মানুষের ভাষা | নিউজ ডেস্ক
নিজস্ব প্রতিবেদন: ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের দামামা কার্যত বেজে গিয়েছে। আর এই নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসকে (TMC) গদিচ্যুত করতে সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়েছে প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP)। সেই লক্ষ্যেরই অন্যতম বড় হাতিয়ার হলো বিজেপির মেগা প্রচার কর্মসূচি 'পরিবর্তন যাত্রা'। গত ২রা মার্চ, মথুরাপুরে আয়োজিত এমনই এক বিশাল 'পরিবর্তন যাত্রা সমাবেশ'-এ উপস্থিত হয়ে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে সুর সপ্তমে চড়ালেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah)। তাঁর আক্রমণের মূল নিশানায় ছিল রাজ্য সরকারের 'তোষণের রাজনীতি', বিপুল ঋণের বোঝা, দুর্নীতি এবং বিতর্কিত পুলিশ আধিকারিকদের রাজনৈতিক পুনর্বাসন।
অমিত শাহ এদিন স্পষ্ট ভাষায় তোপ দেগে বলেন, "কেবলমাত্র তোষণের রাজনীতি করে পশ্চিমবঙ্গের মতো একটি রাজ্যের সার্বিক উন্নয়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়।" তাঁর এই ঝাঁঝালো ভাষণে মূলত রাজ্যের বাজেট বরাদ্দ, সিএএ (CAA) কার্যকর করা এবং রাজ্যে অনুপ্রবেশকারীদের অবাধ বিচরণ নিয়ে রাজ্য সরকারকে কার্যত কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়।
বাজেটে চূড়ান্ত বৈষম্য: বিজ্ঞানের বদলে মাদ্রাসায় জোর!
রাজ্যের সাম্প্রতিক বাজেট বরাদ্দের খতিয়ান তুলে ধরে এদিন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি অভিযোগ করেন, রাজ্য সরকার উন্নয়নের পরিবর্তে নির্দিষ্ট একটি ভোটব্যাঙ্ককে সন্তুষ্ট করার দিকেই বেশি নজর দিচ্ছে।
পরিসংখ্যান তুলে ধরে শাহ বলেন, "যেখানে রাজ্যের ভবিষ্যৎ, গবেষণা এবং সার্বিক উন্নতির জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি (Science and Technology) খাতে মাত্র ৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, সেখানে শুধুমাত্র মাদ্রাসাগুলির জন্যই বরাদ্দ করা হয়েছে পাহাড়প্রমাণ ৫,৭০০ কোটি টাকা!" এই বিপুল আর্থিক বৈষম্যের কথা উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, এই ধরনের একপেশে এবং তোষণমূলক নীতি গ্রহণ করে কীভাবে পশ্চিমবঙ্গের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাতকে অবহেলা করে শুধুমাত্র রাজনৈতিক ফায়দা লোটার উদ্দেশ্যেই মাদ্রাসায় এই বিপুল অর্থ ঢালা হচ্ছে, যা রাজ্যের দীর্ঘমেয়াদী উন্নতির পরিপন্থী।
ঋণের দায়ে ধুঁকছে রাজ্য: জন্মেই শিশুর মাথায় ৭৭ হাজারের বোঝা
রাজ্যের আর্থিক অব্যবস্থা এবং বিপুল ঋণের বোঝা নিয়েও এদিন সরব হন অমিত শাহ। তাঁর দাবি, তৃণমূল সরকারের আমলে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতি কার্যত খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে। শাহের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ৮ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছে।
এই চরম আর্থিক সঙ্কটের ভয়াবহতা বোঝাতে গিয়ে একটি শিউরে ওঠার মতো তথ্য তুলে ধরেন তিনি। শাহ বলেন, "এই বিপুল পরিমাণ ঋণের অর্থ হলো, আজ পশ্চিমবঙ্গে যে শিশুটি জন্মগ্রহণ করছে, জন্মলগ্ন থেকেই তার মাথায় ৭৭ হাজার টাকার ঋণের বোঝা চেপে যাচ্ছে।"
