Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

Recent in Home

জ্বালানি সংকটে মোদীর জরুরি বৈঠক, ডাক পেলেন না মমতা


 

পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ থেকে হরমুজ প্রণালী বন্ধ, গোটা বিশ্বে জ্বালানি সংকট। সংসদে মোদী কোভিডের কথা তুলতেই সোশ্যাল মিডিয়ায় 'লকডাউন' আতঙ্ক। ভোটমুখী পাঁচ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের বৈঠকে না ডাকায় বাদ গেলেন মমতাও। কিন্তু সত্যিই কি ফের লকডাউন আসছে?


মানুষের ভাষা | নিউজ ডেস্ক


 কলকাতা, ২৭ মার্চ: ২০২০ সালের মার্চ মাসের সেই রাতটা অনেকে ভুলতে পারেননি। হঠাৎ টেলিভিশনের পর্দায় প্রধানমন্ত্রী, চব্বিশ ঘণ্টার নোটিশে সারা দেশ বন্ধ। সেই স্মৃতি এখনও তাজা। আর তাই এবার যখন সংসদে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বললেন, কোভিডের মতো প্রস্তুত থাকতে হবে — সোশ্যাল মিডিয়ায় আতঙ্ক ছড়াতে মিনিটও লাগল না।

মার্চ ২৪ তারিখে গুগলে 'Lockdown in India 2026' এবং 'India lockdown again' — এই শব্দগুলো রাতারাতি ট্রেন্ডিংয়ে চলে এল। ঠিক সেই দিনটা, যেদিন ছয় বছর আগে মোদী প্রথম লকডাউন ঘোষণা করেছিলেন। তারিখের এই কাকতাল আর প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের মিল মিলিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া ফুটে উঠল।

কিন্তু আসলে কী হচ্ছে? লকডাউন আসছে কি? আর ভোটমুখী রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা কেন বৈঠকে ডাক পেলেন না?

মোদী ঠিক কী বলেছিলেন?

প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেছিলেন যে ভারত কোভিড মহামারির সময়েও একজোট হয়ে কঠিন পরিস্থিতি সামলেছে এবং এবারও একইভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে। কিন্তু তিনি লকডাউন, কার্ফু বা চলাফেরায় কোনও বিধিনিষেধের কথা একটি শব্দেও বলেননি।

লোকসভায় মোদী বলেন, পশ্চিম এশিয়ার এই যুদ্ধ বিশ্বের জন্য 'অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ' তৈরি করেছে। এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। রাজ্যসভায় গিয়েও একই কথা বলেন। আর সেই 'কোভিডের মতো' তুলনাটাই মানুষের মাথায় সরাসরি লকডাউনের ছবি এঁকে দিল।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতায় 'প্রস্তুত থাকুন' কথাটা শুনে ঘণ্টার মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়া ভরে গেল লকডাউনের গুজবে। তারপর সর্বদলীয় বৈঠকের খবর এল। তারপর জানা গেল মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গেও বৈঠক হবে। এই ধারাবাহিক ঘটনাগুলো মিলিয়ে অনেকের কাছে মনে হল, কোভিডের প্রথম দিনগুলোর মতো কিছু একটা হতে চলেছে।

আগে সর্বদলীয় বৈঠক, এখন মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক

বুধবার প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সভাপতিত্বে একটি সর্বদলীয় বৈঠক হয়েছে। সেখানে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি এবং ভারতের উপর তার প্রভাব নিয়ে বিরোধী দলগুলোকে বিস্তারিত জানানো হয়। ক্যাবিনেট কমিটি অন সিকিউরিটির সমস্ত সদস্য — স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, বিদেশমন্ত্রী এস জয়শংকর এবং অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন — বৈঠকে ছিলেন।

বিদেশসচিব বিক্রম মিশ্রি এবং পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী হরদীপ সিং পুরি বিস্তারিত পরিস্থিতি তুলে ধরেন। তাঁরা জানান, ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা এখনও স্থিতিশীল — অপরিশোধিত তেল, এলপিজি এবং সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। বেশ কিছু জাহাজ ইতিমধ্যে ভারতে পৌঁছেছে এবং আরও আসছে।

এরপর শুক্রবার সন্ধ্যায় ভিডিয়ো কনফারেন্সের মাধ্যমে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক ডাকলেন প্রধানমন্ত্রী। এই বৈঠকে 'টিম ইন্ডিয়া' মনোভাবে কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয় নিয়ে আলোচনা হবে।

মমতা কেন ডাক পেলেন না?

