Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

Recent in Home

এসআইআর বিচারকদের ওপর হামলা: ‘সবচেয়ে বেশি মেরুকরণের রাজ্য’, পশ্চিমবঙ্গকে তীব্র ভর্ৎসনা করে সিবিআই-এনআইএ তদন্তের নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের

 মানুষের ভাষা | নিউজ ডেস্ক

মালদহ: রাজ্যে আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে কতটা শোচনীয় অবনতি ঘটেছে, মালদহের মোথাবাড়ির ঘটনা কার্যত তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। ভোটার তালিকা সংশোধনের (SIR) কাজে নিযুক্ত সাতজন বিচারবিভাগীয় আধিকারিককে (Judicial Officers) ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রেখে চরম হেনস্থা এবং তাণ্ডব চালানোর ঘটনায় এবার অভাবনীয় কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করল সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বর্তমানে "সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়েছে"।

এই নজিরবিহীন অরাজকতার ঘটনায় স্বতঃপ্রণোদিতভাবে (Suo Motu) মামলা গ্রহণ করে দেশের সর্বোচ্চ আদালত নির্দেশ দিয়েছে যে, মোথাবাড়ির এই তাণ্ডবের ঘটনার তদন্তভার এবার কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার হাতেই যাচ্ছে। তবে সিবিআই (CBI) নাকি এনআইএ (NIA)— কারা এই ঘটনার তদন্ত করবে, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার জাতীয় নির্বাচন কমিশনের (Election Commission of India) ওপর ছেড়ে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সূর্যকান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ। পাশাপাশি, চরম প্রশাসনিক গাফিলতির অভিযোগে রাজ্যের মুখ্যসচিব (Chief Secretary), স্বরাষ্ট্রসচিব (Home Secretary) এবং পুলিশের ডিরেক্টর জেনারেল (DGP)-কে কড়া ভাষায় শোকজ করা হয়েছে।

বিকেল ৪টে থেকে মাঝরাত: মোথাবাড়ির সেই অভিশপ্ত প্রহর

সুপ্রিম কোর্টের শুনানিতে মোথাবাড়ির ঘটনার যে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ উঠে এসেছে, তা যেকোনো সভ্য সমাজের জন্য চরম লজ্জাজনক। জানা গিয়েছে, এসআইআর বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন প্রক্রিয়ার কাজ চলাকালীন বিকেল আনুমানিক ৪টে নাগাদ মোথাবাড়িতে বিচারকদের ঘিরে ধরে বিক্ষোভ এবং তাণ্ডব শুরু হয়। অভিযোগ, এই গোটা প্রক্রিয়াটিকে ভেস্তে দেওয়ার লক্ষ্যেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই হামলা চালানো হয়েছিল।

পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে কলকাতা হাইকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল অবিলম্বে রাজ্যের শীর্ষ প্রশাসনিক কর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। রাজ্যের ডিজিপি এবং স্বরাষ্ট্রসচিবকে সরাসরি ফোন করে গোটা ঘটনা সম্পর্কে অবগত করা হয় এবং বিচারকদের দ্রুত উদ্ধারের আর্জি জানানো হয়। রাজ্যের পুলিশ প্রশাসনের তরফ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে, দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। কিন্তু শীর্ষ আদালতের পর্যবেক্ষণ বলছে, এই "দ্রুত পদক্ষেপ"-এর আশ্বাস ছিল সম্পূর্ণ অন্তঃসারশূন্য।

বিকেল ৪টে থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত— দীর্ঘ সাড়ে চার ঘণ্টা কেটে যাওয়ার পরেও পুলিশ প্রশাসনের তরফ থেকে ঘটনাস্থলে কোনো সাহায্য পৌঁছায়নি। আটকে পড়া সাতজন বিচারবিভাগীয় আধিকারিক, যাঁর মধ্যে তিনজন মহিলা আধিকারিকও ছিলেন, কার্যত অবরুদ্ধ অবস্থায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকেন।

অমানবিকতার চরম সীমা: জল-খাবার থেকেও বঞ্চিত বিচারকরা

সুপ্রিম কোর্টের এজলাসে এই ঘটনার যে ভয়াবহ বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তা শিউরে ওঠার মতো। শীর্ষ আদালত চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছে যে, আটকে থাকা ওই আধিকারিকদের বিন্দুমাত্র জল বা খাবার পর্যন্ত পৌঁছাতে দেওয়া হয়নি। বিক্ষোভকারীরা এমন এক অমানবিক পরিস্থিতি তৈরি করেছিল যেখানে একজন মহিলা বিচারক, যাঁর বাড়িতে পাঁচ বছরের এক একরত্তি শিশু রয়েছে, তিনিও চরম আতঙ্কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা খাবার ও জল ছাড়া বন্দি দশায় কাটাতে বাধ্য হন।

রাত গড়িয়ে যাওয়ার পরেও যখন রাজ্য প্রশাসন কার্যত হাত গুটিয়ে বসে থাকে, তখন বাধ্য হয়ে সুপ্রিম কোর্ট নিজে এই বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে এবং কড়া বার্তা পাঠায়। শীর্ষ আদালতের সেই চরম হুঁশিয়ারির পর, শেষমেশ রাত আনুমানিক ১২টা নাগাদ ওই বিচারকদের অতি কষ্টে উদ্ধার করে আনা সম্ভব হয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, যখন পুলিশি নিরাপত্তায় তাঁদের উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, সেই সময়ও দুষ্কৃতীরা তাঁদের লক্ষ্য করে ক্রমাগত ইট ও পাথর ছুঁড়তে থাকে এবং তাঁদের গাড়িতে লাঠি দিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়।

