দিল্লি ও কলকাতায় পাকিস্তানপন্থী পোস্টার, মন্দিরে রেকি, নতুন মডিউল তৈরির পরিকল্পনা — বাংলাদেশকে ঘাঁটি করে ভারতে সক্রিয় লস্কর-ই-তৈয়বার শীর্ষ অপারেটিভ সাব্বির আহমেদ লোনকে গ্রেফতার করল দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল। তদন্তে উঠে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য।
মানুষের ভাষা | নিউজ ডেস্ক
কলকাতা, ৩১ মার্চ: বাংলায় বিধানসভা ভোটের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে এল একটি উদ্বেগজনক খবর। দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল গ্রেফতার করেছে এক শীর্ষ লস্কর-ই-তৈয়বা অপারেটিভকে। তার নাম সাব্বির আহমেদ লোন — রাজা এবং কাশ্মীরী ছদ্মনামে পরিচিত। গ্রেফতার হয়েছেন ঘাজিপুর থেকে, ২৯ মার্চ রাতে।
দিল্লি পুলিশের এক সিনিয়র আধিকারিক জানিয়েছেন, সাব্বির লস্কর-ই-তৈয়বার সঙ্গে যুক্ত একটি মডিউলের প্রধান হ্যান্ডলার ছিলেন। সেই মডিউল দিল্লি ও কলকাতার বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানপন্থী ও ভারত-বিরোধী পোস্টার লাগানোর ঘটনায় জড়িত বলে অভিযোগ।
পাতিয়ালা হাউস কোর্ট তাঁকে পাঁচ দিনের পুলিশ হেফাজতে পাঠিয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।
কে এই সাব্বির আহমেদ লোন?
সাব্বির লোন জম্মু-কাশ্মীরের শ্রীনগর জেলার বাসিন্দা। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন, এরপর বাটামালুর সালাফিয়া আরবি কলেজ থেকে দুই বছরের ইসলামি মাদ্রাসা কোর্স সম্পন্ন করেন।
২০০৪-০৫ সালে তাঁর এলাকায় লস্কর জঙ্গি আবু হুজাইফা আসতেন। তিনিই প্রথম সাব্বিরকে লস্করে টানেন। এরপর শুরু হয় প্রশিক্ষণ। পাকিস্তানের মুজাফফরাবাদে নেওয়া সেই প্রশিক্ষণে ছিল অস্ত্র চালানো, গ্রেনেড ছোড়া, গোপনে কাজ করা — সব।
২০০৭ সালে প্রথমবার গ্রেফতার হন। উদ্ধার হয় একে রাইফেল, গ্রেনেড সহ বিপুল অস্ত্র। দীর্ঘদিন তিহার জেলে ছিলেন। ২০১৯ সালে জামিনে বেরিয়ে আবার ফেরার হন — এবার ঘাঁটি করেন বাংলাদেশে।
বাংলাদেশ কেন বেছে নিল এই জঙ্গি?
বাংলাদেশে থাকাকালীন সাব্বির লস্কর-ই-তৈয়বার আইএসআই-সংযুক্ত নতুন হ্যান্ডলারদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। এই হ্যান্ডলারদের কোড নাম আবু হুজাইফা এবং সুমামা বাবার।
বাংলাদেশকে ঘাঁটি হিসেবে বেছে নেওয়ার কারণ পরিষ্কার। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত দীর্ঘ এবং বহু জায়গায় নজরদারি কঠিন। সরাসরি পাকিস্তান থেকে অপারেশন চালালে দ্রুত নজরে পড়ে। বাংলাদেশ থেকে করলে অনেক সময় আড়ালে থাকে।
সাব্বিরের কাজ ছিল বাংলাদেশ থেকে ভারতে স্লিপার সেল সক্রিয় করা, নতুন অপারেটিভ নিয়োগ করা এবং সেই প্রক্রিয়ায় সীমান্ত পেরনো সহজ করা।
কলকাতা ছিল লঞ্চিং প্যাড
এই গোটা ঘটনায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি হল কলকাতার সরাসরি ভূমিকা।
তদন্তে জানা গেছে, সাব্বির কলকাতায় একটি অপারেশনাল বেস তৈরি করেছিলেন। এই বেস থেকেই একাধিক রাজ্যে কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা ছিল।
দিল্লির মেট্রো স্টেশনে পাকিস্তানপন্থী পোস্টার লাগানো — 'India stop genocide and Free Kashmir', 'Hum Pakistan Hain' — এই ঘটনাগুলো আসলে একটি 'টেস্ট রান' ছিল। অপারেশনের ক্ষমতা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিক্রিয়া মূল্যায়নের জন্যই এই কাজ করা হয়েছিল। কলকাতায়ও একই ধরনের পোস্টার লাগানো হয়েছিল।
এর পাশাপাশি দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থান — কালকাজি মন্দির, লোটাস টেম্পল, ছতরপুর মন্দির — এবং কনট প্লেসের মতো জনবহুল এলাকার রেকি করা হয়েছিল। রেকির ভিডিয়ো পাকিস্তানে পাঠানো হয়েছিল।
পুরো মডিউলটা কীভাবে কাজ করত?
