Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

Recent in Home

'এনার্জি লকডাউন' কী? কোভিডের মতো বিধিনিষেধ আবার আসছে? আসল সত্যিটা কী

 


মার্কিন-ইজরায়েল-ইরান যুদ্ধে হরমুজ প্রণালী বন্ধ। বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ থমকে গেছে। ভারতে গ্যাসের সিলিন্ডারের দাম বাড়ছে, লম্বা লাইন পড়ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রেন্ড হচ্ছে 'এনার্জি লকডাউন'। কিন্তু আদতে কী হচ্ছে?


মানুষের ভাষা | নিউজ ডেস্ক

কলকাতা, ২৬ মার্চ: কোভিডের পর থেকে 'লকডাউন' শব্দটা মানুষের মাথায় একটা বিশেষ জায়গা নিয়ে বসে আছে। সেই শব্দটার সঙ্গে 'এনার্জি' জুড়ে দিতেই সোশ্যাল মিডিয়ায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব, এক্স — সর্বত্র একই প্রশ্ন। 'এনার্জি লকডাউন' কি আসছে? পেট্রোল পাওয়া যাবে তো? রান্নার গ্যাস থাকবে?

সত্যিটা হল — 'এনার্জি লকডাউন' কোনও সরকারি পরিভাষা নয়। এটা কোনও দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেনি। কিন্তু এই শব্দের পিছনে যে বাস্তব সঙ্কট রয়েছে, সেটা একেবারে সত্যি। এবং সেটা ভারতের রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।


হরমুজ প্রণালী: বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ বন্ধ

গোটা বিষয়টা বুঝতে হলে একটু পিছনে যেতে হবে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল ইরানে সমন্বিত বিমান হামলা চালায়। সেই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেই নিহত হন। এর পাল্টায় ইরান পারস্য উপসাগরের দেশগুলোয় ও ইজরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ ঘোষণা করে।

হরমুজ প্রণালী বিশ্বের একমাত্র সমুদ্রপথ যা পারস্য উপসাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করে। প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে যায়, যা বিশ্বের মোট সামুদ্রিক তেল বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ। এই পথ বন্ধ মানে সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাকের তেল ও গ্যাস রপ্তানি কার্যত বন্ধ।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA) জানিয়েছে, এটি বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় তেল সরবরাহ বিপর্যয়। হরমুজ দিয়ে তেলের প্রবাহ দৈনিক ২ কোটি ব্যারেল থেকে নেমে এসেছে প্রায় শূন্যের কাছে। উপসাগরীয় দেশগুলো মিলিয়ে উৎপাদন কমে গেছে দৈনিক কমপক্ষে ১ কোটি ব্যারেল।

'এনার্জি লকডাউন' কথাটা এল কোথা থেকে?

IEA সরকারগুলোকে জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য কিছু পরামর্শ দিয়েছে। বাড়ি থেকে কাজ করা, গাড়ির গতিসীমা কমানো, গণপরিবহন ব্যবহার এবং অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ বন্ধ রাখার মতো পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই পরামর্শগুলো পড়তে অনেকটা কোভিডের সময়ের বিধিনিষেধের মতো।

সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা এই দুটো জিনিস এক করে দিলেন। IEA-র পরামর্শ + কোভিড স্মৃতি = 'এনার্জি লকডাউন'। শব্দটা ভাইরাল হতে সময় লাগল না।

গত ২৪ মার্চ ভারতে 'Energy Lockdown India' শব্দটির গুগল সার্চ হঠাৎ বিপুলভাবে বেড়ে যায় — ঠিক কোভিডের ছয় বছর পর। মানুষ খুঁজছেন কী হবে, কতটুকু মজুত রাখতে হবে, পেট্রোল পাওয়া যাবে কিনা।

কিন্তু বাস্তবে এটা কোভিড লকডাউনের মতো নয়। কোভিডে মানুষকে ঘরে বন্ধ রাখা হয়েছিল সংক্রমণ রোখার জন্য। এনার্জি সঙ্কটে মানুষ ঘরে থাকতে পারছেন, তবে রান্নার গ্যাস পেতে সমস্যা হচ্ছে, পেট্রোলের দাম বাড়ছে।

বিশ্বের কোন দেশ কী করছে?

ফিলিপিন্সে সরকারি কার্যালয়গুলো চার দিনের কর্মসপ্তাহে চলে গেছে। অফিসে এয়ার কন্ডিশনার ২৪ ডিগ্রির নিচে নামানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে, লাঞ্চ বিরতিতে কম্পিউটার বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ইউরোপে পরিস্থিতি গুরুতর। ডাচ TTF গ্যাস বেঞ্চমার্ক মার্চের মাঝামাঝিতে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে €৬০/MWh ছাড়িয়ে গেছে। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার কমানোর পরিকল্পনা পিছিয়ে দিয়েছে। যুক্তরাজ্যে মুদ্রাস্ফীতি ৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শ্রীলঙ্কা, কেনিয়া, মায়ানমারে পেট্রোলের রেশনিং চালু হয়েছে। মিশরে শপিং মল ও রেস্তোরাঁ আগেভাগে বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এগুলো কোভিড লকডাউন নয়, কিন্তু বিধিনিষেধ ঠিকই আছে।

ভারতে কী হচ্ছে?

