Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

Recent in Home

সুপ্রিম কোর্টে ঝুলেই রইল ডিএ মামলার ফয়সালা : ৬ মে পর্যন্ত সময় নিল নবান্ন, বকেয়া মেটানো নিয়ে তুঙ্গে আইনি লড়াই

মানুষের ভাষা | নিউজ ডেস্ক

 কলকাতা: ফের ধাক্কা খেলেন রাজ্যের লক্ষ লক্ষ সরকারি কর্মচারী। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত মহার্ঘ ভাতা বা ডিএ (Dearness Allowance) মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি আবারও পিছিয়ে গেল দেশের সর্বোচ্চ আদালতে। সোমবার সুপ্রিম কোর্টে এই মামলার শুনানি হওয়ার কথা থাকলেও, নবান্নের তরফে অতিরিক্ত সময় চাওয়ায় আগামী ৬ মে পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করে দিয়েছে বিচারপতি সূর্যকান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর ডিভিশন বেঞ্চ। বকেয়া ডিএ মেটানো নিয়ে রাজ্য সরকার ও কর্মচারী সংগঠনগুলির মধ্যে চলা দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে এই দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু শুনানির শুরুতে রাজ্যের তরফে পেশ করা একাধিক যুক্তি এবং নতুন করে সময় চাওয়ার আবেদনে ফের অনিশ্চয়তার মেঘ ঘনীভূত হয়েছে।

শীর্ষ আদালতে সওয়াল-জবাব: ৬০০০ কোটির দাবি ও নবান্নের যুক্তি

এদিন সুপ্রিম কোর্টে রাজ্যের পক্ষে সওয়াল করেন বর্ষীয়ান আইনজীবী কপিল সিব্বল। শুনানির শুরুতেই তিনি দাবি করেন, রাজ্য সরকার সুপ্রিম কোর্টের পূর্ববর্তী নির্দেশ মেনে ডিএ মেটানোর প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছে। তাঁর দাবি অনুযায়ী, ইতিমধ্যে ৬০০০ কোটি টাকা বকেয়া ডিএ বাবদ বণ্টন করা হয়েছে। নবান্নের যুক্তি হলো, যে সমস্ত কর্মচারীদের সার্ভিস রেকর্ড বা তথ্য যাচাইয়ের কাজ সম্পন্ন হয়েছে, তাঁদের বকেয়া টাকা দেওয়া শুরু হয়েছে। কিন্তু বাকি কর্মচারীদের তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কিছু প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক সমস্যা রয়েছে। সেই রেকর্ডগুলো ঠিক করার পরই বাকিদের টাকা দেওয়া সম্ভব হবে।

কপিল সিব্বল আদালতে আরও জানান যে, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ইন্দু মালহোত্রার নেতৃত্বে গঠিত চার সদস্যের কমিটির দেওয়া সুপারিশ মেনেই রাজ্য সরকার পদক্ষেপ নিচ্ছে। আগামী ২৭ এপ্রিল এই কমিটির পরবর্তী সুপারিশ আসার কথা রয়েছে। সেই সুপারিশ হাতে পাওয়ার পর রাজ্য সরকার একটি সুনির্দিষ্ট ‘কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট’ বা পালনের খতিয়ান আদালতে জমা দিতে চায়। এই কারণেই ৬ মে পর্যন্ত সময় চেয়ে নেয় রাজ্য। আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করে পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছে।

কমিটির রিপোর্ট ও কর্মচারীদের পাল্টা তোপ

অন্যদিকে, রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের যৌথ সংগ্রামী মঞ্চের আইনজীবীরা এদিন আদালতে রাজ্যের দাবির তীব্র বিরোধিতা করেন। তাঁদের অভিযোগ, সুপ্রিম কোর্ট গত ৫ ফেব্রুয়ারি স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিল যে, বকেয়া ডিএ-র ২৫ শতাংশ অবিলম্বে মিটিয়ে দিতে হবে এবং বাকি ৭৫ শতাংশের প্রথম কিস্তি ৩১ মার্চের মধ্যে দিতে হবে। কিন্তু রাজ্য সরকার সেই সময়সীমা মানেনি। উপরন্তু, ইন্দু মালহোত্রা কমিটির রিপোর্টও কর্মচারীদের সঙ্গে শেয়ার করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।

কর্মচারী সংগঠনগুলির দাবি, রাজ্য সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে টালবাহানা করছে। তাঁদের যুক্তি, "রেকর্ড নেই" বা "তথ্য যাচাই হয়নি"—এই ওজুহাত দিয়ে মাসের পর মাস বকেয়া পাওনা আটকে রাখা হচ্ছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই রাজ্যের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা (Contempt Petition) করার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে শীর্ষ আদালতে।

