নিউজ ডেস্ক | মানুষের ভাষা
বঙ্গের আকাশে ফের বাজল ভোটের দামামা। আর সেই নির্বাচনী উত্তাপের ভরকেন্দ্র হয়ে উঠল গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত বীরভূমের লাল মাটি। আসন্ন নির্বাচনের প্রচারপর্বে রাজ্যে পা রেখেই শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আক্রমণের পথ বেছে নিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথা বিজেপির অন্যতম শীর্ষ নেতা অমিত শাহ। দুর্নীতি, রাজনৈতিক সন্ত্রাস, পরিবারতন্ত্র এবং তুষ্টিকরণের মতো একাধিক ইস্যুতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর ‘ভাইপো’কে নিশানা করে রীতিমতো তোপ দাগলেন তিনি। বীরভূমের মাটিতে দাঁড়িয়ে শাহের দ্ব্যর্থহীন হুঁশিয়ারি, "এবার পালা বাংলার। ২৩ এপ্রিল যদি দিদির গুন্ডারা ভোট লুঠ করতে আসে, তবে বুঝে নেবেন ৫ মে-র পর তাদের আর কোনো নিস্তার নেই। পাতাল থেকেও খুঁজে বের করে জেলের গরাদের পেছনে ঢোকানো হবে।"
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, রাজ্যের শাসকদলের বিরুদ্ধে এর আগে বহুবার সুর চড়িয়েছে বিরোধী শিবির। কিন্তু বীরভূমের মতো একসময়ের ‘তৃণমূলের দুর্গে’ দাঁড়িয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই তীক্ষ্ণ এবং আগ্রাসী মন্তব্য বঙ্গ রাজনীতির সমীকরণকে এক নতুন মাত্রা দিল।
সন্ত্রাসমুক্ত বাংলার ডাক ও ‘গুন্ডারাজ’ অবসানের হুঁশিয়ারি
এদিনের জনসভা থেকে অমিত শাহের বক্তব্যের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা এবং ভোট-পরবর্তী হিংসার প্রসঙ্গ। একুশের বিধানসভা নির্বাচনের পর বীরভূমের নানুর, লাভপুর এবং ময়ূরেশ্বরে বিজেপি কর্মীদের ওপর যে অবর্ণনীয় অত্যাচার হয়েছিল, সেই স্মৃতি উসকে দিয়ে শাহ বলেন, "আমাদের ১০০ জনেরও বেশি কর্মীকে প্রাণভয়ে বাড়িঘর ছেড়ে সিউড়িতে গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। আজ আমি এই বীরভূমের মাটিতে দাঁড়িয়ে সমস্ত বিজেপি কর্মীকে কথা দিয়ে যাচ্ছি, যারা আমাদের কর্মীদের ওপর নির্মম অত্যাচার চালিয়েছে, ৫ মে-র পর তাদের পাতাল থেকে খুঁজে বের করে জেলে ঢোকানো হবে।"
তৃণমূলের তথাকথিত ‘গুন্ডাবাহিনী’কে কড়া ভাষায় সতর্ক করে তিনি বলেন, "টিএমসি-র গুন্ডাদের এমনভাবে সোজা করা হবে যে, ভবিষ্যতে রাজনৈতিক হিংসা বা সন্ত্রাস করার দুঃস্বপ্নও তারা আর দেখতে পারবে না।" শাহের মতে, বীরভূমের এই নির্বাচন নিছকই কোনো রাজনৈতিক পালাবদলের নির্বাচন নয়, এটি ‘সোনার বাংলা’ গড়ার সংকল্প পূরণের নির্বাচন। কবিগুরুর কল্পনার ‘ভয়শূন্য বাংলা’ গড়ার ডাক দিয়ে তিনি সাধারণ মানুষকে পদ্মফুলে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর কথায়, "মাফিয়ারাজ, অবৈধ তোলাবাজি, কাটমানি এবং তুষ্টিকরণের রাজনীতিকে সমূলে উৎপাটন করতেই এই ভোট। বীরভূমের লাল মাটির হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনতেই এই ভোট।"
দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ: সিউড়ির সমবায় ব্যাঙ্ক থেকে এসএসসি কেলেঙ্কারি
রাজ্যে বিগত কয়েক বছরে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছে। কয়লা পাচার, বালি পাচার থেকে শুরু করে নিয়োগ দুর্নীতি—প্রতিটি ইস্যুকেই এদিন অত্যন্ত সুকৌশলে হাতিয়ার করেন অমিত শাহ। সিউড়ির একটি কো-অপারেটিভ বা সমবায় ব্যাঙ্কে সিবিআই (CBI)-এর তল্লাশির প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, "সিবিআই ওই ব্যাঙ্কে তল্লাশি চালিয়ে শত শত বেনামি অ্যাকাউন্টের হদিশ পেয়েছে, যেখানে কোটি কোটি কালো টাকা লুকিয়ে রাখা ছিল। এই কোটি কোটি টাকা কার? এই টাকা বাংলার গরিব মানুষের টাকা। অবৈধ বালি পাচার, কয়লা পাচার এবং কাটমানির টাকা ওখানে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।"
দুর্নীতিগ্রস্তদের প্রতি চরম বার্তা দিয়ে শাহ বলেন, "যারা দুর্নীতি করেছেন, তারা যেন এমনটা না ভাবেন যে তাদের আর কিছু হবে না। ভারতীয় জনতা পার্টি বাংলায় ক্ষমতায় এলে, এই দুর্নীতিগ্রস্তদের কাছ থেকে গরিবের লুঠ হওয়া টাকার এক-এক পাই আদায় করবে এবং বীরভূমের গরিব মানুষের হাতে তা ফিরিয়ে দেওয়ার কাজ করবে।"
জনসভার মেজাজ বুঝে জনতার সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি উপস্থিত জনসমুদ্রের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন, "আপনারাই বলুন, এই দুর্নীতি কারা করেছে? ক্যাশ-ফর-কোয়েরি (Cash for Query) কেলেঙ্কারি কারা করেছে? ২৬ হাজার শিক্ষকের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলে নিয়োগ দুর্নীতি কারা করেছে? এসএসসি (SSC) দুর্নীতি কার আমলে হয়েছে?" জনতার তরফ থেকে সমস্বরে উত্তর ভেসে আসে। এই প্রশ্নোত্তর পর্বের মাধ্যমে শাহ বুঝিয়ে দেন, দুর্নীতির ইস্যুতে রাজ্যের সাধারণ মানুষের মনে শাসকদলের প্রতি কতটা ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়ে রয়েছে।
দেউচা-পাচামি এবং আদিবাসী ভোটব্যাঙ্ক
বীরভূম জেলার রাজনীতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি বিষয় হলো দেউচা-পাচামি কয়লা খনি প্রকল্প। এশিয়ার বৃহত্তম এই কয়লা খনি প্রকল্প ঘিরে জমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আদিবাসী সমাজের মধ্যে ক্ষোভ এবং অসন্তোষ ধিকধিক করে জ্বলছে। সেই ক্ষোভের আগুনে এদিন কার্যত ঘি ঢালেন অমিত শাহ। তিনি সরাসরি তৃণমূল সরকারের ব্যর্থতার দিকে আঙুল তুলে বলেন, "দেউচা-পাচামি কয়লা ব্লকের কারণে ২১ হাজার সাঁওতাল আদিবাসী নিজেদের ভিটেমাটি হারিয়েছেন। কিন্তু এই সরকার তাঁদের সঠিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেনি। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এলে সমস্ত বাস্তুচ্যুত আদিবাসী ভাইবোনদের জন্য একটি উপযুক্ত এবং সম্পূর্ণ পুনর্বাসন প্যাকেজ নিয়ে আসা হবে।"
