Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

Recent in Home

ওয়াইসির হাত ধরলেন হুমায়ুন, নওশাদ গেলেন বামেদের সাথে — ভোটের আগে সংখ্যালঘু ভোটে ভাঙন, লাভ কার?

মুর্শিদাবাদ-মালদায় মুসলিম ভোট নিয়ে তিন দিক থেকে টানাটানি। একদিকে হুমায়ুন কবিরের AJUP-AIMIM জুটি, অন্যদিকে বামেদের সঙ্গে ISF। তৃণমূলের ভোট ব্যাংকে ফাটল ধরাতে পারলে সুবিধা কার? 


মানুষের ভাষা | নিউজ ডেস্ক

কলকাতা, ২৫ মার্চ: পশ্চিমবঙ্গের ভোটের ময়দানে এবার একটা অন্যরকম সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। মুসলিম ভোটারদের একটা বড় অংশ যে সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে থাকেন — মুর্শিদাবাদ, মালদা, উত্তর দিনাজপুর — সেখানে এবার একটাই পাত্রে পড়ছে না ভোট। দুটো আলাদা শিবির তৈরি হয়েছে। একদিকে তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত হুমায়ুন কবিরের 'আম জনতা উন্নয়ন পার্টি' (AJUP) ওয়াইসির AIMIM-এর হাত ধরেছে। অন্যদিকে ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের (ISF) বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি ঘর বাঁধলেন বাম ফ্রন্টের সঙ্গে।

দুটো ঘটনাই আলাদা আলাদাভাবে বড়। একসঙ্গে দেখলে প্রশ্নটা একটাই — এই বিভাজনে শেষ পর্যন্ত সুবিধা কার হবে?

হুমায়ুনের যাত্রা: বাবরি থেকে ওয়াইসি


হুমায়ুন কবিরকে অনেকে আজও মুর্শিদাবাদের 'ভরতপুরের বিধায়ক' বলেই চেনেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বেলডাঙায় বাবরি মসজিদের আদলে একটি মসজিদ নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে বিতর্ক তৈরি করেছিলেন তিনি। সেই কাণ্ডের পরেই তৃণমূল কংগ্রেস তাঁকে বহিষ্কার করে। এরপর নিজেই দল খোলেন — আম জনতা উন্নয়ন পার্টি, সংক্ষেপে AJUP।

দল খোলার তিন মাসের মধ্যেই বড় পদক্ষেপ। গত ২২ মার্চ হায়দরাবাদে ঈদের অনুষ্ঠানে আসাদুদ্দিন ওয়াইসি ঘোষণা করলেন, তাঁর দল AIMIM হুমায়ুন কবিরের AJUP-এর সঙ্গে মিলে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ভোটে লড়বে। হুমায়ুন নিজে ওয়াইসিকে 'বড় ভাই' বলে সম্বোধন করেছেন। বলেছেন, "এই জোট কোনওদিন ভাঙবে না। যতদিন আমি রাজনীতিতে আছি, ২০২৬-এ যে যাত্রা শুরু হল তা চলতে থাকবে।"

আসন সংখ্যার হিসাব? AJUP ১৮২টি আসনে প্রার্থী দেবে। তার মধ্যে আটটি আসন ছেড়ে দেওয়া হবে AIMIM-কে। হুমায়ুন নিজে লড়বেন ভগবানগোলা, নওদা এবং রাজীনগর — তিনটি আসন থেকে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভবানীপুর কেন্দ্রে পূনম বেগমকে প্রার্থী দিয়েছেন তিনি।

প্রচারের পরিকল্পনাও তৈরি। রাজ্যজুড়ে ২০টি যৌথ সভার ছক কষা হয়েছে। প্রথম সভা হবে ১ এপ্রিল বহরমপুরে, যেখানে ওয়াইসি ও হুমায়ুন দুজনেই থাকবেন। এরপর মুর্শিদাবাদ, উত্তরবঙ্গ, মালদা, বীরভূম, উত্তর দিনাজপুর, আসানসোল এবং শেষে কলকাতায় সভা হবে।

