মানুষের ভাষা | নিউজ ডেস্ক
কলকাতা: শোক যখন শক্তিতে রূপান্তরিত হয়, তখন শাসকের বুক কাঁপে। আর সেই ভয়ের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ ঘটে কদর্য ভাষায়, ব্যক্তিগত আক্রমণে এবং চরম অমানবিকতায়। কলকাতার আরজি কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসক 'অভয়া'-র সঙ্গে ঘটে যাওয়া নারকীয় ঘটনার পর গোটা দেশ কেঁদেছিল। কিন্তু সেই নিহত চিকিৎসকের মা যখন বিচারের দাবিতে, সুবিচারের আশায় রাস্তায় নামলেন এবং চরম হতাশা থেকে রাজনৈতিক পথে লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন তাঁকে যে ভাষায় এবং যে ভঙ্গিতে অপমানিত হতে হলো, তা বঙ্গ রাজনীতির ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে। সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও
Using the term "TMC Goons" is like insulting the goons.
— Rajan V M | राजन | ராஜன் 🇮🇳 (@OnlineRajan__) April 8, 2026
The correct term is "TMC Terrorists".https://t.co/btGlnubFq1
আবারও প্রমাণ করে দিল, রাজনৈতিক স্বার্থান্ধতা মানুষকে কতটা নিচে নামাতে পারে। তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা ও ক্যাডাররা যেভাবে নির্লজ্জের মতো অভয়ার মাকে অপমান করেছেন, তা শুধু রাজনৈতিক শিষ্টাচার নয়, মানবিকতারও চূড়ান্ত অবমাননা।
বিচারের লড়াই থেকে রাজনৈতিক রোষানল
আরজি করের মর্মান্তিক ঘটনার পর থেকেই অভয়ার বাবা-মা সুবিচারের আশায় দরজায় দরজায় ঘুরেছেন। সিবিআই তদন্ত, সুপ্রিম কোর্টের শুনানি, জুনিয়র ডাক্তারদের কর্মবিরতি— সবকিছুতেই তাঁরা মেয়ে হারানোর তীব্র যন্ত্রণা বুকে চেপে লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু রাজ্যের শাসকদলের একাংশ প্রথম থেকেই এই পরিবারটির প্রতি এক অদ্ভুত বৈরী মনোভাব পোষণ করে এসেছে। যখন বিচারের দাবি প্রবল হয়, তখন থেকেই তৃণমূল কংগ্রেসের কিছু নেতা এবং তাদের আইটি সেল এই শোকস্তব্ধ পরিবারের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার শুরু করে। সম্প্রতি অভয়ার মা যখন রাজনৈতিক ময়দানে পা রাখার সিদ্ধান্ত নেন এবং একটি বিরোধী দলের (বিজেপি) হয়ে আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার কথা ঘোষণা করেন, তখন শাসকদলের সেই আক্রোশ যেন সব বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসে।
তৃণমূল নেতাদের কদর্য আক্রমণ ও নির্লজ্জতা
ভিডিওটিতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে এবং সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করছে যে, তৃণমূল ক্যাডাররা কীভাবে ওই শোকসন্তপ্ত মায়ের দিকে কদর্য বাক্যবাণ ছুঁড়ে দিচ্ছেন। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে পাড়ার মোড়, সর্বত্র শাসকদলের নেতা-কর্মীদের মুখে একটাই কথা— "মেয়ের মৃত্যু নিয়ে রাজনীতি করছেন মা!" একবারও কি এই মানুষগুলোর মনে হলো না যে, এই মা তাঁর নাড়ির টুকরো সন্তানকে এক নারকীয় ষড়যন্ত্র ও নৃশংসতার বলি হতে দেখেছেন?
শাসকদলের প্রথম সারির নেতাদের মন্তব্যও এই ক্যাডারদের আস্ফালনে ইন্ধন জুগিয়েছে। কুণাল ঘোষ, ফিরহাদ হাকিম, সায়নী ঘোষের মতো নেতারা এমন মন্তব্য করেছেন যা শুধু অসংবেদনশীল নয়, রীতিমতো ক্রূর। কেউ বলেছেন, "তাঁরা বিরোধীদের হাতের পুতুল হয়ে গিয়েছেন", তো কেউ বলেছেন "মেয়ের মৃত্যুর বিচার চেয়ে আসলে রাজনৈতিক ফায়দা লুটছেন"। তৃণমূলের এক হেভিওয়েট সাংসদ তো খোদ নির্বাচন কমিশনে গিয়ে ওই মায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ ঠুকেছেন। এই প্রতিটি মন্তব্য, প্রতিটি আক্রমণ যেন প্রমাণ করছে, শাসকদলের কাছে একজন সন্তানহারা মায়ের কান্নার চেয়ে নিজেদের রাজনৈতিক গদি বাঁচানো এবং বিরোধীদের কোণঠাসা করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্যাডারদের ট্রোলিং: অমানবিকতার নতুন নজির
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি আসলে এক বৃহত্তর রাজনৈতিক ভীতিপ্রদর্শন কৌশলের একটি খণ্ডচিত্র মাত্র। তৃণমূল ক্যাডারদের এই আচরণ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক বয়ান, যার উদ্দেশ্য হলো নিহত চিকিৎসকের পরিবারকে মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়া এবং গোটা বিচারপ্রক্রিয়া ও আন্দোলনকে কালিমালিপ্ত করা। ভিডিওতে ক্যাডারদের আস্ফালন, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এবং ভাষা প্রমাণ করে যে, ওপরতলার নির্দেশ বা প্রশ্রয় ছাড়া নিচুতলার কর্মীদের এতটা স্পর্ধা হতে পারে না।
