Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

Recent in Home

ভোটাধিকার নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে জোর তরজা: ফ্রিজ হয় তালিকাতেই হবে ভোট ? ট্রাইব্যুনালে ৩৪ লক্ষের বেশি আপিল, নাম উঠলেও কি ভোট দিতে পারবেন নাগরিকরা?


মানুষের ভাষা | নিউজ ডেস্ক

কলকাতা , ১৩ এপ্রিল:গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় উৎসব হল নির্বাচন। আর এই নির্বাচনে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার তাঁদের ভোটাধিকার। কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতা এবং আইনি বেড়াজালের কারণে যদি লক্ষ লক্ষ মানুষের এই গণতান্ত্রিক অধিকার থমকে যায়, তবে তা নিঃসন্দেহে এক গভীর উদ্বেগের বিষয়। সম্প্রতি এমনই এক নজিরবিহীন আইনি ও প্রশাসনিক টানাপোড়েনের সাক্ষী থাকল দেশের শীর্ষ আদালত। একদিকে লক্ষ লক্ষ মানুষের নাগরিকত্ব প্রমাণের লড়াই, অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের কড়া নিয়মকানুন—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল আকার ধারণ করেছে। ১১ তারিখ পর্যন্ত পাওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনালগুলিতে ইতিমধ্যেই ৩৪ লক্ষ ৩৫ হাজার ১৭৪টি আপিল জমা পড়েছে। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল, যাঁদের নাম ট্রাইব্যুনালের তরফ থেকে ছাড়পত্র পাবে, তাঁরা কি এই আসন্ন নির্বাচনে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন? এই জ্বলন্ত ইস্যু নিয়েই সুপ্রিম কোর্টে নির্বাচন কমিশন এবং আইনজীবীদের মধ্যে চলল এক রুদ্ধশ্বাস সওয়াল-জবাব।

পরিসংখ্যানের চমক: প্রত্যাশার চেয়েও বেশি আপিল

যে তথ্যটি এই মুহূর্তে ওয়াকিবহাল মহলকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়ে তুলেছে, তা হল আপিলের এই বিশাল সংখ্যা। ১১ তারিখ পর্যন্ত পাওয়া হিসেব বলছে, বিভিন্ন ট্রাইব্যুনালে মোট ৩৪ লক্ষ ৩৫ হাজার ১৭৪টি আপিল ফাইল করা হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হল, প্রাথমিক পর্যায়ে ‘অ্যাডজুডিকেশন’ (Adjudication) বা আইনি প্রক্রিয়ায় যত সংখ্যক মানুষকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল বলে মনে করা হচ্ছিল, আপিল ফাইলের সংখ্যা তাকেও ছাপিয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ, হিসেবের বাইরেও বহু মানুষ নিজেদের নাগরিকত্ব এবং ভোটাধিকার সুনিশ্চিত করতে আইনি দ্বারস্থ হয়েছেন।

আজ থেকেই ট্রাইব্যুনালগুলি তাদের পুরোদমে কাজ শুরু করছে। এই বিপুল পরিমাণ মামলার পাহাড় সামলে দ্রুত রায়দান করা ট্রাইব্যুনালগুলির কাছে এক হিমালয় প্রমাণ চ্যালেঞ্জ। প্রতিটি মামলার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক-একটি মানুষের ভবিষ্যৎ, তাঁদের পরিচয় এবং এই দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের অধিকার। কিন্তু যাঁরা ১১ তারিখের মধ্যে আপিল ফাইল করেছেন, তাঁদের ভবিষ্যৎ কী? এই প্রশ্নটিই এখন দেশের রাজনৈতিক ও আইনি মহলে সবচেয়ে বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

শীর্ষ আদালতে আইনি লড়াই: শ্যাম দিওয়ানের তাৎপর্যপূর্ণ সওয়াল

এই লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার সুনিশ্চিত করার দাবিতে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন বর্ষীয়ান আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান। তিনি শীর্ষ আদালতের কাছে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আবেদন রাখেন। তাঁর মূল বক্তব্য ছিল, ট্রাইব্যুনালের রায় বেরোনোর পর যাঁদের নাম বৈধ বলে প্রমাণিত হবে, তাঁদের যেন কোনোভাবেই ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা না হয়।

