Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

Recent in Home

রাজ্যে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোটের লক্ষ্যে কমিশনের কড়া পদক্ষেপ, ৩৬ ঘণ্টায় গ্রেফতার ১৫৪৩ দুষ্কৃতী



মানুষের ভাষা । নিউজ ডেস্ক 

আসন্ন নির্বাচনের আগে রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং সাধারণ ভোটারদের মনে পূর্ণ আস্থা ফেরাতে নজিরবিহীন কড়া পদক্ষেপ করল জাতীয় নির্বাচন কমিশন (ECI)। নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণার আগে থেকেই রাজ্যের প্রতিটি কোণায় শান্তি বজায় রাখার যে বার্তা কমিশন দিয়েছিল, এবার তা কার্যত হাতে-কলমে প্রমাণ করতে শুরু করল প্রশাসন। নির্বাচন কমিশনের প্রত্যক্ষ নজরদারিতে এবং কড়া নির্দেশিকা মেনে ‘কনফিডেন্স বিল্ডিং মেজার’ বা সিবিএম (CBM) ড্রাইভের অঙ্গ হিসেবে রাজ্যজুড়ে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করেছে পুলিশ প্রশাসন। গতকাল দুপুর থেকে আজ সকাল পর্যন্ত, মাত্র কয়েক ঘণ্টার এই সাঁড়াশি অভিযানে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মোট ১,০৯৫ জন দুষ্কৃতী ও সমাজবিরোধীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন সূত্রের খবর, এই নিয়ে গত মাত্র ৩৬ ঘণ্টায় রাজ্যে মোট গ্রেফতারের সংখ্যা হু হু করে বেড়ে দাঁড়াল ১,৫৪৩-এ।

জেলাওয়াড়ি পরিসংখ্যান: কোথায় কত গ্রেফতার

রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কমিশন যে এবার কোনওরকম আপস করতে রাজি নয়, এই ধরপাকড়ের পরিসংখ্যানই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ ছিল, দাগি অপরাধী, পুরনো মামলায় অভিযুক্ত, জামিন অযোগ্য পরোয়ানা (Non-Bailable Warrant) থাকা ব্যক্তি এবং এলাকায় অশান্তি ছড়াতে পারে এমন সন্দেহভাজনদের অবিলম্বে হেফাজতে নিতে হবে। সেই নির্দেশিকা মেনেই জেলা পুলিশের সুপার এবং পুলিশ কমিশনারদের নেতৃত্বে এই মেগা অপারেশন চালানো হয়।

জেলাগ্রেফতারের সংখ্যা
পূর্ব বর্ধমান৪৭৯
উত্তর ২৪ পরগনা৩১৯
দক্ষিণ ২৪ পরগনা২৪৬
কলকাতা উত্তর১০৯
হুগলী৪৯
নদীয়া৩২
হাওড়া৩২

কমিশন সূত্রে পাওয়া জেলাভিত্তিক গ্রেফতারির যে খণ্ডচিত্র সামনে এসেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে মূলত স্পর্শকাতর জেলাগুলির দিকেই সবচেয়ে বেশি নজর দেওয়া হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই বিশেষ অভিযানে সবচেয়ে বেশি ধরপাকড় হয়েছে পূর্ব বর্ধমান জেলায়। সেখান থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে ৪৭৯ জনকে। এরপরই তালিকায় রয়েছে উত্তর ২৪ পরগনা। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এবং রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত উত্তেজনাপ্রবণ এই জেলা থেকে ৩১৯ জন দুষ্কৃতীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পিছিয়ে নেই দক্ষিণ ২৪ পরগনাও, সেখান থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে ২৪৬ জনকে।

শহরাঞ্চলেও পুলিশের নজরদারি ছিল চোখে পড়ার মতো। কলকাতা উত্তর (Kolkata North) এলাকা থেকে ১০৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া হুগলী থেকে ৪৯ জন, নদীয়া থেকে ৩২ জন এবং হাওড়া থেকে ৩২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে কমিশনের একটি উচ্চপদস্থ সূত্র নিশ্চিত করেছে। রাতের অন্ধকারে পুলিশের একাধিক দল বিভিন্ন থানা এলাকায় একযোগে এই অভিযান চালায়।

