Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

Recent in Home

প্রথম দফার রণসজ্জা: জেলায় জেলায় ৪০ হাজার পুলিশ, ভরসা জোগাতে অলিগলিতে খোদ নগরপাল


মানুষের ভাষা | নিউজ ডেস্ক

বিশেষ সংবাদদাতা, কলকাতা: বৈশাখের তপ্ত দুপুরে যখন পারদ চড়ছে, ঠিক তখনই রাজনৈতিক উত্তাপে ফুটছে পশ্চিমবঙ্গ। আগামী ২৩শে এপ্রিল রাজ্যে প্রথম দফার নির্বাচন। আর এই প্রথম দফার ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়াকে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ঘেরাটোপে মুড়ে ফেলতে কোনও খামতি রাখছে না নির্বাচন কমিশন। সোমবার কমিশন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রথম দফার ভোটে মোতায়েন করা হচ্ছে মোট ৪০,৯২৮ জন রাজ্য পুলিশ কর্মী। কেবলমাত্র সংখ্যাতত্ত্ব নয়, আধিকারিকদের বিন্যাস এবং স্পর্শকাতর জেলাগুলোতে অতিরিক্ত বাহিনীর উপস্থিতি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, একটি বুথও যাতে অশান্ত না হয়, তা নিশ্চিত করাই কমিশনের প্রধান লক্ষ্য। তবে কেবল বাহিনীর সংখ্যা বাড়ালেই যে ভোট শান্ত হয় না, শীতলকুচি বা মণিপুরের সাম্প্রতিক ইতিহাস সেই তর্কের অবকাশ রেখে দিয়েছে। এই আবহে ভোটারদের মনের ভীতি দূর করতে খোদ রাস্তায় নামলেন কলকাতার নগরপাল অজয় নন্দা।

প্রথম দফার নিরাপত্তার চালচিত্র: এক নজরে পরিসংখ্যান

নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২৩শে এপ্রিলের ভোটে মোতায়েন করা পুলিশ বাহিনীর বিন্যাস অত্যন্ত পরিকল্পিত। নিচুতলার কনস্টেবল থেকে শুরু করে অভিজ্ঞ ইন্সপেক্টর— কাউকেই মাঠের বাইরে রাখা হচ্ছে না। কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই বিপুল সংখ্যক বাহিনীর মধ্যে থাকছেন:

  • ইন্সপেক্টর: ৬৩৭ জন

  • সাব-ইন্সপেক্টর (SI): ১২,৭৭৯ জন

  • মোট পুলিশ কর্মী: ৪০,৯২৮ জন

এই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতি তিনজন পুলিশ কর্মীর মধ্যে একজন আধিকারিক পদমর্যাদার ব্যক্তি থাকছেন। এর অর্থ হলো, ভোটকেন্দ্রে বা টহলদারির সময় তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সম্পন্ন অভিজ্ঞ পুলিশ কর্মীর সংখ্যা গত নির্বাচনের তুলনায় বাড়ানো হয়েছে।

জেলায় জেলায় বাহিনীর বিন্যাস: নজরে পশ্চিম মেদিনীপুর ও পুরুলিয়া

ভৌগোলিক অবস্থান এবং রাজনৈতিক সংঘাতের ইতিহাস বিচার করে কমিশন এবার জেলাভিত্তিক পুলিশ মোতায়েনের ক্ষেত্রে বড়সড় রদবদল ঘটিয়েছে। প্রথম দফায় সবথেকে বেশি পুলিশ মোতায়েন করা হচ্ছে পশ্চিম মেদিনীপুরে। একসময়ের ‘জঙ্গলমহল’ হিসেবে পরিচিত এই জেলায় নিরাপত্তার কড়াকড়ি থাকছে সবথেকে বেশি।

জেলাপুলিশ মোতায়েন (জন)
পশ্চিম মেদিনীপুর৩,২৯৯
পুরুলিয়া২,৮২৭
মুর্শিদাবাদ১,৪৯৫

পশ্চিম মেদিনীপুরে ৩,২৯৯ জন পুলিশ কর্মীর উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, জঙ্গলমহলের সীমান্ত এলাকা এবং সংঘাত প্রবণ বুথগুলোতে কোনওরকম ফাঁক রাখতে চাইছে না প্রশাসন। একইভাবে পুরুলিয়ার রুক্ষ প্রান্তরে ২,৮২৭ জন পুলিশ কর্মীর উপস্থিতি মাওবাদী উপদ্রুত এলাকাগুলোর নিরাপত্তার কথাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। মুর্শিদাবাদে তুলনামূলকভাবে কম বাহিনী থাকলেও, সেখানকার রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা বিচার করে এই ১,৪৯৫ জন পুলিশ কর্মীকে বিশেষ প্রশিক্ষণে নামানো হচ্ছে।

কেন্দ্রবাহিনী বনাম রাজ্যবাহিনী: বিতর্ক ও বাস্তবতা

বাংলার ভোটে ‘কেন্দ্রবাহিনী’ এবং ‘রাজ্যবাহিনী’—এই দুই শব্দবন্ধকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক তরজা চিরকালীন। বিরোধী শিবিরের একাংশ দাবি করেন, কেবল কেন্দ্রবাহিনী থাকলেই ভোট অবাধ হয়। কিন্তু এই ধারণার পাল্টা যুক্তিও কম জোরালো নয়। মণিপুরের উদাহরণ টেনে অনেক বিশেষজ্ঞই দাবি করছেন, যেখানে লক্ষ লক্ষ কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং সেনাবাহিনী নামিয়েও গত আড়াই বছর ধরে স্থায়ী শান্তি ফেরানো যায়নি, সেখানে কেবল বাহিনীর উপস্থিতি কি আদৌ গ্যারান্টি?