যে মা রাতের পর রাত ঘুমোতে পারেননি, যাঁর চোখের জল আজও শুকোয়নি, যাঁকে তাঁর সন্তানের শেষকৃত্য নিয়ে প্রশাসনের চরম অমানবিকতার শিকার হতে হয়েছিল, তাঁকে নিয়ে আজ শাসকদলের ক্যাডারদের এই অট্টহাসি আর ব্যঙ্গ বাংলার সংস্কৃতির মুখে এক বিরাট থাপ্পড়। রাজনীতি তার নিজের পথে চলবে, কিন্তু প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে গিয়ে মাতৃত্বকে অপমান করার এই নজিরবিহীন স্পর্ধা শাসকদলের ঔদ্ধত্যকেই প্রকাশ্যে নিয়ে আসছে।
গণতান্ত্রিক অধিকার ও শাসকের ভণ্ডামি
গণতান্ত্রিক দেশে যে কোনো নাগরিকের অধিকার রয়েছে তাঁর নিজের রাজনৈতিক মতাদর্শ বেছে নেওয়ার। অভয়ার মা যদি মনে করেন যে, বর্তমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়তে গেলে, মেয়ের জন্য ন্যায়বিচার ছিনিয়ে আনতে গেলে তাঁকে সরাসরি নির্বাচনী ময়দানে নামতে হবে, তবে সেই সিদ্ধান্তকে সম্মান জানানোই একটি সভ্য সমাজের কাজ। তাঁর সেই দলের নির্বাচনের সঙ্গে কেউ একমত নাও হতে পারেন, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে শাসকদলের ক্যাডাররা তাঁকে প্রকাশ্যে অপমান করবেন, ট্রোল করবেন বা চরিত্রহনন করবেন।
যে দল দিনরাত 'মা-মাটি-মানুষ'-এর স্লোগান দেয়, নারী সুরক্ষার কথা বলে ভোটের বৈতরণী পার হয়, তাদেরই কর্মীদের দ্বারা একজন অসহায়, সন্তানহারা মাকে এমন নির্লজ্জভাবে অপমানিত হতে দেখে আজ বাংলার বিবেক স্তব্ধ। এটি শাসকের চরম ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছুই নয়। শাসকদলের এই আচরণ প্রমাণ করে যে, তাদের কাছে 'মা' বা 'মহিলা' সম্মান তখনই পান, যখন তাঁরা শাসকদলের তাঁবেদারি করেন। শাসকের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুললেই তিনি 'ষড়যন্ত্রকারী' হয়ে যান।
মায়ের লড়াই বনাম শাসকের পেশিশক্তি
এই ঘটনা আমাদের ভাবতে বাধ্য করে, আমরা কেমন সমাজ তৈরি করছি? যেখানে একজন ধর্ষিতা ও খুন হওয়া মেয়ের মাকে তাঁর রাজনৈতিক পছন্দের জন্য এইভাবে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয় এবং শাসকদলের গুণ্ডাবাহিনী তাঁকে নিয়ে নোংরা খেলায় মাতে, সেখানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও সম্মান কোথায়? রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু একটি মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির শিকার হওয়া পরিবারের প্রতি ন্যূনতম সমবেদনাটুকুও কি রাজনীতি কেড়ে নিয়েছে?
অভয়ার মায়ের এই লড়াই আজ শুধু তাঁর মেয়ের বিচারের জন্য আটকে নেই। এই লড়াই আজ এই গোটা পচা-গলা রাজনৈতিক সিস্টেমের বিরুদ্ধে, যেখানে ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে যাওয়া নেতারা মানুষের চোখের জলকেও উপহাস করতে ছাড়েন না। ক্যাডারদের দিয়ে এই অপমান আসলে শাসকদলের ভেতরের ভয়কেই তুলে ধরছে। তাঁরা ভয় পাচ্ছেন একজন মায়ের কান্নাকে, তাঁরা ভয় পাচ্ছেন সেই মায়ের জনসমর্থনকে।
ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে এই কলঙ্ক
ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। ক্ষমতার দম্ভ চিরস্থায়ী নয়। আজ ক্ষমতার আস্ফালনে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা-মন্ত্রী এবং ক্যাডাররা অভয়ার মায়ের যন্ত্রণাকে ব্যঙ্গ করছেন, তাঁকে কালিমালিপ্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন। কিন্তু বাংলার সাধারণ মানুষ অন্ধ নন, তাঁরা সবকিছু দেখছেন এবং বিচার করছেন। এই নির্লজ্জতা, এই অমানবিকতা এবং এই চরম ঔদ্ধত্যের জবাব হয়তো আগামী দিনের ব্যালট বাক্সেই লুকিয়ে আছে।
একজন মায়ের চোখের জল এবং তাঁকে করা অপমানের দায় শাসকদলকে আজ না হোক কাল নিতেই হবে। 'মানুষের ভাষা' নিউজ ডেস্ক এই জঘন্য, অমানবিক ও কদর্য রাজনৈতিক আক্রমণের তীব্র নিন্দা করছে। আমরা চাই, রাজনীতি তার হারানো শিষ্টাচার ফিরে পাক। একজন শোকস্তব্ধ মা তাঁর প্রাপ্য সম্মান ও সুবিচার পান, এবং অপরাধী ও তাদের মদতদাতারা যেন কোনোভাবেই পার না পায়। বাংলার মাটিতে এই নির্লজ্জ রাজনৈতিক অসভ্যতার অবসান ঘটা এখন সময়ের দাবি।
0 মন্তব্যসমূহ