Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

Recent in Home

ভোটার আগে নয়া হুমকি !!! এবার খাস কলকাতায় হামলার হুমকি পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রীর


মানুষের ভাষা | নিউজ ডেস্ক

কলকাতা: ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক এমনিতেই দীর্ঘদিন ধরে তলানিতে ঠেকে রয়েছে। সীমান্তে অস্ত্রবিরতি চুক্তি থাকলেও, সীমান্তের ওপার থেকে জঙ্গি মদত এবং উস্কানিমূলক মন্তব্যের কোনও বিরাম নেই। নিজেদের দেশের অভ্যন্তরীণ চরম অর্থনৈতিক সংকট এবং রাজনৈতিক ডামাডোল সামলাতে ব্যর্থ হয়ে পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বারবার ভারত-বিরোধিতাকেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এসেছেন। কিন্তু এবার সেই উস্কানিমূলক মন্তব্যের সমস্ত সীমা পার করে দিলেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজা আসিফ (Khawaja Asif)। সরাসরি খাস কলকাতাকে (Kolkata) নিশানা করে হামলার হুমকি দিলেন তিনি। তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক স্তরে তীব্র বিতর্ক ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।

শনিবার পাকিস্তানের শিয়ালকোটে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রী দাবি করেন যে, ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হলে এবং ভারত যদি কোনও ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ (False Flag) অপারেশন চালানোর চেষ্টা করে, তবে তার কড়া জবাব দেওয়া হবে সরাসরি কলকাতায় হামলা চালিয়ে। তাঁর এই ভিত্তিহীন এবং আগ্রাসী মন্তব্য দুই দেশের মধ্যেকার টানাপোড়েনকে এক ধাক্কায় আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

কী বলেছেন পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজা আসিফ?

সংবাদমাধ্যমের সামনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে খোয়াজা আসিফ রীতিমতো হুঙ্কারের সুরে বলেন, "ভারত যদি কোনও ফলস ফ্ল্যাগ অপারেশন চালানোর চেষ্টা করে, তাহলে আমরা সেটার জবাব কলকাতায় দেব।" তাঁর এই মন্তব্যের মধ্যে দিয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রতি চরম আক্রমণাত্মক এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন মনোভাব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

কিন্তু কী এই 'ফলস ফ্ল্যাগ অপারেশন'? সামরিক এবং কূটনৈতিক পরিভাষায়, 'ফলস ফ্ল্যাগ' অপারেশন বলতে এমন এক ধরনের সাজানো বা পূর্বপরিকল্পিত ঘটনাকে বোঝায়, যেখানে কোনও দেশ নিজেদের ক্ষতিসাধন করে বা নিজেদের নাগরিকদের ওপর হামলা চালিয়ে তার দায় সম্পূর্ণভাবে শত্রু রাষ্ট্রের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়। পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দাবি, ভারত নাকি এমন একটি জঘন্য পরিকল্পনা করছে, যেখানে ভারতীয় নাগরিকদের ব্যবহার করে বা পাকিস্তানি নাগরিকদের মধ্যে কোথাও মৃতদেহ ফেলে একটি সাজানো হামলার চিত্র তৈরি করা হতে পারে, যাতে আন্তর্জাতিক মহলে পাকিস্তানকে কোণঠাসা করা যায়। আর এই কাল্পনিক আশঙ্কার ওপর ভিত্তি করেই তিনি খাস কলকাতায় হামলার মতো ভয়ংকর হুমকি দিয়ে বসেছেন।

 অতীত মন্তব্যের ইতিহাস

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, খোয়াজা আসিফের এই অভিযোগের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, তিনি তাঁর এই মারাত্মক দাবির সপক্ষে একবিন্দুও প্রমাণ পেশ করতে পারেননি। পুরোটাই তাঁর নিজস্ব 'আশঙ্কা' এবং 'অনুমান'-এর ওপর ভিত্তি করে বলা। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল মন্ত্রী হয়ে শুধুমাত্র অনুমানের ভিত্তিতে অন্য একটি দেশের অন্যতম প্রধান মেট্রোপলিটন শহরে হামলার হুমকি দেওয়াটা আন্তর্জাতিক শিষ্টাচারের চূড়ান্ত লঙ্ঘন বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।

তবে, খোয়াজা আসিফের ক্ষেত্রে এই ধরনের ভিত্তিহীন ও বিতর্কিত মন্তব্য নতুন কিছু নয়। এর আগেও তিনি একাধিকবার এমন সব দাবি করেছেন, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পাকিস্তানকে হাস্যাস্পদ হতে হয়েছে। বছর কয়েক আগে একটি সাক্ষাৎকারে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, পাকিস্তান যে দাবি করে তারা ভারতের যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে, তার সপক্ষে কোনও প্রমাণ তাদের হাতে আছে কি না। এর উত্তরে অত্যন্ত ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রী জবাব দিয়েছিলেন, "এটা তো সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে!"