ফেব্রুয়ারি ৮, ২০২৬-এ দিল্লির সুপ্রিম কোর্ট মেট্রো স্টেশনে পোস্টার পাওয়া যায়। সিআইএসএফ অভিযোগ দায়ের করে। এরপর তদন্ত শুরু হয়।
২২ মার্চ দিল্লি পুলিশ এই মডিউলের সঙ্গে যুক্ত আটজন বাংলাদেশী নাগরিককে গ্রেফতার করে। তামিলনাড়ু এবং পশ্চিমবঙ্গেও অভিযান চলেছে।
৩০ মার্চ গ্রেফতার হলেন মূল মাস্টারমাইন্ড সাব্বির। দিল্লি পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার প্রমোদ কুশওয়া জানান, এই মডিউলের সঙ্গে লস্কর-ই-তৈয়বার সরাসরি যোগসূত্র প্রমাণিত।
নেটওয়ার্কটি কয়েকটি ধাপে কাজ করত। প্রথমে টার্গেট করা হত বেকার তরুণদের — আর্থিক লোভ দেখানো এবং ধর্মীয় উগ্রতা দিয়ে প্রভাবিত করা। এরপর ট্রেনিং — বেসিক এবং অ্যাডভান্সড। তারপর মাঠে কাজে নামানো।
আইএসআইয়ের প্রক্সি যুদ্ধ
সাব্বির জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, আইএসআই দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট বা টিআরএফ-এর আদলে একটি নতুন সংগঠন তৈরির পরিকল্পনা করছিল। প্রসঙ্গত, টিআরএফই গত বছর পাহেলগামের মর্মান্তিক হামলায় জড়িত ছিল।
সাব্বিরের সহযোগী সজ্জাদ গুল — যার সঙ্গে ২০১৬ সালে একসঙ্গে গ্রেফতার হয়েছিলেন — জামিনে বেরিয়ে পাকিস্তান চলে গেছে এবং সেখান থেকে টিআরএফ পরিচালনা করছে।
এই পুরো নেটওয়ার্কের পেছনে পাকিস্তানের আইএসআই — পরিকল্পনা, অর্থ, নির্দেশ — সবকিছু তাদের মাধ্যমে আসে। কিন্তু এমনভাবে যাতে সরাসরি পাকিস্তানের নাম না আসে। তদন্তকারীরা বলছেন, এটাই আইএসআইয়ের চিরাচরিত প্রক্সি ওয়ার কৌশল।
তদন্তকারীরা হাওয়ালা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আসা অর্থের সূত্র ধরছেন। উদ্ধার হয়েছে বাংলাদেশী টাকা, পাকিস্তানি মুদ্রা এবং নেপালি নোটও।
ভোটমুখী বাংলার জন্য কতটা উদ্বেগের?
পশ্চিমবঙ্গের ভোট যত এগিয়ে আসছে, এই গ্রেফতারির গুরুত্ব তত বাড়ছে। কলকাতাকে 'লঞ্চিং প্যাড' হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের দুর্বলতা, রাজ্যে অবৈধভাবে থাকা বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীদের নেটওয়ার্কে ব্যবহার — এই সব মিলিয়ে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা উদ্বিগ্ন।
দিল্লি, কলকাতা এবং তামিলনাড়ুতে একযোগে অভিযান চালিয়েছে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো। তদন্ত এখনও চলছে। পাঁচ দিনের পুলিশ হেফাজতে সাব্বিরকে ঘনিষ্ঠভাবে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। আরও বড় নেটওয়ার্কের সূত্র বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভোটের মাঠে প্রচারের উত্তাপ যখন চরমে, তখন এই গ্রেফতারি একটাই প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে — রাজ্যের ভেতরে এই নেটওয়ার্কের আর কতটা শিকড় ছড়িয়ে আছে?
0 মন্তব্যসমূহ