মানুষের ভাষা | নিউজ ডেস্ক
কলকাতা: তিলোত্তমার বুকে একসময়ের ছিমছাম আবাসিক এলাকাগুলি গত কয়েক বছরে ক্রমশ বদলে গিয়েছে গগনচুম্বী বহুতলের জঙ্গলে। দক্ষিণ কলকাতার বালিগঞ্জ, কসবা কিংবা ঢাকুরিয়ার মতো অভিজাত এবং ব্যস্ত এলাকাগুলিতে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে একের পর এক নির্মাণ প্রকল্প। আর এই রিয়েল এস্টেট বা আবাসন শিল্পের উল্কাগতির উত্থানের সঙ্গেই হাত ধরাধরি করে জন্ম নিয়েছে আরেক অন্ধকার জগৎ— 'সিন্ডিকেট রাজ'। সেই অন্ধকার জগতের অন্যতম এক মুকুটহীন সম্রাট, ওই বিস্তীর্ণ এলাকার অঘোষিত ত্রাস বিশ্বজিৎ পোদ্দার ওরফে সোনা পাপ্পুর ডেরায় এবার সরাসরি কড়া নাড়ল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)।
নির্মাণ কাজের নামে দিনের পর দিন কোটি কোটি টাকা তোলাবাজি এবং সেই কালো টাকা সমাজের মাথা বা তথাকথিত প্রভাবশালীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে বুধবার সকাল থেকে বালিগঞ্জের ফার্ন রোডে সোনা পাপ্পুর বিলাসবহুল বাসভবনে শুরু হয়েছে ইডি-র মেগা তল্লাশি অভিযান। শুধু বালিগঞ্জেই নয়, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার এই বিশেষ অভিযান এদিন একযোগে চলছে শহরের মোট ছ'টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানায়। এই ম্যারাথন তল্লাশি ঘিরে ইতিমধ্যেই চরম চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে রাজ্য রাজনীতি এবং প্রশাসনিক মহলে।
কে এই সোনা পাপ্পু?
স্থানীয় বাসিন্দা থেকে শুরু করে পুলিশ প্রশাসন— বালিগঞ্জ, ঢাকুরিয়া এবং কসবা অঞ্চলে 'সোনা পাপ্পু' নামটার সঙ্গে সকলেই পরিচিত। তবে এই পরিচিতি কোনও সম্মান বা শ্রদ্ধার নয়, বরং এক চূড়ান্ত আতঙ্কের। এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট এবং পুলিশের খাতায় তাঁর আসল নাম বিশ্বজিৎ পোদ্দার। অভিযোগ, বিগত কয়েক বছর ধরে গোটা দক্ষিণ কলকাতা জুড়ে দাপিয়ে বেরিয়েছে তাঁর নিজস্ব গ্যাং।
কী ধরনের অভিযোগ রয়েছে এই সোনা পাপ্পুর বিরুদ্ধে? ইডি এবং পুলিশ সূত্রে পাওয়া খবর অনুযায়ী, খুন, খুনের চেষ্টা, তোলাবাজি, বোমাবাজি, অবৈধ জমি দখল এবং সর্বোপরি বেআইনি সিন্ডিকেট পরিচালনা করার মতো অন্তত ১৫টির বেশি জামিন অযোগ্য এফআইআর (FIR) দায়ের রয়েছে তাঁর নামে। একাধিক হাই-প্রোফাইল অপরাধমূলক মামলায় তিনি দীর্ঘদিন ধরে ‘ওয়ান্টেড’ বা ফেরার। সম্প্রতি রবীন্দ্র সরোবর থানা এলাকার কাঁকুলিয়া রোডে প্রকাশ্যে দুই দুষ্কৃতী গোষ্ঠীর মধ্যে যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এবং বোমাবাজির ঘটনা ঘটেছিল, সেখানেও মূল চক্রী বা 'মাস্টারমাইন্ড' হিসেবে বারবার উঠে এসেছিল এই সোনা পাপ্পুর নাম। আশ্চর্যের বিষয় হল, পুলিশের খাতায় ফেরার থাকা অবস্থাতেও তাঁকে একাধিকবার সোশ্যাল মিডিয়ায় বুক ফুলিয়ে লাইভ করতে দেখা গিয়েছে, যা পুলিশের ভূমিকা নিয়েও বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছিল।
ফার্ন রোডে শ্বেতশুভ্র 'পোদ্দার হাউস' এবং ইডির হানা
বুধবার ঠিক সকালের আলো ফোটার পরেই বালিগঞ্জ স্টেশনের কাছে ফার্ন রোডের একটি গলিতে এসে থামে কেন্দ্রীয় বাহিনীর একাধিক কনভয়। গাড়ি থেকে নেমেই সরাসরি একটি পেল্লায় সাদা রঙের বাড়ির দিকে এগিয়ে যান ইডি আধিকারিকরা। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে আস্ত এক রাজপ্রাসাদ। আধুনিক স্থাপত্যে মোড়া এই বিলাসবহুল বাড়িটিই সোনা পাপ্পুর বর্তমান ঠিকানা।
বাড়ির সদর গেটের ঠিক বাইরে জ্বলজ্বল করছে একটি সুদৃশ্য নেমপ্লেট— 'পোদ্দার হাউস'। আর সেখানেই পর পর লেখা রয়েছে তিনটি নাম। প্রথম নামটাই হল বিশ্বজিৎ পোদ্দার (সোনা পাপ্পুর আসল নাম), তার ঠিক নিচেই লেখা সোমা পোদ্দার এবং অহনা পোদ্দার। এই বাড়ি দেখলেই যে কারোর মনে প্রশ্ন জাগতে বাধ্য যে, বিপুল পরিমাণ টাকার বিনিয়োগ ছাড়া এমন এলাহি প্রাসাদ তৈরি করা কীভাবে সম্ভব!
