Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

Recent in Home

শুভেন্দু আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ খুনে এবার আসরে সিবিআই, মধ্যমগ্রামের মেগা হত্যাকাণ্ডে গঠিত ৭ সদস্যের বিশেষ দল



নিজস্ব প্রতিবেদন, কলকাতা: রাজ্য রাজনীতির সাম্প্রতিকতম সব থেকে চর্চিত এবং রহস্যময় হত্যাকাণ্ডের তদন্তে এবার নজিরবিহীন মোড়। বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর পরই যেভাবে মধ্যমগ্রামের জনবহুল এলাকায় গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয়েছিল মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দীর্ঘদিনের ছায়াসঙ্গী তথা তাঁর ব্যক্তিগত সহায়ক চন্দ্রনাথ রথকে, সেই ঘটনার তদন্তভার এবার নিজেদের হাতে তুলে নিল সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (CBI)। রাজ্য সরকারের সুপারিশ মেনে নিয়ে এই হাই-প্রোফাইল খুনের রহস্যভেদে ময়দানে নামছে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা। সিবিআই সূত্রের খবর, এই বিশেষ তদন্তের জন্য ইতিমধ্যেই সাত সদস্যের একটি শক্তিশালী স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম (SIT) গঠন করা হয়েছে, যার নেতৃত্বে থাকছেন ডিআইজি (DIG) পদমর্যাদার এক অত্যন্ত দক্ষ আধিকারিক।

রক্তাক্ত ৬ই মে: কী ঘটেছিল সেই রাতে?

ফিরে তাকালে দেখা যায়, গত ৬ই মে রাত ছিল উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামের জন্য এক বিভীষিকাময় অধ্যায়। নির্বাচনের ফল ঘোষণার ঠিক দু’দিনের মাথায়, যখন রাজ্যজুড়ে জয়-পরাজয়ের হিসেবনিকেশ চলছে, তখনই প্রকাশ্য রাস্তায় আততায়ীদের কবলে পড়েন চন্দ্রনাথ রথ। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, অত্যন্ত পেশাদার কায়দায় বাইকে করে আসা দুষ্কৃতীরা চন্দ্রনাথকে লক্ষ্য করে একের পর এক গুলি চালায়। ঘটনাস্থলেই রক্তাক্ত অবস্থায় লুটিয়ে পড়েন তিনি। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।

শরীরের একাধিক জায়গায় গুলির আঘাত এবং ঘটনার নৃশংসতা দেখে পুলিশের প্রাথমিক অনুমান ছিল, এটি কোনও সুপরিকল্পিত ‘সুপারি কিলিং’। বিশেষ করে শুভেন্দু অধিকারীর মতো হেভিওয়েট নেতার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হওয়ার কারণে এই খুনের পিছনে গভীর কোনও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রথম থেকেই সরব হয়েছিল বিজেপি নেতৃত্ব।

তদন্তে সাঁড়াশি অভিযান: ভিন রাজ্য থেকে গ্রেফতার ৩

ঘটনার পর থেকেই জেলা পুলিশ এবং রাজ্য গোয়েন্দা বিভাগ (CID) তদন্তে নামে। মোবাইল টাওয়ার লোকেশন এবং সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ জানতে পারে, আততায়ীরা ঘটনার পরেই রাজ্য ছেড়ে পালিয়েছে। গতকালই এই তদন্তে বড় সাফল্য পায় পুলিশ প্রশাসন। উত্তরপ্রদেশ (UP) এবং বিহারে হানা দিয়ে তিন সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়। ধৃতদের মধ্যে দু’জনকে উত্তরপ্রদেশ এবং একজনকে বিহার থেকে পাকড়াও করা হয়েছে।

প্রশাসনিক সূত্রের খবর, ধৃতরা সকলেই পেশাদার শার্প শ্যুটার কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাদের জেরা করে এই খুনের মূল ষড়যন্ত্রী বা ‘মাস্টারমাইন্ড’ কে, তা জানার চেষ্টা চলছে। তবে এই পর্যায়ে সিবিআই তদন্তভার গ্রহণ করায় এখন সমস্ত নথিপত্র এবং ধৃতদের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

সিবিআই-এর এন্ট্রি: ৭ সদস্যের দুর্ধর্ষ এসআইটি

রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এই মামলার স্পর্শকাতরতা বিচার করে সিবিআই তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছিল। কেন্দ্রীয় সংস্থা সেই আবেদন মঞ্জুর করার পর থেকেই দ্রুত গতিতে কাজ শুরু হয়েছে। ডিআইজি পদমর্যাদার অফিসারের নেতৃত্বে যে সাত সদস্যের দল গঠন করা হয়েছে, তাতে থাকছেন অভিজ্ঞ ইনভেস্টিগেটর এবং ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরা।

সিবিআই সূত্রের খবর, আজই এই বিশেষ দল কলকাতায় পৌঁছে যাচ্ছে। মধ্যমগ্রাম থানায় গিয়ে তারা মামলার কেস ডায়েরি নিজেদের হেফাজতে নেবে। এছাড়া, যে তিনজনকে পুলিশ আটক করেছে, তাদেরও হেফাজতে নিয়ে নতুন করে জেরা করতে পারে কেন্দ্রীয় সংস্থা। গোয়েন্দাদের প্রধান লক্ষ্য হবে— চন্দ্রনাথ রথকে খুনের মোটিভ কী ছিল? এটি কি নিছকই ব্যক্তিগত শত্রুতা, নাকি এর পিছনে বড় কোনও রাজনৈতিক অঙ্ক কাজ করছে?

শুভেন্দু অধিকারীর ছায়াসঙ্গী: কে এই চন্দ্রনাথ রথ?

