মানুষের ভাষা | নিউজ ডেস্ক
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের দামামা বেজে গিয়েছে। আর মাত্র দশ দিন পরেই রাজ্যে প্রথম দফার ভোটগ্রহণ। ঠিক এইরকম এক টানটান রাজনৈতিক আবহের মধ্যেই কয়লা পাচারকাণ্ডের তদন্তে এক অভাবনীয় এবং বিস্ফোরক মোড় নিল রাজ্য রাজনীতি। খোদ রাজধানী দিল্লি থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের ভোটকুশলী সংস্থা আইপ্যাক (I-PAC)-এর ডিরেক্টর ও অন্যতম সহ-প্রতিষ্ঠাতা দীনেশ চান্ডেলকে গ্রেফতার করল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। সোমবার এই হাই-প্রোফাইল গ্রেফতারির খবর প্রকাশ্যে আসতেই রাজ্যজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক তরজা। নির্বাচনের ঠিক মুখে কেন্দ্রীয় এজেন্সির এই পদক্ষেপকে হাতিয়ার করে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস যেমন 'রাজনৈতিক প্রতিহিংসা'র অভিযোগ তুলছে, তেমনই বিরোধীরা সুর চড়াচ্ছে দুর্নীতির প্রশ্নে।
গ্রেফতারির প্রেক্ষাপট: নজরে বেআইনি আর্থিক লেনদেন
ইডি সূত্রের খবর, কয়লা পাচার মামলার গভীরে লুকিয়ে থাকা আর্থিক লেনদেনের শিকড় খুঁজতেই এই পদক্ষেপ। গত ১০ এপ্রিল দীনেশ চান্ডেলের দিল্লির বাসভবন ও একাধিক ঠিকানায় আচমকা হানা দিয়েছিল ইডি-র গোয়েন্দারা। সেই তল্লাশি অভিযানে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র, ডিজিটাল প্রমাণ এবং ডায়েরি তদন্তকারীদের হাতে আসে বলে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার দাবি। সেইসব নথি এবং পূর্বে ধৃতদের বয়ান খতিয়ে দেখার পরই সোমবার দীনেশ চান্ডেলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকে পাঠানো হয় এবং কয়লা পাচার মামলায় 'বেআইনি আর্থিক লেনদেন' বা মানি লন্ডারিংয়ের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।
Delhi: ED took I-PAC Director and Co-Founder Vinesh Chandel out of the judge’s residence. pic.twitter.com/0v7glTQ8Ik
— IANS (@ians_india) April 14, 2026
রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের মতে, ২৯৪ আসনের এই মেগা হাইভোল্টেজ নির্বাচনের ঠিক প্রাক্কালে তৃণমূলের অন্যতম প্রধান ভোট-কৌশলী সংস্থার শীর্ষকর্তার এই গ্রেফতারি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আইপ্যাক মূলত তৃণমূলের নির্বাচনী প্রচার, রূপরেখা এবং জনসংযোগের অন্যতম প্রধান স্থপতি। সেই সংস্থার অন্দরে সরাসরি কেন্দ্রীয় এজেন্সির প্রবেশ ভোটের ময়দানে শাসকদলকে চাপে ফেলার কৌশল বলেই মনে করছেন অনেকে।
তৃণমূলের তীব্র ক্ষোভ: 'গণতন্ত্র নয়, ভয় দেখানো'
দীনেশ চান্ডেলের গ্রেফতারির খবর সামনে আসতেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভে ফেটে পড়েন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, এই গ্রেফতারি নিছক কোনও আইনি পদক্ষেপ নয়, বরং বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করার এক সুপরিকল্পিত ছক। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে স্পষ্ট ভাষায় লেখেন, "ভোটের মাত্র ১০ দিন আগে দীনেশ চান্ডেলের এই গ্রেফতারি শুধু উদ্বেগজনক নয়, এটা সমান সমান লড়াইয়ের (Level playing field) ধারণাটাকেই সম্পূর্ণভাবে নাড়িয়ে দিচ্ছে।"