নওশাদ গেলেন বামেদের সঙ্গে

অন্যদিকে ফুরফুরা শরিফ-ভিত্তিক ISF-এর নওশাদ সিদ্দিকি বেছে নিলেন সম্পূর্ণ আলাদা পথ। সোমবার ফুরফুরা শরিফে আইএসএফের রাজ্য কমিটির দফতর থেকে প্রথম দফার প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হয়। ৩৩টি আসনের মধ্যে ২৩ জন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। নওশাদ নিজে ভাঙড় থেকে লড়বেন।

আইএসএফ এবার বাম ফ্রন্টের নেতৃত্বাধীন জোটের অংশ হিসেবে লড়ছে। দলটি মূলত সংখ্যালঘু-অধ্যুষিত ও গুরুত্বপূর্ণ জেলাগুলিতে মনোযোগ দিয়েছে।

তালিকায় সবচেয়ে বড় চমক তৃণমূল ছেড়ে আইএসএফে যোগ দেওয়া আরাবুল ইসলাম। শওকত মোল্লার ছেড়ে আসা ক্যানিং পূর্ব আসনেই তাঁকে মনোনয়ন দিয়েছে নওশাদের দল।

ভোটের গণিত: ভাঙন কোথায়?

পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম ভোটারের সংখ্যা মোট ভোটারের প্রায় ২৭-২৮ শতাংশ। মুর্শিদাবাদ, মালদা, উত্তর দিনাজপুর, নদীয়া এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিস্তীর্ণ এলাকায় এই ভোট নির্ণায়ক।

২০২১ সালে এই ভোটের একটা বড় অংশ গিয়েছিল তৃণমূলের ঝুলিতে। বাম-কংগ্রেস-ISF জোট মাঝেমধ্যে কিছু পেলেও, হাতে গোনা কয়েকটা আসনেই সীমাবদ্ধ ছিল। ওই নির্বাচনে ISF মাত্র একটি আসন পেয়েছিল। কিন্তু এবার ছবিটা আলাদা।

এবার একই সম্প্রদায়ের ভোটারদের কাছে তিনটি আলাদা আবেদন যাচ্ছে। তৃণমূল বলছে, আমরাই ভরসার জায়গা। AJUP-AIMIM বলছে, স্বতন্ত্র মুসলিম নেতৃত্ব দরকার। ISF-বাম বলছে, ধর্মনিরপেক্ষ বিকল্পই সঠিক পথ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই জোট ক্ষমতায় না আসতে পারলেও বেশ কিছু আসনে ভোট কেটে নেবে।

লাভ কার — সেটাই আসল প্রশ্ন

এখানেই আসছে সবচেয়ে জটিল প্রশ্নটা।

তৃণমূল সাংসদ সৌগত রায় মেনে নিয়েছেন যে এই জোট মুসলিম ভোট 'ভাগ করতে পারে'। তবে তাঁর দাবি, AIMIM ও AJUP-এর রাজ্যে কোনও ভিত্তি নেই, ভোট পাবে না। তবু তিনি বিষয়টাকে 'খারাপ' বলেই মন্তব্য করেছেন। সৌগতবাবু একই সঙ্গে বললেন, "ওয়াইসির দল আসলে বিজেপিকেই সুবিধা করে দিচ্ছে।"

শুধু তৃণমূল নয়। শিবসেনা (ইউবিটি)-র প্রিয়ঙ্কা চতুর্বেদী বলেছেন, বিজেপি সংকটে পড়লেই AIMIM-কে ডাকে। ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার মহুয়া মাজি AIMIM-কে সরাসরি বিজেপির 'বি-টিম' বলে চিহ্নিত করেছেন।

এই সমালোচনার সারটুকু হল — AIMIM যেখানেই প্রার্থী দেয়, সংখ্যালঘু ভোট ভেঙে যায়। আর সেই ভাঙনে বিজেপি জিতে আসে।

পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসেও এর নজির আছে। ২০১৯ লোকসভা ভোটে কয়েকটি আসনে তৃতীয় শক্তির প্রার্থী থাকায় তৃণমূলের মার্জিন কমে যায়, বিজেপি এগিয়ে আসে। এবার যদি ১৮২টি আসনে AJUP আর ৩৩টি আসনে ISF একই সঙ্গে ময়দানে থাকে — বিশেষত মুর্শিদাবাদ, মালদা, উত্তর দিনাজপুরে — তাহলে অঙ্কটা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, সেটা ভাবনার।