এখানেই আসছে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নটা।

সূত্রের খবর, ভোটমুখী পাঁচটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা এই বৈঠকে থাকছেন না। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, কেরলের পিনারাই বিজয়ন, তামিলনাড়ুর এম কে স্ট্যালিন, অসমের হিমন্ত বিশ্বশর্মা এবং পুদুচেরির মুখ্যমন্ত্রী — এই পাঁচজনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।

কারণটা সহজ। ভোটমুখী রাজ্যে নির্বাচনী আচরণবিধি চালু, তাই সেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর বদলে মুখ্যসচিবকে ডাকা হয়েছে।

কিন্তু রাজনৈতিকভাবে বিষয়টা এত সহজ নয়। মমতা এবং মোদীর মধ্যে সম্পর্ক এমনিতেই ভালো নয়। এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গে তীব্র ভোটের প্রচার চলছে। আর এই পরিস্থিতিতে মোদীর ডাকা জাতীয় সংকটের বৈঠক থেকে মমতার বাদ পড়া — রাজনৈতিক মহলে এ নিয়ে আলোচনা হবেই।

মমতা আগেই কেন্দ্রের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদ করেছেন। তাঁর অভিযোগ, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় মোদী সরকার মুখ লুকিয়েছে, আর সব দায় রাজ্যের উপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই বৈঠকে না ডাকায় তৃণমূলের সেই অভিযোগ আরও জোরালো হওয়ার সুযোগ পেল।

লকডাউনের গুজব কতটা সত্যি?

একটাই উত্তর — লকডাউন নেই, আসছেও না।

কেন্দ্রীয় সরকার স্পষ্ট করে দিয়েছে, কোনও লকডাউনের পরিকল্পনা নেই। পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক ও বিদেশ মন্ত্রক যৌথভাবে জানিয়েছে যে দেশের জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল।

এটা স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা নয়, এটা অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। কোভিডের মতো চলাফেরায় বিধিনিষেধ আনার কোনও কারণ বা পরিকল্পনা নেই।

তাহলে গুজব এত দ্রুত ছড়াল কেন?

তিনটে কারণ একসঙ্গে মিলে গেছে। প্রথমত, মোদীর কোভিড-তুলনা মানুষের পুরনো আতঙ্ক জাগিয়ে দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, IEA-র স্বেচ্ছামূলক পরামর্শগুলোকে 'বাধ্যতামূলক বিধিনিষেধ' বলে ভুলভাবে প্রচার করা হয়েছে। তৃতীয়ত, মার্চ ২৪ — ঠিক ছয় বছর আগে লকডাউনের দিন — তারিখটা মানুষের আবেগকে আরও উসকে দিয়েছে।

মমতার সতর্কতা, কিন্তু লকডাউন নয়

পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জনসভা থেকে বললেন, পাওয়ার অ্যালার্ট মানেই লকডাউন নয়। রাজ্য সরকার এলপিজি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে নিজস্ব এসওপি জারি করেছে। তিনি স্পষ্ট করলেন, ২০২১ সালে কোভিডের সময় বাংলা যেভাবে পরিস্থিতি সামলেছে, এবারও সেভাবেই সামলাবে। লকডাউন-টকডাউন হবে না, মানুষকে ঘরবন্দি করা হবে না।

তাঁর কথায় রাজনীতির আভাস স্পষ্ট। নির্বাচনের মাঝে ভয় না দেখিয়ে মানুষকে আশ্বস্ত করাটাই এখন তাঁর কৌশল।

আসল পরিস্থিতি কোথায়?

ভারতের কাছে প্রায় ৬০ দিনের অপরিশোধিত তেলের মজুত রয়েছে। এলপিজির মজুত তুলনামূলকভাবে কম, মাত্র পাঁচ দিনের। কিন্তু সরকার বিকল্প পথে সরবরাহ নিশ্চিত করছে। আমেরিকা, রাশিয়া এবং অ-উপসাগরীয় দেশ থেকে আমদানি বাড়ানো হচ্ছে। কেপ অফ গুড হোপ পথে দীর্ঘ সমুদ্রপথে জাহাজ আসছে।

দাম বাড়বে, সরবরাহে কিছুটা দেরি হবে, কোনও কোনও এলাকায় সমস্যা হবে। কিন্তু মানুষকে ঘরে বন্ধ করার পরিকল্পনা কারও নেই।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Comments

Ad Code