Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

Recent in Home

ভোটের বাজারে মেগা টুইস্ট! ১৩ বছরের বন্দিদশা কাটিয়ে জামিন সুদীপ্ত সেনের, চিন্তায় কারা?


 মানুষের ভাষা | নিউজ ডেস্ক

কলকাতা: বাংলার রাজনীতিতে ফের একবার যেন টাইম মেশিনে চড়ে ফিরে এল এক দশকেরও বেশি পুরোনো এক অধ্যায়। আসন্ন ২০২৬ সালের হাই-ভোল্টেজ বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক মুখে, যখন রাজ্যের প্রতিটি রাজনৈতিক দল নিজেদের ঘুঁটি সাজাতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই ঘটল এক অভাবনীয় ঘটনা। দীর্ঘ প্রায় ১৩ বছরের আইনি লড়াই এবং কারাবাসের পর অবশেষে জেলের অন্ধকার কুঠুরি থেকে মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে চলেছেন রাজ্যের অন্যতম চর্চিত এবং বিতর্কিত চরিত্র— সারদা গোষ্ঠীর কর্ণধার সুদীপ্ত সেন ।

প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে জেলের চার দেওয়ালের অন্দরে বন্দি থাকা এই হাই-প্রোফাইল অভিযুক্তের মুক্তির খবরে স্বাভাবিকভাবেই তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে রাজ্য রাজনীতিতে। বুধবার কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি রাজর্ষি ভরদ্বাজের ডিভিশন বেঞ্চ তাঁর জামিন মঞ্জুর করায় জেল থেকে বেরোনোর পথে সুদীপ্ত সেনের আর কোনো আইনি বাধা রইল না। আর তাঁর এই মুক্তির পরেই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। জেলের বাইরে বেরিয়েই কি কোনও বিস্ফোরক তথ্য ফাঁস করবেন সারদাকর্তা? কার কপালে পড়তে চলেছে চিন্তার ভাঁজ? নির্বাচনের ঠিক মুখে তাঁর এই মুক্তি কি নেহাতই আইনি প্রক্রিয়া, নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে অন্য কোনও সমীকরণ? এই সব প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে বঙ্গ রাজনীতির অলিন্দে।

দীর্ঘ ১৩ বছরের কারাবাস: আইনি জটিলতা এবং মুক্তির পথ

২০১৩ সালের এপ্রিল মাস। বাংলার বুকে ঘটে যাওয়া অন্যতম বৃহত্তম আর্থিক কেলেঙ্কারি বা চিটফান্ড দুর্নীতি প্রকাশ্যে আসতেই তোলপাড় হয়েছিল গোটা দেশ। লক্ষ লক্ষ সাধারণ আমানতকারী, গরিব মানুষ থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত— সকলেই নিজেদের কষ্টার্জিত জীবনের সঞ্চয় হারিয়েছিলেন সারদার ভুয়ো প্রতিশ্রুতিতে। কেলেঙ্কারি ফাঁস হতেই রাতারাতি রাজ্য ছেড়ে সহযোগী দেবযানী মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে গা-ঢাকা দিয়েছিলেন সুদীপ্ত সেন। শেষমেশ ২০১৩ সালের এপ্রিলেই কাশ্মীরের বরফঘেরা সোনমার্গ থেকে তাঁদের দু'জনকে গ্রেফতার করে রাজ্য পুলিশ। সেই শুরু। তারপর থেকে গত প্রায় ১২ বছর ১১ মাস ধরে সুদীপ্ত সেন প্রেসিডেন্সি জেলেরই আবাসিক।

সারদাকাণ্ড প্রকাশ্যে আসার পর সুদীপ্ত সেনের বিরুদ্ধে রাজ্য ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মোট ৩৮৯টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। সিবিআই , ইডি থেকে শুরু করে রাজ্য পুলিশের একাধিক দপ্তর তাঁর বিরুদ্ধে তদন্তে নামে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় একের পর এক মামলার শুনানি চলতে থাকে। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই-এর দায়ের করা মোট ৭৬টি মামলাতেই তিনি আগেই জামিন পেয়েছিলেন। মোট ৩৮৯টি মামলার মধ্যে ৩৮৭টি মামলাতেই তাঁর জামিন মঞ্জুর হয়ে গিয়েছিল।

