নিউজ ডেস্ক | মানুষের ভাষা
কলকাতা : একুশের পর চব্বিশ, আর এবার ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত যেন এক নতুন মাত্রায় পৌঁছল। এবার বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে খোদ দেশের সাংবিধানিক প্রধান। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর উত্তরবঙ্গ সফর এবং তার কর্মসূচি ঘিরে সপ্তাহান্তে যে নজিরবিহীন রাজনৈতিক ডামাডোল তৈরি হয়েছে, এবার তা নিয়ে কড়া পদক্ষেপ করল কেন্দ্র। রাষ্ট্রপতির সফরের খুঁটিনাটি এবং স্থান বদল সংক্রান্ত বিতর্ক নিয়ে রাজ্যের কাছে জরুরি ভিত্তিতে রিপোর্ট তলব করল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক।
রবিবার সকালে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব গোবিন্দ মোহনের তরফ থেকে রাজ্যের মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তীর কাছে এই মর্মে একটি কড়া নির্দেশিকা এসে পৌঁছেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সূত্রে খবর, রাষ্ট্রপতির শিলিগুড়ি সফরে ঠিক কী কী ঘটেছে, কেন তাঁর পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচির স্থান বদল করা হল এবং এই গোটা প্রক্রিয়ায় রাজ্য প্রশাসনের ভূমিকা কী ছিল— রবিবার বিকেলের মধ্যেই তা লিখিতভাবে অমিত শাহের মন্ত্রককে জানাতে হবে। একটি রাজ্যের মুখ্যসচিবের কাছে ছুটির দিনে এমন চরম সময়সীমা বেঁধে দিয়ে রিপোর্ট তলবের ঘটনা রাজনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
সফরের শুরুতেই ছন্দপতন ও বিতর্কের সূত্রপাত
গত শুক্রবার বিকেলেই উত্তরবঙ্গে পৌঁছনোর কথা ছিল রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর। কিন্তু অনিবার্য কারণবশত সেই সফর কিছুটা পিছিয়ে যায়। শনিবার সকাল সাড়ে ১১টা নাগাদ বাগডোগরা বিমানবন্দরে অবতরণ করেন তিনি। তাঁর এই সফরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল শিলিগুড়ির ফাঁসিদেওয়ার বিধাননগরে একটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে আয়োজিত ‘আন্তর্জাতিক সাঁওতাল কনফারেন্স’-এ যোগদান। কিন্তু গোল বাধে ঠিক এখানেই।
নিরাপত্তা এবং পরিকাঠামোগত কারণ দেখিয়ে রাজ্য প্রশাসনের তরফ থেকে শেষ মুহূর্তে ওই অনুষ্ঠানের স্থান বদল করা হয়। ঠিক হয়, বিধাননগরের বদলে শিলিগুড়ির সন্নিকটে গোঁসাইপুর থেকে ভার্চুয়াল মাধ্যমে ওই সাঁওতাল কনফারেন্সে যোগ দেবেন রাষ্ট্রপতি। কিন্তু এই আকস্মিক রদবদলে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন খোদ রাষ্ট্রপতি। ভার্চুয়াল মাধ্যমে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব খারিজ করে দিয়ে তিনি নিজেই সোজা চলে যান বিধাননগরে, যেখানে মূল অনুষ্ঠানটি হওয়ার কথা ছিল।
সেখানে পৌঁছে রাজ্য প্রশাসন এবং মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে কার্যত নজিরবিহীনভাবে ক্ষোভ উগরে দেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, “সাধারণত রাষ্ট্রপতি এলে মুখ্যমন্ত্রীরও আসা উচিত। নিদেনপক্ষে একজন মন্ত্রীর থাকা উচিত। মমতা আমার ছোট বোনের মতো। জানি না, হয়তো কোনও কারণে আমার উপর রাগ করেছে।” স্থান বদলের প্রসঙ্গ টেনে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, “প্রশাসনের মনে কী চলছিল আমি সত্যিই জানি না। আমি তো খুব সহজেই এখানে চলে এলাম। ওরা বলেছিল অনুষ্ঠান করার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নেই। কিন্তু এখানে তো দেখছি এত বড় জায়গা পড়ে আছে! তা-ও কেন ওখানে অনুষ্ঠান করতে দেওয়া হল না, আমি জানি না। এখানে হলে আরও অনেক সাধারণ মানুষ আসতে পারতেন।”
ধর্মতলার ধর্নামঞ্চ থেকে মমতার প্রত্যাঘাত
রাষ্ট্রপতির এই মন্তব্যের পর রাজ্য রাজনীতিতে আক্ষরিক অর্থেই বিস্ফোরণ ঘটে। শনিবার ধর্মতলায় তৃণমূলের ধর্নামঞ্চ থেকে এই ইস্যুকে হাতিয়ার করে সরাসরি কেন্দ্র এবং বিজেপিকে নিশানা করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি স্পষ্ট অভিযোগ করেন যে, রাষ্ট্রপতি না জেনেই ‘বিজেপির নীতির ফাঁদে’ পা দিয়েছেন।
মঞ্চ থেকে কড়া ভাষায় মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “বিজেপির পরামর্শে বিধানসভা ভোটের সময় দয়া করে রাজনীতি করবেন না। এসআইআর (SIR) নিয়ে তো একটাও কথা বললেন না! কত আদিবাসীর নাম ইচ্ছাকৃতভাবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, সেই খবর কি আপনি রেখেছেন? আগে খোঁজ নিয়ে দেখুন, আমরা এই রাজ্যের আদিবাসীদের জন্য কী কী করেছি আর অন্য রাজ্যের সরকার কী করেছে।” মমতার এই মন্তব্য বুঝিয়ে দেয়, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে উত্তরবঙ্গের আদিবাসী ভোটব্যাঙ্ক নিয়ে শাসক ও বিরোধী শিবিরের স্নায়ুযুদ্ধ কতটা চরমে পৌঁছেছে।