এর পাশাপাশি রাজ্যের শাসক দলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, বর্তমানে গোটা দেশে 'পশ্চিমবঙ্গ' নামটির সঙ্গে দুর্নীতি সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক কল্যাণমূলক প্রকল্পে লাগামছাড়া কাটমানি এবং দুর্নীতির অভিযোগ তুলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরাসরি আক্রমণ করেন তিনি। শাহের অভিযোগ, যোগ্য প্রার্থীদের বঞ্চিত করে শিক্ষকদের বেতনের টাকা আত্মসাৎ করেছে শাসক দলের একাংশ। এই লাগাতার দুর্নীতির জেরে রাজ্যের ভাবমূর্তি আজ দেশজুড়ে কালিমালিপ্ত হয়েছে।
রাজীব কুমারকে রাজ্যসভায় পাঠানো 'তৃণমূলের হতাশার বহিঃপ্রকাশ'
এদিন রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিচক্ষণতা এবং স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর আক্রমণের অন্যতম লক্ষ্য ছিলেন রাজ্যের প্রাক্তন পুলিশ মহানির্দেশক (DGP) রাজীব কুমার। সারদা কেলেঙ্কারি সহ একাধিক হাই-প্রোফাইল বিতর্কে নাম জড়ানো এই আইপিএস আধিকারিককে তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে রাজ্যসভায় পাঠানো নিয়ে তীব্র কটাক্ষ করেন শাহ।
তিনি বলেন, "যাঁকে ঘিরে এত বিতর্ক, যাঁর ভূমিকা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে, তাঁকেই রাজ্যসভায় পাঠিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।" অমিত শাহের দাবি, এই সিদ্ধান্ত আদতে তৃণমূল কংগ্রেসের চরম হতাশা এবং দেউলিয়াপনারই লক্ষণ। শাসক দল যে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে বিতর্কিত আমলাদের ব্যবহার করছে, রাজীব কুমারের রাজ্যসভায় যাওয়াই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। শাহ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ঘোষণা করেন, পশ্চিমবঙ্গে পরিবর্তনের সময় আসন্ন এবং খুব শীঘ্রই ভারতীয় জনতা পার্টি এই রাজ্যে ক্ষমতা দখল করে বর্তমান এই নৈরাজ্যের অবসান ঘটাবে।
সিএএ (CAA) বিরোধিতা এবং হিন্দু উদ্বাস্তুদের অধিকার
মথুরাপুরের মতো এলাকায়, যেখানে উদ্বাস্তু মানুষের বসবাস যথেষ্ট, সেখানে দাঁড়িয়ে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ (CAA) ইস্যুকে অত্যন্ত কৌশলে হাতিয়ার করেন অমিত শাহ। সিএএ-র বিরুদ্ধে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লাগাতার বিরোধিতার তীব্র সমালোচনা করেন তিনি।
শাহ বলেন, "মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি প্রথম থেকে সিএএ-র বিরোধিতা না করতেন, তাহলে বাংলাদেশ থেকে আসা ছিন্নমূল হিন্দু উদ্বাস্তুরা অনেক আগেই এবং আরও সহজে এদেশের নাগরিকত্ব পেয়ে যেতেন।" তিনি তৃণমূল নেত্রীর বিরুদ্ধে উদ্বাস্তুদের ভুল বোঝানোর অভিযোগ তোলেন। একইসঙ্গে, সভায় উপস্থিত মতুয়া এবং অন্যান্য হিন্দু উদ্বাস্তুদের আশ্বস্ত করে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভারতীয় জনতা পার্টির সরকার হিন্দু উদ্বাস্তুদের অধিকার রক্ষা এবং তাঁদের নাগরিকত্ব প্রদানের বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সিএএ কার্যকর করার মাধ্যমে সকলের আইনি অধিকার সুনিশ্চিত করা হবে।
