Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

Recent in Home

ভোট-বঙ্গে কি এবার প্রযুক্তির ‘তৃতীয় নয়ন’? ছাপ্পা রুখতে বায়োমেট্রিক ও ফেস রেকগনিশন চালুর সওয়াল সুপ্রিম কোর্টে

 


মানুষের ভাষা | নিউজ ডেস্ক

 কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের ভোট-রাজনীতিতে ‘ছাপ্পা’, ‘রিগিং’ এবং ‘ভুতুড়ে ভোটার’— এই শব্দবন্ধগুলো প্রায় সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। দশকের পর দশক ধরে ক্ষমতার পালাবদল হলেও নির্বাচনী হিংসা ও ভোট লুটের সংস্কৃতি থেকে বাংলা যে মুক্তি পায়নি, তা সাম্প্রতিক প্রতিটি নির্বাচনের রক্তক্ষয়ী পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে। এই কলঙ্কিত অধ্যায়ে ইতি টানতে এবার প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের দাবি উঠল দেশের শীর্ষ আদালতে। ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের পরিচয় নিশ্চিত করতে বায়োমেট্রিক পদ্ধতি এবং ফেস রেকগনিশন বা মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ ব্যবস্থা চালুর আবেদন জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করলেন বিজেপি নেতা তথা বিশিষ্ট আইনজীবী অশ্বিনী উপাধ্যায়। তবে এই প্রযুক্তিগত বিবর্তনের পথে আইনি ও আর্থিক প্রতিবন্ধকতা যে পাহাড়প্রমাণ, সে কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন খোদ প্রধান বিচারপতিও।

শীর্ষ আদালতে সওয়াল-জবাব: প্রযুক্তির স্বপ্ন বনাম বাস্তবতার কঠিন জমি

সোমবার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর এজলাসে এই মামলার শুনানি চলাকালীন এক টানটান মুহূর্তের সৃষ্টি হয়। মামলাকারী অশ্বিনী উপাধ্যায়ের দাবি ছিল, আধার কার্ডের সঙ্গে আঙুলের ছাপ (Fingerprint) এবং চোখের মণি (Iris) স্ক্যান করার যে প্রযুক্তি আমাদের হাতে রয়েছে, তা ভোটকেন্দ্রে ব্যবহার করলে একজনের ভোট অন্যজনের দেওয়ার কোনও সুযোগ থাকবে না। এর ফলে ‘ছাপ্পা ভোট’ এবং ‘ভুয়া ভোটার’ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে।

তবে প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত বিষয়টি নিয়ে কিছুটা রক্ষণশীল অবস্থান নেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। সেখানে বায়োমেট্রিক বা ফেস রেকগনিশন ব্যবস্থা চালু করতে হলে নির্বাচনী বিধিতে (Election Rules) আমূল বদল আনতে হবে। প্রধান বিচারপতি সাফ জানান, “এটি যেমন সময়সাপেক্ষ, তেমনই অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ একটি প্রক্রিয়া। এই ধরনের প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রাথমিক এবং চূড়ান্ত ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের এক্তিয়ারভুক্ত।”

আদালতের এই পর্যবেক্ষণের পর অশ্বিনী উপাধ্যায় যুক্তি দেন যে, নির্বাচন কমিশনের কাছে পর্যাপ্ত ক্ষমতা থাকলেও রাজ্য সরকারগুলির সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া এই ব্যবস্থা কার্যকর করা অসম্ভব। বিশেষ করে বাজেট বরাদ্দ এবং প্রশাসনিক সহায়তার ক্ষেত্রে রাজ্যগুলির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের কাছে একটি নির্দেশিকা বা নোটিশ জারির আর্জি জানান তিনি। কিন্তু প্রধান বিচারপতি এই মুহূর্তে কোনও কড়া নির্দেশ দিতে অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “নির্বাচন কমিশনকে আগে তাদের বক্তব্য পেশ করতে দিন। যদি দেখা যায় কোনও রাজ্য সরকার সহযোগিতা করছে না বা অর্থ দফতর বাজেট দিচ্ছে না, তবে আপনারা পুনরায় আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন।”