সকাল থেকেই এই গোটা বাড়িটি সম্পূর্ণভাবে অবরুদ্ধ করে রেখেছেন কেন্দ্রীয় বাহিনীর সশস্ত্র জওয়ানরা। সদর গেট ভেতর থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বাইরে পাহারায় রয়েছেন আধা সেনার জওয়ানরা, যাতে ভেতরে বাইরের কোনও অবাঞ্ছিত ব্যক্তি প্রবেশ করতে না পারেন, বা ভেতর থেকে কেউ বাইরে বেরোতে না পারেন। বাড়ির দু'দিকে লাগানো সিসিটিভি ক্যামেরাগুলির দিকেও কড়া নজর রেখেছেন তদন্তকারীরা। ইতিমধ্যেই সেই ক্যামেরার ডিভিআর (DVR) এবং ফুটেজ নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
কীভাবে চলত সিন্ডিকেটের এই কোটি টাকার সাম্রাজ্য?
সোনা পাপ্পুর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রিয়েল এস্টেট বা নির্মাণ ক্ষেত্র। ইডি আধিকারিকরা গত কয়েকদিন ধরেই অত্যন্ত গোপনে সোনা পাপ্পুর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া পুরনো এফআইআর-গুলি নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলেন। অন্তত চার থেকে পাঁচটি নির্দিষ্ট অভিযোগকে সামনে রেখেই এই আর্থিক দুর্নীতির তদন্ত বা ইসিআইআর (ECIR) দায়ের করেছে ইডি।
স্থানীয় এবং গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, কসবা বা বালিগঞ্জ এলাকায় যে কোনও নতুন বহুতল বা ফ্ল্যাট নির্মাণের কাজ শুরু হলেই সেখানে অবধারিতভাবে পৌঁছে যেত সোনা পাপ্পুর দলবল। তাঁদের অলিখিত নিয়ম ছিল একটাই— ওই এলাকায় কাজ করতে হলে ইট, বালি, পাথর, সিমেন্ট থেকে শুরু করে যাবতীয় নির্মাণ সামগ্রী কিনতে হবে সোনা পাপ্পুর নির্দিষ্ট করা লোকজনের কাছ থেকেই। এবং সেই সামগ্রী কিনতে হত বাজারদরের চেয়ে বহুগুণ বেশি দামে। শুধু তাই নয়, প্রোমোটারদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের 'প্রোটেকশন মানি' বা তোলা আদায় করা হত। টাকা না দিলে সাইটে কাজ বন্ধ করে দেওয়া, প্রোমোটারকে হুমকি দেওয়া বা শ্রমিকদের মারধর করার মতো ঘটনা ছিল নিত্যদিনের রুটিন।
এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গত কয়েক বছরে সোনা পাপ্পু কোটি কোটি টাকার পাহাড় গড়ে তুলেছেন বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানতে পেরেছে ইডি। এই তোলাবাজির টাকা রিয়েল এস্টেট ব্যবসার আড়ালে সাদা করারও একটি সুপরিকল্পিত ছক ছিল বলে অনুমান গোয়েন্দাদের।
কোথায় যেত কাটমানির টাকা? ইডির নজরে 'প্রভাবশালী' যোগ
সোনা পাপ্পুর বাড়িতে ইডির এই ম্যারাথন তল্লাশির সবচেয়ে বড় এবং তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি হল 'প্রভাবশালী' যোগের সন্ধান। সাধারণ মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন, ১৫টির বেশি মারাত্মক এফআইআর মাথায় নিয়ে একজন দাগি দুষ্কৃতী দিনের পর দিন পুলিশের নাকের ডগা দিয়ে কীভাবে এমন বিরাট সাম্রাজ্য চালিয়ে যাচ্ছিলেন?
