Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

Recent in Home

সেটিং তকমা ঝেড়ে ফেলে খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতার বিরুদ্ধে CBI তদন্তের দাবি ED -র

তদন্তে বাধা ও ‘নথি ছিনতাই’: খোদ মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সিবিআই তদন্তের আর্জি ইডির; ২০২৬-এর আগে নজিরবিহীন আইনি মহাযুদ্ধ


মানুষের ভাষা, কলকাতা :

বৃহস্পতিবার ৮ জানুয়ারি ২০২৬-এর সন্ধ্যায় শহর কলকাতার প্রেক্ষাপটে এক নজিরবিহীন আইনি ও রাজনৈতিক নাটকের সাক্ষী থাকল গোটা দেশ। সল্টলেকের আইপ্যাক (I-PAC) দপ্তরে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)-এর তল্লাশিতে খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ এবং নথিপত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় এবার সরাসরি সিবিআই (CBI) তদন্তের দাবি জানাল ইডি। কলকাতা হাইকোর্টে দায়ের করা এই নজিরবিহীন পিটিশনে ইডি স্পষ্ট জানিয়েছে যে, একজন মুখ্যমন্ত্রী যেভাবে কেন্দ্রীয় এজেন্সির কাজ থামিয়ে ‘তথ্যপ্রমাণ ছিনতাই’ করেছেন, তার তদন্ত কোনো রাজ্য পুলিশের পক্ষে করা সম্ভব নয়।

কলকাতা: বাংলার রাজনীতিতে ‘চুরি’ বা ‘দুর্নীতি’র অভিযোগ নতুন নয়, কিন্তু খোদ মুখ্যমন্ত্রী যখন কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার হাত থেকে ফাইল ও ল্যাপটপ ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগে কাঠগড়ায় দাঁড়ান, তখন তা এক সাংবিধানিক সংকটের ইঙ্গিত দেয়। শুক্রবার সল্টলেকের আইপ্যাক কাণ্ডে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের এজলাসে ইডি যে পিটিশন দাখিল করেছে, তাতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মামলার ‘রেসপনডেন্ট’ বা পক্ষ করার পাশাপাশি পুরো ঘটনার তদন্তভার সিবিআই-এর হাতে তুলে দেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে।

নথিপত্র ‘লুট’ ও রাজীব কাণ্ডের স্মৃতি

ইডির আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে যে, গতকাল তল্লাশি চলাকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিশাল পুলিশ বাহিনী নিয়ে বেআইনিভাবে আইপ্যাক দপ্তরে প্রবেশ করেন। ইডির দাবি, মুখ্যমন্ত্রী নিজে উপস্থিত থেকে কেন্দ্রীয় জওয়ানদের ঘেরাটোপের মাঝখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র এবং ডিজিটাল হার্ড ড্রাইভ সরিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। পিটিশনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই কাজে রাজ্য পুলিশ সক্রিয়ভাবে মুখ্যমন্ত্রীকে সহযোগিতা করেছে।

তদন্তকারী সংস্থাটি আদালতের কাছে জানিয়েছে যে, গতকালের এই নজিরবিহীন ঘটনা ২০১৯ সালের সারদা কাণ্ডের সময়কার ‘রাজীব কুমার’ পরিস্থিতির কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। সেদিনও সিবিআই আধিকারিকদের পুলিশ দিয়ে আটকানো হয়েছিল, আর আজ ২০২৬-এ এসে খোদ মুখ্যমন্ত্রী প্রমাণ লোপাটের অভিযোগে অভিযুক্ত। ইডির প্রশ্ন, যেখানে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী এবং রাজ্য পুলিশ অভিযুক্ত, সেখানে পুলিশ কীভাবে নিরপেক্ষ তদন্ত করবে? সেই কারণেই সিবিআই তদন্তের আর্জি জানিয়েছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট।

শুভেন্দু অধিকারীর ‘মাঠের লড়াই’ বনাম ‘আইনি জয়’

বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এই আইনি পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, “পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এটাই চেয়েছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী বোকার মতো কাজ করেছেন; তিনি ক্যান্ডিডেটদের প্রপোজাল লিস্ট নিয়ে গিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু ল্যাপটপের ভেতরে কী আছে তা কেউ জানেন না”। শুভেন্দুর দাবি, ইডি যে ‘লিভ’ বা আবেদন করেছে তা গ্রান্ট হয়েছে। তিনি আরও যোগ করেন, “যাঁদের ভিডিও এবং ফটোগ্রাফিতে দেখা গিয়েছে, সেই সমস্ত পুলিশ অফিসার এবং মুখ্যমন্ত্রীকে একিউজড বা অভিযুক্ত করতে পিটিশনে রাখা হয়েছে। এই কাগজপত্র রিকভার করার জন্য সিবিআই ছাড়া গতি নেই”। শুভেন্দুর মতে, এটি ইডির আইনজীবীদের একটি অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন এবং সঠিক পদক্ষেপ।

