Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

Recent in Home

বুথের ১০০ মিটারের মধ্যে কেন চাই রাজ্য পুলিশ? কমিশনের নির্দেশের বিরোধিতায় ডিভিশন বেঞ্চে মরিয়া শাসকদল, নেপথ্যে কি অবাধ ভোট লুটের গভীর ষড়যন্ত্র?


মানুষের ভাষা । নিউজ ডেস্ক 

বিশেষ প্রতিবেদন:

গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় উৎসব হলো নির্বাচন। আর সেই নির্বাচনকে অবাধ, শান্তিপূর্ণ এবং নিরপেক্ষ করার গুরুদায়িত্ব ন্যস্ত থাকে ভারতের জাতীয় নির্বাচন কমিশনের ওপর। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নির্বাচন এলেই যেন এক অদ্ভুত আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার ভোটের ঠিক প্রাক্কালে নির্বাচন কমিশনের একটি যুগান্তকারী নির্দেশকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে শুরু হয়েছে প্রবল টানাপোড়েন। নির্বাচন কমিশন স্পষ্ট ভাষায় নির্দেশ দিয়েছে যে, কোনো বুথের ১০০ মিটারের মধ্যে রাজ্য পুলিশের কোনো কর্মী বা আধিকারিক থাকতে পারবেন না। এই ১০০ মিটারের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে কেন্দ্রীয় বাহিনীর হাতে। কমিশনের এই কড়া পদক্ষেপেই কার্যত ঘুম উড়েছে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের।

কমিশনের এই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে তড়িঘড়ি কলকাতা হাইকোর্টের সিঙ্গল বেঞ্চের দ্বারস্থ হয়েছিল শাসকদল। কিন্তু সিঙ্গল বেঞ্চ নির্বাচন কমিশনের স্বাধীন এবং সাংবিধানিক সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করতে সরাসরি অস্বীকার করে। নিজেদের পক্ষে রায় না পেয়ে এবার মরিয়া হয়ে ডিভিশন বেঞ্চের কড়া নেড়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। আর এখানেই রাজনৈতিক মহলে, বিশেষ করে বিরোধী শিবির ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) পক্ষ থেকে উঠছে এক অমোঘ প্রশ্ন— বুথের ১০০ মিটারের মধ্যে রাজ্য পুলিশকে রাখার জন্য শাসকদলের এত মরিয়া প্রচেষ্টা কেন? এর নেপথ্যে কি তবে ভোট লুটের কোনো গভীর ব্লু-প্রিন্ট লুকিয়ে রয়েছে?

সিঙ্গল বেঞ্চের ধাক্কা এবং ডিভিশন বেঞ্চে মরিয়া দৌড়

আগামী বুধবার, ২৯শে এপ্রিল রাজ্যের দ্বিতীয় দফার ভোটগ্রহণ। এই দফায় রাজ্যের সাতটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা— কলকাতা থেকে নদীয়া, হাওড়া থেকে হুগলী, পূর্ব বর্ধমান, উত্তর চব্বিশ পরগনা এবং দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার মোট ১৪২টি কেন্দ্রে ভাগ্য নির্ধারণ হবে। মাঝে আর মাত্র একদিন, আজ সোমবার ২৭শে এপ্রিল। ঠিক এমন একটি স্নায়ুচাপের মুহূর্তে শাসকদলের এই আইনি লড়াই অনেক প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

নির্বাচন কমিশন সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। কমিশনের একমাত্র লক্ষ্য হলো ভোটাররা যাতে নির্ভয়ে এবং প্রভাবমুক্ত হয়ে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন তা সুনিশ্চিত করা। অতীতে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন নির্বাচনে রাজ্য পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ভুরি ভুরি অভিযোগ জমা পড়েছে জাতীয় নির্বাচন সদনে। বিরোধীদের অভিযোগ, রাজ্য পুলিশ নিরপেক্ষতা বজায় রাখার বদলে শাসকদলের 'দলদাস' হিসেবে কাজ করে। সেই অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করেই এবার কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে বুথের সবচেয়ে সংবেদনশীল এলাকা, অর্থাৎ ১০০ মিটারের পরিধিতে কোনো রাজ্য পুলিশ থাকবে না।

কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস এই সিদ্ধান্ত মানতে নারাজ। সিঙ্গল বেঞ্চ যখন কমিশনের নির্দেশে স্থগিতাদেশ দিতে অস্বীকার করে, তখন শাসকদলের উচিত ছিল কমিশনের নির্দেশ মেনে অবাধ নির্বাচনের পথে হাঁটা। কিন্তু তার পরিবর্তে তারা যেভাবে ডিভিশন বেঞ্চের দ্বারস্থ হয়েছে, তা তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়েই বড়সড় সন্দেহ তৈরি করছে।

শাসকদলের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য: কেন রাজ্য পুলিশকে বুথের কাছে চাই?

