ভোটের ডিউটিতে থাকা সাত আধাসেনা জওয়ান স্থানীয় তৃণমূল নেতার বাড়ির ইফতারে যোগ দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ। ছবি ভাইরাল হতেই নড়ে বসল কমিশন। দু'জন গেলেন হেফাজতে, পাঁচজন রাজ্যছাড়া।
মানুষের ভাষা | নিউজ ডেস্ক
কলকাতা, ২৬ মার্চ: ভোটের আগে পশ্চিমবঙ্গে কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়ে এত কড়াকড়ি, সেটা এই ঘটনাটা না জানলে বোঝা মুশকিল। মুর্শিদাবাদ জেলার নিমতিতা এলাকায় একটি ইফতার অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন সাত জন কেন্দ্রীয় আধাসেনা (CAPF) জওয়ান — যাঁরা তখন ভোটের ডিউটিতে ছিলেন। ঘটনার ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তেই কমিশন তড়িঘড়ি তদন্ত শুরু করল। আর তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর বুধবার কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হল।
সাত জনের মধ্যে দু'জনকে আধাসেনার হেফাজতে রাখা হয়েছে এবং বাকি পাঁচজনকে রাজ্যের বাইরে বদলি করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সকলের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঘটনা কবের, কোথায়?
ঘটনাটি ঘটেছিল ৬ মার্চ, রমজান মাসের ১৫তম রোজার দিনে। মুর্শিদাবাদ জেলার জঙ্গিপুর মহকুমার সুতি বিধানসভা এলাকার অন্তর্গত নিমতিতায়। নিমতিতার শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান আলিয়ারা বিবি এবং তাঁর স্বামী, স্থানীয় তৃণমূল সভাপতি সামিউল হক — এই দম্পতির আয়োজনে ইফতার হয়েছিল বলে অভিযোগ।
ইফতারে স্থানীয় রাজনীতিক থেকে সাধারণ মানুষ ছিলেন। আর তার মাঝে ছিলেন ওই সাত জওয়ানও — যাঁদের সেই সময় ডিউটিতে থাকার কথা।
ছবি তোলা হয়েছিল। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছিল। আর সেই ছবিই কাল হল জওয়ানদের।
কমিশনের নিয়ম কী বলে?
নির্বাচন কমিশনের নিয়ম এ ব্যাপারে একেবারে স্পষ্ট। ভোটের ডিউটিতে মোতায়েন কর্মীরা কোনও সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারবেন না এবং স্থানীয় কোনও ব্যক্তির কাছ থেকে কোনওরকম আতিথেয়তা গ্রহণ করতে পারবেন না।
কমিশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্তা বলেন, "কেন্দ্রীয় বাহিনীকে মোতায়েনের এলাকায় যে কোনও সামাজিক বা সামুদায়িক অনুষ্ঠান থেকে কঠোরভাবে দূরে থাকতে হবে। এ ধরনের বিচ্যুতিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়।" কমিশনের বক্তব্য, কেন্দ্রীয় বাহিনী নিরপেক্ষভাবে কাজ করবে — কোনও স্থানীয় পক্ষের সঙ্গে তাদের কোনও যোগাযোগ থাকবে না।
জওয়ানদের দাবি আলাদা
অবশ্য অভিযুক্ত জওয়ানরা ঘটনার ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁদের দাবি, ইফতারটি বাইরে কোনও বাড়িতে হয়নি — হয়েছে বিএসএফ ক্যাম্পের ভেতরেই। আর স্থানীয় প্রতিনিধিদের সেখানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, তাঁরা বাইরে থেকে যাননি।
কিন্তু কমিশন সেই যুক্তি মানেনি। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরেই কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হয়। বিভাগীয় তদন্তে দোষ প্রমাণিত হলে আরও কড়া শাস্তির সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানা গেছে।
শাস্তির পরিসর
কমিশন আলাদা মাত্রায় শাস্তি দিয়েছে। তিন জনকে সাত দিনের আধাসেনা জেলহাজতে রাখা হয়েছে। দু'জন পেয়েছেন আনুষ্ঠানিক সতর্কবার্তা। বাকি দু'জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত চলছে, আরও ব্যবস্থা নেওয়া হবে পরে।
একটা বিষয় লক্ষণীয় — এর আগে পশ্চিমবঙ্গে মোতায়েন কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে এত দ্রুত এবং এত কঠোর ব্যবস্থা খুব কমই দেখা গেছে।
মুর্শিদাবাদ কেন সংবেদনশীল?
