Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

Recent in Home

"বিষ্ণুপুরের বালি, পাথর ও কয়লা পাচারের সঙ্গে যুক্ত তৃণমূলের সিন্ডিকেট শুনে নিন— ২৯-এর আগে আত্মসমর্পণ করুন, কারণ ৪ মে-র পর আর কেউ রেহাই পাবেন না।"বাঁকুড়ায় মোদীর হুঙ্কার

 


নিজস্ব সংবাদদাতা, বাঁকুড়া

"আমি দেখতে পাচ্ছি বাংলায় যেখানেই যাচ্ছি, আগের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে যাচ্ছে। এই উন্মাদনা, এই উৎসাহ আসলে বর্তমান নির্মম সরকারের প্রতি মানুষের রাগের প্রতীক। বাংলা এবার মনস্থির করে ফেলেছে— পাল্টানো দরকার!"

বাঁকুড়ার লাল মাটি, প্রখর রোদ, আর তার মাঝেই জনসমুদ্র। লোকসভা নির্বাচনের উত্তপ্ত আবহে বাঁকুড়া ও বিষ্ণুপুরের সংযোগস্থলে আয়োজিত এক বিশাল জনসভা থেকে রাজ্য সরকারকে তীব্র আক্রমণ শানালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। রাজ্যের শাসক দলকে ‘নির্মম সরকার’ আখ্যা দিয়ে তিনি নারী সুরক্ষা, আদিবাসী বঞ্চনা এবং শিল্পীদের প্রতি রাজ্যের অবহেলার অভিযোগ তুলে সুর চড়ান। একই সঙ্গে বাঁকুড়ার ঐতিহ্যবাহী টেরাকোটা, বালুচরী এবং কৃষকদের উন্নয়নে ‘মোদীর গ্যারান্টি’-র কথা স্মরণ করিয়ে দেন তিনি।

"টিএমসি নেতারা এখন যে হুমকি দিচ্ছেন, তা ফাঁকা আওয়াজ। এই হুমকির পিছনে লুকিয়ে আছে তাদের ভয়। যারা এতকাল বাংলাকে ভয় দেখিয়ে এসেছে, তারা আজ 'বেঙ্গল টাইগার'-এর গর্জনে কাঁপছে। আর এই বেঙ্গল টাইগার কে? বাংলার জনতাই হল আসল বেঙ্গল টাইগার।"

এদিন সভামঞ্চে উপস্থিত ছিলেন বিষ্ণুপুর সাংগঠনিক জেলার জনপ্রিয় সাংসদ তথা প্রার্থী ডঃ সৌমিত্র খাঁ, বাঁকুড়ার প্রার্থী ডঃ সুভাষ সরকার, বিষ্ণুপুর সাংগঠনিক জেলা সভাপতি তাপস বোস এবং বাঁকুড়া সাংগঠনিক জেলা সভাপতি প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। স্থানীয় নেতৃত্ব প্রধানমন্ত্রীকে ডোকরা শিল্প, বিখ্যাত চিত্রশিল্পী যামিনী রায়ের আঁকা ছবি এবং বিশাল পুষ্পস্তবক দিয়ে বরণ করে নেন।

নারীশক্তি ও সংরক্ষণে 'নির্মম' সরকারকে তোপ

এদিনের ভাষণে প্রধানমন্ত্রীর প্রধান লক্ষ্য ছিল রাজ্যের নারীসমাজ। লোকসভায় সদ্য পাশ হওয়া নারী সংরক্ষণ বিলের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, "বাংলার বোনেরা চেয়েছিলেন সংসদে তাঁদের ৩৩% সংরক্ষণ নিশ্চিত হোক। মোদী তা নিশ্চিত করেছে। কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিরোধী জোট তা চায়নি। তারা মহিলাদের সমর্থন করে না।"

"টিএমসি কংগ্রেসের সঙ্গে মিলে ষড়যন্ত্র করেছে এবং মহিলাদের জন্য ৩৩% আসন সংরক্ষিত করার আইনটি বাস্তবায়নে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কারণ বাংলার মেয়েরাই তাদের এই মহা জঙ্গলরাজকে চ্যালেঞ্জ করছে।"

রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দেগে তিনি অভিযোগ করেন, তৃণমূল চায় না রাজ্যের মহিলারা বেশি সংখ্যায় বিধায়ক বা সাংসদ হন, কারণ বাংলার মেয়েরাই বর্তমান ‘মহা জঙ্গলরাজ’-এর বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছেন। মহিলাদের অধিকার লুন্ঠনকারী এই সরকারকে কড়া শাস্তি দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

'মোদীর গ্যারান্টি': মহিলাদের জন্য একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি

রাজ্যে ডাবল ইঞ্জিন সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে মহিলারা কী কী সুবিধা পাবেন, তার এক বিস্তারিত রূপরেখা এদিন তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি আশ্বস্ত করেন যে, বিজেপি সরকার এলে বিনামূল্যের রেশন কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।

  • প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা: মহিলাদের নামে পাকা বাড়ি তৈরির জন্য ১.৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সাহায্য।

  • আয়ুষ্মান ভারত যোজনা: তৃণমূল সরকার রাজ্যে এই প্রকল্প আটকে রেখেছে বলে অভিযোগ করে মোদী জানান, বিজেপি ক্ষমতায় এলে মহিলাদের ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনামূল্যে চিকিৎসার সুবিধা দেওয়া হবে। কিডনির সমস্যায় সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ডায়ালিসিসের প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।

  • আর্থিক সহায়তা ও লখপতি দিদি: গর্ভবতী মহিলাদের জন্য বিশেষ আর্থিক সাহায্য, এবং রাজ্যের ৭৫ লক্ষ মহিলাকে 'লখপতি দিদি' অভিযানের সঙ্গে যুক্ত করার কথা ঘোষণা করেন তিনি।

  • পিএম সূর্য ঘর যোজনা: বিদ্যুৎ বিল শূন্য করতে এই প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি উপভোক্তা পরিবারকে অনুদান এবং সস্তায় এলইডি বাল্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

আদিবাসী আবেগ ও জনজাতি সম্প্রদায়ের বঞ্চনা

বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম সহ জঙ্গলমহলের একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে আদিবাসী ও জনজাতি ভোটব্যাঙ্ক। এদিন সেই আবেগকে ছুঁয়ে প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন, তৃণমূল কংগ্রেস আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রতি চরম বিদ্বেষ পোষণ করে।

দেশের প্রথম আদিবাসী মহিলা রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, "আমরা আদিবাসী সমাজকে ক্ষমতায়ন করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তৃণমূল তাঁর বিরুদ্ধে প্রার্থী দিয়েছিল। বাংলায় রাষ্ট্রপতি আসার পর তৃণমূল তাঁকে কীভাবে অপমান করেছে, তা গোটা দেশ দেখেছে। প্রেসিডেন্টের অপমান কি আমরা মেনে নেব? আদিবাসী সমাজের এক মেয়ের এই অপমান বাংলার মানুষ কখনও ভুলবে না।" কুর্মি, বিরহোর, লোধা এবং টোটো উপজাতির উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী জনমান (PM JANMAN) যোজনার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, প্রতিবেশী রাজ্যগুলিতে হাজার হাজার বাড়ি তৈরি হলেও, বাংলায় আদিবাসীদের জন্য এই প্রকল্পের আওতায় কোনও কাজ হয়নি শুধুমাত্র রাজ্য সরকারের অসহযোগিতার কারণে।

বিশ্বকর্মা যোজনা: ৮ লক্ষ আবেদন, অনুমোদন মাত্র ১ জনের!

বাঁকুড়ার শিল্পকলার প্রশংসা প্রধানমন্ত্রীর গলায় বারবার উঠে আসে। রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, যামিনী রায়, এবং রামকিঙ্কর বেইজের মতো মহীরুহদের স্মরণ করে তিনি টেরাকোটা ও বালুচরী শিল্পের ভূয়সী প্রশংসা করেন। কিন্তু এই শিল্পীদের উন্নয়নের প্রশ্নে রাজ্যের ভূমিকা নিয়ে তিনি একটি চাঞ্চল্যকর পরিসংখ্যান তুলে ধরেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, "হাতে কাজ করা কারিগর ও বিশ্বকর্মা সমাজের জন্য কেন্দ্র সরকার 'পিএম বিশ্বকর্মা যোজনা' চালু করেছে। ওড়িশায় লক্ষ লক্ষ মানুষ এর সুবিধা পাচ্ছেন, ব্যাঙ্ক থেকে কোটি কোটি টাকার ঋণ পাচ্ছেন। কিন্তু বাংলায় প্রায় ৮ লক্ষ কারিগর আবেদন করলেও, তৃণমূল সরকারের বাধায় মাত্র ১ জনের রেজিস্ট্রেশন হয়েছে।" একে বাংলার টেরাকোটা ঐতিহ্যের অপমান বলে কটাক্ষ করেন তিনি।