শ্যাম দিওয়ান সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের বেঞ্চের কাছে জোরালো সওয়াল করে বলেন, শীর্ষ আদালতের উচিত নির্বাচন কমিশনকে একটি সুস্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া। তাঁর দাবি অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন যেন একটি ‘সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট’ বা পরিপূরক ভোটার তালিকা প্রকাশ করে। এই পরিপূরক তালিকায় সেই সমস্ত ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাঁরা ট্রাইব্যুনালে নিজেদের লড়াইয়ে জয়ী হয়েছেন এবং যাঁদের নাম ক্লিয়ার হয়ে গিয়েছে। এই ছাড়পত্র পাওয়া নাগরিকরা যাতে আসন্ন নির্বাচনে নির্বিঘ্নে নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, তা সুনিশ্চিত করার জন্যই এই সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট প্রকাশের আবেদন জানান তিনি। দেশের কোটি কোটি মানুষের কাছে এটি শুধুমাত্র একটি আইনি পদক্ষেপ নয়, বরং মানবাধিকার রক্ষার এক চূড়ান্ত লড়াই।

নির্বাচন কমিশনের আপত্তি ও নিয়মের কড়াকড়ি

আইনজীবী শ্যাম দিওয়ানের এই যুক্তিসঙ্গত আবেদনের পরই আদালতে নিজেদের শক্ত অবস্থান স্পষ্ট করে ভারতের নির্বাচন কমিশন। কমিশনের তরফ থেকে এই প্রস্তাবের তীব্র আপত্তি জানানো হয়। নির্বাচন কমিশনের আইনজীবীরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, চাইলেই রাতারাতি এইভাবে ভোটার তালিকায় নতুন নাম যুক্ত করে তাঁদের ভোট দেওয়ার অধিকার দেওয়া সম্ভব নয়।

কমিশনের যুক্তি অত্যন্ত স্পষ্ট এবং প্রশাসনিক নিয়মের নিরিখে বাঁধা। তারা আদালতকে জানায়, ভোটার তালিকা তৈরি এবং তা সংশোধন করা একটি ‘অনগোয়িং প্রসেস’ বা চলমান প্রক্রিয়া। সারা বছর ধরেই যোগ্য নাগরিকদের নাম ভোটার তালিকায় তোলার কাজ চলতে থাকে। নতুন যাঁরা যোগ্য ভোটার হিসেবে বিবেচিত হবেন, তাঁদের নাম নিয়ম মেনেই তালিকায় আপডেট করা হবে। কিন্তু আসন্ন নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে নিয়মের কোনো শিথিলতা বরদাস্ত করতে রাজি নয় কমিশন।

নির্বাচন কমিশনের তরফ থেকে আদালতে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়, শুধুমাত্র সেই সমস্ত ব্যক্তিরাই এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন, যাঁদের নাম নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে ফ্রিজ (Freeze) বা চূড়ান্ত হওয়া ভোটার তালিকায় রয়েছে। কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রথম দফার নির্বাচনের জন্য ৬ তারিখেই ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, দ্বিতীয় দফার নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকা ফ্রিজ করা হয়েছে ৯ তারিখ। অর্থাৎ, এই নির্দিষ্ট তারিখগুলির পর আর নতুন করে কোনো নাম আসন্ন দফার নির্বাচনগুলির জন্য ভোটার তালিকায় যুক্ত করা প্রশাসনিকভাবে সম্ভব নয়। এই নিয়ম অনুযায়ী, ৬ এবং ৯ তারিখের পর যদি ট্রাইব্যুনাল কোনো ব্যক্তিকে বৈধ নাগরিক হিসেবে ঘোষণাও করে, তবুও নিয়মের গেরোয় পড়ে তাঁরা ভোট দিতে পারবেন না।

সুপ্রিম কোর্টের ‘ব্রহ্মাস্ত্র’: ১৪২ ধারার প্রসঙ্গ

নির্বাচন কমিশনের এই কড়া আইনি ও প্রশাসনিক ব্যাখ্যার পরই সওয়াল-জবাবে নতুন মোড় আসে। দেশের শীর্ষ আদালত নির্বাচন কমিশনকে মনে করিয়ে দেয় তাদের অসীম ক্ষমতার কথা। সুপ্রিম কোর্ট কমিশনের আইনজীবীদের উদ্দেশ্য করে বলে, আদালতের কাছে সংবিধানের ১৪২ নম্বর ধারা (Article 142) অনুযায়ী বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে।

সংবিধানের ১৪২ নম্বর ধারা অনুযায়ী, দেশের কোনো ক্ষেত্রে যদি সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার (Complete Justice) প্রদানের প্রয়োজন হয়, তবে সুপ্রিম কোর্ট যেকোনো নির্দেশ বা ডিক্রি জারি করতে পারে এবং সেই নির্দেশ দেশের সমস্ত প্রান্তে সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। শীর্ষ আদালতের বেঞ্চ নির্বাচন কমিশনকে স্পষ্ট জানায় যে, যেহেতু তারা এই মামলাটি শুনছে এবং এখানে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকারের মতো মৌলিক প্রশ্ন জড়িয়ে রয়েছে, তাই আদালত চাইলে ১৪২ নম্বর ধারা প্রয়োগ করে কমিশনকে সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট প্রকাশের নির্দেশ দিতেই পারে। শীর্ষ আদালতের এই পর্যবেক্ষণে মামলার গতিপ্রকৃতি এক অন্য মাত্রা পায়।

