কলকাতা, ১৩ এপ্রিল: পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোটের ঠিক দশ দিন আগে রাজ্যের ভোটের মাঠে বড় একটা দিন এল। একদিকে আজ অন্ডাল বিমানবন্দরে নামছেন নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সিনিয়র ডেপুটি কমিশনার জ্ঞানেশ ভারতী। অন্যদিকে আজ থেকেই কাজ শুরু করছে ট্রাইবুনাল। আর বিকেলে সুপ্রিম কোর্টে শুনানি — যেখানে ঠিক হবে ট্রাইবুনালে বৈধ প্রমাণিত ভোটাররা এবার ভোট দিতে পারবেন কিনা।
তিনটে ঘটনা। একই দিনে। সবগুলোই রাজ্যের লক্ষ লক্ষ ভোটারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
জ্ঞানেশ ভারতীর তিন দিনের সফর
ভোটগ্রহণের ঠিক আগে রাজ্যে আসছেন ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ ভারতী। আজ দুর্গাপুরে পৌঁছবেন তিনি। সঙ্গে থাকছেন সিনিয়র ডেপুটি কমিশনার পবন কুমার শর্মা সহ আরও এক আধিকারিক।
দিল্লি থেকে সরাসরি অন্ডাল বিমানবন্দরে নেমে দুটি দলে ভাগ হয়ে যাবেন তাঁরা। জ্ঞানেশ ভারতী পশ্চিম বর্ধমান, পূর্ব বর্ধমান, হুগলি এবং উত্তর ২৪ পরগনা — চারটি জেলার ভোট প্রস্তুতির পর্যালোচনা বৈঠক করবেন। আজ পশ্চিম বর্ধমানের ডিএম অফিসে প্রথম বৈঠক। কাল পূর্ব বর্ধমান ও হুগলি। পরশু উত্তর ২৪ পরগনা।
পবন কুমার শর্মা সরাসরি চলে যাবেন বীরভূমে। সেখান থেকে নদীয়া, মুর্শিদাবাদ এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার বৈঠক তাঁর।
প্রতিটি বৈঠকে থাকবেন জেলার পর্যবেক্ষক, পুলিশ পর্যবেক্ষক, জেলা নির্বাচনী আধিকারিক, পুলিশ কমিশনার এবং পুলিশ সুপাররা। বুথ থেকে বাহিনী, সব কিছু খতিয়ে দেখার পরিকল্পনা।
উল্লেখযোগ্য যে এর পাশাপাশি আজই উত্তরবঙ্গে যাচ্ছে কমিশনের আরও একটি আলাদা দল।
ট্রাইবুনাল আজ থেকে কাজ শুরু
কলকাতার যোড়াবাগান এলাকায় শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি জাতীয় জল ও স্বাস্থ্যবিধান প্রতিষ্ঠানের ভবনে তৈরি হয়েছে ট্রাইবুনালের হেডকোয়ার্টার। রবিবার কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল সেই পরিকাঠামো সরেজমিনে দেখে গেছেন।
এখানে ১৯ জন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক থাকবেন। প্রতিজন বিচারকের সঙ্গে তিনজন করে এডিএম পদমর্যাদার আধিকারিক। আরও থাকবেন ২০০ জন মাইক্রো অবজার্ভার।
জেলায় জেলায় জমা পড়া আবেদনপত্র এবং অনলাইনে করা আবেদন — সব এই হেডকোয়ার্টারে আসবে। এখান থেকেই নিষ্পত্তি হবে।
আসল প্রশ্ন: ট্রাইবুনালে পাশ করলেও কি ভোট দেওয়া যাবে?
এখানেই সবচেয়ে বড় জটিলতা।
প্রথম দফার ভোটের ভোটার তালিকা ইতিমধ্যে ফ্রিজ হয়ে গেছে। দ্বিতীয় দফারটাও ফ্রিজ হয়েছে বৃহস্পতিবার। অর্থাৎ ট্রাইবুনাল যদি কাউকে বৈধ বলে স্বীকৃতি দেয়, সেই নাম তালিকায় ঢোকানো কি আর সম্ভব?
