Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

Recent in Home

আইপ্যাক কর্তার গ্রেফতারে তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি! ৫০ কোটির হাওয়ালা কেলেঙ্কারিতে ইডির স্ক্যানারে তৃণমূলের ভোটকুশলী সংস্থা



মানুষের ভাষা | নিউজ ডেস্ক

কলকাতা ও নয়া দিল্লি: একদিকে আসন্ন ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির একের পর এক অভিযান— সব মিলিয়ে বঙ্গ রাজনীতি এখন আক্ষরিক অর্থেই ফুটন্ত কড়াই। এর মধ্যেই রাজ্য রাজনীতির পারদ আরও কয়েক গুণ চড়িয়ে দিল তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক পরামর্শদাতা বা ভোটকুশলী সংস্থা 'আইপ্যাক' (I-PAC)-এর শীর্ষ কর্তার গ্রেফতারি। হাওয়ালা বা বেআইনি আর্থিক লেনদেনের এক চাঞ্চল্যকর মামলায় দিল্লি পুলিশের এফআইআর-এর ভিত্তিতে আইপ্যাকের অন্যতম ডিরেক্টর দীনেশ চান্ডেলকে গ্রেফতার করেছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। শুধু গ্রেফতারিই নয়, এই তদন্তের জাল আরও প্রসারিত করে আইপ্যাকের আরেক ডিরেক্টর প্রতীক জৈন এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদেরও তলব করেছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। আর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস এবং প্রধান বিরোধী দল বিজেপির মধ্যে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক বাগযুদ্ধ।

দিল্লি থেকে মধ্যরাতে গ্রেফতার: নেপথ্যে কী?

ইডি সূত্রে খবর, গত ২৮শে মার্চ হাওয়ালা সংক্রান্ত একটি পুরনো মামলায় দীনেশ চান্ডেলকে গ্রেফতার করা হয়। অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার দাবি, বিভিন্ন ভুয়ো বা শেল কোম্পানির মাধ্যমে প্রায় ৫০ কোটি টাকার বেআইনি লেনদেন বা হাওয়ালা কারবার চালানো হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ কালো টাকা সাদা করার প্রক্রিয়ায় আইপ্যাকের ওই কর্তার সরাসরি যোগ রয়েছে বলে ইডির প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।

তদন্তে নেমে একাধিক ব্যক্তিকে দীর্ঘক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ করেন ইডির আধিকারিকরা। সেই জিজ্ঞাসাবাদের সূত্র ধরেই আইপ্যাকের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং ডিরেক্টর দীনেশ চান্ডেলের নাম সামনে আসে। এরপর গত ২রা এপ্রিল আইপ্যাকের দিল্লি সহ দেশের বিভিন্ন ঠিকানায় একযোগে তল্লাশি অভিযান চালায় কেন্দ্রীয় এজেন্সি। ইডির দাবি, সেই তল্লাশিতে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ এবং চাঞ্চল্যকর নথি উদ্ধার হয়েছে, যা এই হাওয়ালা চক্রের শিকড় ঠিক কতটা গভীরে, তা প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট।

সাড়ে চার কোটির বিনাসুদের ঋণ এবং রামসেতু ইনফ্রাস্ট্রাকচার

ইডি সূত্রের খবর, তল্লাশি অভিযানে একটি নির্দিষ্ট কোম্পানির নাম বিশেষভাবে উঠে এসেছে— 'রামসেতু ইনফ্রাস্ট্রাকচার'। অভিযোগ, এই সংস্থাটির কাছ থেকে সম্পূর্ণ বিনা সুদে এবং বিনা শর্তে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকার বিশাল অঙ্কের ঋণ নেওয়া হয়েছিল। ব্যবসায়িক জগতে বিনা শর্তে এবং সুদ ছাড়া এত বিপুল পরিমাণ অর্থ ঋণ হিসেবে দেওয়া কার্যত অসম্ভব। এই ঋণের টাকা কীভাবে শোধ করা হবে, তার কোনও আইনি চুক্তি বা শর্তাবলি ছিল না।

তদন্তকারীদের দাবি, এটি আদতে কোনও সাধারণ ঋণ ছিল না। বরং হাওয়ালা বা হুন্ডির মাধ্যমে আসা কালো টাকাকে আইনি বৈধতা দিতে বা সাদা করতেই এই বিনাসুদের ঋণের তত্ত্ব খাড়া করা হয়েছিল। এই 'রামসেতু ইনফ্রাস্ট্রাকচার' আদতে একটি শেল কোম্পানি বা কাগুজে সংস্থা কি না, তা এখন ইডির আতসকাঁচের তলায়। এই আর্থিক লেনদেনের পিছনে কোনো প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির কালো টাকা লুকিয়ে আছে কি না, সেটাই এখন তদন্তের মূল বিষয়।