বিজেপি এবং অন্যান্য বিরোধী দলগুলির রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূল কংগ্রেসের এই আইনি লড়াইয়ের নেপথ্যে রয়েছে এক অত্যন্ত সুপরিকল্পিত অসৎ উদ্দেশ্য (Ulterior Motive)। বুথের ১০০ মিটারের বাইরে রাজ্য পুলিশকে সরিয়ে দেওয়ার অর্থ হলো শাসকদলের ভোট করানোর বহুদিনের পরীক্ষিত মডেলে সরাসরি কুঠারাঘাত করা। এই অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যগুলিকে কয়েকটি ভাগে বিশ্লেষণ করা যায়:

১. ছাপ্পা ভোট এবং বুথ দখলের ঢাল:

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে 'ছাপ্পা ভোট' বা 'রিগিং' একটি বহুল প্রচলিত শব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিরোধীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, বুথের আশেপাশে রাজ্য পুলিশ মোতায়েন থাকলে তারা শাসকদলের দুষ্কৃতীদের অবাধে বুথে প্রবেশ করতে দেয়। পুলিশের চোখের সামনেই বিরোধী দলের এজেন্টদের মারধর করে বের করে দেওয়া হয়, আর পুলিশ তখন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে, নতুবা উল্টে বিরোধীদেরই আটক করে। ১০০ মিটারের মধ্যে রাজ্য পুলিশ থাকলে শাসকদলের ক্যাডাররা একটি 'নিরাপদ বলয়' বা সুরক্ষা কবচ পেয়ে যায়।

২. ভোটারদের মনে মনস্তাত্ত্বিক ভীতি প্রদর্শন:

রাজ্য পুলিশ যখন বুথের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে, তখন সাধারণ ভোটারদের মনে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি হয়। শাসকদলের স্থানীয় নেতারাই অনেক সময় পুলিশের পোশাকে বা পুলিশের ছত্রছায়ায় বুথের বাইরে জমায়েত করে। এর ফলে বিরোধী শিবিরের ভোটাররা আতঙ্কে ভোটকেন্দ্রমুখী হতে চান না। কেন্দ্রীয় বাহিনী (CAPF) বুথের দায়িত্বে থাকলে এই ভীতি প্রদর্শনের কোনো সুযোগ থাকে না, কারণ কেন্দ্রীয় জওয়ানরা স্থানীয় নেতাদের চেনেন না বা তাদের কোনো রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা থাকে না।

৩. 'ডায়মন্ড হারবার মডেল' এবং নীরব সন্ত্রাস:

ভোটের দিন ব্যাপক বোমাবাজি বা রক্তপাত না করেও যে সূক্ষ্মভাবে ভোট লুট করা যায়, বিরোধীরা তাকে 'ডায়মন্ড হারবার মডেল' বলে কটাক্ষ করে থাকেন। এই মডেলে বুথের ১০০ মিটারের মধ্যে শাসকদলের নির্দিষ্ট লোকজনকে পুলিশের সাহায্যে বসিয়ে রাখা হয়। কে কাকে ভোট দিচ্ছে, তার ওপর কড়া নজরদারি চালানো হয়। এই সূক্ষ্ম সন্ত্রাস বা মাইক্রো-ম্যানেজমেন্ট একমাত্র তখনই সম্ভব যখন স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের পূর্ণ মদত থাকে। কমিশন সেই মদতের শিকড়টাই কেটে দিতে চাইছে।

৪. জাল ভোটারদের অবাধ প্রবেশ সুনিশ্চিত করা:

ভোটের দিন পরিচয়পত্র যাচাই করা এবং লাইনে শৃঙ্খলা বজায় রাখার কাজটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ ওঠে, রাজ্য পুলিশ দায়িত্বে থাকলে তারা শাসকদলের ভুয়ো বা জাল ভোটারদের পরিচয়পত্র সঠিকভাবে যাচাই না করেই বুথে ঢুকতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, বিরোধী দলের প্রকৃত ভোটারদের নানা অছিলায় হেনস্থা করা হয়। ১০০ মিটারের পরিধি থেকে পুলিশকে সরিয়ে দিলে এই জালিয়াতির রাস্তা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।

বিজেপি প্রার্থীর বিস্ফোরক প্রতিক্রিয়া এবং শাসকদলের ভয়

এই আইনি পদক্ষেপ প্রমাণ করছে যে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস এবারের নির্বাচনে পায়ের তলার মাটি হারাচ্ছে। এই প্রসঙ্গে সোনারপুর উত্তরের বিজেপি প্রার্থী তথা রাজ্যের প্রাক্তন দাপুটে পুলিশকর্তা দেবাশিস ধর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন।

