Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

Recent in Home

মালদায় বেনজির অরাজকতা! ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদের প্রতিবাদে বিচারকদের আটকে রেখে বিক্ষোভ, প্রশ্নের মুখে রাজ্যের নিরাপত্তা



মানুষের ভাষা | নিউজ ডেস্ক


মালদা: লোকসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমশ বেড়েই চলেছে। ভোটের ময়দান যত প্রস্তুত হচ্ছে, ততই শাসক এবং বিরোধী শিবিরের মধ্যে রাজনৈতিক তরজা তীব্র আকার ধারণ করছে। কিন্তু এর মধ্যেই মালদা জেলায় যা ঘটল, তা কার্যত বেনজির এবং চরম উদ্বেগজনক একটি ঘটনা। শুধুমাত্র ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার জল্পনা এবং 'স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন' বা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ার প্রতিবাদে একেবারে বিচারকদের আটকে রেখে চলল তুমুল বিক্ষোভ!

মালদার কালিয়াচক ২ নম্বর ব্লক ডেভেলপমেন্ট অফিসে (BDO Office) টানা কয়েক ঘণ্টা ধরে সাতজন বিচারবিভাগীয় আধিকারিককে (Judicial Officers) অবরুদ্ধ করে রাখা হল। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হল, এই আটকে পড়া আধিকারিকদের মধ্যে তিনজন মহিলা বিচারকও ছিলেন। দিনের আলো থেকে শুরু হওয়া এই ঘেরাও-বিক্ষোভ চলল গভীর রাত পর্যন্ত। নির্বাচনের মতো একটি হাই-ভোল্টেজ এবং স্পর্শকাতর সময়ে, খোদ বিচারকদের ওপর এই ধরনের আগ্রাসী আচরণের ফলে পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা এবং রাজ্যের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র শোরগোল পড়ে গিয়েছে রাজ্যজুড়ে।

নেপথ্যে এসআইআর (SIR) বা স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন বিতর্ক

রাজ্যে অবাধ, স্বচ্ছ এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সুনিশ্চিত করতে জাতীয় নির্বাচন কমিশন প্রথম থেকেই কড়া অবস্থান গ্রহণ করেছে। সেই প্রক্রিয়ার অঙ্গ হিসেবেই, সুপ্রিম কোর্টের কড়া নির্দেশে বর্তমানে ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ চলছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যে পূর্ণাঙ্গ ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়েছিল, সেখানে বহু ভোটারের নামের পাশে 'আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন' (Under Adjudication) বা 'বিচারাধীন' কথাটি উল্লেখ করা হয়েছিল। মূলত নাগরিকত্ব বা ভোটাধিকারের সত্যতা নিয়ে সংশয় দেখা দিলেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

এই নির্দিষ্ট ভোটারদের নাগরিকত্ব বা ভোটাধিকারের সত্যতা যাচাই করার জন্যই নিয়োগ করা হয়েছে বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের। তাঁরাই প্রতিটি কেস পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন যে, এই নামগুলি ভোটার তালিকায় বহাল থাকবে নাকি পাকাপাকিভাবে তালিকা থেকে ডিলিট (Delete) বা মুছে দেওয়া হবে। এই গোটা প্রক্রিয়াটিই প্রশাসনিক ভাষায় 'এসআইআর' (SIR) নামে পরিচিত। আর এই তালিকা সংশোধনের কাজ ঘিরেই চরম উত্তেজনা ছড়িয়েছে মালদার বিস্তীর্ণ এলাকায়।

কালিয়াচকে ঠিক কী ঘটেছিল?

স্থানীয় প্রশাসন এবং পুলিশ সূত্রে খবর, ঘটনার দিন সকাল থেকেই মালদার কালিয়াচক ২ নম্বর বিডিও অফিসের সামনে উত্তেজনা দানা বাঁধতে শুরু করে। এলাকার বহু মানুষ, যাঁদের নাম ভোটার তালিকায় 'বিচারাধীন' অবস্থায় রয়েছে, তাঁরা বিডিও অফিসে জড়ো হতে থাকেন। তাঁদের দাবি ছিল, অবিলম্বে বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের সঙ্গে সরাসরি দেখা করে কথা বলতে হবে এবং কেন তাঁদের নাম বাদ পড়ার মুখে, তার কৈফিয়ত দিতে হবে।