তিনি আরও যোগ করেন, "পশ্চিমবঙ্গে যখন মানুষ একটি সুষ্ঠু এবং অবাধ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছে, তখন কেন্দ্রীয় এজেন্সির এই পদক্ষেপ আদতে একটা হিমশীতল বার্তা দিচ্ছে। এই বার্তা স্পষ্ট— আপনি যদি বিরোধীদের দিকে থাকেন বা তাদের সাহায্য করেন, তবে আপনারও একই পরিণতি হতে পারে। এটা কোনওভাবেই গণতন্ত্র নয়, এটা নির্লজ্জ ভয় দেখানো।"
মমতার 'ভবিষ্যদ্বাণী' এবং খণ্ডঘোষের সভা
এই গ্রেফতারির ঘটনা তৃণমূল শিবিরের কাছে যে খুব একটা অপ্রত্যাশিত ছিল না, তার ইঙ্গিত মিলেছিল একদিন আগেই। রবিবার পূর্ব বর্ধমানের খণ্ডঘোষে এক বিশাল নির্বাচনী জনসভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেছিলেন। তিনি প্রকাশ্য সভাতেই হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, "আজকে মধ্যরাত থেকে ওদের অপারেশন শুরু হবে। আমি খবর পেয়েছি, আমরাও সব খবর পাই।" মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্যের ২৪ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই দিল্লির বুকে আইপ্যাক কর্তার গ্রেফতারি প্রমাণ করে দিল যে তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্ব কেন্দ্রীয় এজেন্সির এই অতিসক্রিয়তা সম্পর্কে আগে থেকেই আঁচ পেয়েছিল।
বিরোধীদের কটাক্ষ: 'আইন আইনের পথেই চলবে'
শাসকদলের এই তীব্র প্রতিক্রিয়ার পাল্টা জবাব দিতে ছাড়েনি বিরোধী শিবিরও। বিরোধী নেতাদের একাংশ শাসকদলের 'আস্ফালন' নিয়ে তীব্র কটাক্ষ করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শীর্ষ বিরোধী নেতার কথায়, "শাসকদলের নেতাদের কী আস্ফালন! বাপরে বাপ! এই করে নেব, তাই করে নেব! আর সকালবেলায় যখন বিভিন্ন দফতর, অফিস বা বাড়িতে তল্লাশি চলছে, তখন তারা ল্যাপটপ আর ফাইল নিয়ে বেরিয়ে আসছেন। এই যে বীরদর্পে 'দেখে নেব' ভাব, তারপর পরিণতি কী হচ্ছে? যা হচ্ছে আজকাল সবাই দেখতে পাচ্ছে। আইন আইনের পথেই চলবে, দোষ করলে শাস্তি পেতেই হবে।"
রাজনৈতিক তরজা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বিরোধীদের তরফ থেকে কয়লা পাচারকাণ্ডে শাসকদলের শীর্ষ নেতৃত্বকে সরাসরি নিশানা করা হচ্ছে। এক বিরোধী নেতার তির্যক মন্তব্য, "এই যাবতীয় দুর্নীতিতে গোটা পৃথিবীর সবাই গ্রেফতার হবে, একমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ছাড়া। কয়লা পাচারকাণ্ডে আপনাকেও গ্রেফতার করতে পারে, আমাকেও করতে পারে, খালি ওঁরা দু'জন গ্রেফতার হবেন না! এর পিছনে কী বিজ্ঞান আছে, কী দর্শন আছে, তা একমাত্র নরেন্দ্র মোদিই বলতে পারবেন।" এই মন্তব্যের মধ্যে দিয়ে একদিকে যেমন শাসকদলকে বিদ্ধ করা হয়েছে, তেমনই কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা নিয়েও এক সূক্ষ্ম শ্লেষ মিশে রয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
অতীতের ছায়া: ৮ জানুয়ারির সেই নাটকীয় তল্লাশি
আইপ্যাকের সঙ্গে ইডি-র এই সংঘাত নতুন নয়। এর প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল বেশ কয়েক মাস আগেই। কয়লা পাচার মামলার তদন্তেই গত ৮ জানুয়ারি তৃণমূলের এই ভোটকুশলী সংস্থার কর্ণধার প্রতীক জৈনের লাউডন স্ট্রিটের বাড়ি এবং সল্টলেকের সেক্টর ফাইভে আইপ্যাকের অফিসে ম্যারাথন তল্লাশি চালিয়েছিল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট।