ভোটের খরচ ও সময় প্রার্থনা: নবান্নের অস্বস্তি

উল্লেখ্য, গত ৬ মার্চ রাজ্য সরকার সুপ্রিম কোর্টে একটি 'মডিফিকেশন অ্যাপ্লিকেশন' জমা দিয়ে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় চেয়েছিল। সেই আবেদনে নবান্নের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল যে, সামনেই বিধানসভা নির্বাচন এবং রাজ্যে একগুচ্ছ জনমুখী প্রকল্প চালু রয়েছে। ফলে নির্বাচনী খরচ এবং প্রশাসনিক চাপের কারণে এখনই বিপুল পরিমাণ টাকা বকেয়া ডিএ বাবদ খরচ করা সম্ভব নয়। তবে সুপ্রিম কোর্ট এদিনের শুনানিতে সেই দীর্ঘমেয়াদী সময়ের আবেদনে কোনও চূড়ান্ত সিলমোহর দেয়নি, বরং মে মাসের প্রথম সপ্তাহে রাজ্যকে নতুন করে রিপোর্ট পেশ করতে বলেছে।

ডিএ মামলার টাইমলাইন: এক নজরে আইনি চড়াই-উতরাই

পশ্চিমবঙ্গের ডিএ মামলার ইতিহাস দীর্ঘ এবং জটিল। নিচে এই মামলার প্রধান মাইলফলকগুলি তুলে ধরা হলো:

তারিখবিশেষ ঘটনা / নির্দেশ
২০ মে, ২০২২কলকাতা হাইকোর্ট নির্দেশ দেয়, ৩ মাসের মধ্যে বকেয়া ডিএ মেটাতে হবে।
সেপ্টেম্বর, ২০২২হাইকোর্টের নির্দেশ চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে যায় রাজ্য সরকার।
৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ—২৫% বকেয়া অবিলম্বে এবং প্রথম কিস্তি ৩১ মার্চের মধ্যে মেটাতে হবে।
৬ মার্চ, ২০২৪সময় চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে রাজ্যের আবেদন। ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় দাবি নবান্নের।
১৫ এপ্রিল, ২০২৪সুপ্রিম কোর্টে শুনানি। রাজ্য জানায় ৬০০০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী শুনানি ৬ মে।

তথ্য ও পরিসংখ্যান: বকেয়া পাওনার অঙ্ক কত?

রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের দাবি অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের তুলনায় রাজ্যের কর্মীরা এখনও প্রায় ৩৬ শতাংশ ডিএ পিছিয়ে রয়েছেন। রাজ্য সরকার ধাপে ধাপে ৪ শতাংশ এবং পরে আরও ৪ শতাংশ ডিএ বৃদ্ধি করলেও, বকেয়া বা ‘অ্যারিয়ার’ মেটানো নিয়ে কোনও চূড়ান্ত ঘোষণা করেনি। নবান্নের একটি সূত্রের দাবি, বকেয়া মেটাতে গেলে সরকারি কোষাগার থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত বোঝা পড়বে, যা বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতিতে মেটানো দুঃসাধ্য। অথচ কর্মচারী সংগঠনগুলোর দাবি, রাজ্যের নিজস্ব মেলা-খেলা বা ক্লাবগুলোকে অনুদান দেওয়ার অর্থ থাকলে, কর্মীদের হকের পাওনা কেন দেওয়া হবে না?

২০২৬-এর দিকে নজর: রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

এই ডিএ মামলা এখন কেবল আইনি লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই, এটি রাজ্যের ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে এক বিরাট রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজ্যের বিশাল সংখ্যক সরকারি কর্মী এবং তাঁদের পরিবার এক শক্তিশালী ভোটব্যাঙ্ক। ডিএ না পাওয়ায় তাঁদের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তা শাসকদলের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হতে পারে। বিজেপি এবং অন্যান্য বিরোধী দলগুলিও এই ইস্যুতে রাজপথে নেমেছে। শুভেন্দু অধিকারী থেকে শুরু করে বিরোধী নেতৃত্বের দাবি, "রাজ্য সরকার দেউলিয়া হয়ে গিয়েছে, তাই কর্মীদের পাওনা দিচ্ছে না।" অন্যদিকে তৃণমূলের দাবি, "কেন্দ্রীয় বঞ্চনার কারণে টাকার অভাব থাকা সত্ত্বেও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাধ্যমতো ডিএ বাড়াচ্ছেন।"

আগামী ৬ মে: ভাগ্য নির্ধারণ কি সেদিনই?

আগামী ৬ মে দিনটির দিকে তাকিয়ে আছেন লক্ষ লক্ষ সরকারি কর্মী, পেনশনভোগী এবং তাঁদের পরিবার। সেদিন রাজ্য সরকার যদি সন্তোষজনক 'কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট' জমা দিতে না পারে, তবে আদালত কঠোর কোনও পদক্ষেপ নিতে পারে কি না, তা নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে। বিশেষ করে ইন্দু মালহোত্রা কমিটির পরবর্তী সুপারিশে কী থাকে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে।

রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের একাংশের বক্তব্য, "আমরা কোনও দান বা খয়রাতি চাইছি না। আমাদের কাজের হকের পাওনা চাইছি। সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশের পরেও যদি আমাদের পথে বসে থাকতে হয়, তবে তা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের।"


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Comments

Ad Code