Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

Recent in Home

শাস্ত্র মতে পতন কখন নিশ্চিত শাসকের - ক্ষমতার দম্ভ ও কুরুক্ষেত্রের শিক্ষা: জনতার আদালতই শেষ কথা

ক্ষমতার দম্ভ ও কুরুক্ষেত্রের শিক্ষা: জনতার আদালতই শেষ কথা


সম্পাদকীয় : মানুষের ভাষা , প্রবীর রায় চৌধুরী : 

ইতিহাসের এক আশ্চর্য পুনরাবৃত্তি আছে। সিংহাসনে বসলে শাসকের চোখে অনেক সময়ই এক অদ্ভুত মায়াঞ্জন লেগে যায়। তার মনে হতে থাকে, ক্ষমতার এই গদি হয়তো চিরস্থায়ী এবং সাধারণ মানুষ বড়ই দুর্বল, বড়ই বোকা। কিন্তু যুগ যুগ ধরে ইতিহাস বার বার প্রমাণ করেছে, যে শাসক জনতাকে বোকা ভাবে, চূড়ান্ত বিচারে সে নিজেই সবচেয়ে বড় বোকা। ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে যারা সাধারণ মানুষের অধিকারকে অবজ্ঞা করে, তাদের পতন কেবল সময়ের অপেক্ষা।

হাজার হাজার বছর আগে কুরুক্ষেত্রের প্রাঙ্গণে শ্রীমদভগবদ্গীতা যে শাশ্বত সত্য উচ্চারণ করেছিল, আজকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও তা বর্ণে বর্ণে মিলে যায়। গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন, রণভূমি এবং রাজকার্য— এই দুইয়ের জন্যই কারা চূড়ান্তভাবে অযোগ্য। যে ব্যক্তি মোহাচ্ছন্ন, যার চিত্ত দুর্বল এবং যে কেবল নিজের জয়-পরাজয়ের ফলাফলের প্রতি অত্যধিক আসক্ত, রণভূমি তার জন্য নয়। কারণ, যুদ্ধ কেবল অস্ত্রের নয়, ধর্ম ও ন্যায়েরও। কিন্তু যখন রাজকার্য বা রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশ্ন আসে, তখন মাপকাঠি আরও অনেক বেশি কঠোর।

মহাভারতের শান্তিপর্ব, বিদুর নীতি এবং গীতার ষোড়শ অধ্যায় (দৈবাসুরসম্পদ্বিভাগযোগ) ঘাঁটলে দেখা যায়, কাম, ক্রোধ ও লোভ— এই তিনটি প্রবৃত্তি যার সঙ্গী, সে কখনও আদর্শ শাসক হতে পারে না। গীতায় এদের বলা হয়েছে ‘নরকের দ্বার’। বর্তমান রাজনীতির দিকে তাকালে আমরা ঠিক কী দেখি? দম্ভ, দর্প ও অভিমানে মত্ত হয়ে কিছু নেতা নিজেদের ঈশ্বর ভাবতে শুরু করেন। তারা ভুলে যান চাণক্যের সেই অমোঘ নীতি— 'প্রজারঞ্জন' বা মানুষের কল্যাণই রাজার একমাত্র ধর্ম। যে শাসক নিজের সম্পদের পাহাড়ে বসে সাধারণ মানুষের যন্ত্রণাকে উপহাস করেন, স্তাবক পরিবৃত হয়ে বাস্তব থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখেন, শাস্ত্র মতেই তার সিংহাসনে বসার কোনো নৈতিক অধিকার নেই।

প্রাচীন ভারতের এই দর্শনের সঙ্গে আধুনিক বিশ্বের মহান নেতাদের ভাবনার বিন্দুমাত্র অমিল নেই। আব্রাহাম লিংকন যথার্থই স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন, সব মানুষকে সব সময়ের জন্য বোকা বানানো যায় না। মহাত্মা গান্ধীও বলে গেছেন, ইতিহাসে বহু স্বৈরশাসকের আবির্ভাব হয়েছে, কিছু সময়ের জন্য তাদের অপরাজেয় মনে হলেও শেষ পর্যন্ত তাদের পতন অনিবার্য। জন এফ. কেনেডির কথায়, যারা শান্তিপূর্ণ পরিবর্তনের পথ রুদ্ধ করে, তারা আসলে নিজেদের সহিংস পতনকেই ডেকে আনে।

আজকের দিনেও যখন কোনো রাজনৈতিক দল বা নেতা ক্ষমতার অহংকারে মাটির পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, তখন তারা আসলে নিজেদের পতন নিজেরাই ডেকে আনেন। তারা বুঝতে পারেন না যে, সাধারণ মানুষ হয়তো সাময়িকভাবে নীরব থাকতে পারে, কিন্তু তারা অন্ধ নয়। ভোটের রাজনীতিতে বা পেশিশক্তির আস্ফালনে সাময়িক জয় মিলতে পারে ঠিকই, কিন্তু মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ যখন ব্যালট বক্সে বা রাজপথে ফেটে পড়ে, তখন কোনো দম্ভ, কোনো বাহুবলই তাকে আটকাতে পারে না।

শেষ পর্যন্ত জয় হয় সাধারণ মানুষেরই। তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে অহংকারের সিংহাসন, আর টিকে থাকে শুধু মানুষের ভাষা। সেই ভাষাই ঠিক করে দেয় আগামী দিনের ইতিহাস এবং বুঝিয়ে দেয়— দম্ভ নয়, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাই হলো প্রকৃত রাজধর্ম।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Comments

Ad Code