তবে সুদীপ্ত সেনের মুক্তির পথে মূল কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল রাজ্য পুলিশের হাতে থাকা বারাসতের দুটি মামলা। সেই দুটি মামলা এতদিন ঝুলে ছিল। কিন্তু অবশেষে বুধবার হাইকোর্টের বিচারপতি রাজর্ষি ভরদ্বাজের ডিভিশন বেঞ্চ সেই শেষ দুটি মামলাতেও তাঁর জামিন মঞ্জুর করেছে। তবে আদালত এই জামিনের ক্ষেত্রে বেশ কিছু অত্যন্ত কঠোর শর্ত আরোপ করেছে বলে আইনি সূত্রে খবর। সমস্ত আইনি নথিপত্রের কাজ মিটে গেলে বৃহস্পতিবারই প্রেসিডেন্সি জেল থেকে তাঁর ছাড়া পাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

কুণাল ঘোষের সাফাই: ‘রাজনীতির কোনও যোগ নেই’

সারদাকাণ্ডের তদন্তে একসময় অন্যতম চর্চিত নাম ছিল কুণাল ঘোষের। এক সময় সুদীপ্ত সেনের সংস্থায় উচ্চপদে কর্মরত ছিলেন তিনি। বর্তমানে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক তথা আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে বেলেঘাটা কেন্দ্রের দাপুটে প্রার্থী। সুদীপ্ত সেনের এই নাটকীয় মুক্তি এবং ভোটের মুখে তার প্রভাব নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হয়েছিল কুণালবাবুর কাছে।

সংবাদমাধ্যমের সামনে কুণাল ঘোষ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে এবং সাবলীলভাবে জানিয়েছেন যে, সারদাকর্তার এই জামিনের সঙ্গে রাজনীতির কোনও সম্পর্ক খোঁজাটা একেবারেই অর্থহীন। তিনি বলেন, "এই জামিনের সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। এটা সম্পূর্ণ আইনের বিষয়। যেকোনো অভিযুক্ত বা বন্দীর পূর্ণ আইনি অধিকার রয়েছে আদালতের কাছে জামিনের আর্জি জানানোর। তিনি দীর্ঘ প্রায় ১৩ বছর ধরে জেলে রয়েছেন। আদালত নিশ্চয়ই সব দিক খতিয়ে দেখেছে এবং শুনানি শেষেই জামিন মঞ্জুর করেছে। এর মধ্যে রাজনীতির রং লাগানো ঠিক নয়।"

শাসকদলের এই নেতার বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, তৃণমূল কংগ্রেস এই ঘটনাকে সম্পূর্ণভাবে একটি বিচ্ছিন্ন আইনি প্রক্রিয়া হিসেবেই দেখতে এবং দেখাতে চাইছে, যাতে ভোটের মুখে বিরোধীরা এই ইস্যুকে হাতিয়ার করতে না পারে।

অধীররঞ্জন চৌধুরীর জল্পনা-জাগানো মন্তব্য

কুণাল ঘোষ বিষয়টিকে আইনি মোড়কে বেঁধে রাখতে চাইলেও, বিরোধীরা কিন্তু ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন। সুদীপ্ত সেনের মুক্তি নিয়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং অন্যরকম ইঙ্গিত দিয়েছেন বহরমপুরের বিদায়ী সাংসদ তথা প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীররঞ্জন চৌধুরী।

অধীরবাবুর মতে, সারদাকর্তা জেলের বাইরে এলে এমন অনেক অজানা এবং বিস্ফোরক তথ্য সামনে আসতে পারে, যা রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে সুনামি তৈরি করতে সক্ষম। সংবাদমাধ্যমের সামনে অধীরবাবুর সংক্ষিপ্ত অথচ জল্পনা-জাগানো মন্তব্য, "সুদীপ্ত সেন বাইরে এলে অনেক কিছু সামনে আসবে।"

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, অধীর চৌধুরীর এই মন্তব্যের নেপথ্যে গভীর রাজনৈতিক ইঙ্গিত লুকিয়ে রয়েছে। সারদাকাণ্ডের সঙ্গে অতীতে রাজ্যের শাসকদলের একাধিক নেতা-মন্ত্রীর নাম জড়িয়েছিল। এমনকি খোদ সুদীপ্ত সেন জেলে থাকাকালীন বিভিন্ন সময়ে চিঠি লিখে বা বয়ান দিয়ে অনেক রাঘববোয়ালের দিকে আঙুল তুলেছিলেন। এখন তিনি যখন সম্পূর্ণ মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেবেন, তখন কি তিনি এমন কারও নাম প্রকাশ্যে আনবেন, যা ভোটের মুখে শাসকদলের জন্য চরম বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়াবে? অধীরবাবুর মন্তব্য সেই জল্পনার আগুনে নতুন করে ঘি ঢেলেছে।