পূর্ব বর্ধমানে বড়সড় পদক্ষেপ, জালে হেভিওয়েট নেতা

এই গোটা সিবিএম ড্রাইভের মধ্যে রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করেছে পূর্ব বর্ধমান জেলার একটি হাই-প্রোফাইল গ্রেফতারি। পুলিশ ও নির্বাচন কমিশন সূত্রে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, পূর্ব বর্ধমান থেকে গ্রেফতার হওয়া ৪৭৯ জনের মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় কাউন্সিলর নাড়ু ভগত। রাজনৈতিক মহলে এই গ্রেফতারি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

নির্বাচনের আগে সাধারণত রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অনেকেই পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকার চেষ্টা করেন। কিন্তু নাড়ু ভগতের মতো একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে এই বিশেষ অভিযানে গ্রেফতার করার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন অত্যন্ত কড়া এবং স্পষ্ট একটি বার্তা দিল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বার্তাটি হল— অপরাধমূলক কার্যকলাপ বা অশান্তি পাকানোর চেষ্টায় যুক্ত থাকলে, রাজনৈতিক পরিচয় বা পদমর্যাদা কোনওভাবেই ঢাল হিসেবে কাজ করবে না। প্রশাসন এবার দলমত নির্বিশেষে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।

সিবিএম ড্রাইভ: অপারেশন অল আউট 

কিন্তু কী এই সিবিএম (CBM) ড্রাইভ এবং কেন নির্বাচনের আগে এর এত গুরুত্ব? 'কনফিডেন্স বিল্ডিং মেজার' বা সিবিএম হল নির্বাচন কমিশনের একটি বহু পরীক্ষিত এবং কার্যকরী কৌশল। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ইতিহাসে রাজনৈতিক হিংসা, বুথ দখল এবং ভোটারদের ভয় দেখানোর বেশ কিছু অভিযোগ অতীতকাল থেকেই বারবার সামনে এসেছে। এই ভয়ের পরিবেশ কাটিয়ে সাধারণ মানুষ যাতে নির্ভয়ে এবং স্বাধীনভাবে নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, তা নিশ্চিত করতেই এই সিবিএম ড্রাইভ চালানো হয়।

এই প্রক্রিয়ার অধীনে পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী যৌথভাবে এলাকায় এলাকায় রুট মার্চ (Route March) করে, স্পর্শকাতর এলাকাগুলিতে এরিয়া ডমিনেশন (Area Domination) চালানো হয় এবং সর্বোপরি, যারা ভোটপ্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে, তাদের চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক গ্রেফতার (Preventive Arrest) করা হয়। গতকাল দুপুর থেকে আজ সকাল পর্যন্ত হওয়া এই ১,০৯৫ জনের গ্রেফতারি মূলত এই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থারই একটি জ্বলন্ত উদাহরণ।

কমিশনের ব্লু-প্রিন্ট: কীভাবে চলছে অপারেশন?

কমিশনের এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে একটি নিখুঁত পরিকল্পনা বা ব্লু-প্রিন্ট। বেশ কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই রাজ্যের প্রতিটি থানার অফিসার ইন-চার্জদের (OC) নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল নিজেদের এলাকার 'ট্রাবলমেকার' বা সমস্যা সৃষ্টিকারীদের তালিকা প্রস্তুত করতে। সেই তালিকায় নাম ছিল দাগি অপরাধী, বেআইনি অস্ত্র কারবারি, বোমাবাজ এবং এমন রাজনৈতিক কর্মীদের যারা অতীতে ভোটের সময় অশান্তি পাকানোর দায়ে অভিযুক্ত হয়েছিল।