কিন্তু আইনি নিয়ম অনুযায়ী, এই ধরনের স্পর্শকাতর শুনানির সময় বাইরে থেকে কেউ এসে সরাসরি বিচারকদের কাজে হস্তক্ষেপ করতে পারেন না। তাই জমায়েত হওয়া উন্মত্ত জনতাকে বিডিও অফিসের ভেতরে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হয়নি। আর এতেই পরিস্থিতি কার্যত অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। বিকেল ৪টে নাগাদ বিক্ষোভকারীরা বিডিও অফিস চত্বরে ব্যাপক জমায়েত করে গোটা অফিসটাই কার্যত ঘিরে ফেলেন।

ভেতরে তখন নিজেদের কাজ করছিলেন সাতজন বিচারক। বিক্ষোভের তীব্রতা এতটাই মারাত্মক আকার ধারণ করে যে, ওই আধিকারিকরা কেউ নিজেদের চেম্বার থেকে বাইরে বেরোতে পারেননি। বাইরে দফায় দফায় চলতে থাকে স্লোগান এবং লাগাতার বিক্ষোভ প্রদর্শন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, বাইরে বাঁশ, লাঠি নিয়ে রাস্তা অবরোধ থেকে শুরু করে ইট-বৃষ্টির মতো অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটেছে। অবরুদ্ধ অবস্থার মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে শুরু করেন ওই আধিকারিকরা, বিশেষ করে আটকে পড়া তিনজন মহিলা বিচারক। ঘন্টার পর ঘন্টা এই অচলাবস্থা জারি থাকলেও, প্রাথমিক পর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়।

নির্বাচন কমিশনের কড়া পদক্ষেপ এবং প্রশাসনের তৎপরতা

বিচারকদের আটকে রাখার খবর নির্বাচন কমিশনে পৌঁছতেই নড়েচড়ে বসে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (CEO) দপ্তর। এই বেনজির ঘেরাও এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতির ঘটনায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করা হয় কমিশনের শীর্ষ মহলের তরফ থেকে। সঙ্গে সঙ্গে জেলা প্রশাসনকে কড়া বার্তা পাঠানো হয়।

কমিশনের এক শীর্ষ কর্তা সংবাদমাধ্যমকে জানান, "আমরা গোটা ঘটনাটির দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছি। এই ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। ইতিমধ্যেই মালদার জেলাশাসক (DM) এবং পুলিশ সুপারকে (SP) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে অবিলম্বে ঘটনাস্থলে পৌঁছে আটকে পড়া বিচারকদের সুরক্ষিতভাবে উদ্ধার করার জন্য।" পাশাপাশি এই ঘটনায় রাজ্যের ডিরেক্টর জেনারেল অফ পুলিশের (DGP) কাছে একটি বিস্তৃত রিপোর্টও তলব করেছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন।

পরিস্থিতি সামাল দিতে এলাকায় বিশাল পুলিশ বাহিনীর পাশাপাশি কেন্দ্রীয় বাহিনী (Central Forces) মোতায়েন করা হয়। শেষ পর্যন্ত দীর্ঘক্ষণের চেষ্টায় এবং কড়া নিরাপত্তার ঘেরাটোপে আটকে থাকা বিচারকদের সুরক্ষিত অবস্থায় উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।

তুঙ্গে রাজনৈতিক তরজা: মুখ্যমন্ত্রীর তোষণ নীতিকে বিঁধলেন সুকান্ত

বিচারকদের মতো নিরপেক্ষ এবং সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তিদের এভাবে আটকে রেখে হেনস্থা করার ঘটনায় স্বভাবতই রাজনৈতিক তরজা তুঙ্গে উঠেছে। এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শাসকদলের বিরুদ্ধে চাঁচাছোলা আক্রমণ শানিয়েছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা বিজেপি নেতা সুকান্ত মজুমদার।

তাঁর অভিযোগ, রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রীর দীর্ঘদিনের 'তোষণ নীতি' এবং ক্রমাগত উসকানিমূলক মন্তব্যের জন্যই আজ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে। তিনি বলেন, "আজ বাংলায় বিচারবিভাগীয় আধিকারিকরাও সুরক্ষিত নন। তাঁদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রেখে ক্রমাগত হুমকি ও ভয় দেখানো হচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে হামলার চেষ্টা হয়েছে। প্রকাশ্য দিবালোকে বাঁশ-লাঠি নিয়ে রাস্তা আটকে রাখা হচ্ছে, গাড়ি ভাঙচুর করা হচ্ছে। আর প্রশাসন নীরব দর্শক হয়ে বসে আছে।"

সুকান্ত মজুমদারের আরও দাবি, রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে নিজের পদের গাম্ভীর্য না রেখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্রমাগত উসকানিমূলক রাজনীতি করে চলেছেন। এর ফলে গোটা রাজ্যেই, বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে একটি অস্থির এবং বিপজ্জনক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এই চরম অরাজকতার জন্য মুখ্যমন্ত্রীকেই সম্পূর্ণভাবে দায়ী করেছেন তিনি। পাশাপাশি, জাতীয় নির্বাচন কমিশনের কাছে এই ঘটনার প্রেক্ষিতে অবিলম্বে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ারও আর্জি জানিয়েছেন তিনি।

সীমান্তবর্তী জেলা মালদা: কেন এত স্পর্শকাতর?