বীরভূম এবং তৎসংলগ্ন জেলাগুলিতে আদিবাসী ভোট একটি বড় ফ্যাক্টর। রাজনৈতিক মহলের ধারণা, দেউচা-পাচামির মতো একটি স্পর্শকাতর ইস্যুকে তুলে ধরে শাহ একলপ্তে সেই বিশাল আদিবাসী ভোটব্যাঙ্ককে বিজেপির অনুকূলে আনার একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক চাল চাললেন।
‘ভাইপো’ বনাম ‘বাংলার ভূমিপুত্র’: বহিরাগত তত্ত্বের মোক্ষম জবাব
রাজ্যে বিজেপির উত্থান রুখতে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক হাতিয়ার হলো ‘বহিরাগত’ তত্ত্ব। বিজেপি নেতাদের ‘দিল্লির নেতা’ বা ‘হিন্দি বলয়ের লোক’ বলে বারবার আক্রমণ শানিয়েছে শাসকদল। এদিন বীরভূমের মাটি থেকেই তৃণমূলের সেই বহিরাগত তত্ত্বকে একেবারে ধূলিসাৎ করে দেওয়ার চেষ্টা করলেন অমিত শাহ।
পরিবারতন্ত্রের অভিযোগ তুলে তৃণমূল নেত্রীকে তীব্র আক্রমণ করে শাহ বলেন, "এই দিদি শুধু একটাই জিনিস চান—কীভাবে নিজের ভাইপোকে মুখ্যমন্ত্রী করা যায়! আপনারা আমাকে জোর গলায় বলুন, ভাইপোকে কি মুখ্যমন্ত্রী বানানো উচিত?" এরপরই তিনি ঘোষণা করেন, "আজ আমি গুরুদেব ঠাকুরের পবিত্র ভূমি বীরভূমে দাঁড়িয়ে বলে যাচ্ছি, অনেকে মিথ্যা রটাচ্ছে যে বাংলা নাকি দিল্লি থেকে পরিচালিত হবে। না! বাংলার পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী বাংলাতেই জন্মানো কোনো ব্যক্তি হবেন। তিনি বাংলায় পড়াশোনা করেছেন, তিনি বাংলা ভাষায় কথা বলেন। তবে দিদি, আপনি খুশি হবেন না। সেই মুখ্যমন্ত্রী তৃণমূল কংগ্রেস থেকে কেউ হবেন না, আপনার ভাইপোও হবেন না। তিনি হবেন ভারতীয় জনতা পার্টির একজন একনিষ্ঠ ভূমিপুত্র কার্যকর্তা।" শাহের এই ঘোষণার পরই সভাস্থলে ‘জিন্দাবাদ’ স্লোগান ওঠে। বিজেপির এই ‘ভূমিপুত্র’ তাস আগামী দিনে রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে যে বড়সড় প্রভাব ফেলতে চলেছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
সহানুভূতি আদায়ের ‘নাটক’ নিয়ে কটাক্ষ
বক্তব্যের শেষ পর্বে এসে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত আঘাত ও অসুস্থতা নিয়ে নজিরবিহীন কটাক্ষ করতেও ছাড়েননি অমিত শাহ। অতীতে নির্বাচনের আগে মুখ্যমন্ত্রীর পায়ে চোট পাওয়া বা মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধার ঘটনাগুলিকে সরাসরি ‘নাটক’ বলে আক্রমণ করেন তিনি। শাহ বলেন, "এবার এখনও পর্যন্ত মমতা দিদির না পা ভেঙেছে, না মাথায় ব্যান্ডেজ বেঁধেছেন। প্রতিবারই নির্বাচনের আগে তিনি কিছু না কিছু একটা করে ‘বেচারি’ সেজে মানুষের সামনে এসে দাঁড়ান। এবারও যদি হাত-পা ভেঙে বা মাথায় ব্যান্ডেজ বেঁধে সহানুভূতি কুড়োনোর জন্য কোনো নাটক করেন, তবে বাংলার মানুষ যেন আর সেই ছলনায় বা ছলাকলায় না ভোলেন। দিদি, আপনি যেখানে খুশি ব্যান্ডেজ বাঁধিয়ে নিন, এবার আর বাংলার মানুষ আপনার ওই সহানুভূতি আদায়ের ফাঁদে পা দেবেন না। আপনি এত দুর্নীতি করেছেন যে, বাংলার জনগণ আপনাকে আর ক্ষমা করতে পারবে না।"