ইডির তদন্তকারী আধিকারিকদের দৃঢ় বিশ্বাস, এই সিন্ডিকেট থেকে প্রতি মাসে যে কোটি কোটি টাকার কাটমানি উঠত, তার চূড়ান্ত উপভোক্তা বা 'আল্টিমেট বেনিফিশিয়ারি' সোনা পাপ্পু একা ছিলেন না। এই বিপুল অর্থের একটা বড় অংশ নিয়মিতভাবে পৌঁছে যেত প্রভাবশালীদের পকেটে। এই প্রভাবশালীরা কারা? তাঁরা কি রাজনৈতিক জগতের কেউ, নাকি প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তি? ইডির দাবি, ওপর মহলের সেই রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক 'ছাতা' বা শেল্টার ছাড়া দিনের পর দিন এমন বেআইনি রাজত্ব চালানো আক্ষরিক অর্থেই অসম্ভব।
আজকের এই তল্লাশির অন্যতম প্রধান লক্ষ্যই হল সেই অদৃশ্য প্রভাবশালীদের নাম খুঁজে বের করা। ইডি জানতে চাইছে, কারা সোনা পাপ্পুর মাথায় আশীর্বাদের হাত রেখেছিলেন? এই কোটি কোটি টাকা সোনা পাপ্পুর হাত ঘুরে ঠিক কোন কোন ঠিকানায় পৌঁছে যেত? কোথায় কীভাবে এই কালো টাকার ফান্ডিং করা হত?
বাড়ি তল্লাশি করে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র, সম্পত্তির দলিল, ব্যাঙ্কের পাসবই এবং ডিজিটাল প্রমাণ (মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, হার্ডডিস্ক) বাজেয়াপ্ত করার চেষ্টা করছেন আধিকারিকরা। এই নথিগুলি থেকেই টাকার গতিপথ বা 'মানি ট্রেল' (Money Trail) সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
শহরের ছ'টি জায়গায় চিরুনি তল্লাশি
শুধুমাত্র ফার্ন রোডের পোদ্দার হাউসেই নয়, আর্থিক তছরুপের এই বিশাল চক্রের জাল কতদূর ছড়িয়ে রয়েছে, তা বুঝতে বুধবার কলকাতা শহরের আরও পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে একযোগে হানা দিয়েছে ইডি। সোনা পাপ্পুর ঘনিষ্ঠ সঙ্গী, বেশ কয়েকজন প্রোমোটার এবং বেনামি সম্পত্তির খোঁজে এই তল্লাশি চলছে বলে সূত্র মারফত জানা গিয়েছে। এর আগে রাজ্যের শিক্ষা দুর্নীতি, রেশন দুর্নীতি এবং কয়লা পাচার মামলায় যেভাবে প্রভাবশালীরা ইডির জালে জড়িয়ে পড়েছেন, সেখানে নির্মাণ শিল্পের এই তোলাবাজি কাণ্ডে নতুন করে কাদের নাম উঠে আসে, সেদিকেই এখন নজর গোটা রাজ্যের।
আবাসন শিল্পে সিন্ডিকেটের থাবা: ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ
এই গোটা ঘটনার একটি বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে, যা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। এই ধরনের সিন্ডিকেট রাজের কারণে যে শুধুমাত্র প্রোমোটাররাই ক্ষতিগ্রস্ত হন তা নয়, এর চূড়ান্ত মূল্য চোকাতে হয় সাধারণ মধ্যবিত্ত ফ্ল্যাট ক্রেতাদের। নির্মাণ সামগ্রী বেশি দামে কিনতে বাধ্য হওয়া এবং মোটা অঙ্কের তোলা দেওয়ার কারণে একটি প্রোজেক্টের সামগ্রিক খরচ অনেকটাই বেড়ে যায়। আর সেই বর্ধিত খরচের বোঝা শেষ পর্যন্ত চাপে ক্রেতার ঘাড়ে। ফলস্বরূপ, মধ্যবিত্তের স্বপ্নের বাড়ির দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যায়।
বালিগঞ্জ ও কসবা অঞ্চলে সোনা পাপ্পুর এই একচ্ছত্র আধিপত্য এবং তার বিরুদ্ধে ইডির এই সার্জিক্যাল স্ট্রাইক রাজ্য রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করল। দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা এই তল্লাশিতে ঠিক কী কী নথি উদ্ধার হল, বা কত টাকার বেআইনি সম্পত্তির হদিস মিলল, তা অভিযান সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার পরেই আনুষ্ঠানিকভাবে জানা যাবে। তবে এই ঘটনা প্রমাণ করে দিল যে, বেআইনি অর্থ লেনদেন এবং হাওলা কারবারের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির জিরো-টলারেন্স নীতি অব্যাহত রয়েছে।
এখন দেখার বিষয়, ফার্ন রোডের এই বিলাসবহুল বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া সূত্র ধরে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট শেষ পর্যন্ত সেই 'প্রভাবশালী'দের দরজায় পৌঁছতে পারে কি না, যাঁরা এতদিন পর্দার আড়ালে থেকে এই গোটা কলকাঠি নেড়ে এসেছেন। বালিগঞ্জের এই তল্লাশি অভিযান যে আগামী দিনে আরও বড় কোনও রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক ভূমিকম্পের ইঙ্গিত দিচ্ছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
(মানুষের ভাষা ব্লগের নিউজ ডেস্কের পাঠকদের জন্য প্রতিনিয়ত এই খবরের সর্বশেষ আপডেট আমরা নিয়ে আসব। নজর রাখুন আমাদের পরবর্তী প্রতিবেদনে।)
0 মন্তব্যসমূহ