রাষ্ট্রীয় স্তরে জাতীয় নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়ে কোনও দেশের মন্ত্রী যদি ফেসবুক বা এক্স (পূর্বতন টুইটার)-এর তথ্যের ওপর নির্ভর করে সরকারি দাবি পেশ করেন, তবে সেই দেশের সামরিক এবং গোয়েন্দা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক। এবারও কলকাতার মতো শহরে হামলার হুমকির নেপথ্যে তেমন কোনও ফাঁকা আওয়াজই কাজ করছে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

হুমকির নেপথ্যে রাজনাথ সিংয়ের কড়া বার্তা?

পাকিস্তানের এই হঠাৎ হুঙ্কারের কারণ খুঁজতে গেলে কয়েকদিন পিছনের একটি ঘটনার দিকে নজর দিতে হবে। সম্প্রতি ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং (Rajnath Singh) পাকিস্তানকে উদ্দেশ্য করে অত্যন্ত কড়া এবং কড়া ভাষায় একটি সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। রাজনাথ সিং স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন, ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে পরিচালিত 'অপারেশন সিন্দুর' সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়নি, বরং তা কেবলমাত্র সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে।

সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারতের 'জিরো টলারেন্স' (Zero Tolerance) নীতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে রাজনাথ সিং বলেছিলেন, "আগে দেশের কোনও না কোনও অংশে জঙ্গি হামলা হত। আর সেই সময় সরকারের রেসপন্স কী হত? কেবল ডজিয়ার পাঠানো হত। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার এই প্রথা ভেঙেছে। আমরা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোরতম পদক্ষেপ নিয়েছি। উরির সার্জিক্যাল স্ট্রাইক (Surgical Strike) হোক বা পুলওয়ামা হামলার পর বালাকোট এয়ার স্ট্রাইক (Balakot Air Strike)— ভারত বুঝিয়ে দিয়েছে যে তারা আর চুপ করে বসে থাকবে না।"

তিনি আরও যোগ করেন, "আজ ভারত সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে জ্বলন্ত উদাহরণ। ভারতের সামরিক বাহিনী অপারেশন সিন্দুরের সময় পাকিস্তানকে দেখিয়ে দিয়েছে যে ভারত কী করতে পারে। পাকিস্তান যদি কোনও রকম উস্কানিমূলক বা দুঃসাহসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তবে তার জবাব অত্যন্ত কঠোরভাবে দেওয়া হবে। এমন নজিরবিহীন অ্যাকশন নেওয়া হবে, যা তারা কল্পনাও করতে পারবে না।"

প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই বজ্রকঠিন সতর্কবার্তায় স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, ভারত নিজের অখণ্ডতা ও নিরাপত্তা রক্ষায় বিন্দুমাত্র আপস করবে না। কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, রাজনাথ সিংয়ের এই দৃঢ় অবস্থানের পরপরই পাকিস্তানে এক প্রকার চাপ সৃষ্টি হয়। আর সেই চাপের কাছে নতিস্বীকার করেই এবং দেশের কট্টরপন্থীদের শান্ত করতেই খোয়াজা আসিফ পালটা কলকাতার নাম করে এই সস্তা হুমকির রাস্তা বেছে নিয়েছেন।

কেন কলকাতাকেই নিশানা করার কথা বলা হলো?

এর আগে পাকিস্তান বা সে দেশের মদতপুষ্ট জঙ্গি সংগঠনগুলির তরফ থেকে সাধারণত দিল্লি বা মুম্বইয়ের মতো শহরের নাম উল্লেখ করে হামলার হুঁশিয়ারি দেওয়া হত। কিন্তু এবার সরাসরি ভারতের পূর্ব প্রান্তের মহানগরী কলকাতাকে নিশানা করার বিষয়টি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কলকাতা পূর্ব ভারতের সবচেয়ে বড় এবং জনবহুল শহর। এখানকার সাংস্কৃতিক এবং কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। এই ধরনের একটি মেট্রোপলিটন শহরের নাম উল্লেখ করে হুমকি দেওয়ার মূল উদ্দেশ্যই হলো ভারতের সাধারণ মানুষের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক চাপ (Psychological pressure) এবং অহেতুক আতঙ্ক সৃষ্টি করা। এছাড়া, ভারতের বিশাল ভূখণ্ডের পূর্ব প্রান্ত পর্যন্ত যে পাকিস্তানের 'কথিত' নজরদারি রয়েছে, সেই কাল্পনিক আখ্যানটিও নিজেদের দেশের মানুষের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন আসিফ।

পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক সংকট

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, খোয়াজা আসিফের এই মন্তব্যকে শুধুমাত্র ভারত-পাক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের চশমা দিয়ে দেখলে ভুল হবে। এর নেপথ্যে রয়েছে পাকিস্তানের চরম অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক দুরবস্থা।

বর্তমানে পাকিস্তান এক নজিরবিহীন অর্থনৈতিক সংকটের (Economic Crisis) মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। মুদ্রাস্ফীতি আকাশছোঁয়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে, এবং বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার তলানিতে এসে ঠেকেছে। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক স্তরেও চরম ডামাডোল চলছে। সাধারণ মানুষের ক্ষোভ যখন চরমে, তখন সেই ক্ষোভ থেকে মানুষের নজর ঘোরাতে পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতাদের কাছে সবচেয়ে সহজ ও পরীক্ষিত উপায় হলো 'ভারত-বিরোধিতা' বা 'অ্যান্টি-ইন্ডিয়া সেন্টিমেন্ট' জাগিয়ে তোলা।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি সম্পূর্ণভাবে একটি কৌশলগত প্রচেষ্টা। নিজেদের দেশের মানুষের কাছে একটি শক্ত অবস্থান তুলে ধরতে এবং জনমতকে প্রভাবিত করতেই পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রী এই ধরনের চরমপন্থী ভাষার প্রয়োগ করেছেন। এতে বাস্তব কোনও সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা না থাকলেও, আন্তর্জাতিক স্তরে নিজেদের 'ভিকটিম কার্ড' খেলার একটি মরিয়া চেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

ভারতের অবস্থান ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা

পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই চরম উস্কানিমূলক এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্যের পর এখনও পর্যন্ত ভারত সরকারের বা বিদেশ মন্ত্রকের তরফ থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক বা অফিশিয়াল প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। ভারত বরাবরই এই ধরনের ভিত্তিহীন আস্ফালনকে গুরুত্বহীন মনে করে এড়িয়ে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করে।

তবে সাউথ ব্লক মুখে কুলুপ আঁটলেও, ভারতের নিরাপত্তা সংস্থাগুলি এবং গোয়েন্দা দপ্তর গোটা পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে। সূত্র মারফত জানা গিয়েছে, কলকাতাসহ দেশের প্রধান শহরগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং সমস্ত রুটিন নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কারণ পাকিস্তান রাষ্ট্র হিসেবে যাই বলুক না কেন, তাদের মাটি থেকে পরিচালিত স্লিপার সেল বা লস্কর, জইশের মতো জঙ্গি সংগঠনগুলি যাতে এই ধরনের মন্তব্যে উৎসাহিত হয়ে কোনও নাশকতা ঘটাতে না পারে, সেদিকে সর্বদা সতর্ক রয়েছে ভারত।

পরিশেষ

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যেকার সম্পর্ক এমনিতেই অত্যন্ত জটিল এবং সংবেদনশীল। এই পরিস্থিতিতে একটি পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মুখে এমন লাগামহীন এবং উস্কানিমূলক মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও বিষাক্ত করে তোলে। প্রমাণহীন অভিযোগ এবং ফাঁকা হুমকির রাজনীতি করে পাকিস্তান সাময়িকভাবে নিজেদের দেশের মানুষের নজর ঘোরাতে পারলেও, আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা যে ক্রমশ তলানিতে গিয়ে ঠেকছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

ভারত প্রমাণ করে দিয়েছে যে তারা শান্তি চায়, কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনওরকম আপস করতে রাজি নয়। রাজনাথ সিংয়ের বার্তা এবং খোয়াজা আসিফের পালটা হুঙ্কার— এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে উপমহাদেশের ভূ-রাজনীতি আগামী দিনে কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার। তবে কলকাতার মতো শহরকে টার্গেট করার এই ধৃষ্টতা যে ভারতবাসী মোটেই ভালোভাবে নেয়নি, তা সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে দেশের সাধারণ নাগরিকের প্রতিক্রিয়াতেই স্পষ্ট।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Comments

Ad Code