দায় এড়ানোর রাজনীতি: শাহের নিশানায় তৃণমূলের নীতি
রাজ্য সরকারের ‘দায় এড়ানোর’ মানসিকতার তীব্র সমালোচনা করে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, "দিদির রাজ্যে যদি কোনো দাঙ্গা হয়, তিনি বলেন আদালত করিয়েছে। যদি ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ ঘটে, তিনি বলেন মেয়েরা যেন বাড়ির বাইরে না বেরোয়। রাজ্যে অনুপ্রবেশ ঘটলে তিনি বিএসএফ-এর (BSF) ঘাড়ে দোষ চাপান। আর বাংলার উন্নয়ন থমকে গেলে তিনি মোদীজির দোষ খোঁজেন। দিদি, আর কতদিন আপনি অন্যদের ওপর দোষ চাপিয়ে পার পেয়ে যাবেন? বাংলার মানুষ আজ বুঝে গিয়েছে যে, রাজ্যের এই দুরবস্থার জন্য সম্পূর্ণ দোষ আপনার এবং আপনার ভাইপোর।"
বিশ্লেষণ ও উপসংহার
অমিত শাহের এদিনের এই জনসভা নিছক কোনো সাধারণ নির্বাচনী প্রচার ছিল না। এটি ছিল আসন্ন বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে বঙ্গ বিজেপির রণকৌশলের একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা। এই সভার মাধ্যমে বিজেপি অন্তত চারটি স্পষ্ট বার্তা দিতে সক্ষম হয়েছে। প্রথমত, দলের নিচুতলার কর্মীদের মধ্যে এই বিশ্বাস জাগিয়ে তোলা যে, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তাদের পাশে আছে এবং তৃণমূলের রাজনৈতিক সন্ত্রাসের যোগ্য জবাব দেওয়া হবে। দ্বিতীয়ত, রাজ্যের বিভিন্ন দুর্নীতির তদন্ত যে আরও কঠোরভাবে এগোবে, তার পূর্বাভাস দেওয়া। তৃতীয়ত, তৃণমূলের ‘বহিরাগত’ তত্ত্বের মোকাবিলায় ‘ভূমিপুত্র মুখ্যমন্ত্রীর’ ঘোষণা করে বাঙালি আবেগকে নিজেদের দিকে টানা। এবং চতুর্থত, আদিবাসী সমাজের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা এবং ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে ভোটব্যাঙ্ক সুসংহত করা।
অন্যদিকে, শাসকদলের ওপর চাপ বাড়াতে ‘পরিবারতন্ত্র’ এবং ‘সহানুভূতির রাজনীতি’ নিয়ে শাহের যে চাঁচাছোলা আক্রমণ, তা রাজ্যের সাধারণ ভোটারদের মনে কতটা দাগ কাটে, সেটাই এখন দেখার। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বীরভূমের লাল মাটিতে দাঁড়িয়ে অমিত শাহ যেভাবে তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলেন, তা রাজ্য রাজনীতির উত্তাপকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল। ২৩ এপ্রিলের ভোট এবং ৫ মে-র সম্ভাব্য ফলাফলের দিকে এখন তাকিয়ে রয়েছে গোটা দেশ। বাংলার রাজনৈতিক পালাবদলের এই হাই-ভোল্টেজ লড়াইয়ে শেষ হাসি কে হাসবে, তার উত্তর লুকিয়ে আছে ইভিএম-এর বাক্সে। মানুষের ভাষা নিউজ ডেস্কের নজর থাকবে এই মহারণের প্রতিটি খবরের দিকে।
0 মন্তব্যসমূহ