মানুষের ভাষা, নিউজ ডেস্ক
কলকাতা , ৩০ মার্চ : পশ্চিম এশিয়া জুড়ে ঘনীভূত হচ্ছে অস্থিরতার কালো মেঘ। একদিকে সংঘাতের জেরে এমনিতেই উত্তপ্ত গোটা মধ্যপ্রাচ্য, তার উপর লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর ধারাবাহিক হামলা বিশ্ব অর্থনীতিতে গভীর চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। এই অত্যন্ত জটিল এবং স্পর্শকাতর ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবার সরাসরি সৌদি আরবের যুবরাজ মহম্মদ বিন সলমনের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের টেলিফোন বৈঠক সারলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী । মূলত পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান সঙ্কট, অবাধ ও সুরক্ষিত জলপথ পরিবহণ এবং আন্তর্জাতিক শক্তি নিরাপত্তা— এই বিষয়গুলি নিয়েই দুই রাষ্ট্রনেতার মধ্যে দীর্ঘ ও তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা হয়েছে।
https://youtube.com/shorts/5tm_8Jgjr4E?si=LfIcQlAheyAAR2nv
সোমবার ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের তরফে এক সাংবাদিক বৈঠকে এই কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, গত ২৮ মার্চ সৌদি যুবরাজের সঙ্গে এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সেরেছেন প্রধানমন্ত্রী। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে ভারতের এই পদক্ষেপ অত্যন্ত সময়োচিত এবং কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কী নিয়ে আলোচনা হল দুই নেতার?
নয়াদিল্লিতে আয়োজিত আন্তঃমন্ত্রণালয় ব্রিফিংয়ে বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে লাগাতার যোগাযোগ রেখে চলেছেন। আন্তর্জাতিক স্তরে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যেই এই নিরন্তর প্রয়াস।
জয়সওয়াল বলেন, "এই ধারাবাহিক কূটনৈতিক আলোচনার অঙ্গ হিসেবেই গত ২৮ মার্চ প্রধানমন্ত্রী সৌদি আরবের যুবরাজ মহম্মদ বিন সলমনের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। এই কথোপকথনের সময় পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাতের পরিস্থিতি নিয়ে দুই নেতার মধ্যে বিস্তারিত মতবিনিময় হয়েছে।"
আলোচনার মূল বিষয়বস্তুগুলি একনজরে:
জ্বালানি পরিকাঠামোয় হামলার নিন্দা: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন শক্তি উৎপাদনকারী কেন্দ্র এবং জ্বালানি পরিকাঠামোর ওপর হওয়া সাম্প্রতিক হামলার তীব্র নিন্দা করেছেন। ভারত মনে করে, জ্বালানি পরিকাঠামোর ওপর এই ধরনের আক্রমণ গোটা বিশ্বের অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
অবাধ নৌচলাচল সুনিশ্চিত করা: অবাধ নৌচলাচল এবং আন্তর্জাতিক জলপথ বা শিপিং লেনগুলি যাতে সকলের জন্য উন্মুক্ত এবং সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকে, তা নিশ্চিত করার বিষয়েও উভয় নেতাই সহমত পোষণ করেছেন।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা: আঞ্চলিক শান্তি এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য দুই দেশের মধ্যে যৌথ উদ্যোগ এবং সহযোগিতার পরিসর বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
লোহিত সাগরের সঙ্কট এবং ভারতের অর্থনৈতিক উদ্বেগ
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের সূক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গিতে যদি এই আলোচনার গভীরে যাওয়া যায়, তবে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, মোদী এবং সলমনের এই আলোচনার অন্যতম মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে লোহিত সাগরের বর্তমান পরিস্থিতি। গত বেশ কয়েক মাস ধরে লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগরে যাতায়াতকারী পণ্যবাহী বাণিজ্যিক জাহাজগুলির ওপর লাগাতার ড্রোন ও মিসাইল হামলা চলছে। এর ফলে সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে যে অন্যতম প্রধান সামুদ্রিক বাণিজ্য পথটি রয়েছে, তা কার্যত অবরুদ্ধ বা চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
ভারতের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের এক বিশাল অংশ এই সামুদ্রিক পথ দিয়েই সম্পন্ন হয়। ধারাবাহিক হামলার জেরে আন্তর্জাতিক জাহাজ কোম্পানিগুলি বাধ্য হচ্ছে আফ্রিকার 'কেপ অফ গুড হোপ' (Cape of Good Hope) ঘুরে দীর্ঘতর পথ পাড়ি দিতে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি বড় সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে:
পরিবহণের সময় বৃদ্ধি: গন্তব্যে পৌঁছতে আগের তুলনায় প্রায় ১৫ থেকে ২০ দিন অতিরিক্ত সময় লাগছে।
ভাড়া ও বিমা বৃদ্ধি: পণ্য পরিবহণের খরচ (Freight cost) একলাফে বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে। পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বেড়েছে জাহাজের বিমার প্রিমিয়াম।
আমদানি-রপ্তানিতে ধাক্কা: এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ভারতের আমদানি-রপ্তানি ব্যবসার ওপর।
এই চরম উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে শিপিং লেন সুরক্ষিত রাখার বিষয়ে মোদীর এই বার্তা ভারতের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে অত্যন্ত জরুরি একটি পদক্ষেপ।
জ্বালানি নিরাপত্তা: অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি
সৌদি আরবের যুবরাজের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর এই আলোচনার আরেকটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল 'এনার্জি সিকিউরিটি' বা আন্তর্জাতিক শক্তি নিরাপত্তা। ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি তেল আমদানিকারক দেশ। দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে মোট চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি খনিজ তেল ভারতকে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। আর এক্ষেত্রে সৌদি আরব ভারতের অন্যতম প্রধান, নির্ভরযোগ্য এবং বিশ্বস্ত জ্বালানি সরবরাহকারী দেশ।
পশ্চিম এশিয়ায় যদি কোনও কারণে সংঘাতের পরিধি আরও বৃদ্ধি পায় বা জ্বালানি উত্তোলন কেন্দ্রগুলিতে আঘাত আসে, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের (Crude Oil) দাম হু হু করে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তেলের দাম বাড়লে ভারতের কী ক্ষতি? আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে পেট্রল ও ডিজেলের দাম বৃদ্ধির প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়। জ্বালানির দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে পণ্য পরিবহণ ব্যবস্থার ওপর, যার জেরে খাদ্যশস্য থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়। ফলস্বরূপ, দেশে মুদ্রাস্ফীতি (Inflation) মাথাচাড়া দিতে পারে, যা সাধারণ মানুষের জীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। তাই পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি বজায় রাখা এবং শক্তির নিরবচ্ছিন্ন জোগান নিশ্চিত করা ভারতের অর্থনীতির জন্য কার্যত 'লাইফলাইন'। মোদী এবং বিন সলমন উভয়েই আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং জ্বালানির স্থিতিশীলতার বিষয়ে নিজেদের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা আরও নিবিড় করার প্রয়োজনীয়তার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং কৌশলগত অংশীদারি
শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক সঙ্কটই নয়, এই টেলিফোনিক বৈঠকে ভারত ও সৌদি আরবের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা কীভাবে আরও বৃদ্ধি করা যায়, তা নিয়ে কথা বলেছেন দুই নেতাই।
গত কয়েক বছরে ভারত এবং সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্ক এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। গত বছর ভারতে আয়োজিত জি-২০ (G20) শীর্ষ সম্মেলনের সময় সৌদি যুবরাজ মহম্মদ বিন সলমন দিল্লি সফরে এসেছিলেন। সেই সময় 'ইন্ডিয়া-মিডল ইস্ট-ইউরোপ ইকোনমিক করিডর' (IMEC) নামক যে যুগান্তকারী মেগা প্রকল্পের ঘোষণা হয়েছিল, তা ভারত ও সৌদি আরবের কৌশলগত অংশীদারির এক বিরাট মাইলফলক। বর্তমান পরিস্থিতিতে যখন পশ্চিম এশিয়ায় অস্থিরতা চলছে, তখন এই ধরনের মেগা আন্তর্জাতিক প্রকল্পগুলির ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করতে দুই নেতাই আঞ্চলিক শান্তি এবং পরিকাঠামোগত উন্নয়নের স্বার্থে নিজেদের মধ্যে সমন্বয় আরও বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন।
বিশ্বমঞ্চে ভারতের ক্রমবর্ধমান ও ইতিবাচক ভূমিকা
বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র তাঁর ব্রিফিংয়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আন্তর্জাতিক নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে ক্রমাগত যোগাযোগ রেখে চলেছেন। এটি বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়ে একটি সঠিক রূপরেখা তৈরি করতে ভারতের ক্রমবর্ধমান এবং জোরালো ভূমিকার কথাই তুলে ধরে।
আজকের দিনে ভারত আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কেবল একজন নীরব দর্শক বা প্রান্তিক দেশ নয়। বরং, ভারত এখন বিশ্বের অন্যতম প্রধান সমস্যাগুলিতে 'পিসমেকার' (Peacemaker) বা গঠনমূলক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করার ক্ষমতা রাখে। পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে সৌদি আরব একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং শক্তিশালী আঞ্চলিক খেলোয়াড় (Key Regional Player)। সেই সৌদি আরবের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে ভারতের এই সরাসরি এবং খোলামেলা আলোচনা একটি সুস্পষ্ট কৌশলগত বার্তা বহন করে। এই বার্তাটি হল— ভারত যে কোনও মূল্যে সংঘাতের বদলে আলোচনার মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিশ্বাসী এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলিকে সুরক্ষিত রাখতে বদ্ধপরিকর।
পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল এবং পরিবর্তনশীল। সব মিলিয়ে একটি বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে ওই অঞ্চল। ঠিক এই সময়ে নরেন্দ্র মোদী এবং মহম্মদ বিন সলমনের এই কথোপকথন আন্তর্জাতিক কূটনীতির দুনিয়ায় অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
একদিকে ভারতের বিশাল বাজার ও দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি, অন্যদিকে সৌদি আরবের শক্তি উৎপাদন ক্ষমতা এবং ইসলামিক দুনিয়ায় তাদের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব— এই দুইয়ের মেলবন্ধন পশ্চিম এশিয়ার এই সঙ্কটে একটি ইতিবাচক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। আগামী দিনে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা সময়ই বলবে। তবে ভারত যে নিজের দেশীয় অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে আগাম এবং অত্যন্ত পরিণত কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, বিদেশ মন্ত্রকের এই বিবৃতি তারই অকাট্য প্রমাণ।

0 মন্তব্যসমূহ