নিজস্ব প্রতিবেদন, কলকাতা: দীর্ঘ প্রতীক্ষা, তপ্ত রাজনৈতিক লড়াই আর আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা উৎকণ্ঠার অবসান হতে চলেছে। ২০২৬-এর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ‘গেরুয়া ঝড়’ আছড়ে পড়ার পর এবার সেই মাহেন্দ্রক্ষণ— রাজ্যের মসনদে কে বসবেন? গত কয়েকদিন ধরে গঙ্গার দুই পাড়ে যে জল্পনার চোরাস্রোত বইছিল, তার চূড়ান্ত সমাধান হতে চলেছে আজই। শুক্রবার সাতসকালেই তিলোত্তমায় পা রাখছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। দিল্লির হাইভোল্টেজ রাজনীতির ভরকেন্দ্র এখন কলকাতা। শাহের এই সফর মূলত বিজেপির নবনির্বাচিত বিধায়কদের নিয়ে একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক এবং আগামীর নীল নকশা চূড়ান্ত করার জন্য। রাজনৈতিক মহলের খবর, আজকের এই বৈঠকেই স্থির হয়ে যাবে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রীর নাম।
শুক্রবার সকাল থেকেই কলকাতার একটি বিলাসবহুল হোটেলে সাজ সাজ রব। এখানেই বিজেপির নবনির্বাচিত বিধায়কদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন শাহ। সঙ্গে থাকছেন বিজেপির কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক এবং সর্বভারতীয় স্তরের শীর্ষ নেতৃত্ব। সূত্রের খবর, এই বৈঠকের প্রধান আলোচ্য বিষয়ই হল ‘মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচন’। যদিও বিজেপির সংসদীয় দলের পক্ষ থেকে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়নি, তবে দলের অন্দরে কান পাতলে একটি নামই বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে— শুভেন্দু অধিকারী।
শুভেন্দুর এই অপ্রতিরোধ্য উত্থানের পিছনে রয়েছে এক অমোঘ ইতিহাস। বাংলার রাজনীতির কারবারিরা মনে করছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর নিজের গড় ভবানীপুরে গিয়ে পরাজিত করাটা ছিল শুভেন্দুর রাজনৈতিক কেরিয়ারের শ্রেষ্ঠ চাল। ২০২১ সালে নন্দীগ্রামে ১,৯৫৬ ভোটে জয়ের সেই রোমহর্ষক লড়াইয়ের পর, এবার ২০২৬-এর নির্বাচনে ভবানীপুরের মাটিতে দাঁড়িয়ে মমতার হাত থেকে জয় ছিনিয়ে আনা চাট্টিখানি কথা নয়। ১৫ হাজারেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ের পর শুভেন্দুকে ‘জায়ান্ট কিলার’ তকমা দিতে আর কোনও দ্বিধা রাখেনি দিল্লির শীর্ষ নেতৃত্বও।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বাংলার বর্তমান পরিস্থিতিতে এমন একজন নেতার প্রয়োজন ছিল যাঁর প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং মাঠ-ঘাটের রাজনীতির ওপর সমান দখল রয়েছে। শুভেন্দু অধিকারীর পক্ষে তিনটি বিষয় সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে:
১. তৃণমূল নেত্রীর ব্যাক টু ব্যাক পরাজয় : নন্দীগ্রামের পর ভবানীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করা শুভেন্দুর রাজনৈতিক ওজনে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
২. ভূমিপুত্র ভাবমূর্তি: দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব চাইছে এমন কাউকে সামনে আনতে যাঁর সঙ্গে মাটির টান গভীর এবং যিনি বাংলার নাড়ি নক্ষত্র চেনেন।
৩. সংগঠনের ওপর নিয়ন্ত্রণ: এবারকার নির্বাচনে জঙ্গলমহল থেকে শুরু করে উত্তরবঙ্গ— সবর্ত্রই শুভেন্দুর রণকৌশল কাজ দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে জোড়া কেন্দ্র থেকে প্রার্থী হয়ে নন্দীগ্রামেও তৃণমূলের পবিত্র করকে প্রায় ১০ হাজার ভোটে হারানো তাঁর জনপ্রিয়তারই প্রমাণ।
তবে রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। শাহের ঝোলায় অন্য কোনও ‘সারপ্রাইজ’ নামও থাকতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। কিন্তু পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করলে, শুভেন্দুই আপাতত দৌড়ে অনেকটা এগিয়ে।
