নিউজ ডেস্ক | মানুষের ভাষা:
কলকাতা : একটি গণতান্ত্রিক কাঠামোয় রাজ্য সরকার যখন তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়, অথবা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিকাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে, তখন দেশের সংবিধান এক চরম ও চূড়ান্ত রক্ষাকবচের বিধান দেয়। এটিই হল বহুল চর্চিত ৩৫৬ নম্বর ধারা বা ‘রাষ্ট্রপতি শাসন’ (President's Rule)। এটিকে অনেক সময় ‘স্টেট এমারজেন্সি’ বা রাজ্যভিত্তিক জরুরি অবস্থাও বলা হয়ে থাকে। এই বিশেষ সাংবিধানিক ধারার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকার চাইলে নির্বাচিত রাজ্য সরকারকে সাসপেন্ড বা বরখাস্ত করে সরাসরি সংশ্লিষ্ট রাজ্যের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিতে পারে।
সাধারণত, কোনও রাজ্যে ৩৫৬ ধারা জারির প্রক্রিয়াটি শুরু হয় সেই রাজ্যের রাজ্যপালের রিপোর্টের ভিত্তিতে। কিন্তু, দেশের নির্বাচন কমিশন (Election Commission of India - ECI)-ও এই ক্ষেত্রে এক অত্যন্ত নির্ণায়ক ও তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে, বিশেষত যখন রাজ্যের প্রশাসনিক অচলাবস্থা সরাসরি গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়। আজ আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব, ঠিক কোন পথে বা কোন শৃঙ্খল মেনে (Chain of Command) এই প্রক্রিয়াটি কার্যকর হয় এবং ঠিক কতটা চরম পরিস্থিতি তৈরি হলে নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রপতি শাসনের মতো কড়া পদক্ষেপের সুপারিশ করতে পারে।
সিদ্ধান্ত গ্রহণের শৃঙ্খল: নির্বাচন কমিশন থেকে রাষ্ট্রপতি ভবন
ভারতের সংবিধান প্রণেতারা অত্যন্ত দূরদর্শিতার সঙ্গে ৩৫৬ নম্বর ধারার অপব্যবহার রোধ করতে এক সুনির্দিষ্ট ও কড়া পদ্ধতিগত শৃঙ্খল বা ‘প্রোসিডিওরাল ল্যাডার’ তৈরি করে গেছেন। নির্বাচন কমিশন যদি মনে করে যে কোনও রাজ্যে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করানো আক্ষরিক অর্থেই অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে, তবুও তারা এককভাবে বা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করতে পারে না। এর জন্য তাদের একটি নির্দিষ্ট সাংবিধানিক পথ অনুসরণ করতে হয়, যা ধাপে ধাপে রাষ্ট্রপতি পর্যন্ত পৌঁছায়।
১. প্রথম ধাপ: নির্বাচন কমিশনের মূল্যায়ন এবং 'অথবা অন্য উপায়ে' (Or Otherwise) শর্ত
সংবিধানের ৩৫৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি একটি রাজ্যে সরাসরি শাসনভার জারি করতে পারেন রাজ্যপালের রিপোর্ট পাওয়ার পর, "অথবা অন্য উপায়ে" (Or otherwise)। এই "অন্য উপায়ে" শব্দবন্ধটি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যপূর্ণ। এর অর্থ হল, রাষ্ট্রপতি কেবল রাজ্যপালের রিপোর্টের ওপর নির্ভরশীল নন, তিনি চাইলে অন্য কোনও নিরপেক্ষ, বস্তুনিষ্ঠ এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতেও পদক্ষেপ করতে পারেন। যদি নির্বাচন কমিশন তাদের নিজস্ব পর্যালোচনায় দেখে যে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের নির্বাচনী কাঠামো বা প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে, তবে তারা সরাসরি একটি আনুষ্ঠানিক রিপোর্ট বা শংসাপত্র রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দিতে পারে। কমিশনের এই রিপোর্টই কেন্দ্রীয় হস্তাক্ষেপ বা রাষ্ট্রপতি শাসনের স্বপক্ষে প্রয়োজনীয় "বস্তুনিষ্ঠ উপাদান" (Objective material) হিসেবে কাজ করে।
২. দ্বিতীয় ধাপ: কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার পর্যালোচনা
ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি কখনোই শূন্যে বা সম্পূর্ণ একক সিদ্ধান্তে কাজ করেন না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রপতি তাঁর প্রশাসনিক ও শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতা প্রয়োগ করেন প্রধানমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার (Union Cabinet) পরামর্শ মেনে। যখন নির্বাচন কমিশন (বা রাজ্যপাল) রাজ্যে সাংবিধানিক পরিকাঠামো ভেঙে পড়ার রিপোর্ট রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করে, তখন কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা সেই পরিস্থিতি অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যালোচনা করে। যদি মন্ত্রিসভা একমত হয় যে, ওই রাজ্যে সত্যিই আর সংবিধান মেনে সরকার পরিচালনা করা সম্ভব নয়, তখন তারা আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতিকে ৩৫৬ নম্বর ধারা প্রয়োগের পরামর্শ দেয়।
৩. তৃতীয় ধাপ: রাষ্ট্রপতির ঘোষণা (Presidential Proclamation)
কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সুস্পষ্ট পরামর্শ পাওয়ার পর, রাষ্ট্রপতি ৩৫৬ নম্বর ধারার অধীনে একটি ঘোষণাপত্র (Proclamation) জারি করেন। এই ঘোষণা জারি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ওই নির্দিষ্ট রাজ্যের সমস্ত প্রশাসনিক ও শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে স্থানান্তরিত হয়ে যায়। তবে রাষ্ট্রপতি নিজে রাজ্য চালান না, তিনি তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে কেন্দ্র-নিযুক্ত রাজ্যপালের মাধ্যমে রাজ্যের শাসনভার পরিচালনা করেন। এই সময়ে রাজ্যের নির্বাচিত বিধানসভাকে হয় সাময়িকভাবে স্থগিত (Suspended) রাখা হয়, অথবা সম্পূর্ণ ভেঙে দেওয়া (Dissolved) হয়।
৪. চতুর্থ ধাপ: সংসদের অনুমোদন
৩৫৬ ধারার যাতে কোনওভাবেই রাজনৈতিক স্বার্থে স্বৈরতান্ত্রিক অপব্যবহার না হয়, তার জন্য সংবিধানে কড়া সুরক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। রাষ্ট্রপতির এই ঘোষণাকে অবশ্যই দেশের সংসদের উভয় কক্ষে (লোকসভা এবং রাজ্যসভা) পাশ করাতে হবে। ঘোষণা জারির ঠিক দুই মাসের মধ্যে এই সংসদীয় অনুমোদন পাওয়া বাধ্যতামূলক। সংসদ যদি এই প্রস্তাবে সিলমোহর দেয়, তবে প্রাথমিকভাবে ছয় মাসের জন্য সেই রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন বহাল থাকে।
৫. পঞ্চম ধাপ: বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনা (Judicial Review)
১৯৯৪ সালে সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী ‘এস. আর. বোম্মাই বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া’ (S.R. Bommai vs. Union of India) মামলার রায়ের পর থেকে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির বিষয়টি আর আইনি নজরদারির ঊর্ধ্বে নেই। সুপ্রিম কোর্ট চাইলে রাষ্ট্রপতির এই ঘোষণার আইনি ও সাংবিধানিক বৈধতা খতিয়ে দেখতে পারে। শীর্ষ আদালত পর্যালোচনা করে দেখে যে, রাষ্ট্রপতি শাসন জারির সিদ্ধান্তটি সত্যিই কোনও বস্তুনিষ্ঠ এবং প্রাসঙ্গিক উপাদানের (যেমন নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ রিপোর্ট) ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়েছে কি না, নাকি এর পেছনে নিছকই কোনও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা উদ্দেশ্য লুকিয়ে রয়েছে।
ঠিক কোন পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনকে আসরে নামতে হয়?
সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের মূল দায়িত্ব হল দেশের সমস্ত নির্বাচনের "তত্ত্বাবধান, নির্দেশনা এবং নিয়ন্ত্রণ" করা। কমিশন কেবল তখনই রাষ্ট্রপতি শাসনের মতো চরম পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেয়, যখন একটি রাজ্যের পরিবেশ এতটাই বৈরী, হিংসাত্মক বা খণ্ডিত হয়ে পড়ে যে সেখানে গণতন্ত্রের নিজস্ব শ্বাস নেওয়ার জায়গা থাকে না। মূলত নিচের পরিস্থিতিগুলিতে এই চরম পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে:
নির্বাচন চলাকালীন আইনশৃঙ্খলার চূড়ান্ত অবনতি: নির্বাচন চলাকালীন যদি দেখা যায় যে রাজ্যের শাসকদল বা সরকার স্বয়ং ব্যাপক নির্বাচনী হিংসা, বুথ দখল, অথবা ব্যালট বা নির্বাচনী নথিপত্র ধ্বংসের মতো ঘটনায় জড়িয়ে পড়েছে, এবং স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ভোট প্রক্রিয়াকে নিরাপত্তা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ বা অস্বীকার করছে, তখন নির্বাচন কমিশন সোজা ভাষায় জানিয়ে দিতে পারে যে ওই রাজ্যে সাংবিধানিক পরিকাঠামো সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট করাতে না পারার কারণে তারা ৩৫৬ ধারার দ্বারস্থ হতে পারে।
ত্রিশঙ্কু বিধানসভা এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থা (Political Deadlock): অনেক সময় নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর এমন এক খণ্ডিত জনাদেশ বা ফলাফল সামনে আসে, যেখানে কোনও একটি একক দল বা জোট সরকার গড়ার মতো প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে পারে না। এমন রাজনৈতিক অচলাবস্থার জেরে সরকার গঠন অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে, এবং ব্যাপক দলবদল বা দুর্নীতিগ্রস্ত ‘ঘোড়া কেনাবেচা’ (Horse-trading) রুখতে রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়। একটি নিরপেক্ষ প্রশাসন নিশ্চিত করে পুনরায় একটি সুস্পষ্ট জনাদেশ না আসা পর্যন্ত এই ব্যবস্থা বহাল থাকে।
১ বছরের মেয়াদ বৃদ্ধির নিয়ম (The 1-Year Extension Rule): এই নির্দিষ্ট ক্ষেত্রটিতে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা আক্ষরিক অর্থেই চূড়ান্ত। সাধারণ নিয়মে, একটি রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত বাড়ানো যেতে পারে। কিন্তু, ১৯৭৮ সালের ৪৪তম সংবিধান সংশোধনী আইন অনুযায়ী, এই মেয়াদ এক বছরের বেশি (সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত) বাড়াতে হলে দুটি বিশেষ শর্তের মধ্যে অন্তত একটি পূরণ হতে হবে। এক, দেশে জাতীয় জরুরি অবস্থা (National Emergency) জারি থাকতে হবে। অথবা দুই, খোদ নির্বাচন কমিশনকে এই মর্মে শংসাপত্র বা সার্টিফিকেট দিতে হবে যে, ওই রাজ্যে এমন এক চরম ও প্রতিকূল পরিস্থিতি বিরাজ করছে যার কারণে সাধারণ নির্বাচন পরিচালনা করা কার্যত অসম্ভব। কমিশনের এই শংসাপত্র ছাড়া এক বছরের বেশি রাষ্ট্রপতি শাসন জারি রাখা যায় না।
প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা অন্য সঙ্কটের কারণে নির্বাচন স্থগিত: বিধানসভার মেয়াদ শেষ হওয়ার ঠিক আগে যদি কোনও রাজ্যে অভূতপূর্ব মাত্রার প্রাকৃতিক বিপর্যয়, মহামারী, বা যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়, যার ফলে ভোটগ্রহণ আক্ষরিক অর্থেই অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন নির্বাচন কমিশনের ভোট করাতে পারার অক্ষমতাই রাষ্ট্রপতি শাসন জারির মূল কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, ৩৫৬ নম্বর ধারার প্রয়োগে নির্বাচন কমিশনের অন্তর্ভুক্তি হল ভারতীয় সংবিধানের সবচেয়ে শক্তিশালী ‘সার্কিট ব্রেকার’ বা সুরক্ষাকবচ। এটি এমন একটি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে ভারতীয় রাষ্ট্রযন্ত্র স্বীকার করে নেয় যে, সংশ্লিষ্ট রাজ্যে স্থানীয় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে বিকল হয়ে পড়েছে, এবং গণতন্ত্রকে পুনরায় ট্র্যাকে ফেরাতে কেন্দ্রীয় সরকারকে হস্তক্ষেপ করে গোটা ব্যবস্থাটিকে একবার 'রিসেট' (Reset) করতে হবে। এটি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক হাতিয়ার নয়, বরং ভারতের গণতান্ত্রিক আত্মাকে বাঁচিয়ে রাখার শেষ ও চরমতম অস্ত্র।
0 মন্তব্যসমূহ