নিজস্ব প্রতিবেদন, কলকাতা: রাজ্যে পালাবদলের পর এবার প্রশাসনের অন্দরে আমূল পরিবর্তনের পথে হাঁটা শুরু করল নতুন সরকার। দীর্ঘদিনের ‘পুনর্নিযুক্তি’ সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে নজিরবিহীন এক প্রশাসনিক সংস্কারের পথে পা বাড়ালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শুক্রবার রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে, যেখানে সাফ জানানো হয়েছে— বিভিন্ন বোর্ড, নিগম, পাবলিক সেক্টর ইউনিট (PSU) এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় মনোনীত সদস্য, ডিরেক্টর এবং চেয়ারপার্সনদের মেয়াদ অবিলম্বে শেষ করতে হবে। এর পাশাপাশি, ৬০ বছরের বেশি বয়সী যে সমস্ত আধিকারিক ও কর্মীরা অবসরের পর চুক্তিতে বা পুনর্নিযুক্ত হয়ে কাজ করছিলেন, তাঁদেরও দ্রুত সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক মহলের মতে, এটি কেবল একটি সাধারণ বদলি নয়, বরং রাজ্যের বেকার যুবক-যুবতীদের জন্য সরকারি চাকরির নতুন দরজা খুলে দেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত কৌশল।
স্বরাষ্ট্র দপ্তরের কড়া নির্দেশিকা: কী আছে তাতে?
এদিন নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, স্বরাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকে রাজ্যের সমস্ত দপ্তরের প্রধান সচিব, সচিব এবং বিভাগীয় প্রধানদের কাছে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। সেই চিঠিতে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, বিগত সরকারের সময় বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও বোর্ডে রাজনৈতিকভাবে মনোনীত সদস্যদের কাজ আর দীর্ঘায়িত করা হবে না। নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, “অবিলম্বে এই সমস্ত মনোনীত ব্যক্তিদের মেয়াদ সমাপ্ত করতে হবে এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ফেরাতে নতুন রূপরেখা তৈরি করতে হবে।”
সবচেয়ে বড় কোপ পড়েছে সেই সমস্ত আধিকারিকদের ওপর, যাঁরা ৬০ বছর বয়সে অবসর নেওয়ার পরেও প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে বছরের পর বছর গুরুত্বপূর্ণ পদে বসেছিলেন। স্বরাষ্ট্র দপ্তরের নির্দেশ অনুযায়ী, প্রতিটি দপ্তরকে চিহ্নিত করতে হবে এমন কতজন ‘পুনর্নিযুক্ত’ কর্মী রয়েছেন এবং তাঁদের ইস্তফা নিশ্চিত করতে হবে। প্রশাসনিক সংস্কারের এই কড়া পদক্ষেপের ফলে কয়েকশো প্রভাবশালী চেয়ারপার্সন ও ডিরেক্টরের পদ এক লহমায় শূন্য হতে চলেছে।
বিপুল অর্থ সাশ্রয় এবং অপচয় রোধ
মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরেই শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছিলেন, রাজ্যের কোষাগারের ওপর বাড়তি চাপ কমাতে তিনি বদ্ধপরিকর। প্রশাসনিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ‘পুনর্নিযুক্ত’ আধিকারিকদের পিছনে প্রতি মাসে রাজ্য সরকারের কয়েক কোটি টাকা ব্যয় হতো।
বিলাসবহুল জীবনযাপন: এই আধিকারিকদের কেবল বেতনই নয়, তাঁদের জন্য বরাদ্দ ছিল সরকারি গাড়ি, আবাসন, নিরাপত্তারক্ষী এবং আনুষঙ্গিক খরচ।
অব্যবহৃত মেধা: অবসরের পর নতুন রক্তকে জায়গা না দিয়ে পুরনোদের বসিয়ে রাখায় প্রশাসনের গতি শ্লথ হয়ে পড়ছিল বলে অভিযোগ ছিল দীর্ঘদিনের।
প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের ফলে রাজ্য সরকারের তহবিলে এক বিশাল অংকের টাকা সাশ্রয় হবে, যা সরাসরি উন্নয়নমূলক কাজে বা নতুন নিয়োগের প্রক্রিয়ায় ব্যয় করা সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
কীভাবে তৈরি হবে হাজার হাজার নতুন সরকারি চাকরি?