২০২৬-এর লক্ষ্যমাত্রা এবং বাংলার রাজনৈতিক উত্তাপ

এই মামলার প্রেক্ষাপটটি যে নিছক আইনি নয়, বরং গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্যপূর্ণ, তা স্পষ্ট হয়ে যায় মামলাকারীর বক্তব্যে। যদিও উপাধ্যায় দাবি করেছেন যে তাঁর এই আবেদন কেবল আসন্ন পাঁচটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের জন্য নয়, কিন্তু রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন— লক্ষ্য আসলে ২০২৬-এর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন। বাংলার শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে যে ‘তাল ঠোকাঠুকি’ শুরু হয়েছে, তাতে এই প্রযুক্তিগত রক্ষাকবচ বড় অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।

ইতিমধ্যেই শোরগোল শুরু হয়েছে যে, ২০২৬ সালে রাজ্যে ২২৬টির বেশি আসন পাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে বিজেপি। অন্যদিকে, শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি, বাংলার মানুষ তাদের পাশেই আছে এবং উন্নয়নের নিরিখে তারা জয়ী হবে। কিন্তু এই দুই দাবির মাঝখানে ঝুলে রয়েছে একটিই প্রশ্ন— ‘ভোটটা অবাধ ও সুষ্ঠু হবে তো?’

বাংলার নির্বাচনী সংস্কৃতির অন্ধকার দিক

নির্বাচনী হিংসা ও কারচুপির নিরিখে পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। একদা বাম আমলের ‘সায়েন্টিফিক রিগিং’ থেকে বর্তমানের পঞ্চায়েত বা লোকসভা নির্বাচনে বুথ দখলের অভিযোগ— প্রেক্ষাপট বদলালেও চিত্রনাট্য প্রায় একই রয়ে গিয়েছে। জনৈক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, “বিহার বা উত্তরপ্রদেশ একসময় ভোট-হিংসার জন্য কুখ্যাত ছিল। কিন্তু সেই রাজ্যগুলোও আজ অনেকটা স্বচ্ছ ভোট-সংস্কৃতির দিকে এগিয়ে গিয়েছে। অথচ পশ্চিমবঙ্গ এই বৃত্ত থেকে বেরোতে পারছে না, এটা বাঙালির জন্য চরম লজ্জার।”

ভোটের সময় এলাকায় এলাকায় বাইক বাহিনী, বুথ দখল, এমনকি জেসিপি দিয়ে বিরোধী প্রার্থীর বাড়ি ভেঙে দেওয়ার মতো অভিযোগও কম নয়। এই রক্তক্ষয়ী সংস্কৃতির অবসান ঘটাতেই বায়োমেট্রিক ও ফেস রেকগনিশনের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন মামলাকারীরা। তাঁদের দাবি, ডিজিটাল ইন্ডিয়ার যুগে যদি ব্যাঙ্ক লেনদেন বা সরকারি পরিষেবা আধারের মাধ্যমে সুরক্ষিত হতে পারে, তবে গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠ উৎসব ‘নির্বাচন’ কেন পুরনো মান্ধাতা আমলের ভোটার কার্ডের ছবির ওপর নির্ভর করে চলবে?

শাসক শিবিরের পাল্টা তোপ: ‘রাবড়ি বানানো হচ্ছে নাকি?’

সুপ্রিম কোর্টে এই মামলা এবং প্রযুক্তির ব্যবহারের প্রস্তাব উঠতেই সরব হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব। তাদের মতে, এটি আসলে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার একটি সুক্ষ্ম ষড়যন্ত্র। শাসক দলের এক প্রভাবশালী নেতার কথায়, “বাংলার মানুষ ভোট দেবে। ভোট তো আর কেন্দ্রীয় বাহিনী বা প্রযুক্তি দেবে না। একদিকে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে, অন্যদিকে গল্প দেওয়া হচ্ছে বায়োমেট্রিক আর ফেস রেকগনিশনের। এটা কি রাবড়ি বানানো হচ্ছে নাকি? নিচ থেকে গরম আর উপর থেকে ঠান্ডা করা হচ্ছে?”

