Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

Recent in Home

রাষ্ট্রপতি শাসন ছাড়া এত বদলি কীভাবে? ৯২ জন অফিসার সরানো নিয়ে হাই কোর্টে কমিশনকে কাঠগড়ায় তুললেন কল্যাণ



মানুষের ভাষা নিউজ ডেস্ক

কলকাতা, ২৪ মার্চ: ভোটের আগে পশ্চিমবঙ্গে যা হচ্ছে, তা আগে কখনও হয়নি — অন্তত এটুকু দাবি করছেন তৃণমূল সাংসদ তথা আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। নির্বাচন ঘোষণার পর থেকে একের পর এক শীর্ষ আমলা ও পুলিশ কর্তাকে পদ থেকে সরিয়ে দিচ্ছে ভারতের নির্বাচন কমিশন। এই অপসারণের ধরন এতটাই অভূতপূর্ব যে কল্যাণ সোজাসুজি প্রশ্ন তুলে ফেললেন — রাজ্যে কি সংবিধানের ৩৫৬ অনুচ্ছেদ, অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়েছে?

প্রশ্নটা নেহাত কথার কথা নয়। রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হলেই কেবল এই ভাবে সরকারের সমস্ত স্তরের আধিকারিকদের একসঙ্গে সরানো সম্ভব — এই যুক্তিই তিনি দাঁড় করিয়েছেন কলকাতা হাই কোর্টে।

গত ১৫ মার্চ রাজ্যে বিধানসভা ভোটের তারিখ ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। সেই রাতেই রাজ্যের মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তীকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে স্বরাষ্ট্রসচিব জগদীশপ্রসাদ মীনাকেও সরানো হয়। বিষয়টা শুধু বদলিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি — জগদীশপ্রসাদকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে অন্য রাজ্যে। আর নন্দিনীকে সরানো হয়েছে বটে, কিন্তু তাঁকে কোনও নতুন দায়িত্বই দেওয়া হয়নি।

সেই রাত থেকে যে তালিকা তৈরি হতে শুরু করেছিল, তা পরের কয়েক দিনে থামেনি। নবান্নের পুনর্বহালও বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ ও কলকাতা পুলিশের যে সব আইপিএস আধিকারিককে আগে সরানো হয়েছিল এবং পরে রাজ্য সরকার অন্য দায়িত্বে পুনর্বহাল করেছিল, সেই সিদ্ধান্তও বাতিল করে দিয়েছে কমিশন। পাঁচটি রেঞ্জের পাঁচ জন ডিআইজি-কেও বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

হাই কোর্টে জনস্বার্থ মামলা

এই পরিস্থিতিতে কলকাতা হাই কোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছেন আইনজীবী অর্ককুমার নাগ। সোমবার মামলাটি শুনানির জন্য উঠল প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল এবং বিচারপতি পার্থসারথি সেনের ডিভিশন বেঞ্চে। মামলাকারীর পক্ষে আদালতে দাঁড়ালেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়।

কল্যাণের সওয়াল সরাসরি কমিশনের উদ্দেশ্যকে প্রশ্ন করল। তাঁর বক্তব্য, মুখ্যসচিব পশ্চিমবঙ্গের সামগ্রিক প্রশাসন দেখেন। নির্বাচনের সঙ্গে তাঁর সরাসরি সম্পর্ক থাকে না। তবুও তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, এবং কোনও দায়িত্ব ছাড়াই ফেলে রাখা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রসচিব নির্বাচনের কাজে সরাসরি যুক্ত নন। তাঁকে শুধু সরানো হয়নি — পাঠানো হয়েছে অন্য রাজ্যে।

কল্যাণ আরও বলেন, পঞ্চায়েত দফতরের সচিবকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, নির্বাচনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কোথায়? জাভেদ শামিমের মতো অভিজ্ঞ আইনশৃঙ্খলা সামলানোর অফিসারকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কলকাতার পুলিশ কমিশনার সুপ্রতিম সরকার মাত্র এক মাস হল দায়িত্ব নিয়েছেন — তাঁকে সরানোর পিছনে কারণ কী?

সংখ্যাটা কম নয়

কল্যাণ আদালতে যে পরিসংখ্যান তুলে ধরেছেন, সেটা চোখ কপালে তোলার মতো।

৬৩ জন পুলিশ অফিসার, ১৬ জন আইএএস অফিসার এবং ১৩ জন পুলিশ সুপার — এই কয়েক দিনের মধ্যে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এর বাইরে ডিআইজি স্তরের পাঁচ জন অফিসারকেও বদলি করা হয়েছে। এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যাঁদের সরানো হয়েছে, তাঁদের কোনও নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। কল্যাণের প্রশ্ন, এই পরিস্থিতিতে রাজ্যে যদি কোনও বিপর্যয় ঘটে, তা হলে দায়িত্ব নেবে কে?

