্লাশি চালিয়ে এই সিন্ডিকেটের পান্ডাদের হদিশ পাওয়াই এখন ইডির মূল লক্ষ্য। আজকের তল্লাশি অভিযান শেষ হওয়ার পর কী ধরণের নতুন নথি, ইলেকট্রনিক প্রমাণ বা বেআইনি সম্পত্তির হদিশ পাওয়া যায়, এবং তা জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক বা অন্য কোনও প্রভাবশালী ব্যক্তির সাথে সরাসরি যুক্ত করা যায় কি না, তার ওপরই নির্ভর করছে এই মামলার আগামী দিনের গতিপ্রকৃতি। শহরের একাধিক জায়গায় অভিযানের রুদ্ধশ্বাস ছবি আজও শহরবাসীকে মনে করিয়ে দিচ্ছে, রেশন দুর্নীতির গভীরতা আসলে কতখানি। নির্বাচনের আগে ইডির এই সকাল আসলে কোনও বড় ‘ঝড়ের’ পূর্বাভাস কি না, তা সময়ই বলবে।
0 মন্তব্যসমূহ