নিজস্ব প্রতিবেদন, কলকাতা: আসন্ন নির্বাচনের ফল ঘোষণা এবং ভোট গণনার স্বচ্ছতা নিয়ে রাজ্য রাজনীতির দীর্ঘদিনের টানাপড়েনে এবার চূড়ান্ত যবনিকা টানল দেশের শীর্ষ আদালত। ভোট গণনার কাজে কেন শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের ব্যবহার করা হবে, এই প্রশ্ন তুলে যে আইনি লড়াই শুরু হয়েছিল, তাতে বড়সড় ধাক্কা খেল রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। কলকাতা হাইকোর্টের পর এবার সুপ্রিম কোর্টেও খারিজ হয়ে গেল তৃণমূলের আবেদন। আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ১৩ই এপ্রিল নির্বাচন কমিশন যে নির্দেশিকা জারি করেছিল, তাতে হস্তক্ষেপ করার কোনও প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ, গণনাকেন্দ্রে ‘কাউন্টিং সুপারভাইজার’ এবং ‘কাউন্টিং অ্যাসিস্ট্যান্ট’ হিসেবে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীরাই দায়িত্ব সামলাবেন।
আদালতের লড়াই ও সিব্বলের যুক্তি
এদিন সুপ্রিম কোর্টে মামলার শুনানির শুরু থেকেই তৃণমূলের পক্ষে বর্ষীয়ান আইনজীবী কপিল সিব্বল একাধিক আশঙ্কার কথা তুলে ধরেন। তাঁর প্রধান যুক্তি ছিল, একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় রাজ্য সরকারের কর্মীদের ব্রাত্য রেখে শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় কর্মীদের ওপর ভরসা করা কি যুক্তিসঙ্গত? তিনি দাবি করেন, এর ফলে একটি বিশেষ রাজনৈতিক বার্তা যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। সিব্বল আদালতের কাছে আবেদন জানান, যাতে রাজ্য ও কেন্দ্রের কর্মীদের একটি সুষম সংমিশ্রণ (Mix) গণনার কাজে লাগানো হয়।
তবে সিব্বলের এই সওয়াল ধোপে টেকেনি। সুপ্রিম কোর্ট পাল্টা পর্যবেক্ষণে জানায়, যখন নির্বাচন প্রক্রিয়া চলে, তখন সমস্ত আধিকারিক ও কর্মীরা সরাসরি নির্বাচন কমিশনের অধীনে চলে যান। এক্ষেত্রে তাঁরা রাজ্যের কর্মী নাকি কেন্দ্রের, সেই পরিচয় গৌণ হয়ে দাঁড়ায়। বিচারপতিদের পর্যবেক্ষণ, "যাঁরা গণনার কাজ করবেন, তাঁরা যদি সরাসরি কমিশনের নিয়ন্ত্রণেই কাজ করেন এবং তাঁদের দায়বদ্ধতা যদি শুধুমাত্র কমিশনের কাছেই থাকে, তবে তাঁদের পেশাগত পরিচয় নিয়ে সংশয় থাকার কারণ নেই।"
কমিশনের অধিকার ও স্বচ্ছতার প্রশ্ন
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে আদালতে জানানো হয়, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব। ১৩ই এপ্রিলের নির্দেশিকা কোনও বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়, বরং গণনার গতি এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কমিশন যুক্তি দেয় যে, গণনাকেন্দ্রে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের কাউন্টিং এজেন্টরা উপস্থিত থাকেন। প্রতিটি ইভিএম খোলার সময় এবং রাউন্ড ভিত্তিক গণনার শেষে এজেন্টদের স্বাক্ষর নেওয়া হয়। ফলে সেখানে কারচুপি বা পক্ষপাতিত্বের কোনও সুযোগ নেই।
সুপ্রিম কোর্ট কমিশনের এই যুক্তিতে মান্যতা দিয়ে জানায়, সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন পরিচালনার পূর্ণ অধিকার কমিশনের রয়েছে। তারা কেন্দ্র বা রাজ্য— যে কোনও স্তরের কর্মীদের মধ্য থেকে আধিকারিক বেছে নিতে পারে। এক্ষেত্রে আদালত মনে করছে না যে কমিশনের অধিকারে হস্তক্ষেপ করার মতো কোনও পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক মহলে প্রতিক্রিয়ার ঝড়
শীর্ষ আদালতের এই রায়ের পর রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে শোরগোল শুরু হয়েছে। বিরোধীরা এই রায়কে ‘গণতন্ত্রের জয়’ হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, বিগত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় দেখা গিয়েছে যে গণনার সময় স্থানীয় প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়। কেন্দ্রীয় কর্মীদের উপস্থিতিতে সেই সুযোগ অনেকটাই কমে যাবে। বিশেষ করে গ্রাম পঞ্চায়েত বা অন্যান্য স্থানীয় নির্বাচনের সময় গণনার কারচুপি নিয়ে যে ভুরি ভুরি অভিযোগ উঠেছিল, লোকসভা বা বিধানসভা নির্বাচনে তার পুনরাবৃত্তি রুখতেই এই কড়া অবস্থান প্রয়োজন ছিল।