কমিশনের এক্তিয়ার নিয়ে প্রশ্ন

হাই কোর্টে কল্যাণের যুক্তির কেন্দ্রে ছিল একটাই প্রশ্ন — কমিশন কি এই ধরনের ক্ষমতা আদৌ প্রয়োগ করতে পারে?

তাঁর সওয়াল ছিল, এসআইআর (বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন) প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকেই কমিশন রাজ্যের আধিকারিকদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে। ওই সময় ওই আধিকারিকদের কাজ নিয়ে কমিশনের কোনও অভিযোগ ছিল না। তা হলে ভোট ঘোষণার পর হঠাৎ তাঁদের সরানোর কারণ কী?

এই প্রসঙ্গেই কল্যাণ টেনে আনেন সংবিধানের ৩৫৬ অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ। তাঁর বক্তব্য, রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হলে এই ভাবে একসঙ্গে এত আধিকারিককে সরানো যায়। তা হলে কি রাজ্যে ৩৫৬ অনুচ্ছেদ কার্যকর হয়েছে? তিনি আরও বলেন, শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই এটা হয়েছে, দেশের অন্য কোনও রাজ্যে এমন ঘটনা দেখা যায়নি।

রাজ্যও একমত নয়

রাজ্য সরকারও কমিশনের এই বদলির বিরোধিতা করেছে। রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল কিশোর দত্ত আদালতে প্রশ্ন তুলেছেন, কমিশনকে কি এতটাই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে যে নির্বাচনের কাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন, এমন আধিকারিকদেরও সরিয়ে দিতে পারবে?

এটা লক্ষণীয় যে এই মামলায় রাজ্য সরকার ও মামলাকারী — দুই পক্ষই কমিশনের এই পদক্ষেপের বিরোধী। প্রধান বিচারপতির এজলাসে সরকার ও আবেদনকারীর আইনজীবী এক সুরে কথা বলছেন — এমনটা সচরাচর দেখা যায় না।

পটভূমি: রাজ্য বনাম কমিশনের দীর্ঘ দ্বন্দ্ব

বলে রাখা ভালো, রাজ্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে সম্পর্ক বেশ কিছু মাস ধরেই উত্তপ্ত। এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছিলেন। সুপ্রিম কোর্ট সেই শুনানিতে পরিষ্কার বলেছিল যে দুই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান — রাজ্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে এক দুর্ভাগ্যজনক 'দোষারোপের খেলা' চলছে এবং দুই পক্ষের মধ্যে বিশ্বাসের চরম ঘাটতি রয়েছে।

সেই টানাপোড়েনের মধ্যেই এল ভোটের তারিখ ঘোষণা। আর তারপর থেকেই এক এক করে চলতে লাগল অপসারণ।

কমিশনের বক্তব্য

কমিশনের পক্ষ থেকে কেন এই বদলিগুলি করা হচ্ছে, সে ব্যাপারে হাই কোর্টে নিজেদের বক্তব্য জানানো হয়েছে। কমিশনের যুক্তি, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ। তবে কোন নির্দিষ্ট আধিকারিকের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ ছিল, তা এখনও স্পষ্ট করা হয়নি।

কমিশনের সাংবিধানিক ক্ষমতা নিয়ে আদালত পর্যায়ে বিতর্ক নতুন নয়। সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন পরিচালনায় ব্যাপক ক্ষমতা দেয়। কিন্তু সেই ক্ষমতার সীমা কোথায়, বিশেষত নির্বাচন-সংক্রান্ত নয় এমন বিভাগের আধিকারিকদের ক্ষেত্রে — এই প্রশ্নের উত্তর এখন হাই কোর্টের উপর।

পরের শুনানিতে কী হবে?

মামলাটি এখনও চলছে। হাই কোর্ট কমিশনের ব্যাখ্যা শুনেছে, রাজ্যের বক্তব্যও শুনেছে। পরবর্তী শুনানিতে বেঞ্চ কী নির্দেশ দেয়, সেটাই এখন দেখার।

এদিকে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠছে, নির্বাচনের আগে এই ধরনের প্রশাসনিক রদবদল কি আদৌ স্বাভাবিক? ৬৩ জন পুলিশ অফিসার, ১৬ জন আইএএস এবং ১৩ জন পুলিশ সুপারকে কোনও দায়িত্ব ছাড়া ফেলে রাখলে রাজ্যের স্বাভাবিক প্রশাসনিক কাজকর্ম কীভাবে চলবে — এই প্রশ্নটা শুধু রাজনীতির না, সাধারণ মানুষেরও।

বিপর্যয়ের সময়ে কে সামলাবেন — আদালতেই এই প্রশ্ন তুলেছেন কল্যাণ। জবাবটা এখনও নেই।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Comments

Ad Code