মুর্শিদাবাদ শুধু ভৌগোলিকভাবে সীমান্তবর্তী জেলা নয়, রাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত উত্তপ্ত। ২০২৫ সালের এপ্রিলে এই জেলায় সাম্প্রদায়িক অশান্তি হয়েছিল। সেই পরিপ্রেক্ষিতে এবারের ভোটে এই জেলায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে অনেক বেশি সতর্ক কমিশন।
সূত্রের খবর, ৩০ মার্চের মধ্যে রাজ্যে আরও ৩০০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী আসবে। তার মধ্যে শুধু মুর্শিদাবাদ জেলায় মোতায়েন থাকবে ১৩ কোম্পানি।
কেন এত জোর দেওয়া হচ্ছে এই জেলায়? কারণ মুর্শিদাবাদে মুসলিম ভোটারের সংখ্যা ৬৬ শতাংশেরও বেশি। রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বলেই এখানে যে কোনও ঘটনা দ্রুত রাজনৈতিক রং পায়।
কমিশনের নজরদারি ব্যবস্থা
এই ঘটনা শুধু সাত জন জওয়ানের শাস্তির গল্প নয়। এটা বলছে কমিশন কতটা খুঁটিয়ে নজর রাখছে।
কেন্দ্রীয় বাহিনীর গাড়িতে রিয়েল-টাইম জিপিএস ট্র্যাকিং চালু হয়েছে। প্রতিদিনের চলাফেরা ও যোগাযোগের বাধ্যতামূলক রিপোর্ট দিতে হচ্ছে। এর পাশাপাশি র্যান্ডম পরীক্ষাও চলছে। জওয়ানদের বডি ক্যামেরাও পরতে হচ্ছে।
কমিশনের এক কর্তা বলেছেন, "বাহিনী সঠিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে কিনা, রুট মার্চ ঠিকমতো হচ্ছে কিনা এবং মাঠে তাদের মেলামেশার ধরন — সব কিছুই কমিশন ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।"
এই নজরদারির জালেই ধরা পড়েছে নিমতিতার ঘটনা।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক তরঙ্গ উঠেছে। তৃণমূলের অভিযোগ, ঘটনাটিকে অযথা বড় করে দেখানো হচ্ছে। তাদের দাবি, স্থানীয় পঞ্চায়েত প্রধানের সঙ্গে জওয়ানদের মেলামেশা স্বাভাবিক মানবিক সৌজন্যের অংশ ছিল, তাতে কোনও অসৎ উদ্দেশ্য ছিল না।
বিজেপি অবশ্য একেবারে উল্টো কথা বলছে। তাদের দাবি, তৃণমূল পরিকল্পিতভাবে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে। এই ঘটনাকে তারা রাজ্যের 'ভোট কারচুপির ষড়যন্ত্র' বলে চিহ্নিত করতে চাইছে।
মাঠের বাস্তবতা অবশ্য এত সরল নয়। ইফতার একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান। রমজান মাসে ইফতারে যোগ দেওয়া মানে রাজনৈতিক পক্ষ নেওয়া — এই যুক্তি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু কমিশনের নিয়মের কাছে সেই যুক্তি ধোপে টেকেনি।
নিরপেক্ষতার মানদণ্ড
পশ্চিমবঙ্গের ভোটে কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়ে আলোচনা বহু পুরনো। রাজ্য সরকার বরাবর বলে এসেছে, কেন্দ্রীয় বাহিনী পক্ষপাতিত্ব করে। কেন্দ্র ও বিজেপি বলে, রাজ্য পুলিশ ন্যায্য ভোট হতে দেয় না।
এই দ্বন্দ্বের মাঝে কমিশন এবার যা করল — সাত জন জওয়ানকে শাস্তি দিল, এবং সেই শাস্তি তারা দিল তৃণমূল নেতার আয়োজনে অংশ নেওয়ার অভিযোগে — সেটা একটা বার্তা দিচ্ছে। বার্তাটা হল, কমিশন কাউকে ছাড় দেবে না।
ভোটের আগেই রাজ্যে ৪৮০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। দুই দফায় ভোট — ২৩ এবং ২৯ এপ্রিল — এই বিশাল বাহিনীকে নিরপেক্ষ রাখা কমিশনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
নিমতিতার ঘটনা সেই চ্যালেঞ্জের একটা ছোট্ট পরীক্ষা ছিল। কমিশন পাস করেছে বলাই যায়।
২৯৪ আসনের বিধানসভায় ভোট হবে দুই দফায়। ফল আসবে ৪ মে। তার আগে রাজ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতি এবং তাদের আচরণ — দুটোই রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে।
0 মন্তব্যসমূহ