'আমরা জানি নেপথ্যে কারা আছে': রাজনৈতিক যুক্তি খারিজ শীর্ষ আদালতের

রাজ্য সরকারের তরফ থেকে বা আইনজীবীদের একাংশের তরফ থেকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছিল যে, মোথাবাড়ির এই ঘটনার পেছনে কোনো রাজনৈতিক রং নেই, এটি সম্পূর্ণ একটি 'অরাজনৈতিক' (Apolitical) জনরোষ। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট এই যুক্তিকে কার্যত ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিয়েছে।

বিচারপতিরা অত্যন্ত কড়া ভাষায় রাজ্যের আইনজীবীদের (অ্যাডভোকেট জেনারেল-সহ) উদ্দেশ্য করে বলেন, "আপনারা কি মনে করেন যে আমরা জানি না এই গোটা ঘটনার পেছনে কারা আছে? কারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে এবং এর দায়ভার কাদের, সে সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্ট সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল।" শীর্ষ আদালত মনে করে, বিচারকদের শুধুমাত্র হেনস্থা করাই এই তাণ্ডবের মূল উদ্দেশ্য ছিল না; বরং এই গোটা বিচারব্যবস্থা এবং এসআইআর প্রক্রিয়ার প্রতি বিচারকদের যে আত্মবিশ্বাস, তা সমূলে ভেঙে দেওয়াই ছিল এই আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য।

বিচারকরা সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশেই এবং সুপ্রিম কোর্টের হয়েই (On behalf of the Supreme Court) নিরপেক্ষভাবে এই তালিকা সংশোধনের কাজ করছিলেন। এসডিও (SDO) বা বিডিও (BDO)-দের হাত থেকে এই দায়িত্ব সরিয়ে বিচারকদের দেওয়া হয়েছিল, যাতে কোনো রাজনৈতিক দলের কোনো অভিযোগ বা আপত্তি না থাকে। তাই বিচারকদের ওপর এই হামলাকে সুপ্রিম কোর্ট নিজেদের নির্দেশের ওপর সরাসরি আঘাত বলেই মনে করছে।

তদন্তভার সিবিআই না এনআইএ-কে? সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন

এই ঘটনার তদন্ত নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। আদালত জানিয়েছে যে, রাজ্য পুলিশের ওপর এই ঘটনার তদন্তভার আর ছাড়া যাবে না। জাতীয় নির্বাচন কমিশন ঠিক করবে যে এই ঘটনার তদন্ত সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (CBI) করবে, নাকি ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (NIA) করবে।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এর আগে এই ধরনের মামলায় কলকাতা হাইকোর্টে অভিযোগ জানানোর কথা বলা হলেও, মোথাবাড়ির ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে যে, তদন্তকারী সংস্থাকে তাদের প্রাথমিক রিপোর্ট সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের কাছেই পেশ করতে হবে। অর্থাৎ, শীর্ষ আদালত নিজেই এই তদন্তের ওপর সরাসরি নজরদারি (Monitoring) চালাবে। ফলস্বরূপ, অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনাই আর রইল না বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা।

প্রশাসনিক ব্যর্থতা: কাঠগড়ায় মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব ও ডিজিপি

রাজ্যের শীর্ষ আমলাদের ভূমিকা নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট যে কতটা ক্ষুব্ধ, তা তাদের নির্দেশে স্পষ্ট। যখন কলকাতা হাইকোর্টের প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিরা জরুরি পরিস্থিতিতে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন, তখন কেন হোয়াটসঅ্যাপ বা ফোনে উপযুক্ত সাড়া মিলবে না? কেন আশ্বাস দেওয়ার পরেও আট ঘণ্টা ধরে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে না? এই প্রশ্নগুলি তুলে সুপ্রিম কোর্ট রাজ্যের মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব এবং রাজ্য পুলিশের ডিজি-কে সরাসরি শোকজ (Show cause) করেছে। আগামী শুনানির দিন এই তিন শীর্ষ আধিকারিককে ভার্চুয়ালি (Virtually) আদালতে উপস্থিত থেকে এই চরম প্রশাসনিক গাফিলতির জবাবদিহি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালত জানিয়েছে, রাজ্যের সর্বোচ্চ আধিকারিকদের এই শিথিল ভূমিকা অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং এটি কখনোই ভালোভাবে নেওয়া হচ্ছে না।

বিচারকদের নিরাপত্তায় কড়া নির্দেশিকা জারি

আগামী দিনে যাতে এ রাজ্যের বুকে আর কোনো বিচারককে এই ধরনের অমানবিক পরিস্থিতির শিকার না হতে হয়, তার জন্য সুপ্রিম কোর্ট তাৎক্ষণিকভাবে বেশ কয়েকটি কড়া নির্দেশিকা জারি করেছে:

  • কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিরাপত্তা: অবিলম্বে এসআইআর প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত সমস্ত বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের অফিসে এবং তাঁদের বাসস্থানে বা পরিবারের জন্য কেন্দ্রীয় বাহিনীর (Central Forces) নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা প্রদান করতে হবে।

  • জমায়েতে নিষেধাজ্ঞা: যে সমস্ত বিডিও অফিস বা এসডিও অফিসে এসআইআর-এর শুনানি বা কাজ চলছে, তার আশেপাশে পাঁচজনের বেশি মানুষ কোনোভাবেই জমায়েত করতে পারবেন না। অবিলম্বে এই নির্দেশিকা কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Comments

Ad Code