তৃণমূলের পাল্টা হুঙ্কার: ‘বাংলার বাঘিনীকে আটকানো যাবে না’

ইডির এই পদক্ষেপকে গুরুত্ব দিতে নারাজ তৃণমূল শিবির। দলের মুখপাত্র তন্ময় ঘোষ এক বিস্ফোরক প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন, “সিবিআই কেন, মোদীজির বন্ধু ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দিয়ে আমেরিকা থেকে এফবিআই (FBI)-কেও আনতে পারে, কিচ্ছু হবে না”। তৃণমূলের দাবি, ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে বিজেপি কেন্দ্রীয় এজেন্সিকে ব্যবহার করছে। তন্ময় ঘোষের কথায়, “বাংলার বাঘিনী রাস্তায় নেমেছেন পশ্চিমবঙ্গকে রক্ষা করার জন্য। ২০২৬-এ বাংলার মানুষ চতুর্থবারের জন্য তৃণমূল সরকারকেই আশীর্বাদ করবে”।

সিপিএম ও বিজেপির প্রতিক্রিয়া: ‘নজিরবিহীন নাটক’

সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী অবশ্য ইডি এবং তৃণমূল—উভয় পক্ষকেই কাঠগড়ায় তুলেছেন। তাঁর মতে, এটি একটি ‘পারস্পরিক পিঠ চুলকানোর খেলা’। সুজনবাবু প্রশ্ন তুলেছেন, “ভোটের সময় কেন শুধু ইডি-সিবিআই আসে? আর ইডি যখন তল্লাশি করছিল, তখন তারা নিরাপত্তা নিশ্চিত করেনি কেন?”। তাঁর দাবি, কেন মুখ্যমন্ত্রী ভাইপোকে দিয়ে এফআইআর করালেন না, কেন নিজে সেখানে গিয়ে হাঙ্গামা করলেন, তারও তদন্ত হওয়া উচিত।

অন্যদিকে, বিজেপি নেতা দেবজিত সরকার দাবি করেছেন যে, ভারতের ইতিহাসে তো বটেই, এমনকি বিশ্বের ইতিহাসেও এমন ঘটনা দেখা যায়নি যেখানে একজন মুখ্যমন্ত্রী কোনো বেসরকারি সংস্থার তল্লাশিতে গিয়ে কেন্দ্রীয় এজেন্সির হাত থেকে ফাইল ও ল্যাপটপ টেনে হিঁচড়ে নিয়ে আসেন। তাঁর মতে, এই নজিরবিহীন আচরণের ফল মুখ্যমন্ত্রীকে ভোগ করতে হবে。


ইডির দায়ের করা পিটিশনের মূল সারমর্ম (Table Summary)

আইনি আর্জিবিস্তারিত বিবরণ
সিবিআই তদন্তরাজ্য পুলিশের বদলে কেন্দ্রীয় সংস্থাকে দিয়ে তদন্তের আবেদন।
এফআইআর (FIR)মুখ্যমন্ত্রী ও পুলিশ আধিকারিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করার অনুমতি।
দলভুক্তিকরণ (Party)মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এই মামলায় সরাসরি পক্ষ করার আবেদন।
নথি পুনরুদ্ধারছিনিয়ে নেওয়া ল্যাপটপ ও ফাইল ফেরত দেওয়ার নির্দেশ।
ভিডিও ফুটেজসিসিটিভি ও মিডিয়া ফুটেজকে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণের আর্জি।

২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের ঢের আগে আইপ্যাক কাণ্ড বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন যুদ্ধের সূচনা করল। বিকেল আড়াইটার দিকে হাইকোর্টে যখন ইডির আইনজীবী এসবি রাজু সওয়াল করবেন, তখন গোটা দেশের নজর থাকবে বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের রায়ের দিকে। যদি আদালত সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দেয়, তবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য তা হবে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সবথেকে বড় আইনি লড়াই। আইপ্যাক-এর দপ্তরে সেই সন্ধ্যায় ঠিক কী ঘটেছিল, তার উত্তর হয়তো লুকিয়ে আছে ওই ছিনিয়ে নেওয়া ল্যাপটপটির মধ্যেই。

ট্যাগ (Tags):

#EDHighCourt #MamataBanerjee #CBIInvestigation #IPACRaid #SuvenduAdhikari #WestBengalPolitics #BreakingNewsKolkata #PoliticalCrisis #AssemblyElection2026 #TMCVsBJP


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Comments

Ad Code