নিজস্ব প্রতিবেদন, কলকাতা ও দিল্লি: দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। জল্পনা ও জ্যামিতিক সমীকরণের সমস্ত চোরাবালি পেরিয়ে অবশেষে বাংলার পরবর্তী প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে সিলমোহর পড়ল শুভেন্দু অধিকারীর নামে। শুক্রবার বিকেলেই বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হতে চলেছেন নন্দীগ্রামের ‘জায়ান্ট কিলার’ শুভেন্দু অধিকারী। কাল, শনিবার সকাল ১১টায় ঐতিহাসিক বিগ্রেড প্যারেড গ্রাউন্ডে হবে তাঁর রাজকীয় শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান। যেখানে উপস্থিত থাকবেন খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই জয় কেবল নির্বাচনী জয় নয়, এটি ভারতীয় জনতা পার্টির কাছে এক আবেগঘন এবং আদর্শগত জয়। যে মাটির সন্তান শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এই দলটিকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেই মাটিতেই অবশেষে নিজেদের সরকার গড়তে সফল হল গেরুয়া শিবির।
প্রত্যাশিতই ছিল শুভেন্দুর নাম
শুভেন্দু অধিকারীর নাম ঘোষণা হওয়াটা ছিল কার্যত সময়ের অপেক্ষা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬-এর ফলাফল বের হওয়ার অনেক আগে থেকেই যখন বাংলায় পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছিল, তখন থেকেই সম্ভাব্য মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দুর নামই সবচেয়ে জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছিল। যদিও দলের অন্দরে আরও বেশ কিছু নাম নিয়ে আলোচনা চলেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পাল্লা ভারী ছিল তাঁরই।
এর পিছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে আসছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের প্রতি তাঁর প্রশ্নাতীত আনুগত্য এবং বাংলার প্রতিটি জেলায় তাঁর ‘আন্দোলনের মুখ’ হিসেবে পরিচিতি। ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে আসা এই নেতার জনমানসে এক আলাদা প্রভাব রয়েছে। বিরোধী দলনেতা হিসেবে গত পাঁচ বছরে তিনি যেভাবে বিধানসভার ভেতরে ও বাইরে শাসকদলকে কোণঠাসা করেছিলেন, তাতে দলের অন্দরে তিনি নিজেকে কার্যত ‘অঘোষিত সেনাপতি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছিলেন। ফলে আজকের এই ঘোষণা তাঁর দীর্ঘ লড়াইয়ের এক স্বাভাবিক পরিণতি বলেই মনে করা হচ্ছে।
শ্যামাপ্রসাদের মাটিতে ‘শ্রদ্ধার্ঘ্য’
বিজেপির কাছে পশ্চিমবঙ্গের এই জয় এক স্বতন্ত্র গুরুত্ব বহন করে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দল জয়লাভ করলেও, নিজেদের প্রতিষ্ঠাতার জন্মভিটেতে কেন তারা এতদিন ব্রাত্য— এই প্রশ্ন বিজেপি নেতৃত্বের মনে কাঁটার মতো বিঁধত। বারবার বাংলায় জয়ের দোরগোড়ায় এসেও থমকে যেতে হয়েছে তাদের। এবারের লড়াইয়ে তাই শুরু থেকেই বিজেপির তুরুপের তাস ছিল ‘শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মাটিতে তাঁরই ভাবাদর্শের সরকার’।
দলীয় সূত্রের খবর, শুভেন্দু অধিকারীর এই জয়কে বিজেপি নেতৃত্ব ডক্টর মুখোপাধ্যায়ের প্রতি শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসেবে দেখছে। এটি কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং একটি ‘মানসিক জয়’। যে রাজ্য থেকে জনসঙ্ঘের যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেই রাজ্যে সরকার গঠন করাকে বিজেপির রাজনীতির ‘পূর্ণ বৃত্ত’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই সাফল্যকে নজিরবিহীনভাবে উদযাপন করতে কালকের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে এক অভাবনীয় সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে।
শপথ গ্রহণে ২০ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী: মেগা ইভেন্ট ব্রিগেডে