আইনি লড়াই: পুরোনো মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগ

তবে ইডির এই সমস্ত অভিযোগ এবং গ্রেফতারির পদ্ধতি নিয়ে আদালতে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন দীনেশ চান্ডেল ও আইপ্যাকের আইনজীবীরা। সুপ্রিম কোর্ট এবং নিম্ন আদালতে আইপ্যাকের তরফে দাবি করা হয়েছে, এটি সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত একটি পদক্ষেপ।

আদালতে দীনেশ চান্ডেলের আইনজীবী সওয়াল করেন, "তদন্তকারী সংস্থা সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে মধ্যরাতে একজনকে তুলে নিয়ে যায় এবং মাঝরাতেই তাঁকে আদালতে পেশ করা হয়। আইপ্যাক ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে কাজ শুরু করে। কিন্তু ইডি যে মামলার ভিত্তিতে এই গ্রেফতারি করেছে, সেটি প্রায় ৬ বছর পুরনো একটি মামলা (আনুমানিক ২০২০ সালের)। সেই পুরনো মামলায় ইতিমধ্যেই তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে, চার্জশিট জমা পড়েছে এবং প্রসিকিউশন কমপ্লেনও ফাইল করা হয়েছে। সেই ঘটনার সাথে আইপ্যাক বা দীনেশ চান্ডেলের দূরদূরান্ত পর্যন্ত কোনও সম্পর্ক ছিল না।" আইপ্যাকের দাবি, শুধুমাত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তদন্তকারী সংস্থাকে ব্যবহার করে তাদের কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা চলছে।

কয়লা পাচারের টাকা গোয়া নির্বাচনে? সরব শুভেন্দু

আইপ্যাক কর্তার এই গ্রেফতারি প্রকাশ্যে আসতেই আসরে নেমেছে বঙ্গ বিজেপি। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এই ঘটনাকে হাতিয়ার করে সরাসরি তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বকে নিশানা করেছেন। তাঁর বিস্ফোরক অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গের কয়লা পাচার এবং গরু পাচারের বিপুল পরিমাণ কালো টাকা হাওয়ালার মাধ্যমে ভিন রাজ্যে পাঠানো হয়েছে।

শুভেন্দু অধিকারী বলেন, "সবাই জানে তো! কয়লা দুর্নীতির কালো টাকা হাওয়ালার মাধ্যমে আইপ্যাকের হাত দিয়ে গোয়া বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের প্রচারে ব্যবহার করা হয়েছে। এটা নতুন কী আছে? বরং এত দেরি করে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হলো, সেটাই আসল প্রশ্ন। আরও আগে এদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ করা উচিত ছিল।" বিজেপির দাবি, আইপ্যাক নিছকই একটি রাজনৈতিক পরামর্শদাতা সংস্থা নয়, বরং তারা তৃণমূলের হয়ে বেআইনি আর্থিক লেনদেন এবং কালো টাকা সাদা করার মাধ্যম হিসেবে কাজ করছিল।

‘একজনকে ধরলে হাজার জন বেরোবে’, ইডি-সিবিআই নিয়ে তোপ মমতার

আইপ্যাকের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় এজেন্সির এই অতিসক্রিয়তা এবং দলের বিরুদ্ধে ওঠা যাবতীয় অভিযোগ নিয়ে স্বভাবতই ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আইপ্যাক কান্ডের সরাসরি নাম না করলেও, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির ভূমিকা নিয়ে তিনি নরেন্দ্র মোদী এবং অমিত শাহকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, "যখন ইচ্ছে নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ ইডি পাঠিয়ে দিচ্ছে, সিবিআই পাঠিয়ে দিচ্ছে। ওদের সাথে সব আছে— ইডি, সিবিআই, কেন্দ্রীয় বাহিনী, অর্থবল। সবাইকে বিরক্ত করছে। সবাইকে ধমকাচ্ছে, চমকাচ্ছে। বলছে সবাইকে জ্বালিয়ে দেব। আমাদের তৃণমূল কর্মীদেরও বিনাকারণে গ্রেফতার করা হচ্ছে।"