চন্দ্রনাথ রথ কেবল শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত সহায়ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন তাঁর দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সৈনিক। মেদিনীপুরের ভূমিপুত্র চন্দ্রনাথ শুভেন্দুর ছায়ার মতো সঙ্গী ছিলেন গত কয়েক বছর ধরে। রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সাংগঠনিক কাজে তাঁর অবাধ যাতায়াত ছিল। বিশেষ করে বিরোধী দলনেতা হিসেবে শুভেন্দু যখন তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেন, তখন চন্দ্রনাথই ছিলেন তাঁর প্রধান সমন্বয়কারী।

শুভেন্দু-ঘনিষ্ঠদের মতে, চন্দ্রনাথের কাছে এমন অনেক গোপন তথ্য বা নথি থাকতে পারত, যা অনেকের কাছে অস্বস্তির কারণ। ফলে তাঁর মৃত্যু কেবল একজন ব্যক্তির মৃত্যু নয়, বরং অনেক অজানা তথ্যের চিরতরে হারিয়ে যাওয়াও হতে পারে। এই সম্ভাবনাকেই খতিয়ে দেখতে চাইছে সিবিআই।

তদন্তের মূল অভিমুখ: যে প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজছে সিবিআই

১. পেশাদার খুনি: কেন মধ্যমগ্রামের মতো ঘিঞ্জি এলাকায় খুনের জন্য পেশাদার শার্প শ্যুটারদের হায়ার করা হয়েছিল?

২. নিরাপত্তার গলদ: শুভেন্দু অধিকারীর সহায়ক হওয়া সত্ত্বেও তাঁর গতিবিধির আগাম খবর খুনিদের কাছে কীভাবে পৌঁছাল?

৩. ভিন রাজ্য কানেকশন: উত্তরপ্রদেশ এবং বিহারের দুষ্কৃতীদের এই খুনে ব্যবহারের পিছনে কার হাত রয়েছে?

৪. ষড়যন্ত্রের গভীরতা: খুনের নেপথ্যে থাকা সুপারি বা অর্থ জোগাড় হয়েছিল কোথা থেকে?

রাজনৈতিক টানাপড়েন ও প্রশাসনিক তৎপরতা

চন্দ্রনাথ রথের খুনের ঘটনায় প্রথম থেকেই উত্তাল ছিল রাজ্য রাজনীতি। শুভেন্দু অধিকারী খোদ এই ঘটনার জন্য প্রশাসনের ওপর ক্ষোভ উগরে দিয়েছিলেন। এবার সিবিআই তদন্ত শুরু হওয়ায় পদ্ম-শিবির কিছুটা স্বস্তিতে থাকলেও, ধৃতদের জেরা করে কী তথ্য বেরিয়ে আসে, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে সব পক্ষ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সিবিআই যদি এই খুনের পিছনে কোনও রাজনৈতিক যোগসূত্র খুঁজে পায়, তবে রাজ্যের শাসক দলের ওপর চাপ বাড়বে বহুগুণ।

এক নজরে চন্দ্রনাথ রথ হত্যা মামলার গতিপ্রকৃতি

তারিখ/সময়ঘটনাস্থিতি
৬ই মে রাতমধ্যমগ্রামে চন্দ্রনাথ রথের ওপর গুলি।ঘটনাস্থলে মৃত্যু।
৮ই মেরাজ্য পুলিশের বিশেষ দল গঠন ও তদন্ত শুরু।সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ।
১০ই মেউত্তরপ্রদেশ ও বিহার থেকে ৩ দুষ্কৃতী আটক।পুলিশের হেফাজতে জেরা।
১১ই মেরাজ্য সরকারের সিবিআই তদন্তের সুপারিশ।কেন্দ্রীয় সম্মতি লাভ।
১২ই মে (আজ)সিবিআই-এর ৭ সদস্যের এসআইটি গঠন।কলকাতায় পৌঁছাচ্ছে দল।

আগামী দিনের রূপরেখা

সিবিআই-এর গোয়েন্দারা আজ কলকাতায় পা রাখার পরেই সরাসরি মধ্যমগ্রামে অকুস্থলে যেতে পারেন। ফরেন্সিক ল্যাবরেটরির সাহায্য নিয়ে পুনর্গঠন করা হতে পারে সেই রাতের ঘটনার। এছাড়া চন্দ্রনাথের মোবাইল ফোন এবং তাঁর শেষ কয়েকদিনের কল লিস্ট (CDR) অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করা হবে। গোয়েন্দাদের ধারণা, চন্দ্রনাথের ফোনে এমন কোনও মেসেজ বা কল থাকতে পারে যা তাঁকে সেই রাতে নির্দিষ্ট জায়গায় ডেকে নিয়ে গিয়েছিল।

বাংলার মাটিতে রাজনৈতিক হিংসা নতুন কোনও বিষয় নয়, কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর অত্যন্ত বিশ্বস্ত কর্মীর এই পরিণতি রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও বড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়েছে। সিবিআই-এর এই পদক্ষেপের ফলে এবার প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে বলে আশা করছেন চন্দ্রনাথের পরিবার এবং শুভেন্দু অধিকারীর অনুগামীরা।

সব মিলিয়ে, চন্দ্রনাথ রথ খুনের তদন্ত এবার জাতীয় স্তরের তদন্তকারী সংস্থার হাতে যাওয়ায় রহস্যের পর্দা কত দ্রুত উন্মোচিত হয়, এখন সেটাই দেখার। মধ্যমগ্রামের অলিগলি থেকে দিল্লির সিবিআই সদর দপ্তর— সর্বত্রই এখন আলোচনার কেন্দ্রে কেবল একটিই নাম, চন্দ্রনাথ রথ।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Comments

Ad Code