কলকাতা: লোকসভা নির্বাচনের আবহে শহরে ফের একবার তৎপর এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)। শুক্রবারের রেশ কাটতে না কাটতেই মঙ্গলবার সাতসকালে শহরের একাধিক প্রান্তে একযোগে শুরু হলো কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার ম্যারাথন তল্লাশি অভিযান। বালিগঞ্জের ফার্ন রোড থেকে শুরু করে বেহালা— শহরের দুই ভিন্ন প্রান্তে এদিন কড়া নিরাপত্তার ঘেরাটোপে এই অভিযান চালায় ইডি। একদিকে কলকাতা পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের ডেপুটি কমিশনার (DCP) শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের ফ্ল্যাট, অন্যদিকে বেহালার স্বনামধন্য ব্যবসায়ী তথা সান এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজিং ডিরেক্টর জয়েশ কামদারের বিলাসবহুল বাড়ি, সব জায়গাতেই চলল ইডি আধিকারিকদের চিরুনি তল্লাশি। মূলত কুখ্যাত দুষ্কৃতী 'সোনা পাপ্পু' কাণ্ডে বিপুল পরিমাণ বেআইনি আর্থিক লেনদেন বা 'প্রসিডস অফ ক্রাইম'-এর খোঁজে নেমেই এই অভিযান বলে ইডি সূত্রের খবর।
বালিগঞ্জের ফার্ন রোডে কড়া নিরাপত্তায় ঘেরা ডিসিপির আবাসন
এদিন ভোর পৌনে ছ'টা নাগাদ আচমকাই ইডির ছ'টি গাড়ির একটি কনভয় এসে পৌঁছয় বালিগঞ্জের ৩/২ ফার্ন রোডের 'স্বস্তিক ফার্ন' নামক একটি অভিজাত আবাসনের সামনে। গাড়ি থেকে নেমেই মুহূর্তের মধ্যে গোটা আবাসনটি নিজেদের কড়া পাহারায় ঘিরে ফেলেন কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা। আবাসনের মূল গেট থেকে শুরু করে পিছনের গেট— সবকটিতেই তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। বাইরে থেকে যেমন কাউকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি, তেমনই ভেতর থেকেও কোনো আবাসিককে বাইরে আসার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
এই স্বস্তিক ফার্ন আবাসনেই ফ্ল্যাট রয়েছে কলকাতা পুলিশের বর্তমান ডেপুটি কমিশনার (স্পেশাল ব্রাঞ্চ) শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের। দীর্ঘদিন তিনি কলকাতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কালীঘাট থানার ওসি (OC) হিসেবে দায়িত্ব সামলেছেন। ইডি সূত্রে খবর, আবাসনের নির্দিষ্ট ফ্ল্যাটে ঢুকে তল্লাশি অভিযান শুরু করেন তদন্তকারী আধিকারিকরা। যদিও অভিযানের সময় শান্তনু সিনহা বিশ্বাস নিজে ফ্ল্যাটে উপস্থিত ছিলেন না বলেই জানা গিয়েছে। তবে তার পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করে একাধিক তথ্য জানার চেষ্টা করেন ইডি আধিকারিকরা। ফ্ল্যাটের প্রতিটি ঘরে, আলমারি এবং বিভিন্ন নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হয়।
উল্লেখ্য, ফার্ন রোডের এই ঠিকানার পাশাপাশি শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের ফার্ন রোডেরই আরও একটি ঠিকানাতেও এদিন একযোগে তল্লাশি চালায় ইডির আরেকটি দল। সেখানেও গ্রাউন্ড ফ্লোর এবং ফার্স্ট ফ্লোরের একাধিক তালাবন্ধ ফ্ল্যাটের গ্রিল খুলে ভেতরে প্রবেশ করেন তদন্তকারীরা। দীর্ঘক্ষণ ধরে চলে এই তল্লাশি প্রক্রিয়া।
পুলিশ আধিকারিকের বিরুদ্ধে পুরোনো অভিযোগের ছায়া
শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের নাম কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার খাতায় এই প্রথম নয়। এর আগেও কয়লা পাচার কাণ্ডে দুর্নীতি ও বেআইনি আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে তার নাম জড়িয়েছিল। সেই সময় তাকে দিল্লিতে ইডির সদর দপ্তরে তলব করে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়। সেবার তার কাছ থেকে একাধিক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট এবং সম্পত্তির নথিপত্র চেয়ে পাঠিয়েছিলেন তদন্তকারীরা। কয়লা পাচার মামলার সেই ছায়া কাটতে না কাটতেই এবার সোনা পাপ্পু কান্ডে নতুন করে এই পুলিশ কর্তার জোড়া ঠিকানায় ইডির হানা স্বাভাবিকভাবেই প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
