Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

Recent in Home

প্রথম বলেই ছক্কা !!! প্রথম মন্ত্রীসভার বৈঠকে একগুচ্ছ ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে সিলমোহর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর

 


নিজস্ব প্রতিবেদন, কলকাতা: নবান্নের অলিন্দে এখন নতুনত্বের ছোঁয়া। দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপড়েন আর পরিবর্তনের পালাবদল শেষে শুক্রবার অনুষ্ঠিত হল নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক। আর প্রথম দিনেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বুঝিয়ে দিলেন, তাঁর সরকার কেবল গদি দখলের নয়, বরং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং কেন্দ্রীয় ও রাজ্য প্রকল্পের মেলবন্ধনের মাধ্যমে এক ‘নতুন বাংলা’ গড়ার লক্ষ্যে অবিচল। ক্যাবিনেট বৈঠকের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী যে একগুচ্ছ ঘোষণা করেছেন, তা এক কথায় নজিরবিহীন। সীমান্তের নিরাপত্তা থেকে শুরু করে শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতীদের জন্য চাকরির বয়সে ছাড়— প্রতিটি সিদ্ধান্তেই ছিল সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার ছাপ।

পুরনো প্রকল্প বন্ধ নয়, লক্ষ্য স্বচ্ছতা

মুখ্যমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, রাজ্যে চালু থাকা কোনও সামাজিক কল্যাণকর প্রকল্পই বন্ধ করা হচ্ছে না। রাজনৈতিক মহলে জল্পনা ছিল, সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে হয়তো পুরনো জমানার জনপ্রিয় প্রকল্পগুলি থমকে যাবে। কিন্তু শুভেন্দু অধিকারী সেই আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে বলেন, “কোন চালু থাকা সামাজিক প্রকল্প বন্ধ হচ্ছে না। সেটা ৩০ বছর আগের হতে পারে বা ১০ বছর আগের। আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, আর আজ তা ক্যাবিনেটে মঞ্জুর করলাম।” তবে এই প্রকল্পগুলি চালানোর ক্ষেত্রে ‘স্বচ্ছতা’ বা ‘ট্রান্সপারেন্সি’ হবে মূল ভিত্তি।

মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, এখন থেকে সমস্ত সামাজিক প্রকল্পের সুবিধা পৌঁছে দেওয়া হবে সরাসরি উপভোক্তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে (DBT)। নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের ধাঁচেই রাজ্যে এবার ‘পেপারলেস অফিস’ এবং পোর্টালে স্বচ্ছতার ওপর জোর দেওয়া হবে। মুখ্যমন্ত্রী কড়া ভাষায় সতর্ক করে দেন যে, কোনও মৃত ব্যক্তি বা কোনও ‘অভারতীয়’ যাতে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা না পায়, তা নিশ্চিত করা হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ভুয়ো উপভোক্তা ছেঁটে ফেলে প্রকৃত অভাবী মানুষের কাছে সরকারি পরিষেবা পৌঁছে দেওয়াই নতুন সরকারের প্রাথমিক লক্ষ্য।

চাকরিপ্রার্থীদের জন্য বড় উপহার: ৫ বছরের বয়সে ছাড়

রাজ্যের লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতীর জন্য সম্ভবত সবচেয়ে বড় সুখবরটি নিয়ে এসেছেন মুখ্যমন্ত্রী। সরকারি চাকরির আবেদনের ক্ষেত্রে উর্ধসীমা সরাসরি ৫ বছর বাড়িয়ে দিল রাজ্য ক্যাবিনেট। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিকে মর্যাদা দিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শুভেন্দু জানান, ২০১৫ সালের পর থেকে রাজ্যে বড় মাপের কোনও নিয়োগ না হওয়ায় অনেক যোগ্য প্রার্থীর চাকরির বয়স পেরিয়ে গিয়েছে। তাঁদের কথা মাথায় রেখেই ক্যাবিনেটের এই ‘বয়স বৃদ্ধি’র সিদ্ধান্ত। এটি যে রাজ্যের ছাত্র-যুব সমাজের কাছে এক বিশাল বড় পাওনা, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

সীমান্ত সুরক্ষায় অগ্রাধিকার: বিএসএফকে জমি হস্তান্তর

রাজ্যের জাতীয় সুরক্ষা এবং অনুপ্রবেশ রুখতে এক চূড়ান্ত কড়া অবস্থান নিয়েছে নতুন সরকার। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে সীমান্তে কাঁটাতার দেওয়ার জন্য বিএসএফ যে জমির দাবি জানিয়ে আসছিল, তা পূর্ববর্তী সরকারের আমলে লাল ফিতের ফাসাঁয় আটকে ছিল। মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় সমস্ত জমি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনে থাকা বিএসএফকে হস্তান্তর করা হবে। মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, আগের সরকার ‘অভারতীয় অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ এবং নিজেদের ‘ভোট ব্যাংক’ বাঁচাতে ভূমি দপ্তরকে কাজ করতে দেয়নি। আজ থেকেই সেই প্রক্রিয়ায় গতি আনা হয়েছে এবং ভূমি ও রাজস্ব সচিবকে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

চালু একাধিক বন্ধ থাকা কেন্দ্রীয় প্রকল্প 

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আজ স্পষ্ট করেছেন যে, রাজ্য এবার থেকে আর কেন্দ্রীয় প্রকল্পের বিরোধিতা করবে না। বরং রাজ্যের মানুষ যাতে কেন্দ্রের সমস্ত জনমুখী প্রকল্পের সুবিধা পান, তার জন্য আজ থেকেই  কাজ শুরু হচ্ছে। 