ভারতের রান্নাঘরে এই যুদ্ধের আঁচ সবচেয়ে বেশি লেগেছে।

ভারতের ৯১ শতাংশ LPG আসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। কাতার একা দেয় প্রায় ৩৪ শতাংশ, UAE দেয় ২৬ শতাংশ। হরমুজ বন্ধ হওয়ার পর থেকে এই সরবরাহ কার্যত বন্ধ।

৭ মার্চ থেকে দিল্লিতে ১৪.২ কেজির গার্হস্থ্য সিলিন্ডারের দাম ৬০ টাকা বেড়ে ৯১৩ টাকা হয়েছে। বাণিজ্যিক ১৯ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১১৫ টাকা বেড়েছে।

কালোবাজারে ১৪.২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে। ভারতজুড়ে গ্যাস বিতরণ কেন্দ্রের সামনে লম্বা লাইন পড়েছে। ইনডাকশন স্টোভের চাহিদা হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে — Amazon-এ বিক্রি ৩০ গুণ বেড়ে গেছে।

বাণিজ্যিক LPG বরাদ্দ প্রাথমিকভাবে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরু, কোচির মতো শহরে হাজার হাজার রেস্তোরাঁ ও হোটেল বন্ধ হয়েছে বা কাঠের উনুনে ফিরে গেছে।

সরকার Essential Commodities Act প্রয়োগ করে গ্যাস বিতরণের একটি অগ্রাধিকারের তালিকা তৈরি করেছে। প্রথমে গার্হস্থ্য পাইপড গ্যাস ও পরিবহনের CNG, তারপর সার কারখানা, তারপর শিল্প প্রতিষ্ঠান। হোটেল-রেস্তোরাঁ সবার শেষে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সংসদে বলেছেন, পরিস্থিতি নজরদারিতে রয়েছে এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন স্বাভাবিক রাখাই সরকারের লক্ষ্য। তবে তিনি সতর্ক করেছেন, চলমান সঙ্কটের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে।

তেলের দাম কোথায় যাচ্ছে?

২ মার্চ ব্রেন্ট ক্রুড ছিল ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলার। ৯ মার্চের মধ্যে সেটা বেড়ে ১২০ ডলার ছাড়িয়েছে — এক সপ্তাহেরও কম সময়ে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালী যদি আরও কয়েক সপ্তাহ বন্ধ থাকে, তেলের দাম ১০০ ডলার পার করবে। সেক্ষেত্রে আমেরিকায় গ্যাসোলিনের দাম গ্যালনপ্রতি ৩.৫০ ডলার ছুঁয়ে যেতে পারে এবং মুদ্রাস্ফীতি দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

১৯৭০-এর সঙ্গে তুলনা কতটা সঠিক?

অনেকে এই সঙ্কটকে ১৯৭৩ সালের তেল সঙ্কটের সঙ্গে তুলনা করছেন। সেটা অংশত ঠিক, অংশত বাড়িয়ে বলা।

IEA জানাচ্ছে, ১৯৭০-এর দশকের সঙ্কটে তেল সরবরাহ কমেছিল প্রায় ১ কোটি ব্যারেল। এবার সেটা ২ কোটি ব্যারেলেরও বেশি। পরিমাণের দিক থেকে এটি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সরবরাহ বিপর্যয়। কিন্তু বিশ্ব এখন নবায়নযোগ্য শক্তিতে অনেক বেশি নির্ভরশীল, সৌরশক্তি ও বায়ুশক্তির ব্যবহার বেড়েছে। তাই ধাক্কাটা সামলানোর ক্ষমতাও আগের চেয়ে বেশি।

তাহলে 'এনার্জি লকডাউন' আসবে?

সহজ উত্তর — না, কোভিডের মতো ঘরবন্দি হওয়ার পরিস্থিতি নেই।

কোনও দেশই আনুষ্ঠানিকভাবে 'এনার্জি লকডাউন' ঘোষণা করেনি। এই শব্দটি মূলত সোশ্যাল মিডিয়ার তৈরি, বাস্তব নীতিগত পদক্ষেপের অংশ নয়। কিন্তু এটাও ঠিক যে জ্বালানির সাশ্রয়, রেশনিং এবং বিভিন্ন বিধিনিষেধ একাধিক দেশে কার্যকর হয়েছে।

ভারতে এখনও পেট্রোল পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু ভারতের কাছে মাত্র ২৫ দিনের কাঁচা তেলের মজুত রয়েছে — প্রধান আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম। সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে চাপ বাড়বে।

শেষ কথা, এই মুহূর্তে আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই। কিন্তু সতর্ক থাকার যথেষ্ট কারণ আছে। বিশ্ব একটা বড় জ্বালানি সঙ্কটের মুখে। সেটা কতদিন চলবে, এবং ভারতের উপর কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটা নির্ভর করছে হরমুজ প্রণালী কবে খুলবে তার উপর।

আর সেই উত্তর এখনও কারো কাছে নেই।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Comments

Ad Code