আসরে প্রধানমন্ত্রী, রাজ্যকে নিশানা বিজেপির
শনিবার রাতেই এই তরজা জাতীয় স্তরে আছড়ে পড়ে। রাষ্ট্রপতির প্রতি রাজ্য সরকার ‘অপমানজনক’ আচরণ করেছে— এই অভিযোগ তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব হয় গোটা বিজেপি নেতৃত্ব। খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই বিতর্কে হস্তক্ষেপ করেন। নিজের এক্স (পূর্বতন টুইটার) হ্যান্ডেলে প্রধানমন্ত্রী কড়া ভাষায় লেখেন, “রাষ্ট্রপতির পদ সবসময় রাজনীতির ঊর্ধ্বে এবং এই সর্বোচ্চ পদের মর্যাদা সর্বাবস্থায় রক্ষা করা উচিত। আশা করা যায়, পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও তৃণমূল কংগ্রেসের শুভবুদ্ধির উদয় হবে।”
প্রধানমন্ত্রীর এই পোস্টের পর পরই বিজেপিশাসিত বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা একযোগে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সমালোচনা শুরু করেন। রাজ্যের বিরোধী দলনেতা থেকে শুরু করে বঙ্গ বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব অভিযোগ করেন, আদিবাসী সম্প্রদায়ের একজন মহিলা দেশের সর্বোচ্চ পদে বসেছেন, এটা তৃণমূল সরকার মেনে নিতে পারছে না বলেই পদে পদে প্রোটোকল ভেঙে তাঁকে অপমান করা হচ্ছে।
রাজ্যের পাল্টা যুক্তি ও প্রোটোকল রক্ষার দাবি
বিজেপির এই সর্বাত্মক আক্রমণের সামনে অবশ্য হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি রাজ্যের শাসক দল। শনিবার রাতেই তৃণমূল কংগ্রেস এবং রাজ্য সরকারের শীর্ষ মহল থেকে পাল্টা জবাব দেওয়া শুরু হয়। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে সমাজমাধ্যমে জানান, রাষ্ট্রপতির উত্তরবঙ্গ সফরে রাজ্য সরকার কোনও প্রোটোকল বিঘ্নিত করেনি।
রাজ্যের যুক্তি, যে ‘আন্তর্জাতিক সাঁওতাল কাউন্সিল’-এর অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির যাওয়ার কথা ছিল, সেটি সম্পূর্ণ একটি বেসরকারি সংস্থা। তাদের কর্মসূচির বিষয়ে রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ের সঙ্গে জেলার পুলিশ ও প্রশাসনের নিরন্তর সমন্বয় ছিল। গত বৃহস্পতিবারই রাজ্য প্রশাসনের তরফে রাষ্ট্রপতির সচিবালয়কে লিখিতভাবে জানানো হয়েছিল যে, ওই নির্দিষ্ট স্থানে পর্যাপ্ত পরিকাঠামো এবং প্রস্তুতির অভাব রয়েছে। এত বড় মাপের ভিভিআইপি নিরাপত্তার জন্য যে বন্দোবস্ত প্রয়োজন, তা সেখানে নেই। তা সত্ত্বেও দিল্লির তরফে কর্মসূচি অপরিবর্তিত রাখা হয়।
রাজ্য প্রশাসনের এক শীর্ষ আধিকারিক জানান, প্রোটোকল মেনে বাগডোগরায় রাষ্ট্রপতিকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন খোদ শিলিগুড়ির মেয়র এবং দার্জিলিংয়ের জেলাশাসক। মুখ্যমন্ত্রী নিজে রাতে রাষ্ট্রপতির সফর সংক্রান্ত সরকারি নথিপত্র জনসমক্ষে প্রকাশ করে দেন, যাতে প্রমাণ করা যায় যে রাজ্য সরকার কোথাও গাফিলতি করেনি।
রবিবারের চিঠি এবং ভবিষ্যৎ সমীকরণ
রাজ্য সরকারের এই যাবতীয় ব্যাখ্যার পরেও চিঁড়ে ভেজেনি। রবিবার সকালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তরফ থেকে মুখ্যসচিবকে পাঠানো চিঠি বুঝিয়ে দিচ্ছে, কেন্দ্র এই ইস্যুকে এত সহজে ছেড়ে দিতে রাজি নয়। বিকেলের মধ্যে রাজ্যের রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক কী পদক্ষেপ করে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে গোটা দেশের রাজনৈতিক মহল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, বাংলার মাটি তত বেশি উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকা গত কয়েকটি নির্বাচনে বিজেপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হলেও, সাম্প্রতিক সময়ে তৃণমূল সেখানে নিজেদের জমি অনেকটাই পুনরুদ্ধার করেছে। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির মতো অরাজনৈতিক এবং সাংবিধানিক পদকে কেন্দ্র করে এই বেনজির তরজা আদতে দুই শিবিরেরই ভোট-কৌশলের অংশ কি না, তা নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে। একদিকে রাজ্যপাল পদ থেকে সিভি আনন্দ বোসের আচমকা ইস্তফা এবং আর এন রবির মতো কড়া ধাঁচের প্রাক্তন পুলিশকর্তার আগমন, আর অন্যদিকে রাষ্ট্রপতির সফর ঘিরে এই কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত— সব মিলিয়ে বাংলার রাজনৈতিক আবহাওয়া যে আগামী দিনে আরও চরম আকার ধারণ করতে চলেছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
0 মন্তব্যসমূহ