তাঁর কথায়, "তৃণমূল এটাই জানে না যে ইলেকশন কমিশনের যেকোনো নির্দেশের ক্ষেত্রে ইলেকশন কমিশনের ডিসিশনই হচ্ছে আল্টিমেট সিদ্ধান্ত। এবারে তৃণমূল যেটা কেন এতদিন তো পুলিশকে দিয়ে ভোট লুট করানো এবং বুথ দখল করানো এটা করিয়ে এসেছে। তার হাত থেকে যখন ওই সোনার হরিণ চলে যাচ্ছে এটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার যে তারা এটার উপরে... মানে ওদের পুরো কন্ট্রোল চলে যাবে।"

দেবাশিস বাবু আরও যোগ করেন, "মানুষ যেভাবে প্রথম দফায় নির্বাচন দিয়েছে, করেছে, এরা অত্যন্ত শঙ্কিত। এবং এদের হারাটা একদম সুনিশ্চিত। আর এই ১০০ মিটার দূরে পুলিশকে রাখলে এতদিন যে ছাপ্পাটা চালিয়ে গেছে সেটা কোনোভাবেই হবে না। ডিভিশন বেঞ্চ কেন, সুপ্রিম কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চে গেলেও এদের কোনো লাভ হবে না। এরা হারছে।"

প্রাক্তন এই পুলিশকর্তার বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট যে, রাজ্য পুলিশকে ব্যবহার করে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার যে 'সোনার হরিণ' তৃণমূলের হাতে ছিল, তা এবার হাতছাড়া হতে বসেছে। প্রথম দফার নির্বাচনে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং বিপুল ভোটদান শাসকদলের অন্দরে প্রবল ভীতির সঞ্চার করেছে। তারা বুঝতে পারছে যে অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন হলে সাধারণ মানুষ ইভিএম-এর বোতামে তাদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাবে।

দ্বিতীয় দফার মেগা ফাইট এবং গণতন্ত্র রক্ষার তাগিদ

যে সাতটি জেলায় ২৯শে এপ্রিল ভোট হতে চলেছে— কলকাতা, নদীয়া, হাওড়া, হুগলী, পূর্ব বর্ধমান, উত্তর এবং দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা— সেগুলি রাজনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল। এই ১৪২টি আসনই নির্ধারণ করে দিতে পারে আগামী দিনে রাইটার্স বা নবান্নের দখল কার হাতে থাকবে। এই জেলাগুলিতে অতীতে শাসকদলের একাধিপত্য থাকলেও, বর্তমানে বিরোধী গেরুয়া শিবির সেখানে প্রবল শক্তিতে উঠে এসেছে।

বিশেষ করে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা এবং কলকাতার বেশ কিছু এলাকায় রাজ্য পুলিশের ভূমিকা নিয়ে চিরকালই বিতর্কের ঝড় উঠেছে। নির্বাচন কমিশন এবার বদ্ধপরিকর যে কোনোভাবেই প্রশাসনকে রাজনৈতিক দলের শাখা সংগঠনে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না। ১০০ মিটারের যে 'লক্ষণরেখা' কমিশন টেনে দিয়েছে, তা আসলে গণতন্ত্রকে রক্ষা করার একটি অত্যন্ত জরুরি পদক্ষেপ।

তৃণমূল কংগ্রেসের হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চে যাওয়ার এই মরিয়া চেষ্টা সাধারণ মানুষের কাছে একটি অত্যন্ত ভুল বার্তা দিচ্ছে। জনগণ প্রশ্ন তুলছেন, যাদের জনসমর্থন আছে বলে তারা দাবি করে, তারা কেন কেন্দ্রীয় বাহিনীর পাহারায় ভোট করাতে ভয় পাচ্ছে? যদি উন্নয়ন হয়ে থাকে, যদি মানুষ শাসকদলের পাশেই থাকেন, তবে পুলিশকে পাহারাদার হিসেবে বুথের ১০০ মিটারের মধ্যে রাখার এমন নির্লজ্জ আইনি লড়াই কেন?

পরাজয়ের ভয় যখন মানুষকে তাড়া করে, তখন সে যেকোনো খড়কুটো আঁকড়ে বাঁচতে চায়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বুথের ১০০ মিটারের পরিধিতে রাজ্য পুলিশকে ফেরত পাওয়ার এই আইনি লড়াই আসলে আসন্ন রাজনৈতিক বিপর্যয় এড়ানোর একটি মরিয়া এবং শেষ চেষ্টা মাত্র। এখন দেখার বিষয়, মাননীয় আদালত নির্বাচন কমিশনের এই স্বচ্ছতা বজায় রাখার নির্দেশকে বহাল রাখেন কি না। তবে বাংলার সচেতন ভোটাররা এবার বদ্ধপরিকর, বুথের বাইরে কে পাহারায় থাকলো আর কে থাকলো না, তার পরোয়া না করে নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার তারা নির্ভয়ে প্রয়োগ করবেন। আর সেখানেই হয়তো লুকিয়ে আছে শাসকদলের আসল ভয়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Comments

Ad Code