আলু চাষি এবং সিন্ডিকেটকে চরম হুঁশিয়ারি

বাঁকুড়া এবং সংলগ্ন জেলার আলু চাষিদের দুর্দশার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "মন্ডিতে যতদিন তৃণমূলের সিন্ডিকেট থাকবে, কৃষকদের শোষণ চলবে।"

বক্তব্যের শেষ পর্বে বিষ্ণুপুরের বালি, পাথর ও কয়লা মাফিয়াদের বিরুদ্ধে সরাসরি হুঁশিয়ারি দেন নরেন্দ্র মোদী। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "আমি সমস্ত গুন্ডা, সিন্ডিকেট এবং দুর্নীতিবাজদের একটা শেষ সুযোগ দিচ্ছি। বিষ্ণুপুরের বালি, পাথর ও কয়লা পাচারের সঙ্গে যুক্ত তৃণমূলের সিন্ডিকেট কান খুলে শুনে নিন— ২৯ তারিখের আগে আত্মসমর্পণ করুন, কারণ ৪ মে-র পর আর কেউ রেহাই পাবেন না।"


এক নজরে বাঁকুড়া জনসভা থেকে 'মোদীর গ্যারান্টি'

প্রকল্পের নামবর্তমান পরিস্থিতি (মোদীর অভিযোগ অনুযায়ী)বিজেপি সরকার এলে প্রতিশ্রুতি
আয়ুষ্মান ভারতরাজ্য সরকার আটকে রেখেছে।৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনামূল্যে চিকিৎসা এবং বিনামূল্যে ডায়ালিসিস।
পিএম আবাস যোজনাকাটমানি ও দুর্নীতির অভিযোগ।মহিলাদের নামে পাকা বাড়ি তৈরিতে ১.৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত সহায়তা।
পিএম বিশ্বকর্মা যোজনা৮ লক্ষ আবেদনে মাত্র ১টি অনুমোদন।কারিগরদের আধুনিক প্রশিক্ষণ ও ব্যাঙ্ক ঋণের সম্পূর্ণ সুবিধা।
পিএম সূর্য ঘর যোজনারাজ্যে বাস্তবায়ন ধীর গতির।সোলার প্যানেল বসাতে আর্থিক অনুদান, বিদ্যুৎ বিল জিরো (শূন্য) করার লক্ষ্য।
পিএম জনমান যোজনাউপজাতিদের জন্য কোনও বাড়ি হয়নি।বিরহোর, লোধা, টোটো সম্প্রদায়ের জন্য দ্রুত আবাসন ও উন্নয়ন।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

বাঁকুড়া এবং বিষ্ণুপুর— এই দুটি লোকসভা কেন্দ্রেই গত ২০১৯ সালের নির্বাচনে বিপুল জয় পেয়েছিল পদ্ম শিবির। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও এই মাটি ধরে রাখতে মরিয়া গেরুয়া শিবির। অন্যদিকে, হারানো জমি পুনরুদ্ধারে জোর কদমে প্রচার চালাচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস। তবে প্রথম দফার ভোটের ঠিক আগে, বাঁকুড়ার লাল মাটিতে দাঁড়িয়ে নরেন্দ্র মোদী যেভাবে দুর্নীতি, সিন্ডিকেট রাজ, এবং নারী সুরক্ষার ইস্যুকে হাতিয়ার করে শাসক দলকে বিঁধলেন, তা যে বিরোধী শিবিরের পালে বাড়তি হাওয়া জোগাবে, তা বলাই বাহুল্য। এখন দেখার বিষয়, 'বেঙ্গল টাইগার' খ্যাত বাংলার সাধারণ মানুষ ইভিএম-এ কাকে তাদের জনাদেশ প্রদান করে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Comments

Ad Code