অন্যদিকে, শাসকদলের পক্ষ থেকে এই রায়কে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। তাঁদের একাংশের দাবি, রাজ্য সরকারি কর্মীদের ওপর আস্থা না রাখা তাঁদের অপমান করার শামিল। তবে আদালতের নির্দেশ শিরোধার্য করে আগামী দিনে গণনাকেন্দ্রে নিজেদের এজেন্টদের আরও সক্রিয় থাকার বার্তা দিয়েছে তৃণমূল নেতৃত্ব।
১৩ই এপ্রিলের সেই বিতর্কিত নির্দেশিকা
উল্লেখ্য, গত ১৩ই এপ্রিল জাতীয় নির্বাচন কমিশন একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানিয়েছিল, এবার থেকে ভোট গণনার মূল টেবিলে কাউন্টিং সুপারভাইজার এবং কাউন্টিং অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে মূলত কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদেরই নিয়োগ করা হবে। রাজ্য সরকারি কর্মীদের মাইক্রো-অবজারভার বা অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজে লাগানো হতে পারে, কিন্তু সরাসরি ভোট গণনার মূল প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় কর্মীদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এই নির্দেশিকার বিরুদ্ধেই প্রথমে হাইকোর্ট এবং পরে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল শাসকদল।
কেন এই কড়াকড়ি?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গ সহ বেশ কয়েকটি রাজ্যে ভোট পরবর্তী হিংসা এবং গণনায় কারচুপির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। নির্বাচন কমিশনের কাছে বিভিন্ন সময়ে রিপোর্ট জমা পড়েছে যে, স্থানীয় স্তরে রাজ্য সরকারি কর্মীদের একাংশ অনেক সময় পরোক্ষ রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েন। এই ‘পারসেপশন’ বা জনমানসের ধারণা বদলাতেই কমিশন এবার কেন্দ্রীয় সংস্থায় কর্মরত ব্যাংক কর্মী, বিমা নিগম বা অন্যান্য কেন্দ্রীয় দফতরের কর্মীদের গণনার কাজে নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
স্বচ্ছতা বনাম স্বাধিকারের লড়াই
এদিনের রায়ে সুপ্রিম কোর্ট তিনটি বিষয়কে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে:
১. প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ: নির্বাচনের সময় সকল কর্মী কমিশনের ‘ডেপুটেশনে’ থাকেন।
২. এজেন্টদের ভূমিকা: রাজনৈতিক দলগুলির সক্রিয় অংশগ্রহণই স্বচ্ছতার আসল গ্যারান্টি।
৩. নিরপেক্ষতা: কর্মীদের উৎসস্থলের চেয়ে তাঁদের কাজের তদারকি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
শীর্ষ আদালতের এই নির্দেশের ফলে এখন আর আইনি পথে কমিশনের নির্দেশিকাকে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ রইল না। আগামী নির্বাচনে এই নতুন নিয়ম মেনেই প্রতিটি গণনা কেন্দ্রে কাজ শুরু হবে। ভোটারদের একাংশের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে ভোট গণনার প্রক্রিয়া নিয়ে আমজনতার মনে যে সংশয় ছিল, তা অনেকটাই দূর হবে। এখন দেখার, গণনার দিন কেন্দ্রীয় কর্মীরা কমিশনের এই আস্থার মর্যাদা কতটা রাখতে পারেন এবং রাজনৈতিক দলগুলি গণনাকেন্দ্রে কেমন ভূমিকা পালন করে।
সুপ্রিম কোর্টের এই রায় নির্বাচন কমিশনের হাতকে আরও শক্তিশালী করল। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সক্রিয় রাজ্যে, যেখানে প্রতিটি বুথ এবং প্রতিটি ভোটের হিসাব নিয়ে তীব্র লড়াই হয়, সেখানে কেন্দ্রীয় কর্মীদের গণনার কাজে লাগানো একটি মাইলফলক সিদ্ধান্ত হতে চলেছে। তৃণমূলের আইনি ধাক্কা যেমন বিরোধীদের রাজনৈতিক অস্ত্র তুলে দিল, তেমনই কমিশনের জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ— যাতে গণনার দিন কোনও যান্ত্রিক বা প্রশাসনিক ত্রুটি ছাড়াই নিখুঁতভাবে জনমত প্রতিফলিত হয়।
0 মন্তব্যসমূহ