শনিবার কলকাতার ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড সাক্ষী থাকতে চলেছে এক নজিরবিহীন ঘটনার। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উপস্থিতিতে শপথ নেবে বাংলার নতুন মন্ত্রিসভা। সঙ্গে উপস্থিত থাকছেন বিজেপি শাসিত ২২ টি রাজ্যের মুখমন্ত্রী এবং সম্পূর্ণ কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভা। গত ১৪ মার্চ এই মাঠ থেকেই প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের যে ডাক দিয়েছিলেন, শনিবার সেই মাঠেই যেন বৃত্ত সম্পূর্ণ হতে চলেছে। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল ৮টা ০৫ মিনিটে দিল্লির পালম বিমানবন্দর থেকে বায়ুসেনার বিশেষ বিমানে রওনা দেবেন তিনি। সকাল ১০টা ২৫ মিনিটে কলকাতা বিমানবন্দরে নামার পর হেলিকপ্টারে আরসিটিসি হেলিপ্যাড হয়ে সড়কপথে তিনি পৌঁছাবেন ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে। বেলা সাড়ে ১১টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত তিনি এই মেগা অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে নতুন সরকারের পথচলার সাক্ষী থাকবেন।
এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে ফেলা হয়েছে গোটা ব্রিগেড চত্বর। মোতায়েন করা হয়েছে হাজার হাজার পুলিশ কর্মী এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী। ঐতিহাসিক পরিবর্তনের এই সাক্ষী হতে বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ ভিড় করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, এই অনুষ্ঠান হবে ঐতিহাসিকভাবে বর্ণাঢ্য।
এইবারের নির্বাচনে বিজেপির জয়ের পিছনে রয়েছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কারণ। দুর্নীতি বিরোধী প্রচার থেকে শুরু করে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার অবনতি— এই ইস্যুগুলিকে হাতিয়ার করে পদ্ম-শিবির যেভাবে মানুষের কাছে পৌঁছেছিল, তার ফল হাতেনাতে মিলেছে ব্যালট বাক্সে। বিশেষ করে গ্রামীণ বাংলায় শাসক দলের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের জমা হওয়া ক্ষোভ এবার আছড়ে পড়েছে ইভিএমে।
বিজেপির এই ‘মহাসমর’ জয়ের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নারী ভোট এবং তফসিলি জাতি-উপজাতি ভোটের বড় একটি অংশ তৃণমূল থেকে বিজেপির দিকে সরে এসেছে। উত্তরবঙ্গ বরাবরই বিজেপির শক্ত ঘাঁটি ছিল, কিন্তু এবার দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতেও গেরুয়া পতাকা উড়ছে সগৌরবে। বিশেষ করে পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর এবং দুই ২৪ পরগনার বেশ কিছু আসনে অভাবনীয় ফল করেছে বিজেপি।
শপথ গ্রহণের আনন্দ মিটে যাওয়ার পরেই নতুন সরকারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে একগুচ্ছ কঠিন প্রশ্ন। বছরের পর বছর ধরে চলা কর্মসংস্থানের অভাব, বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানা খোলার দাবি এবং ঋণে জর্জরিত রাজ্যের কোষাগার সামলানো— এই সবই হবে নতুন মুখ্যমন্ত্রীর জন্য অগ্নিপরীক্ষা। বিজেপি তাদের নির্বাচনী ইস্তাহারে যে ‘সোনার বাংলা’র প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা বাস্তবায়িত করা এখন সময়ের দাবি।
বিশেষ করে কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলি রাজ্যে চালু করা এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন আনা নতুন মন্ত্রিসভার প্রধান লক্ষ্য হবে বলে মনে করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে নতুন সরকার কতটা দ্রুত উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে পারে, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে রাজ্যের সাড়ে দশ কোটি মানুষ।
নতুন মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন, তার ওপর নির্ভর করছে নবান্নের আগামী দিনের কর্মসংস্কৃতি। প্রশাসনিক মহলে এখন থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছে কানাঘুষো। বদলি হতে পারেন একগুচ্ছ শীর্ষ আমলা। পুলিশের ওপরতলায় আসতে পারে বড়সড় পরিবর্তন। শাহের বৈঠকের পর নাম ঘোষণা হলেই রাজভবনে গিয়ে রাজ্যপালের কাছে সরকার গঠনের দাবি জানাবেন হবু মুখ্যমন্ত্রী। সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় এখন প্রহর গুনছে গোটা বাংলা।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেই হয়তো পর্দা উঠবে এই রহস্যের। কার কপালে জুটবে বাংলার কুর্সি? শুভেন্দু অধিকারী নাকি অন্য কেউ? ব্রিগেডের মঞ্চে যখন শনিবার নরেন্দ্র মোদী দাঁড়াবেন, তখন তাঁর পাশে বাংলার পরবর্তী প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে কার দেখা মিলবে, সেই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে শাহের আজকের রুদ্ধদ্বার বৈঠকেই।
0 মন্তব্যসমূহ