কমিশনের পালটা যুক্তি: ভোটাধিকার বনাম প্রশাসনিক কাঠামো

সুপ্রিম কোর্টের এই ১৪২ ধারার প্রয়োগের হুঁশিয়ারির মুখে দাঁড়িয়ে নির্বাচন কমিশন কিছুটা সুর নরম করলেও, নিজেদের প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কথা অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে আদালতে তুলে ধরে। কমিশনের আইনজীবীরা শীর্ষ আদালতের ক্ষমতাকে সম্মান জানিয়ে বলেন, "হ্যাঁ, আপনারা এই ধরনের নির্দেশ অবশ্যই দিতে পারেন। আপনাদের সেই সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে।" কিন্তু একইসঙ্গে তাঁরা নিয়মের বাস্তব দিকটিও তুলে ধরেন।

কমিশন জানায়, সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিলে ট্রাইব্যুনাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়া ব্যক্তিদের নাম ভোটার তালিকায় নতুন করে যুক্ত করে দেওয়া হবে। কিন্তু তাতেও মূল সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ, ভারতের নির্বাচন পরিচালনার যে নিজস্ব নিয়ম ও পরিকাঠামো রয়েছে, সেই অনুযায়ী এই নবসংযোজিত নাগরিকরা আসন্ন নির্বাচনে কোনোভাবেই ভোট দিতে পারবেন না।

কমিশন আদালতকে বিশদে জানায়, তাদের নিয়ম অনুযায়ী যেকোনো নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকা ফ্রিজ বা চূড়ান্ত করার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে। সেই সময়সীমাটি হল মনোনয়ন পত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন (Last date of nomination)। যেদিন কোনো নির্দিষ্ট দফার জন্য প্রার্থীদের মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিন থাকে, ঠিক সেই দিনই সেই দফার জন্য ভোটার তালিকা চূড়ান্তভাবে লক করে দেওয়া হয়। এর পেছনে মূল কারণ হল প্রশাসনিক স্তরে ব্যালট পেপার তৈরি, ইভিএম (EVM) মেশিনের ডেটা লোডিং, পোলিং বুথে নির্দিষ্ট সংখ্যক ভোটারের তালিকা পাঠানো এবং সর্বোপরি নির্বাচনের স্বচ্ছতা বজায় রাখা। মনোনয়ন পর্ব শেষ হয়ে যাওয়ার পর ভোটার তালিকায় নতুন নাম ঢুকলে পুরো নির্বাচনী পরিকাঠামো ভেঙে পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই কমিশন স্পষ্ট করে দেয় যে, নাম ভোটার তালিকায় যুক্ত হলেও, নতুন ভোটাররা এই চলতি নির্বাচনে কোনোভাবেই অংশ নিতে পারবেন না।

উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় সাধারণ মানুষ

সুপ্রিম কোর্টের এই সওয়াল-জবাব এবং নির্বাচন কমিশনের কঠোর অবস্থান রাজ্যের লক্ষ লক্ষ মানুষের মনে এক গভীর অনিশ্চয়তার ছায়া ফেলেছে। ৩৪ লক্ষেরও বেশি মানুষ যাঁরা ট্রাইব্যুনালে নিজেদের সমস্ত সম্বল দিয়ে আইনি লড়াই চালাচ্ছেন, তাঁদের কাছে নাগরিকত্ব প্রমাণের পাশাপাশি ভোট দেওয়াটাও নিজেদের অস্তিত্ব প্রমাণের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বিপুল সংখ্যক ভোটার যেকোনো নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের প্রশাসনিক নিয়ম এবং মনোনয়ন পর্বের শেষ দিনের গ্যাঁড়াকলে পড়ে যদি এই মানুষগুলি ভোটদান থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হন, তবে তা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার একটি বড় শূন্যতা হিসেবেই রয়ে যাবে।

আগামী দিনে সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের ১৪২ ধারার প্রয়োগ করে এই জটিল প্রশাসনিক জট ছাড়াতে পারে কি না, নাকি নির্বাচন কমিশনের প্রচলিত নিয়মই শেষ কথা হিসেবে গণ্য হয়, তা জানার জন্য রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষায় রয়েছে গোটা দেশ। ট্রাইব্যুনালের প্রতিটি রায় এবং সুপ্রিম কোর্টের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে এই লক্ষ লক্ষ মানুষের ভবিষ্যৎ। মানুষের ভাষা নিউজ ডেস্কের নজর থাকবে এই স্পর্শকাতর ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খবরের প্রতিটি আপডেটের দিকে। সময়মতো এবং নিখুঁত তথ্য আমরা আপনাদের সামনে তুলে ধরব।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Comments

Ad Code