  • আয়ুষ্মান ভারত (Ayushman Bharat - PMJAY):

    এতদিন পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এই বিশ্ববিখ্যাত স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্প থেকে বঞ্চিত ছিলেন। আজ থেকেই পশ্চিমবঙ্গ এই প্রকল্পে যুক্ত হলো। এর মাধ্যমে রাজ্যের প্রতিটি পরিবার বছরে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনামূল্যে চিকিৎসার সুবিধা পাবেন। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের সঙ্গে এ বিষয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় চুক্তি সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

  • পিএম শ্রী স্কুল (PM-SHRI Schools):

    প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর স্বপ্নের এই শিক্ষা প্রকল্পের অধীনে রাজ্যের স্কুলগুলিকে আধুনিকীকরণ করা হবে। উন্নত ল্যাবরেটরি, স্মার্ট ক্লাস এবং আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতির মাধ্যমে রাজ্যের সরকারি স্কুলগুলির চেহারা বদলে যাবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় এক আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু হচ্ছে।

  • প্রধানমন্ত্রী বিশ্বকর্মা যোজনা (PM Vishwakarma):

    রাজ্যের হস্তশিল্পী, কামার, কুমার, সূত্রধর এবং অন্যান্য ১৮টি পেশার সঙ্গে যুক্ত কারিগরদের জন্য এই প্রকল্প আশীর্বাদ হতে চলেছে। এর অধীনে কারিগররা স্বল্প সুদে ঋণ, উন্নত সরঞ্জাম এবং বিশেষ প্রশিক্ষণ পাবেন। গ্রামীণ বাংলার অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে এই প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

  • প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনা (PM Fasal Bima Yojana):

    রাজ্যের কৃষকদের প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে বাঁচাতে চালু হচ্ছে এই পূর্ণাঙ্গ শস্য বিমা। আগে রাজ্যের নিজস্ব যে বিমা ছিল, তার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে এবার কেন্দ্রীয় গাইডলাইন মেনে কৃষকরা তাঁদের ফসলের ন্যায্য সুরক্ষা পাবেন। অতি দ্রুত এই ইন্স্যুরেন্স প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কৃষি দপ্তরকে।

  • বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও (Beti Bachao Beti Padhao):

    কন্যা ভ্রুণ হত্যা রোধ এবং কন্যাসন্তানদের শিক্ষা নিশ্চিত করতে এই জাতীয় স্তরের সামাজিক সচেতনতামূলক প্রচার এবং সুবিধাগুলি এবার গ্রামগঞ্জেও জোরদার করা হবে। রাজ্যের বর্তমান কন্যাশ্রী প্রকল্পের পাশাপাশি এটি নারী ক্ষমতায়নে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে।

  • প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনা ৩.০ (PM Ujjwala 3.0):

    রাজ্যের প্রতিটি প্রান্তের গরিব পরিবারগুলিতে ধোঁয়ামুক্ত রান্নাঘর নিশ্চিত করতে এই প্রকল্পের তৃতীয় পর্যায় কার্যকর করা হবে। বিশেষ করে যে সমস্ত পরিবার এখনও এলপিজি কানেকশন পাননি, তাঁদের কাছে বিনামূল্যে গ্যাস সিলিন্ডার এবং ওভেন পৌঁছে দেওয়াই হবে এই প্রকল্পের লক্ষ্য।

প্রশাসনিক সংস্কার এবং আগামীর পথ

মুখ্যমন্ত্রী আরও জানিয়েছেন যে, রাজ্যে এবার থেকে সিআরপিসি-র বদলে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS) কার্যকর করা হবে। এছাড়া দীর্ঘ ১১ মাস ধরে থমকে থাকা জনগণনার কাজও আজ থেকেই শুরু করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। ক্যাবিনেটের আরেকটি উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত হলো, রাজ্যের আইএএস এবং আইপিএস অফিসাররা এবার থেকে নিয়মিত কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে প্রশিক্ষণের সুযোগ পাবেন, যা প্রশাসনিক দক্ষতার মানোন্নয়নে সাহায্য করবে।

সামগ্রিকভাবে, প্রথম ক্যাবিনেট বৈঠকেই শুভেন্দু অধিকারী বুঝিয়ে দিলেন তাঁর সরকার ‘স্পিড’ এবং ‘স্বচ্ছতা’—এই দুই মন্ত্রেই চলবে। আগামী সোমবার ফের ক্যাবিনেট বৈঠকের ডাক দেওয়া হয়েছে, যেখানে আরও কিছু জনমুখী ঘোষণা আসতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে। সীমান্তের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা এবং রাজ্যবাসীকে কেন্দ্রীয় পরিষেবার অংশীদার করে তোলার যে নতুন দিগন্ত আজ উন্মোচিত হলো, তার সুফল পেতে মানুষ এখন প্রহর গুনছে।

বিজেপির ‘সংকল্পপত্র’-এর প্রতিটি প্রতিশ্রুতি একে একে পালিত হচ্ছে দেখে রাজনৈতিক মহলের মত— পশ্চিমবঙ্গ এখন উন্নয়নের এক নতুন এবং প্রতিযোগিতামূলক ধারায় প্রবেশ করতে চলেছে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Comments

Ad Code