Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

Recent in Home

এবার জালে রাঘব বোয়াল !!! পুরোদুর্নীতি মামলায় গ্রেফতার সুজিত বসু


নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা: শেষ পর্যন্ত আর শেষ রক্ষা হল না। নিয়োগ দুর্নীতির কালো মেঘ এবার ঘনিয়ে এল রাজ্যের প্রথম সারির প্রভাবশালী রাজনীতিকের মাথার ওপরে। শুক্রবার রাতে সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সে দীর্ঘ সাড়ে ১০ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস জিজ্ঞাসাবাদের পর এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)-র হাতে গ্রেফতার হলেন সুজিত বসু। পুর-নিয়োগ দুর্নীতি মামলার তদন্তে অসহযোগিতা এবং বয়ানে একাধিক অসংগতির অভিযোগে তাঁকে হেফাজতে নিল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। বিধাননগর তথা দক্ষিণ দমদম এলাকার বেতাজ বাদশা হিসেবে পরিচিত এই দাপুটে নেতার গ্রেফতারি রাজ্য রাজনীতিতে এক বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

ইডি সূত্রের খবর, এদিন সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ সিজিও কমপ্লেক্সে হাজিরা দিয়েছিলেন তিনি। দফায় দফায় জেরার পর রাত ন’টা নাগাদ তাঁকে গ্রেফতারির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অভিযোগের গুরুত্ব এবং গত কয়েক বছরের তদন্তে উঠে আসা নথিপত্র সামনে রেখে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা দাবি করছেন, এই দুর্নীতির জাল বহুদূর বিস্তৃত।

তদন্তে অসহযোগিতা ও বয়ানে অসংগতি

এদিন জিজ্ঞাসাবাদের শুরু থেকেই সুজিত বসু তদন্তকারী আধিকারিকদের প্রশ্নের মুখে পড়েন। ইডি সূত্রের দাবি, দক্ষিণ দমদম পুরসভায় থাকাকালীন নিয়োগ সংক্রান্ত একাধিক নথিতে তাঁর প্রভাবের প্রমাণ মিলেছে। গোয়েন্দারা জানতে চেয়েছিলেন, কিসের ভিত্তিতে এবং কার নির্দেশে অন্তত ১৫০ জনের চাকরি হয়েছিল? কিন্তু সুজিতবাবু প্রতিটি ক্ষেত্রেই ‘মনে নেই’ অথবা ‘জানি না’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

গোয়েন্দা সূত্রের খবর, তাঁর দেওয়া বয়ানের সঙ্গে এর আগে বাজেয়াপ্ত হওয়া নথিপত্রের কোনও মিল পাওয়া যায়নি। এমনকি, নিয়োগ দুর্নীতির অন্যতম অভিযুক্ত অয়ন শীল এবং অন্যান্য মিডলম্যানদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের যে সূত্র পাওয়া গিয়েছিল, সেই প্রসঙ্গেও তিনি কোনও সদুত্তর দিতে পারেননি। দীর্ঘ ১০ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে জিজ্ঞাসাবাদের পর ইডি আধিকারিকরা নিশ্চিত হন যে, তাঁকে হেফাজতে নিয়ে জেরা করা ছাড়া তদন্তের অগ্রগতি সম্ভব নয়।

চাকরির বদলে জমি: এক চাঞ্চল্যকর মোড়

পুর-নিয়োগ দুর্নীতির এই মামলায় এবার ‘ল্যান্ড ফর জব’ বা ‘চাকরির বদলে জমি’— এই নয়া তত্ত্ব সামনে এনেছে ইডি। সাধারণত নিয়োগ দুর্নিতে টাকার লেনদেনের কথা শোনা যায়, কিন্তু সুজিত বসুর ক্ষেত্রে অভিযোগটি আরও গুরুতর। গোয়েন্দারা দাবি করছেন, দক্ষিণ দমদম পুরসভায় থাকাকালীন অন্তত ১৫০ জনের নিয়োগের নেপথ্যে ছিলেন সুজিত বসু।

অভিযোগের তালিকায় সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্যটি হল লেকটাউন এলাকার একটি জমি। ইডি-র দাবি অনুযায়ী, ওই এলাকায় এক প্রার্থীর পরিবারের থেকে একটি দামী জমি হাতিয়ে নেওয়া হয়েছিল। সেই জমির বিনিময়ে ওই পরিবারের দুই থেকে তিনজনকে পুরসভায় চাকরি পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল এবং কাজও হয়েছিল। শুধু তাই নয়, ওই জমিতে যে ফ্ল্যাট তৈরি করা হয়েছে, তাতে সুজিত বসুর পরিবারের একাধিক সদস্যের নামে ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রি করার তথ্যও গোয়েন্দারা পেয়েছেন বলে দাবি। মজার বিষয় হল, ওই জমি কেনাবেচার জন্য কোনও অর্থের লেনদেন হয়নি। অর্থাৎ, চাকরির ‘মূল্য’ হিসেবে জমিটিকেই ব্যবহার করা হয়েছিল।

দক্ষিণ দমদম পুরসভা: দুর্নীতির আঁতুড়ঘর?