তৃণমূলের মূল যুক্তি হল, অনেক গ্রামীণ এলাকায় এখনও প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো দুর্বল। সেখানে বায়োমেট্রিক যন্ত্রে কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে বা সার্ভার ডাউন থাকলে হাজার হাজার মানুষ ভোটদান থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। এছাড়া, ভোটারের গোপনীয়তা ও তথ্য সুরক্ষা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন তাঁরা।

বায়োমেট্রিক ভোটিং: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ (এক নজরে পরিসংখ্যান)

যদি এই ব্যবস্থা চালু হয়, তবে ভারতের মতো বিশাল জনসংখ্যার দেশে তা হবে বিশ্বের বৃহত্তম প্রযুক্তিগত পরীক্ষা। নিচে একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা দেওয়া হলো:

বিষয়বিবরণ / চ্যালেঞ্জ
প্রযুক্তির ধরনফেস রেকগনিশন, আইরিস স্ক্যান এবং ফিঙ্গারপ্রিন্ট ভেরিফিকেশন।
আর্থিক ব্যয়ভারতের ১০ লক্ষের বেশি পোলিং বুথে এই মেশিন বসাতে কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন।
আইনি ভিত্তিপিপলস রিপ্রেজেন্টেশন অ্যাক্ট (১৯৫১) এবং কন্ডাক্ট অফ ইলেকশন রুলস (১৯৬১) সংশোধন জরুরি।
সময়সীমাবুথ প্রতি ভোটার শনাক্তকরণের সময় কিছুটা বাড়তে পারে, তবে ভুয়া ভোটার শনাক্তকরণ ১০০% নিশ্চিত হবে।
তথ্য সুরক্ষাআধার ডাটাবেসের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ফলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের আশঙ্কা।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত

নির্বাচন কমিশনের প্রাক্তন আধিকারিকদের একাংশ মনে করছেন, কেবল প্রযুক্তি দিয়ে সবটা সম্ভব নয়। প্রযুক্তি তখনই কাজ করবে যখন প্রশাসনিক সদিচ্ছা থাকবে। যদি বুথ দখল হয়ে যায় এবং ভোটারকেই বুথে ঢুকতে না দেওয়া হয়, তবে সেখানে ফেস রেকগনিশন যন্ত্রটি কেবল ভোটকর্মীদের মুখই দেখবে। আসল ভোটারের নাগাল পাবে না। তাই প্রযুক্তির পাশাপাশি কড়া নিরাপত্তার ঘেরাটোপে ভোট হওয়া একান্ত প্রয়োজন।

তবে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ইভিএম মেশিন আসার পর ভোট গণনায় যেমন স্বচ্ছতা এসেছে, ঠিক তেমনই বায়োমেট্রিক পদ্ধতি চালু হলে ‘ভুয়ো ভোটার’ এবং ‘প্রক্সি ভোটিং’ বা একজনের ভোট অন্যের দেওয়ার প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব।

উপসংহার

সুপ্রিম কোর্ট আপাতত বড় কোনও নির্দেশ না দিলেও, পরবর্তী লোকসভা বা বিধানসভা নির্বাচনে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা যায় কিনা, তা খতিয়ে দেখার জন্য নির্বাচন কমিশনকে সবুজ সংকেত দিয়ে রেখেছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে কি পশ্চিমবঙ্গ এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সাক্ষী হবে? নাকি পুরনো ‘ছাপ্পা’ আর ‘রিগিং’-এর মেঘেই ঢাকা পড়বে বাংলার গণতন্ত্র? সময় তার উত্তর দেবে। তবে আপাতত দিল্লির আদালত থেকে কলকাতার নবান্ন— সর্বত্রই এখন চর্চার বিষয় একটাই, ‘বায়োমেট্রিক বনাম ব্যালটের অধিকার’।

প্রযুক্তির এই যুদ্ধে জয় কার হবে, তা এখনই বলা কঠিন। কিন্তু বাংলার সাধারণ ভোটাররা যে একটি শান্ত ও উৎসবমুখর নির্বাচনের প্রত্যাশায় দিন গুনছেন, সে বিষয়ে কোনও দ্বিমত নেই। ‘মানুষের ভাষা’ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে আমরা নজর রাখব এই স্পর্শকাতর মামলার পরবর্তী গতিপ্রকৃতির দিকে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Comments

Ad Code