হুমায়ুন নিজেও বলেছেন, ত্রিশঙ্কু বিধানসভার পরিস্থিতিতে তাঁর দল নির্ণায়ক ভূমিকা নিতে পারে। তবে ভবিষ্যতে বিজেপি না তৃণমূল — কাকে সমর্থন করবেন, সেটা এখনও স্পষ্ট করেননি।

এই অস্পষ্টতাই সবচেয়ে রাজনৈতিক।

বিজেপির হিসাব

বিজেপি কিন্তু এই গোটা পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশ্যে উচ্ছ্বসিত নয়। উল্টে তেলেঙ্গানার বিজেপি সভাপতি রামচন্দর রাও AIMIM-এর এই জোটের সমালোচনা করেছেন, তাদের 'হিন্দু-বিরোধী' বলেছেন। এটাও একটা কৌশল — প্রকাশ্যে বিরোধিতা করলে হিন্দু মেরুকরণে সুবিধা।

কিন্তু ভোটের মাঠে সুবিধাটা কীভাবে হচ্ছে, সেটা বোঝা কঠিন নয়।

মুর্শিদাবাদে মুসলিম ভোটার ৬৬ শতাংশের বেশি। ওই জেলার ২২টি আসনে যদি মুসলিম ভোট তিনটি দলে ভাগ হয়ে যায় — তৃণমূল, AJUP-AIMIM, এবং ISF-বাম — তাহলে প্রতিটি দলের ভাগে কম ভোট পড়ে। হিন্দু ভোট যদি একজোট হয়ে বিজেপির দিকে যায়, তাহলে পার্থক্যটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে — হিসাব করলেই বোঝা যায়।

রাজ্যে মোট ৬.৪ কোটির বেশি ভোটার। ভোট হবে দুই দফায়, ২৩ এবং ২৯ এপ্রিল। ফল বেরোবে ৪ মে। মূল লড়াই তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে। কিন্তু এই তৃতীয়-চতুর্থ শক্তিগুলো সেই লড়াইকে অনেকটাই প্রভাবিত করতে পারে।

ওয়াইসির পুরনো রেকর্ড

ওয়াইসির পশ্চিমবঙ্গে আসা এই প্রথম নয়। ২০২১ সালেও AIMIM কিছু আসনে প্রার্থী দিয়েছিল, কিন্তু তেমন দাগ রাখতে পারেনি। তবে এবার পার্থক্য হল হুমায়ুন কবিরের মতো একজন পরিচিত স্থানীয় মুখ সঙ্গে আছেন, যাঁর মুর্শিদাবাদে কিছুটা হলেও জমি আছে।

ওয়াইসি বলেছেন, এই জোটের লক্ষ্য শুধু এই নির্বাচন নয়, রাজ্যে মুসলিম সংখ্যালঘুদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে তোলা। কথাটা শুনতে বড়, কিন্তু প্রশ্ন হল, এই 'স্বতন্ত্র নেতৃত্ব' আদতে কার কাজে আসে?



পশ্চিমবঙ্গের ভোট মানে সবসময়ই জটিল গণিত। এবার সেই গণিতে নতুন চলরাশি যোগ হয়েছে। AJUP-AIMIM এবং ISF-বাম — দুটি জোটই সংখ্যালঘু ভোটারদের কাছে আলাদা বার্তা নিয়ে যাচ্ছে। তৃণমূলের একাধিপত্য চ্যালেঞ্জ করছে। আর সেই ফাঁকে বিজেপি কতটুকু ঘরে তুলতে পারবে — সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

হুমায়ুন বলছেন জোট ভাঙবে না। নওশাদ বলছেন বিকল্প আছে। ওয়াইসি বলছেন নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে। আর বিজেপি? তারা চুপ করে দেখছে — এবং সম্ভবত মনে মনে হিসাব মেলাচ্ছে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Comments

Ad Code