বাংলায়, বিশেষ করে মালদা এবং মুর্শিদাবাদের মতো আন্তর্জাতিক সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে ভোটার তালিকা একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং রাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত থাকার কারণে এই অঞ্চলে বেআইনি অনুপ্রবেশ এবং নাগরিকত্ব নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর বহু দশকের পুরনো।

বিরোধী দলগুলির দীর্ঘদিনের অভিযোগ, শাসকদল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নিজেদের ভোটব্যাঙ্ক অটুট রাখতে বাংলাদেশ থেকে আসা বহু বেআইনি অনুপ্রবেশকারীকে ভুয়ো ভোটার হিসেবে তালিকায় ঢুকিয়ে রেখেছে। অন্যদিকে শাসকদলের পালটা দাবি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এবং মেরুকরণের রাজনীতির ফায়দা তুলতে বহু প্রকৃত এবং বৈধ ভারতীয় নাগরিকের নাম ভোটার তালিকা থেকে ছলেবলে কৌশলে বাদ দেওয়ার গভীর চক্রান্ত চলছে।

এই চরম অবিশ্বাসের আবহে, যখন বিচারকদের দিয়ে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে তালিকা সংশোধনের কাজ শুরু হয়েছে, তখনই এমন পরিকল্পিত বিক্ষোভ ও ঘেরাওয়ের ঘটনা பல প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। ওয়াকিবহাল মহলের একাংশের মতে, যাঁদের নাম সত্যিই বাদ যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে বা যাঁরা অবৈধভাবে তালিকায় স্থান পেয়েছিল, তাঁরাই এই বিক্ষোভের নেপথ্যে ইন্ধন জোগাতে পারে। বিচারকদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে এবং এলাকায় ভয়ের পরিবেশ কায়েম করে নিজেদের নাম তালিকায় টিকিয়ে রাখার একটা মরিয়া চেষ্টা হিসেবেই এই ঘেরাও-বিক্ষোভকে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ।

শেষ কথা: আগামী দিনে কমিশনের ভূমিকা

আগামী ২৩ এবং ২৯ এপ্রিল, এই দুই দফায় পশ্চিমবঙ্গে ভোটগ্রহণ পর্ব অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণার পর থেকেই নির্বাচন কমিশন রাজ্যের প্রশাসন এবং পুলিশের রদবদলে একাধিক কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে। অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের লক্ষ্যে বারবার জিরো-টলারেন্স নীতির কথা বলা হচ্ছে কমিশনের তরফ থেকে। কিন্তু তা সত্ত্বেও মালদার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলায় খোদ বিচারকদের আটকে রাখার এই ঘটনা প্রমাণ করছে, গ্রাউন্ড জিরোর বাস্তব পরিস্থিতি এখনও কতটা চ্যালেঞ্জিং এবং উদ্বেগজনক।

মালদার এই ঘটনার পর রাজ্যজুড়ে এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ায় নিযুক্ত অন্যান্য বিচারক এবং আধিকারিকদের নিরাপত্তা নিয়েও বড়সড় প্রশ্ন উঠে গেল। কমিশন এই ঘটনার পর প্রতিটি বিডিও অফিস এবং যেখানে যেখানে ভোটার তালিকার শুনানির কাজ চলছে, সেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও আঁটসাঁট করবে বলে মনে করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, মালদার কালিয়াচকের এই ঘেরাও কাণ্ড শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং রাজ্যের আসন্ন নির্বাচনের আগে এক অশনিসংকেত। পুলিশ প্রশাসন আগামী দিনে এই ধরনের পরিস্থিতি কতটা শক্ত হাতে এবং নিরপেক্ষভাবে মোকাবিলা করতে পারে, সেটাই এখন দেখার। কারণ, বিচারব্যবস্থা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত আধিকারিকরা যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তবে সাধারণ মানুষের মনেও অবাধ ও স্বচ্ছ নির্বাচন নিয়ে সংশয় তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।


 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Comments

Ad Code