মুখ্যমন্ত্রীর এই সাহসী পদক্ষেপ কেবল প্রশাসনিক জট খোলার জন্য নয়, এর নেপথ্যে রয়েছে রাজ্যের কয়েক লক্ষ শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতীর কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো কীভাবে এই রদবদল নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি করবে:
১. উচ্চপদে শূন্যপদ তৈরি এবং প্রমোশন চেন (Promotion Chain):
যখন একজন ৬০ বছরের বেশি বয়সী ‘এক্সটেনশন’ পাওয়া বড় আধিকারিক পদত্যাগ করবেন, তখন সেই শীর্ষ পদটি খালি হবে। এর ফলে নিচের পদে থাকা যোগ্য আধিকারিকরা পদোন্নতি পাবেন। এই ‘চেইন রিঅ্যাকশন’ বা শিকল প্রতিক্রিয়ার ফলে একদম নিচের স্তরের অর্থাৎ এন্ট্রি-লেভেল (WBCS, WBPS বা ক্লার্কশিপ) পদগুলি শূন্য হবে, যা সরাসরি নতুন নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব হবে।
২. ডব্লিউবিসিএস ও অন্যান্য ক্যাডার সার্ভিসে গতির সঞ্চার:
এতদিন অনেক গুরুত্বপূর্ণ বোর্ডে ক্যাডার অফিসারদের বদলে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা অবসরপ্রাপ্ত আইএএস-দের বসিয়ে রাখা হতো। এখন সেই পদগুলিতে পেশাদার ও নিয়মিত সরকারি আধিকারিকদের নিয়োগ করা হবে। এর ফলে পাবলিক সার্ভিস কমিশন (PSC)-এর মাধ্যমে নিয়মিত নিয়োগের প্রক্রিয়া আরও জোরদার হবে।
৩. রাজনৈতিক মনোনয়নের বদলে সরাসরি নিয়োগ:
বিভিন্ন বোর্ড ও কর্পোরেশনের বিশেষ কাজে এতদিন ‘অ্যাড-হক’ বা চুক্তিভিত্তিক কর্মী নেওয়া হতো প্রভাব খাটিয়ে। নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, স্বচ্ছতা ফেরাতে এই পদগুলিতে পিএসসি বা নির্দিষ্ট নিয়োগ বোর্ডের মাধ্যমে স্থায়ী কর্মী নেওয়ার পথ প্রশস্ত হচ্ছে।
৪. নিয়োগের উর্ধ্বসীমা শিথিল ও পদের সৃষ্টি:
রাজ্য ক্যাবিনেট ইতিমধ্যেই সরকারি চাকরির বয়সের উর্ধ্বসীমা ৫ বছর বাড়িয়েছে। এখন এই ‘ক্লিন আপ’ ড্রাইভের ফলে যে শূন্যপদগুলি তৈরি হবে, সেখানে এই নতুন বয়সের নিয়মে কয়েক লক্ষ প্রার্থী আবেদন করার সুযোগ পাবেন। অর্থাৎ, কয়েক বছর ধরে নিয়োগ না হওয়ায় যে ‘ব্যাকলগ’ তৈরি হয়েছিল, তা এবার কাটতে শুরু করবে।
নতুন কর্মসংস্থানের এক নজরে পরিসংখ্যান (সম্ভাব্য)
| ক্ষেত্র | বর্তমান অবস্থা | নতুন প্রশাসনিক সংস্কারের প্রভাব |
| বিভাগীয় শীর্ষ পদ | পুনর্নিযুক্ত ও রাজনৈতিকভাবে মনোনীত আধিকারিকদের দখলে। | সরাসরি শূন্যপদ তৈরি হবে এবং দ্রুত স্থায়ী নিয়োগ হবে। |
| বোর্ড ও নিগম (PSU) | কয়েকশো চেয়ারপার্সন ও ডিরেক্টর পদের মেয়াদ শেষ। | পেশাদার তরুণ প্রজন্মের জন্য নতুন পদের সৃষ্টি। |
| নিচের তলার কর্মী | বছরের পর বছর নিয়োগ থমকে ছিল। | উচ্চপদে প্রমোশনের ফলে কয়েক হাজার এন্ট্রি-লেভেল পদ তৈরি। |
| প্রশাসনিক স্বচ্ছতা | ‘লবি কালচার’ ও স্বজনপোষণ। | যোগ্যতার ভিত্তিতে স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার শুরু। |
প্রশাসনিক সংস্কার এবং নতুন বাংলার রূপরেখা
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছে রাজ্যের ছাত্র ও যুব সংগঠনগুলি। তাঁদের মতে, বিগত জমানায় ‘রি-এমপ্লয়মেন্ট’ এক প্রকার প্রথায় পরিণত হয়েছিল, যার ফলে যোগ্য প্রার্থীরা দিনের পর দিন অপেক্ষা করেও চাকরির দেখা পাচ্ছিলেন না। স্বরাষ্ট্র দপ্তরের এই কড়া অবস্থান প্রমাণ করে যে, নতুন সরকার ‘পারফরম্যান্স’ এবং ‘স্বচ্ছতা’কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রী আজ সচিবদের সঙ্গে বৈঠকে স্পষ্ট করে দিয়েছেন, “প্রশাসনকে গতিশীল করতে হবে। জং ধরা পুরনো যন্ত্র দিয়ে নতুন বাংলা গড়া সম্ভব নয়।” তিনি সাফ জানিয়েছেন, যারা যোগ্য এবং তরুণ, তাঁদের হাতেই থাকতে হবে প্রশাসনের গুরুদায়িত্ব। এই নির্দেশের ফলে প্রশাসনের অন্দরে এক প্রকার শুদ্ধিকরণ শুরু হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কয়েকশো আধিকারিকের পদত্যাগ কেবল শুরু মাত্র। আগামী কয়েক মাসে রাজ্যের প্রতিটি ব্লকে এবং মহকুমায় এই ‘এডমিনিস্ট্রেটিভ রিফর্ম’ বা প্রশাসনিক সংস্কারের ঢেউ আছড়ে পড়বে। এর ফলে একদিকে যেমন সরকারি কাজে লাল ফিতের ফাঁস আলগা হবে, তেমনই অন্যদিকে সরকারি চাকরির পরীক্ষায় সফল হওয়া প্রার্থীদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হবে।
সব মিলিয়ে, নয়া জমানার এই মাস্টারস্ট্রোক একদিকে যেমন কোষাগারের অপচয় রোধ করবে, তেমনই বাংলার বেকার সমস্যার সমাধানে এক শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠবে। এখন দেখার, স্বরাষ্ট্র দপ্তরের এই নির্দেশিকা প্রতিটি বিভাগ কত দ্রুত কার্যকর করে এবং নতুন নিয়োগের বিজ্ঞপ্তিগুলি কবে থেকে প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। তবে বাংলার যুবসমাজ যে এক নতুন ভোরের প্রত্যাশায় বুক বাঁধছে, তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই।
0 মন্তব্যসমূহ