ভোটের বাজারে 'সারদা' ফ্যাক্টর এবং রাজনৈতিক সমীকরণ

বাংলার রাজনীতিতে সারদাকাণ্ড বরাবরই একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং আবেগের ইস্যু। ২০১৩ থেকে ২০২৬— এই দীর্ঘ সময়ে গঙ্গা দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। সারদাকাণ্ডে সর্বস্বান্ত হওয়া অনেক মানুষ আজও বিচারের আশায় দিন গুনছেন। ঠিক এই প্রেক্ষাপটে, বিধানসভা নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে মূল অভিযুক্তের এই আইনি মুক্তি বিরোধীদের হাতে একটি মোক্ষম রাজনৈতিক হাতিয়ার তুলে দিতে পারে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

বিরোধীরা প্রচারের ময়দানে বারবার এই প্রশ্ন তুলতে পারে যে, কেন এত বছর ধরে তদন্ত চলার পরেও সাধারণ আমানতকারীরা তাঁদের টাকা ফেরত পেলেন না, অথচ মূল চক্রী জামিন পেয়ে গেলেন! পাশাপাশি, সুদীপ্ত সেন বাইরে বেরিয়ে কার দিকে অভিযোগের আঙুল তোলেন, তার ওপরেও নজর থাকবে সমস্ত রাজনৈতিক দলের।

ইডি কাঁটায় বিদ্ধ তৃণমূল এবং 'তুরুপের তাস' মহিলা ভোটব্যাঙ্ক

একদিকে যখন সারদাকর্তার মুক্তি নিয়ে রাজ্য রাজনীতি সরগরম, অন্যদিকে তখন এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট -এর জোড়া ফলায় বিদ্ধ রাজ্যের শাসকদল। সূত্রের খবর, ভোটের মুখেই তৃণমূলের তিন হেভিওয়েট প্রার্থীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছে ইডি। নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রচার পর্বে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার এই পদক্ষেপে যথেষ্ট বিড়ম্বনায় পড়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। বিরোধীদের অভিযোগ, দুর্নীতিগ্রস্তদের আড়াল করার চেষ্টা করছে শাসকদল, অন্যদিকে তৃণমূলের পাল্টা দাবি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে নির্বাচনের ঠিক আগে ইডি-সিবিআইকে লেলিয়ে দিচ্ছে কেন্দ্রের শাসকদল।

তবে এই সমস্ত দুর্নীতি এবং আইনি গেরোর মাঝেই তৃণমূলের প্রধান ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজ্যের মহিলা ভোটব্যাঙ্ক। আসন্ন এই বিধানসভা নির্বাচনে মহিলাদের মন জয় করতে শাসকদলের 'তুরুপের তাস' হতে চলেছে সরকারি বাসে বিনামূল্যে যাতায়াতের মেগা প্রতিশ্রুতি। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ব্যাপক সাফল্যের পর, মহিলাদের জন্য সরকারি পরিবহণে এই বিনামূল্যে যাতায়াতের ঘোষণা যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে তা ভোটের বাক্সে শাসকদলের জন্য যে গেমচেঞ্জার হতে পারে, তা একবাক্যে স্বীকার করে নিচ্ছেন বিরোধীরাও।

এবার কী করবেন সুদীপ্ত সেন?

সব মিলিয়ে, ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, বঙ্গ রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে নিত্যনতুন চমক ততই বাড়ছে। ১৩ বছরের বন্দিদশা কাটিয়ে মুক্ত সারদাকর্তা সুদীপ্ত সেন এবার কোন পথে হাঁটেন, সেটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন। তিনি কি জেলের বাইরের জীবনে সম্পূর্ণ নীরবতা পালন করে আইনি লড়াই চালিয়ে যাবেন, নাকি ভোটের এই তপ্ত আবহে মুখ খুলে নতুন করে কোনও 'প্যান্ডোরার বাক্স'  খুলে দেবেন?

যদি সুদীপ্ত সেন মুখ খোলেন, তবে কার কপালে সবথেকে বেশি চিন্তার ভাঁজ পড়বে, তা হয়তো সময়ই বলবে। তবে এটুকু নিশ্চিত, সারদাকর্তার জেলের বাইরে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলার রাজনীতিতে শুরু হতে চলেছে এক নতুন অধ্যায়ের।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Comments

Ad Code