সুজিত বসু যখন দক্ষিণ দমদম পুরসভার ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন, তখন থেকেই এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতার অভিযোগ উঠছিল। গোয়েন্দাদের দাবি, তিনি যখন বিধায়ক এবং পরবর্তীকালে প্রভাবশালী পদে আসীন হন, তখনও তাঁর সুপারিশে (Recommendation) অসংখ্য নিয়োগ হয়েছে। ইডি-র হাতে আসা একটি তালিকা অনুযায়ী, এই ১৫০ জনের চাকরি হয়েছে স্রেফ সুজিত বসুর সরাসরি হস্তক্ষেপের কারণে।

নিচে দেওয়া হল সুজিত বসুর বিরুদ্ধে ইডি-র প্রাথমিক অভিযোগের একটি খণ্ডচিত্র:

অভিযোগের বিষয়বিস্তারিত বিবরণ
মোট নিয়োগের সুপারিশদক্ষিণ দমদম পুরসভায় অন্তত ১৫০ জন প্রার্থীর অবৈধ নিয়োগ।
বিনিময় মাধ্যমনগদ টাকা এবং জমি বা স্থাবর সম্পত্তি।
সুনির্দিষ্ট উদাহরণলেকটাউনে জমির বিনিময়ে এক পরিবারের ৩ জনকে চাকরি।
অসহযোগিতা১০.৫ ঘণ্টার জেরায় প্রায় ৯০% প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়া।
পরিবারের ভূমিকাসম্পত্তি ক্রয়ের নথিতে পরিবারের সদস্যদের নামের ব্যবহার।

এর আগের তল্লাশি এবং পরিবারের ওপর চাপ

সুজিত বসুর গ্রেফতারি হঠাত করে হয়নি। এর আগে একাধিকবার কেন্দ্রীয় সংস্থা তাঁর বাড়িতে হানা দিয়েছিল। তাঁর লেকটাউনের বাড়ি ছাড়াও তাঁর মালিকানাধীন রেস্তোরাঁ এবং হোটেলেও তল্লাশি চালিয়েছিলেন গোয়েন্দারা। সেই সময় বেশ কিছু ডিজিটাল তথ্য এবং নথিপত্র বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। এমনকি তাঁর ছেলে সমুদ্র বসু এবং মেয়েকেও দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করেছে ইডি।

পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা বিপুল সম্পত্তির উৎস কী এবং সেই সম্পত্তির সঙ্গে পুর-নিয়োগের কোনও যোগসূত্র আছে কি না, তা নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরেই তদন্ত চলছিল। ইডি সূত্রের দাবি, সুজিত বসুর জীবনযাপন এবং আয়ের উৎসের মধ্যে বিশাল ফারাক রয়েছে, যা নিয়োগ দুর্নীতির টাকাতেই মেটানো হয়েছে বলে তাঁদের প্রাথমিক অনুমান।

আইনি লড়াই ও আগামী পদক্ষেপ

শুক্রবার রাতে সিজিও কমপ্লেক্সের সাততলায় যখন গ্রেফতারির আইনি প্রক্রিয়া চলছিল, তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন সুজিত বসুর ছেলে সমুদ্র বসু এবং তাঁদের আইনজীবীরা। আইনজীবীদের দাবি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সুজিত বসু নির্দোষ এবং তিনি তদন্তে সহযোগিতা করেছেন বলেই তাঁদের দাবি।

আগামীকাল অর্থাৎ শনিবার সকালে সুজিত বসুকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হবে। এরপর তাঁকে আদালতে পেশ করা হবে। আদালত তাঁকে কত দিনের ইডি হেফাজতে পাঠায়, এখন সেটাই দেখার। গোয়েন্দাদের পরিকল্পনা হল, তাঁকে হেফাজতে নিয়ে এই নিয়োগ দুর্নীতির অন্যান্য পান্ডাদের সঙ্গে মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করা।

রাজনৈতিক উত্তাপ তুঙ্গে

সুজিত বসুর গ্রেফতারির খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাজ্য রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়েছে। বিরোধী শিবিরের নেতাদের দাবি, এই তো কেবল শুরু। দক্ষিণ দমদম থেকে শুরু করে রাজ্যের একাধিক পুরসভায় যে বিশাল লুঠের কারবার চলেছে, তাতে আরও অনেক বড় মাথা জড়িত। অন্যদিকে, শাসকদলের পক্ষ থেকে এই গ্রেফতারিকে কেন্দ্রীয় এজেন্সির অপব্যবহার হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

তবে সাধারণ মানুষের নজর এখন সিজিও কমপ্লেক্সের সাততলায়। যে মানুষটি এতদিন ক্ষমতার শীর্ষে ছিলেন, তাঁর এই পতন কি নিয়োগ দুর্নীতির জট খুলতে সাহায্য করবে? ইডি দাবি করছে, সুজিত বসুকে জেরা করলেই উঠে আসবে আরও অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য। বিশেষ করে টাকার বদলে চাকরি নয়, ‘জমির বদলে চাকরি’— এই নয়া মোড় তদন্তকে কোন দিকে নিয়ে যায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

উপসংহার

সুজিত বসুর গ্রেফতারি নিছক একটি ব্যক্তির গ্রেফতারি নয়, এটি রাজ্যের পুর-নিয়োগ ব্যবস্থার অস্বচ্ছতার এক বিরাট প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ১৫০ জনের চাকরির সুপারিশ, লেকটাউনের বিতর্কিত ফ্ল্যাট এবং ১০ ঘণ্টার ম্যারাথন জেরা— সব মিলিয়ে এক টানটান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে রাতারাতি পরিস্থিতি বদলে গেল। এখন দেখার, আদালতের দরজায় দাঁড়িয়ে সুজিত বসুর আইনজীবীরা কী যুক্তি দেন এবং ইডি এই ‘ল্যান্ড ফর জব’ স্ক্যামের আরও কত গভীরে পৌঁছাতে পারে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Comments

Ad Code