তালিকা প্রস্তুত হওয়ার পর, গতকাল দুপুর থেকে একযোগে গোটা রাজ্যে শুরু হয় এই 'ক্লিন আপ' বা পরিচ্ছন্নতা অভিযান। বিশেষ করে উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার মতো বিস্তীর্ণ জেলা, যেখানে নদীপথ এবং সীমান্তবর্তী এলাকার সুযোগ নিয়ে দুষ্কৃতীরা গা ঢাকা দেয়, সেখানে রাতের অন্ধকারে পুলিশের স্পেশাল অপারেশন গ্রুপ (SOG) এবং র‍্যাফ (RAF) নামিয়ে তল্লাশি চালানো হয়। পূর্ব বর্ধমানের মতো কৃষিপ্রধান ও রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত জেলাতেও পুলিশি তৎপরতা ছিল চরম পর্যায়ে।

রাজনৈতিক তরজা ও প্রশাসনিক কড়াকড়ি

নির্বাচন কমিশনের এই কড়া পদক্ষেপের পর রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর চর্চা। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি প্রথম থেকেই দাবি জানিয়ে আসছিল যে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে রাজ্যকে সমাজবিরোধী মুক্ত করতে হবে। কমিশনের এই পদক্ষেপকে তারা ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন। অন্যদিকে, শাসকদলের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে যে পুলিশ নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে এবং আইন আইনের পথে চলছে। তবে, পূর্ব বর্ধমানে কাউন্সিলরের গ্রেফতারি শাসক শিবিরের অন্দরে কিছুটা হলেও অস্বস্তি বাড়িয়েছে বলে ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা।

প্রশাসনের এক শীর্ষ কর্তা জানিয়েছেন, "এই ধরপাকড় এখানেই শেষ নয়। এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া। নির্বাচনের দিন পর্যন্ত এই সিবিএম ড্রাইভ চলবে। আমরা চাইছি ভোটের দিন যাতে সাধারণ মানুষকে কোনওরকম অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন না হতে হয়। যারা অশান্তি পাকাতে পারে বলে সামান্যতম সন্দেহ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কড়া আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।"

জনমানসে প্রভাব ও আগামী দিনের রূপরেখা

পুলিশ ও নির্বাচন কমিশনের এই যৌথ অভিযানের জেরে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ইতিবাচক বার্তা পৌঁছেছে। রাতের বেলা যখন পুলিশের সাইরেন বাজিয়ে রুট মার্চ হচ্ছে এবং একের পর এক দুষ্কৃতী ধরা পড়ছে, তখন ভোটাররা অনেকটাই স্বস্তি পাচ্ছেন। বিশেষ করে কলকাতা উত্তর থেকে শুরু করে হাওড়া, হুগলী বা নদীয়ার মতো জেলাগুলিতে, যেখানে গত কয়েক বছরে বেশ কিছু রাজনৈতিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, সেখানে এই সিবিএম ড্রাইভ সাধারণ মানুষের মনে ভরসা যোগাচ্ছে।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, ৩৬ ঘণ্টায় ১,৫৪৩ জনকে গ্রেফতার করার এই ঘটনা প্রমাণ করে যে কমিশন এবার 'জিরো টলারেন্স' নীতি নিয়ে এগোচ্ছে। আগামী দিনগুলিতে কেন্দ্রীয় বাহিনীর সংখ্যা রাজ্যে আরও বাড়বে এবং পুলিশের সাথে তাদের যৌথ টহলদারি আরও জোরদার হবে। এর পাশাপাশি, বেআইনি অস্ত্র এবং বেআইনি মদের ঠেকগুলিতেও লাগাতার অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে, আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে যাতে কোনওভাবেই রক্তপাত বা হিংসার রাজনীতি মাথাচাড়া দিতে না পারে, তার জন্য আটঘাট বেঁধে ময়দানে নেমেছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন। পূর্ব বর্ধমান থেকে দক্ষিণ ২৪ পরগনা— জালের বিস্তার এতটাই নিখুঁত করা হয়েছে যে, সমাজবিরোধীদের কাছে এখন আত্মগোপন করা ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনও রাস্তা খোলা নেই। অবাধ, নিরপেক্ষ এবং শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণের যে প্রতিশ্রুতি কমিশন দিয়ে থাকে, এই বিশাল ধরপাকড় অভিযান সেই লক্ষ্য পূরণের পথে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং শক্তিশালী পদক্ষেপ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Comments

Ad Code