গত বিধানসভা নির্বাচনে শীতলকুচির ঘটনা এখনও বাংলার মানুষের স্মৃতিতে টাটকা। কেন্দ্রীয় বাহিনীর গুলিতে চারজনের মৃত্যু ঘিরে যে উত্তাল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তার তদন্ত আজও পূর্ণতা পায়নি। তৃণমূল ও বিজেপি—উভয় পক্ষই এই ঘটনা নিয়ে হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের রাজনীতি করেছে বলে অভিযোগ। কিন্তু আসল সত্য আজও আদালতের অলিন্দে বন্দী। একজন অফিসারকে সাসপেন্ড করেই দায় সেরেছে প্রশাসন। প্রশ্ন উঠছে, বাহিনীর পোশাকের রং কি ভোটের স্বচ্ছতা নির্ধারণ করে? নাকি বাহিনীর নিয়ন্ত্রকদের নিরপেক্ষতা?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাহিনীর উপস্থিতি শুধুমাত্র একটি ‘মানসিক স্বস্তি’ দিতে পারে। কিন্তু সুষ্ঠু ভোট নির্ভর করে সেই বাহিনীর পরিচালনার ওপর। সংবিধান ও আইনের শাসন মেনে চলা আধিকারিকরাই পারেন প্রকৃত গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে।

নিচুতলায় আস্থা ফেরাতে নগরপাল: উল্টোডাঙার চিত্র

ভোটের দিন বুথ দখল বা ছাপ্পা ভোটের আতঙ্কে অনেক সাধারণ ভোটারই ঘর থেকে বেরোতে ভয় পান। বিশেষ করে শহর কলকাতার ঘিঞ্জি এলাকাগুলোতে এই প্রবণতা বেশি। সেই ‘ভয়’ কাটাতে এবার সক্রিয় স্বয়ং কলকাতা পুলিশের কমিশনার অজয় নন্দা। সোমবার তিনি উত্তর কলকাতার ডিও (DEO North)-কে সঙ্গে নিয়ে পৌঁছে যান উল্টোডাঙার বাসন্তী কলোনিতে।

বাসন্তী কলোনি কলকাতার অন্যতম ঘিঞ্জি এবং রাজনৈতিকভাবে অতিসংবেদনশীল এলাকা হিসেবে পরিচিত। সেখানে মেইন রাস্তা ছেড়ে গলি-ঘুপজির ভেতরে ঢুকে সাধারণ বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন নগরপাল। সঙ্গে ছিলেন পুলিশের উচ্চপদস্থ আধিকারিকরাও। সিপি সাহেব বাসিন্দাদের আশ্বস্ত করে বলেন, “নিশ্চিন্তে ভোট দিতে যান। কোনওরকম সমস্যা হলে সরাসরি আমাদের জানান।” শুধু কথা দিয়েই দায় সারেননি তিনি। স্থানীয়দের হাতে তুলে দিয়েছেন বিশেষ হেল্পলাইন নম্বর। নির্বাচনের আগে, চলাকালীন বা পরে—যেকোনও সময় কোনওরকম হুমকির সম্মুখীন হলে ওই নম্বরে ফোন করার আবেদন জানিয়েছেন তিনি।

বাসন্তী কলোনির এক বাসিন্দা বলেন, “পুলিশ সাহেব নিজে এসে কথা বলে গেলেন, এটা একটা বড় ভরসা। আগে আমরা ভাবতাম বস্তি এলাকায় আমাদের কথা শোনার কেউ নেই। আজ নম্বর দিলেন, বললেন ওনারা সাথে আছেন। এবার হয়তো নির্ভয়ে ভোট দিতে পারব।”

কমিশনের কড়া বার্তা: নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা না কেবল প্রদর্শন?

নির্বাচন কমিশনের এই বিপুল পুলিশ মোতায়েন এবং নগরপালের এই জনসংযোগ কর্মসূচি কি আদতে ‘কনফিডেন্স বিল্ডিং’ বা আস্থা বৃদ্ধি করতে পারবে? প্রশ্নটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কারণ, ভোটারদের আস্থা কেবল পুলিশের উপস্থিতিতে ফেরে না, বরং ফেরে অপরাধীদের বিরুদ্ধে পুলিশের কঠোর পদক্ষেপে।

কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, কেবল পুলিশ মোতায়েনই নয়, ড্রোন নজরদারি এবং সিসিটিভি ক্যামেরার সংখ্যাও বাড়ানো হচ্ছে। বিশেষ করে পশ্চিম মেদিনীপুর ও পুরুলিয়ার সীমান্ত এলাকায় ‘নাকা চেকিং’ বা তল্লাশি শুরু হয়েছে যুদ্ধকালীন তৎপরতায়।

উপসংহার

আগামী ২৩শে এপ্রিলের ভোট কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াই নয়, এটি বাংলার প্রশাসনিক দক্ষতারও বড় পরীক্ষা। ৪০ হাজার পুলিশ কর্মীর এই বাহিনী যদি নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে, তবেই হয়তো শীতলকুচির মতো কালো অধ্যায় এড়ানো সম্ভব হবে। নগরপাল অজয় নন্দার দেওয়া সেই ফোন নম্বরগুলো কি ভোটের দিন সচল থাকবে? সাধারণ মানুষের অভিযোগের গুরুত্ব কি দেওয়া হবে? বাংলার মানুষ এখন সেই উত্তরের অপেক্ষায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Comments

Ad Code