বেহালায় রুদ্ধদ্বার নাটক ও ব্যবসায়ী জয়েশ কামদারের বাড়িতে তল্লাশি
বালিগঞ্জের পাশাপাশি এদিন সকাল থেকেই চরম নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি হয় বেহালার জ্যোতিষ রায় রোডে। সকাল ছ'টা নাগাদ পাঁচটি গাড়ির কনভয় নিয়ে ইডি আধিকারিকরা এসে পৌঁছন সান কনস্ট্রাকশন গ্রুপের ম্যানেজিং ডিরেক্টর জয়েশ কামদারের বাড়িতে। কিন্তু সেখানে পৌঁছনোর পর তদন্তকারীদের এক অদ্ভুত পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়।
প্রায় ৪০ মিনিট ধরে বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় ইডি আধিকারিক ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের। বারবার ডাকাডাকি করার পরেও, বাড়ির নিরাপত্তারক্ষী বা কেয়ারটেকার কেউই গেট খোলেননি। তৈরি হয় এক রুদ্ধশ্বাস নাটকীয় পরিস্থিতি। অবশেষে সকাল ৬টা ৪০ মিনিট নাগাদ বাড়ির ভেতর থেকে গেট খোলা হলে তদন্তকারীরা ভেতরে প্রবেশ করেন।
জয়েশ কামদার সাম্প্রতিককালে ইডির আতসকাঁচের নিচে থাকা অন্যতম চর্চিত নাম। বিভিন্ন জায়গায় প্রোমোটিং এবং নির্মাণের কাজের সঙ্গে যুক্ত তার সংস্থা 'সান এন্টারপ্রাইজ' বা 'সান কনস্ট্রাকশন'। ইডি সূত্রে খবর, এই জয়েশ কামদারের একাধিক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের স্টেটমেন্ট খতিয়ে দেখার পর বেশ কিছু সন্দেহজনক এবং বিপুল অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের হদিস মিলেছে। তদন্তকারীদের দাবি, এই ট্রানজাকশনগুলির সূত্র ধরে এগোতেই একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে, যা দেখে রীতিমতো চমকে উঠেছেন খোদ ইডি আধিকারিকরাই।
এর আগে গত ১লা এপ্রিল সোনা পাপ্পুর বাড়িতে তল্লাশির দিনই জয়েশ কামদারের বেহালার বাড়ি ও অফিসেও হানা দিয়েছিল ইডি। সেবার তার অফিস থেকে নগদ প্রায় দেড় কোটি টাকা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। সেই ঘটনার পর বিপুল অঙ্কের টাকার উৎস জানতে জয়েশ কামদারকে দু'বার নোটিশ পাঠিয়ে তলব করেছিল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট। কিন্তু দু'বারই তিনি হাজিরা এড়িয়ে যান। আর সেই কারণেই তদন্তের জাল গোটাতে এদিন সরাসরি তার বাড়িতে এসে হাজির হন তদন্তকারীরা। তাকে মুখোমুখি বসিয়ে এই বেআইনি লেনদেন সম্পর্কে ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
'সোনা পাপ্পু' কানেকশন এবং কালো টাকার উৎস সন্ধানে কেন্দ্রীয় সংস্থা
এদিনের এই জোড়া তল্লাশি অভিযানের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কসবা এলাকার কুখ্যাত দুষ্কৃতী সোনা পাপ্পুর বিরুদ্ধে রুজু হওয়া মামলা। তোলাবাজি, প্রতারণা এবং বেআইনি অস্ত্র রাখার অভিযোগে কসবা সহ একাধিক থানায় সোনা পাপ্পুর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের হয়েছিল। পরবর্তীকালে প্রিভেনশন অফ মানি লন্ডারিং অ্যাক্ট (PMLA) বা আর্থিক তছরুপ নিবারণ আইনে এই মামলার তদন্তভার নিজেদের হাতে তুলে নেয় এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট।
ইডির মূল লক্ষ্য হলো 'প্রসিডস অফ ক্রাইম' বা অপরাধের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থের গতিপথ ট্রেস করা। তোলাবাজি এবং প্রতারণার মাধ্যমে সংগ্রহ করা এই বিপুল পরিমাণ কালো টাকা কীভাবে, কার হাত ঘুরে, কোথায় কোথায় বিনিয়োগ করা হয়েছে, তারই তদন্তে নেমেছে ইডি। তদন্তে নেমেই সোনা পাপ্পুর সঙ্গে জয়েশ কামদারের মতো প্রোমোটার এবং শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের মতো প্রভাবশালীদের যোগসূত্রের সন্দেহজনক ইঙ্গিত পেয়েছেন গোয়েন্দারা।
রিয়েল এস্টেট চক্র, জমি দখল এবং বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত
ইডি সূত্রে আরও জানা যাচ্ছে, এই গোটা প্রক্রিয়ার সঙ্গে শহরের একটি বিশাল জমি দখল বা 'ল্যান্ড গ্র্যাবিং' চক্রের যোগ থাকতে পারে। বেআইনিভাবে দখল করা জমিকে বিভিন্ন প্রভাবশালীদের মদতে এবং পুরসভার একাংশের সাহায্যে বৈধ জমিতে পরিণত করে সেখানে বহুতল নির্মাণের একটি বিরাট সিন্ডিকেট কাজ করছে বলে সন্দেহ তদন্তকারীদের।
এই জয়েশ কামদারের নাম এর আগেও সংবাদ শিরোনামে এসেছিল। গত বছর সেপ্টেম্বরে মহালয়ার দিন চারু মার্কেট থানা এলাকায় তার একটি নিজস্ব জিমে প্রকাশ্যে গুলি চলার ঘটনা ঘটে। সেই সময় জয়েশ কামদার নিজেই তার অফিসে উপস্থিত ছিলেন। একের পর এক এই ধরনের অপরাধমূলক ঘটনার সঙ্গে তার নাম জড়িয়ে যাওয়া এবং তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেন, এই সব কিছু মিলিয়ে একটি বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত পাচ্ছে ইডি।
ভোটের আবহে উত্তপ্ত রাজ্য রাজনীতি, তুঙ্গে রাজনৈতিক তরজা
উল্লেখ্য, ঠিক গত শুক্রবারেই দক্ষিণ কলকাতার রাসবিহারী কেন্দ্রের তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী তথা কলকাতা পুরসভার মেয়র পারিষদ দেবাশিস কুমারের বাড়িতেও দীর্ঘ তল্লাশি চালিয়েছিল আয়কর দপ্তর (IT)। সেই ল্যান্ড গ্র্যাবিং মামলার তদন্তে অমিত গঙ্গোপাধ্যায় নামের এক ব্যবসায়ীর সূত্র ধরে দেবাশিস কুমারকে এর আগে দু'বার তলবও করা হয়েছিল।
শুক্রবার তৃণমূল নেতার বাড়িতে আয়কর হানা এবং ঠিক তার একদিন পরেই মঙ্গলবার খোদ কলকাতা পুলিশের প্রাক্তন ওসি এবং এক প্রথম সারির ব্যবসায়ীর বাড়িতে ইডির এই চিরুনি তল্লাশি— সব মিলিয়ে লোকসভা নির্বাচনের মুখে শহরের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতি রীতিমতো সরগরম।
শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের তরফ থেকে ইতিমধ্যেই এই অভিযানের তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। তাদের অভিযোগ, লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতেই বিজেপি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলিকে ব্যবহার করে বিরোধীদের উপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের দাবি, রাজনৈতিকভাবে ময়দানে লড়াই করতে না পেরে ইডি, সিবিআই এবং আয়কর দপ্তরকে হাতিয়ার করেছে কেন্দ্রের শাসক দল।
অন্যদিকে, শাসকদলের এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপি। গেরুয়া শিবিরের পালটা দাবি, রাজ্যে দুর্নীতির শেকড় এতটাই গভীরে পৌঁছেছে যে কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলি স্বাধীনভাবে কাজ করতে গেলেই কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে একের পর এক কেউটে বেরিয়ে পড়ছে। এর সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই, বরং সাধারণ মানুষের লুঠ হওয়া টাকার হিসাব পেতেই এই তদন্ত চলছে।
আগামী দিনের আইনি পদক্ষেপ
এদিনের এই ম্যারাথন তল্লাশি অভিযান থেকে ইডি আধিকারিকরা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র এবং ডিজিটাল প্রমাণ (যেমন মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ এবং হার্ডডিস্ক) বাজেয়াপ্ত করেছেন বলে জানা যাচ্ছে। জয়েশ কামদারের বয়ান রেকর্ড করার পাশাপাশি ডিসিপি শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের পরিবারের সদস্যদের দেওয়া বয়ানও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, সোনা পাপ্পু কাণ্ডের এই তদন্ত আগামী দিনে রাজ্য রাজনীতি এবং কলকাতা পুলিশের অন্দরে আরও বড় কোনো প্রভাব ফেলতে পারে। উদ্ধার হওয়া নথিপত্র এবং ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্টের ফরেনসিক অডিট সম্পন্ন হলে এই বেআইনি আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে আরও কোনো প্রভাবশালীর নাম জড়িয়ে আছে কিনা, তা স্পষ্ট হবে। আপাতত বালিগঞ্জ এবং বেহালার এই জোড়া অভিযানের দিকেই কড়া নজর রাখছে গোটা রাজ্যের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহল।
0 মন্তব্যসমূহ