এই প্রশ্নটাই আজ বিকেলে সুপ্রিম কোর্টে উঠবে। প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের বেঞ্চ এই বিষয়ে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেবে বলে জানানো হয়েছে।
সংখ্যাটা কত বড়?
পরিস্থিতি বোঝার জন্য কয়েকটা সংখ্যা দেখা দরকার। এসআইআর প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে এখন পর্যন্ত বাদ গেছেন ৯০ লক্ষ ৮৩ হাজার ৩৪৫ জন। বিচারাধীন ছিলেন ৬০ লক্ষেরও বেশি। তার মধ্যে অবৈধ বলে চিহ্নিত হয়েছেন ২৭ লক্ষ ১৬ হাজার ৩৯৩ জন।
এই ২৭ লক্ষ মানুষের ভবিষ্যৎ এখন আদালতের হাতে। তারা ট্রাইবুনালে আবেদন করতে পারবেন। বৈধ প্রমাণ করতে পারলে নাম উঠবে কিনা — সেটাই আজকের প্রশ্ন।
কমিশনকেও ছাড় নেই
মালদার কালিয়াচকে বিচারিক আধিকারিকদের ঘেরাওয়ের ঘটনার পর সুপ্রিম কোর্ট রাজ্যের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনকেও কড়া নির্দেশ দিয়েছে। রাজ্যের ভেতর থেকেও সুর উঠছে — কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন।
আগে থেকেই রাজ্যে অফিস স্থাপন করে বসে থাকা উচিত ছিল — এমন মন্তব্য কমিশনের পক্ষ থেকেই করা হয়েছিল। কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন থাকার পরেও প্রতিনিধিদের নিরাপত্তা দিতে না পারার অভিযোগও উঠেছে।
ভোটের আগে ২৪০০ কোম্পানিরও বেশি কেন্দ্রীয় বাহিনী রাজ্যে এসে গেছে। কিন্তু সেই বাহিনীর সঠিক ব্যবহার হচ্ছে কিনা — সুপ্রিম কোর্ট থেকে কমিশন, সবাই এখন এই প্রশ্নের মুখে।
বিরোধী থেকে শাসকদল, রাজনীতির তাপ বাড়ছে
সাধারণ মানুষ ট্রাইবুনালের লাইনে দাঁড়াচ্ছেন, আর রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরকে দোষ দিচ্ছে।
তৃণমূলের অভিযোগ, এসআইআরের নামে লক্ষ লক্ষ আসল বাঙালির নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। বিজেপির পাল্টা বক্তব্য, ভুয়া ভোটারদের বাদ দেওয়া হয়েছে — যারা সত্যিকারের ভোটার, তারা প্রমাণ দিলে নাম উঠবে।
এর মাঝে সাধারণ মানুষ দিশাহারা। কেউ জানেন না ট্রাইবুনালে কীভাবে যাবেন, কী কাগজ লাগবে, কতদিনে ফল পাবেন।
ভোটের দিন এগিয়ে আসছে
২৩ এপ্রিল প্রথম দফায় ১৫২টি আসনে ভোট। ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফায় বাকি ১৪২টিতে। ফল আসবে ৪ মে।
হাতে আছে মাত্র কয়েকটা দিন। ট্রাইবুনাল কাজ শুরু করছে আজ থেকে। সুপ্রিম কোর্ট আজ নির্দেশ দেবে। জ্ঞানেশ ভারতী জেলায় জেলায় ঘুরছেন।
সবকিছু একই সময়ে, ভীষণ দ্রুতগতিতে। কিন্তু ৯০ লক্ষের বেশি মানুষের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য যা করার দরকার ছিল, তার জন্য যথেষ্ট সময় আর অবশিষ্ট নেই।

0 মন্তব্যসমূহ