সেই দিনের ঘটনা ঘিরে নজিরবিহীন নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল রাজ্য রাজনীতিতে। ইডি-র অভিযোগ, তল্লাশি অভিযান চলাকালীন খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেখানে উপস্থিত হন এবং তদন্তে বাধা সৃষ্টি করেন। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার দাবি, মুখ্যমন্ত্রী সেখান থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ, মোবাইল ফোন এবং হার্ডডিস্ক নিজের সঙ্গে করে নিয়ে বেরিয়ে যান। ইডি আধিকারিকদের বয়ান অনুযায়ী, সেই সময় শোনা গিয়েছিল, "দেখো ম্যাঁয় সব লেকে আয়া, সব মাই হার্ডডিস্ক।"
খোদ রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানের এই পদক্ষেপ ঘিরে তোলপাড় শুরু হয় জাতীয় রাজনীতিতে। ইডি এই ঘটনাকে কার্যত 'চুরি এবং ডাকাতি'-র সমতুল্য আখ্যা দিয়ে সরাসরি কলকাতা হাইকোর্ট এবং পরে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়। তদন্তকারী সংস্থার অভিযোগ ছিল, প্রভাব খাটিয়ে তথ্যপ্রমাণ লোপাটের চেষ্টা করা হয়েছে।
আগামীর আইনি রূপরেখা এবং আদালতের দিনলিপি
দীনেশ চান্ডেলের গ্রেফতারির পর এখন সবার নজর আদালতের দিকে। একদিকে যেমন চান্ডেলকে হেফাজতে নিয়ে কয়লা পাচারকাণ্ডের বিপুল আর্থিক লেনদেনের জট ছাড়াতে মরিয়া ইডি, অন্যদিকে আগামী কয়েক দিনে দেশের শীর্ষ আদালতগুলোতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শুনানি রয়েছে।
১৫ই এপ্রিল, সুপ্রিম কোর্ট: ৮ জানুয়ারির তল্লাশি এবং হার্ডডিস্ক উদ্ধারের ঘটনা নিয়ে ইডি যে মামলা দায়ের করেছিল, আগামী ১৫ই এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টে সেই বহুচর্চিত আইপ্যাক মামলার গুরুত্বপূর্ণ শুনানি রয়েছে।
১৭ই এপ্রিল, দিল্লি হাইকোর্ট: এর আগেই আইপ্যাকের দুই শীর্ষ কর্তা প্রতীক জৈন এবং ঋষিরাজ সিং-কে দিল্লির অফিসে তলব করে নোটিশ পাঠিয়েছিল ইডি। ভোটের ব্যস্ততার কারণ দেখিয়ে তাঁরা ৩০শে এপ্রিলের পরে হাজিরা দেওয়ার আবেদন জানিয়ে দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। আগামী ১৭ই এপ্রিল দিল্লি হাইকোর্টে সেই মামলার শুনানি রয়েছে।
ভোটের সমীকরণে প্রভাব
বিধানসভা নির্বাচনের মাত্র দশ দিন আগে এই হাই-ভোল্টেজ গ্রেফতারি বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করল। কয়লা পাচারের মতো স্পর্শকাতর দুর্নীতির মামলায় তৃণমূলের 'মস্তিষ্ক' বলে পরিচিত আইপ্যাকের শীর্ষকর্তার গ্রেফতারি সাধারণ মানুষের মনে কী প্রভাব ফেলবে, তা বোঝা যাবে ইভিএমের ফলাফলেই। তবে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, নির্বাচনের আগে এই ঘটনা তৃণমূলের প্রচার কৌশলে কিছুটা হলেও ধাক্কা দিতে পারে। অন্যদিকে, শাসকদল এই গ্রেফতারিকে 'কেন্দ্রীয় বঞ্চনা ও এজেন্সি-রাজ'-এর উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে সহানুভূতির ভোট আদায়ের চেষ্টা করবে।
সব মিলিয়ে, ভোটমুখী পশ্চিমবঙ্গে উত্তাপ ক্রমশ বাড়ছে। আইনি লড়াই এবং রাজনৈতিক তরজার এই ককটেলে আগামী দিনগুলি যে আরও নাটকীয় হতে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য।
0 মন্তব্যসমূহ