কেন্দ্রীয় এজেন্সির মাঝরাতের তল্লাশি এবং গ্রেফতারি নিয়ে তীব্র উষ্মা প্রকাশ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, "মধ্যরাতে ইডি রেড করছে, সিবিআই রেড করছে। অর্ডার দিচ্ছে এজেন্টদের গ্রেফতার করুন। এত সস্তা ভাববেন না! একজনকে গ্রেফতার করবেন, হাজার জন বেরিয়ে আসবে। হাজার জনকে গ্রেফতার করবেন, লক্ষ জন বেরোবে। ভূত দেখার মতো ভয় পাচ্ছে এরা।"

অন্যদিকে, তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও কেন্দ্রীয় এজেন্সির এই ভূমিকার বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন এবং আইনি পথে মোকাবিলার বার্তা দিয়েছেন।

পাল্টা ময়দানে অমিত শাহ

তৃণমূলের এই আক্রমণের পাল্টা জবাব দিতে ছাড়েননি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। নির্বাচন কমিশন এবং কেন্দ্রীয় এজেন্সির নিরপেক্ষতা নিয়ে তৃণমূলের তোলা অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন, "তৃণমূল কংগ্রেস একদিকে নির্বাচন কমিশনকে আক্রমণ করছে, অন্যদিকে দুর্নীতির পক্ষে দাঁড়াচ্ছে। বাংলার মানুষ সব দেখছে এবং তারাই ঠিক করবে আগামী দিনে কে মুখ্যমন্ত্রী হবেন এবং কাদের হাতে রাজ্যের ভার থাকবে।"

আজই তলব আইপ্যাকের আরেক ডিরেক্টরকে

দীনেশ চান্ডেলের গ্রেফতারির রেশ কাটতে না কাটতেই এই মামলায় তদন্তের জাল আরও গুটিয়ে আনছে ইডি। এনআইএ এবং ইডি সূত্রে পাওয়া সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, আইপ্যাকের অন্যতম ডিরেক্টর প্রতীক জৈন, তাঁর স্ত্রী বার্বি জৈন এবং ভাই পুলকিত জৈনকে সমন পাঠানো হয়েছে। ১৫ই এপ্রিল (আজ) তাঁদের দিল্লির ইডি দফতরে হাজিরা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তদন্তকারীদের অনুমান, আইপ্যাকের অভ্যন্তরীণ আর্থিক গঠন এবং বিভিন্ন শেল কোম্পানির সাথে তাদের লেনদেনের বিষয়ে প্রতীক জৈন এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে হাওয়ালা চক্রের আরও অনেক অজানা তথ্য প্রকাশ্যে আসবে। এই জিজ্ঞাসাবাদের পর নতুন করে কাউকে গ্রেফতার করা হয় কি না, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।

২০২৬-এর আগে রাজনৈতিক সমীকরণ

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের আগে আইপ্যাক কর্তার এই গ্রেফতারি যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। তৃণমূল কংগ্রেসের ভোট কৌশল নির্ধারণ এবং জনসংযোগের ক্ষেত্রে আইপ্যাকের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের বিপুল জয়ের পিছনে এই সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। তাই নির্বাচনের ঠিক আগে এই সংস্থার শীর্ষ কর্তাদের বিরুদ্ধে হাওয়ালা মামলার মতো গুরুতর অভিযোগ তৃণমূলের জন্য যথেষ্ট অস্বস্তির কারণ হতে পারে।

এখন দেখার বিষয়, সুপ্রিম কোর্টে আইপ্যাক বনাম ইডির এই আইনি লড়াই কোন দিকে মোড় নেয় এবং আজ প্রতীক জৈন ও তাঁর পরিবারকে জিজ্ঞাসাবাদের পর তদন্তকারী সংস্থা কী নতুন তথ্য পেশ করে। তবে এ কথা বলাই বাহুল্য, আগামী দিনগুলোতে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা বনাম রাজ্য সরকারের এই সংঘাত বঙ্গ রাজনীতিতে আরও উত্তাপ ছড়াবে। বাংলার প্রতিটি রাজনৈতিক পদক্ষেপের নিখুঁত বিশ্লেষণ নিয়ে 'মানুষের ভাষা' ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের নিউজ ডেস্ক নজর রাখবে এই ঘটনার প্রতিটি আপডেটের দিকে।


তথ্যসূত্র: এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) প্রেস বিজ্ঞপ্তি, সুপ্রিম কোর্টের শুনানির নথি, এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সাম্প্রতিক বয়ান।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Comments

Ad Code