আগামীকালকের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানটি হবে সম্ভবত বাংলার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক অনুষ্ঠান। ব্রিগেডের ময়দানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পাশাপাশি হাজির থাকবেন বিজেপি শাসিত ২০টি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা। যেখানে উত্তরপ্রদেশের যোগী আদিত্যনাথ থেকে শুরু করে অসমের হিমন্ত বিশ্বশর্মা— হেভিওয়েট সব নামই রয়েছে তালিকায়। জোট সঙ্গী বা সরাসরি বিজেপি ক্ষমতায় থাকা এমন প্রায় সমস্ত রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানদের কালকের ব্রিগেডে উপস্থিত থাকার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
দিল্লি সূত্রের খবর, এই বিরাট সমাবেশের উদ্দেশ্য হল গোটা দেশকে বার্তা দেওয়া যে, পূর্ব ভারতের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার এখন বিজেপির দখলে। শনিবার সকাল থেকেই কলকাতায় এক নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নিজে উপস্থিত থেকে শুভেন্দুর শপথ গ্রহণ প্রত্যক্ষ করবেন, যা এই গোটা প্রক্রিয়ায় এক আলাদা রাজনৈতিক মর্যাদা যোগ করছে।
ছাত্রনেতা থেকে ‘শ্যাডো চিফ মিনিস্টার’—এক দীর্ঘ সফর
শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক উত্থান কোনো রূপকথা নয়, বরং ধাপে ধাপে নিজের জমি শক্ত করার এক দীর্ঘ লড়াই। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির ময়দানে হাত পাকিয়েছেন তিনি। বিধায়ক, সাংসদ হওয়ার পাশাপাশি রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ একাধিক মন্ত্রী পদও তিনি সামলেছেন। কিন্তু ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে তাঁর তৃণমূল ত্যাগ এবং বিজেপিতে যোগদান ছিল বাংলার রাজনীতির টার্নিং পয়েন্ট।
২০২১-এর নির্বাচনে নন্দীগ্রামে সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করে তিনি গোটা ভারতের নজর কেড়েছিলেন। এরপর বিধানসভায় প্রধান বিরোধী দলনেতা হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁকে বলা হত ‘শ্যাডো চিফ মিনিস্টার’ বা ছায়া মুখ্যমন্ত্রী। গণতান্ত্রিক কাঠামোয় বিরোধী দলনেতার পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখান থেকেই আজ তিনি হতে চলেছেন রাজ্যের প্রকৃত মুখ্যমন্ত্রী। অর্থাৎ ‘শ্যাডো’ থেকে সরাসরি সূর্যের আলোয় এসে প্রশাসনের হাল ধরতে চলেছেন তিনি।
এক নজরে শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক প্রোফাইল
| পর্যায় | বিবরণ |
| প্রারম্ভিক জীবন | ছাত্র পরিষদের মাধ্যমে রাজনীতির আঙিনায় প্রবেশ। |
| আইনসভা সফর | একাধিকবার বিধায়ক এবং তমলুকের লোকসভা কেন্দ্রে সাংসদ নির্বাচিত। |
| বিজেপিতে যোগদান | ডিসেম্বর ২০২০, মেদিনীপুরের সভা থেকে পদ্ম শিবিরে অভিষেক। |
| ঐতিহাসিক জয় | ২০২১-এ নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ১,৯৫৬ ভোটে পরাজিত করা। |
| বিরোধী দলনেতা | বিধানসভায় শাসকদলের বিরুদ্ধে কড়া আক্রমণাত্মক ভূমিকা। |
| মুখ্যমন্ত্রী | ২০২৬-এর নির্বাচনে জয়ের পর বাংলার প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী। |
আগামীর চ্যালেঞ্জ ও নতুন ভোরের প্রতিশ্রুতি
শপথ নেওয়ার পরেই শুভেন্দু অধিকারীর সামনে পাহাড়প্রমাণ চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘদিনের ঋণে জর্জরিত রাজ্যের অর্থনীতিকে টেনে তোলা, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা— এই সবই থাকবে তাঁর প্রধান কাজের তালিকায়। বিজেপি যে ‘সোনার বাংলা’র স্বপ্ন ফেরি করেছে, তা বাস্তবায়িত করার মূল দায়িত্ব এখন তাঁর কাঁধে। কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে নতুন সরকার কতটা দ্রুত উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে পারে, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে রাজ্যের কোটি কোটি মানুষ।
কালকের বিগ্রেড প্যারেড গ্রাউন্ড হবে সেই নতুন যাত্রার সাক্ষী। যেখানে পরিবর্তনের শঙ্খধ্বনি আজ বাংলার আকাশে-বাতাসে। রাজনৈতিক মহলের নজর এখন কেবল একটিই দিকে— কালকের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যখন প্রধানমন্ত্রী মোদীর সামনে দাঁড়িয়ে শপথ নেবেন ‘বাংলার ভূমিপুত্র’ শুভেন্দু অধিকারী।
0 মন্তব্যসমূহ