অনুপ্রবেশ ইস্যু এবং লোক দেখানো 'মন্দির রাজনীতি'
রাজ্যে অনুপ্রবেশ এবং ডেমোগ্রাফিক পরিবর্তন নিয়েও এদিন চড়া সুরে কথা বলেন অমিত শাহ। তিনি সরাসরি অভিযোগ করেন যে, নিছকই সস্তা নির্বাচনী ফায়দা এবং ভোটব্যাঙ্ক সুরক্ষিত করার লক্ষ্যে তৃণমূল কংগ্রেস ইচ্ছাকৃতভাবে অনুপ্রবেশকারীদের মদত জোগাচ্ছে। এর ফলে রাজ্যের সীমান্ত সুরক্ষার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাও চরম হুমকির মুখে পড়ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে 'নরম হিন্দুত্ব' বা মন্দির নির্মাণ নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তাকেও 'লোক দেখানো ভণ্ডামি' বলে উড়িয়ে দিয়েছেন শাহ। তাঁর দাবি, অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণ এবং কাশী বিশ্বনাথ বা মহাকাল করিডোরের মতো সারা দেশজুড়ে বিভিন্ন তীর্থক্ষেত্রের যে অভাবনীয় উন্নয়ন বিজেপি সরকার করেছে, তা দেখে রাজনৈতিক চাপে পড়েই তৃণমূল এখন মন্দিরের কথা বলছে। এর আগে তারা হিন্দু তীর্থক্ষেত্রগুলির উন্নয়নের জন্য কিছুই করেনি।
এই প্রসঙ্গে সম্প্রতি তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত দাপুটে নেতা হুমায়ুন কবীরের আচরণের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক কৌশলের তুলনা টানেন শাহ। তিনি অভিযোগ করেন, বাবরী মসজিদ বা অন্যান্য ধর্মীয় স্থান নির্মাণ নিয়ে হুমায়ুন কবীর এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উভয়েই সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন। একদিকে দলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ বজায় রাখা এবং অন্যদিকে হিন্দু আবেগকে শান্ত করার জন্য তৃণমূল নেত্রী এই দ্বিমুখী নীতি গ্রহণ করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
মেগা 'পরিবর্তন যাত্রা' এবং টার্গেট ২০২৬
আগামী ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে বিজেপি যে আর এক ইঞ্চিও জমি ছাড়তে রাজি নয়, তা অমিত শাহের এই সভা থেকেই স্পষ্ট। রাজ্যজুড়ে গেরুয়া শিবিরের এই 'পরিবর্তন যাত্রা' ৫,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি পথ অতিক্রম করবে বলে দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে।
রাজ্যের প্রতিটি কোণায় পৌঁছতে ছোট-বড় মিলিয়ে অসংখ্য সভা এবং রোড-শোয়ের আয়োজন করা হয়েছে। এই মেগা প্রচার কর্মসূচির চূড়ান্ত সমাপ্তি ঘটবে কলকাতার ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে, যেখানে এক বিশাল সমাবেশে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত থাকবেন দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। মথুরাপুরের এই সভা থেকে কার্যত সেই মহাযুদ্ধেরই শঙ্খধ্বনি করে গেলেন অমিত শাহ, আর স্পষ্ট করে দিলেন যে আগামী দিনে বাংলায় বিজেপির প্রধান নির্বাচনী হাতিয়ার হতে চলেছে 'তোষণ-বিরোধী' এবং 'দুর্নীতি-মুক্ত' সুশাসনের ডাক।
Tags: #WestBengalElection2026 #AmitShah #MathurapurRally #ParivartanYatra #MamataBanerjee #TMCvsBJP #CAABengal #BengalPolitics #ManusherBhashaNews #PoliticalNewsBengali
0 মন্তব্যসমূহ